#শ্রাবণ_মেঘের_উপাখ্যান —৪২
#তাসনিম_লিজা
----কপি নিষিদ্ধ!
---- আই লাভ ইউ!
স্তব্ধ মাহিরা। পড়তে নিয়েও নিজেকে সামলে উঠে
দাঁড়ালো সে। দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সামনে থাকা পুরুষটার দিকে। হতবাক দৃষ্টি মাহিরার। মানে কি থেকে কি বললো লোকটা? সিরিয়াসলি? সে তো তার সিনিয়র ভাইয়া হয়। ঘটনাটা তেমন একটা বড় নয়, কিছুক্ষণ আগে মেঘ ও তার ছানাপোনাদের দেখতে খুশিতে দ্বিতীয়তলায় আসছিলো মাহিরা। হাতে ফুলের বুকে যেখানে গোলাপ ফুল নেই। অন্য সব ফুল মিলিয়ে বানানো হয়েছে মধ্যে মেঘের প্রিয় বেলি ফুল দেওয়া ছিলো। মেয়েটা আনন্দে কোনোদিক খেয়াল না করেই হাঁট ছিলো। আকস্মিক কারোর সাথে ধাক্কা লেগে ফুলের বুকে ও সাথে নিজেও পড়ে যেতে নিলে কেউ একজন তাকে না ধরে ফুলের বুকে ধরে সেটাই তার সামনে নিয়ে উক্ত কথাটি বলে উঠলো। হতভম্ব মাহিরা৷ এখনো চোখ স্থির তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার লোকটার দিকে।
অতঃপর সেই আকস্মিক অনুভূতি মনের মধ্যে চেপে বলে উঠে মাহিরা,
---- আপনি কি নিজ জ্ঞানে আছেন রাতুল ভাইয়া? কি বলছেন আপনি এসব?
রাতুল নিজেই নিজের কথার উপর স্তব্ধ। মুখ ফসকে কি সত্যি কথা বেরিয়ে গেলো? আহ! মুখ রে যেখানে খুশি সেখানে মনের কথা বলতে নেই কেন বুঝিস না? নিজেকে নিজেই আচ্চা মতো বকা দিলো রাতুল। অতঃপর জোরপূর্বক হাসলো সে। বললো,
---- সরি! আসলে সরি বলতে গিয়েই তো আমার এই অবস্থা। কিছু মনে করো না মাহিরা। একজনকে অনেক ভালোবাসি তো বলতে পারিনি তাই প্রেকটিস করছিলাম। হঠাৎ তুমি এলে সরির জায়গায় আই লাভ ইউ বলে ফেলেছি। এই নাও তোমার ফুল!
মানেটা কি? প্রপোজ করলো নাকি এক্সপ্লেইন করলো বুঝলো না মাহিরা। ফুলটা নিয়ে মুচকি হেসে বললো,
---- ধন্যবাদ ভাইয়া। আর সরি ও। আমি ও দেখতে পাইনি।
---- ইট’স ওকে!
চলে যেতে নিলো মাহিরা। পিছু গেলো রাতুল ও।
সবাই চলে গিয়েছে দেখা করে রয়ে গিয়েছিলো রাতুল শ্রাবণের সাথেই।
---- তুমি কি রিলেশন করো?
দাঁড়িয়ে গেলো মাহিরা। পিছু তাকালো রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললো,
---- কেন?
রাতুল আগ্রহ নিয়ে বললো,
----- কেন জানতে পারি না?
মাহিরা হাসি মুখে বললো,
---- হ্যা।
চুপসে গেলো রাতুলের হাসিমাখা মুখখানা। বেলুনের মতো টাস করে হাওয়া হয়ে গেলো মনটা। মিনমনি গলায় বললো,
---- কে সে?
মাহিরার নির্লিপ্ত কণ্ঠ,
---- আপনাকে বলবো কেন?
---- চোখ গুলো উপরাতে হবে তো তাই। বলো ফাস্ট!
---- মানে?
---- কিছু না। ওর নাম্বার দাও।
মাহিরা কেবিনের সামনে এসে থামলো। বললো,
---- তাকে আমি ভালোবাসি। তবে তার নাম্বার আমার কাছে নেই। তাকে আমি দূর থেকেই পছন্দ করি। যাকে বলে ওয়ান সাইডেট লাভস স্টোরি! বুঝলেন?
ভেতরে চলে যায় মাহিরা। রাতুলের ভীষণ রাগ হয় এবং মন খারাপ ও হয়। কতদিন? যতোদিন থেকে মেঘের সাথে দেখেছে। রাতুল শ্রাবণের সাথে মেঘের কাছে গেলে মেয়েটাকে দেখতো সে। তার স্বভাব মেঘের মতোই৷ একটু আদুরে টাইপ শান্ত তবে মিশলে অনেক চঞ্চল হয়ে যায়। এতোদিন আড়াল রেখে যাকে একতরফা ভালোবেসেছে আজ অজুহাত দেখিয়ে প্রপোজ করে এসব কি জানতে পারলো রাতুল? মনের মধ্যে তীব্র ঝড় বয়তে লাগলো। চেহেরায় কাঠিন্যেতা ফুটে ওঠলো। নাহ তা তো হতে দেওয়া যাবে না। মাত্র কয়েকদিন পর রেজাল্ট দিবে তারপর সে জব নিবে বাবার ব্যবসা নয় নিজের যোগ্যতায় মেয়েটাকে তার প্রেমিকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। মাহিরার পরিবার অনেক ভালো কিন্তু বেশ পাওয়ারফুল। মানে কিছুটা ডাকাত টাইপের আর কি। জোর করা বা হেনস্তা করা ভালো না। আর তাদের পঞ্চপাণ্ডবের কেউ এমন না। হালকা মজা মাস্থি করে কিন্তু এতোটাও খারাপ না। বেরিয়ে যায় রাগে গজগজ করতে করতে রাতুল। জানতেই হবে কে সে যার সাথে মাহিরার রিলেশন আছে ৷
---- কংগ্রাচুলেশনস! বান্ধবী! আমাদের চড়ুইগুলো কোথায় রে?
বাহ সবাই এসে শুধু তাদেরই খোঁজে। সামান্য মন খারাপ করে বললো মেঘ,
---- বাহ বান্দুবি আমাকে না দেখেই তাদের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছেন? আমি তো বড্ড অভিমান করেছি।
হেঁসে উঠলো মাহিরা। ফুলের বুকে পাশে রেখে বললো,
---- আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না তাদের দেখতেই হবে।
---- এই যে মাহিরা তারা এসে গিয়েছে।
পিছনে তাকালো মাহিরা। রাতুল নিয়ে আসছে দুটো বেবি কট। মানে লোকটা যায়নি? এতোকিছু ভাবার সময় নেই কাছে এগিয়ে আসলো বেবিদের। দুচোখ ভরে দেখলো তাদের। হাত ছুঁইয়ে দিলো আলতো করে। খুশিতে গদোগদো হয়ে বললো,
---- ইশশ কি সুন্দর ছোট্ট পুতুল। আমার তো ইচ্ছে করছে একটা নিয়ে যায়। সারাক্ষণ আদর করি।
চুমু দিতে নিলে রাতুল থামিয়ে দিলো৷ বললো,
---- এই না না। ওদের চুমু খেয়ো না ওরা ছোট।
ভ্রুঁ কুঁচকে গেলো মাহিরার। রাতুলের দিকে তাকালো সে। প্রশ্ন করলো,
---- মানে? চুমু ও কি বড় ছোট দেখে খেতে হয় নাকি? তাহলে ঠিক কত বড় হলে চুমু খাবো?
---- আমার মতো মানে আমাকে?
---- কিছু বললেন?
---- নাহ! ওরা ছোট থাক চুমু খান পেট ভরে আমি যায় তাহলে।
বোকার মতো তাকিয়ে থাকে মাহিরা। রাতুল চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে চলে যায়।
মাহিরা সব বাদ দিয়ে বাবুদের সাথে কথা বলছিলো আর হাসছিলো৷ মেঘ বেড থেকে শুইয়ে দেখছিলো। মাহিরা নরম হাতে দুজনকে মেঘের পাশে এনে শুইয়ে দিলো। নার্স আসে বেবিদের খাওয়াতে হবে তাই মাকে সাহায্য করলো ফিডিং করাতে। মাহিরা জিজ্ঞেস করলো,
---- সবাই কোথায়? আর শ্রাবণ ভাইয়াকে ও দেখছি না।
শ্রাবণ বাসায় গিয়েছে জাহিদ আহমেদ নিজে জোর করে নিয়ে গিয়েছে। জামিলা একটু বেগম বাহিরে গিয়েছেন। রাতুল ছিলো এতোক্ষণ। যেহেতু বিপদের কোনো ভয় নেই সেহেতু এখন তারা নিরাপদ। মেঘ বললো,
---- সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। আর আমার ওনি না খেয়ে ছিলো। বাবা নিয়ে গিয়েছে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে তারপর আসবে।
---- আপনার ওনির মতে যদি, আমি ও একটা ওনি পেতাম তাহলে জীবনটা ধন্য হতো৷
---- চোখ কান খোলা রাখলেই ওনি কে পেয়ে যাবেন ম্যাডাম।
----- কোথায়? পাচ্ছি না তো?
মাহিরার কথায় মেঘ বললো,
---- আমার তো মনে হয় ওনি, ওনি হতে বেশি সময় লাগবে না।
---- কে ওনিটা আগে সেটা বল?
---- নাহ! আমি তো জানি না৷
---- তাহলে জানিস কিভাবে?
---- আন্দাজে ডিল মারলাম আরকি!
মাহিরা মৃদু রাগ দেখালো। বললো,
---- মজা করছিস আমার সাথে?
হাসলো মেঘ। মেয়েটা তারই মতো শান্ত ও চুপচাপ।
কিভাবে যেনো মিলে গেলো দুজনে। তাই তো দুজন
আজ ও মিলেমিশে আছে।
তারমধ্যে তড়িঘড়ি করে আসলো শ্রাবণ। মাহিরাকে দেখে মৃদু হেসে বললো,
---- কেমন আছো মাহিরা?
বাবুদের পাশ থেকে ওঠে দাঁড়ালো মাহিরা। হাসি মুখে বললো,
---- এখন আমি বিন্দাস আছি ভাইয়া আপনাদের
দুটো পুতুলকে দেখতে পেরে।
বলেই আবার ছোট্ট ছানাদের দিকে তাকালো। শ্রাবণের দৃষ্টি প্রথমে মেঘের দিকে অতঃপর মাহিরার কথাতে তাকালো মেঘের পাশে। নিজেও এগিয়ে গেলো তাদের কাছে। দু’চোখ ভরে দেখতে লাগলো ছানা দুটোকে। পাশে হাঁটু মুড়ে বসে রইলো। মাহিরা ও মেঘ শ্রাবণকে দেখছে, দেখছে প্রাণ ভরে কাঁদতে মানে ছেলেটা আনন্দে কেঁদে উঠছে বারবার। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু বাঁধহীন গড়িয়ে পড়ছে। মেঘ দেখছে তার প্রিয় পুরুষটার আনন্দ। এটাই বোধহয় লোকটার এই সততার পুরুষ্কার। ভালো মানুষের জীবনে ও ভালো হয়। মা বাবাকে হারিয়ে ও মা বাবা পেয়েছে এর চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে? হোক না ছোট সন্তান তো মা আর বাবা-ই হয় সবসময় বাবা মায়ের কাছে।
---- ভাইয়া কাঁদছেন কেন? আপনার তো সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা।
মাহিরা কি জানে কেন কাঁদছে শ্রাবণ। চোখ মুছে তৎক্ষনাৎ বলে উঠে শ্রাবণ,
---- কই না তো এমনি।
ছানা দুটো হাত পা নাড়িয়ে উঠলো। শ্রাবণ ও যেনো কেঁপে ওঠলো। খুশি হলো হাসিও ফুটলো ঠোঁটের কোণে। ইশ আর একটু বড় হলে তার সাথে কথা বলবে বাবা বলে ডাকবে। তার কোলে আসবে । তার বাড়িটা মনে হবে প্রাণ ফিরে পাবে।
খানিকক্ষণ থেকে অনেক গল্প করে মাহিরা চলে যায়। অবশ্য একা যায় না রাতুল হসপিটালের বাহিরে ছিলো সে অপেক্ষা করছিলো এবং জানার চেষ্টা ও করেছিলো সে কে সে কে বলে! মাহিরা কথা বলেনি। রাতুল রিকশা আনলে চুপচাপ চলে যায়। তাকিয়ে থাকে মাহিরার যাওয়ার পানে হতাশ ভঙ্গিতে রাতুল।
দিনটা কেটে গেলো শ্রাবণ মেঘের তাদের ছানাদের সামলাতে সামলাতেই। জাহিদ আহমেদ বার বার এসে দেখে যান। জামিলা বেগম খাবার নিয়ে আসেন মেঘের জন্য নরম যা ডক্টর খেতে বলেছেন তাই।
_____________________
হসপিটালে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু জাহাঙ্গীর আহমেদ সামান্য অসুস্থ হওয়ায় কারোর যাওয়া
হয়নি ঠিক করা হয়েছে বিকেলের দিকে যাবে। সেই কারনেই এখন আসা হলো হসপিটালে।
শ্রাবণ জাহাঙ্গীর আহমেদকে দেখে সালাম দিলো,
---- আসসালামু আলাইকুম আংকেল।
---- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কংগ্রাচুলেশনস শ্রাবণ বাবা হয়ে গেলে তো। অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছো অনেক দায়িত্ব কিন্তু,
শ্রাবণ মুচকি হাসলো। তিনি আবার ও বললেন,
---- কোথায় আমাদের মেয়ে আর নানাভাইরা?
---- আসুন আপনারা।
দিব্যকে দেখে শ্রাবণ এবার রাগ করলো না উল্টো পিছনে এসে বললো,
---- ভাইয়া আপনি এসেছেন? আপনাদের সংসার
জীবন কেমন চলছে?
দিব্য ম্লান হাসলো। দুঃখ নেই আর নেই কোনো আফসোস। তবু কোথাও একটা শূন্যতা রয়েই যায় যেখানে তার বউ থাকলে ও পূর্ণ হয় না। শ্রাবণের কাঁধে হাত রেখে বললো,
---- কেনো আসবো না শুনি? আমার বোন অসুস্থ আবার নতুন অতিথির আগমনে না চাইলে ও আসতে হতো। তুমি বারণ করলে ও আসতাম। আর রইলো আমরা কেমন আছি? তোমরা যেমন আছো আমরা ও তেমনই আছি শ্রাবণ।
শ্রাবণ মুচকি হাসলো। সে বেশ খুশি মানে তার জীবনটা আনন্দে ভরপুর বলা চলে। শ্রাবণ বললো,
---- আলহামদুলিল্লাহ! চলুন ভাইয়া তাদের মামার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না৷
শ্রাবণ নিজ দায়িত্বে নিয়ে গেলো কেবিনের ভেতরে। মেঘ বাবুদের খাইয়ে তাদের সাথে একটু ঘুমোতে নিয়েছিলো অমনিই বাহিরে কথা শব্দ পেয়ে চোখ মেলতেই চাচা চাচি ও দোয়াকে দেখতে পেলো। তারপরই দেখা মিললো দিব্যর৷ অবাক হয় মেঘ। কারন সাথে আছে শ্রাবণ ও তারা আবার হাসছে ও। যে লোকটা দিব্য ভাইয়াকে পছন্দ করতো না তা না মেঘের কারনে এড়িয়ে যেতো আজ তারা একসাথে?
---- মাশাল্লাহ!
---- কত কিউট দুজন তাই না আম্মু?
ফাইজা বেগম গলায় চেইন পড়িয়ে দিলেন তাদের মুখ দেখে। মেঘের দিকে তাকালেন তিনি৷ বললে,
---- মেঘ মা কেমন আছিস এখন?
মেঘ তখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের দেখছিলো। ধ্যান ভাঙে ফাইজা বেগম এর কথাতে।
বললো,
---- আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি চাচিমা।
---- আপু তোমাদের বেবি কিন্তু অনেক কিউট। আমাকে দিবা?
কি সুন্দর আবদার দিয়ে দিতে বলছে বাচ্চাকে। দিব্য কি বলবে বুঝলো না, মেয়েটা মাঝেমধ্যে বোকার মতো কি বলে নিজেও জানে না। বাবা মায়ের সামনে কিছু বলতে ও পারছে না। মেঘ হাসলো। দিব্য এগিয়ে এসে বললো,
---- তুমি নিজেই তো একটা বাচ্চা। আবার বাচ্চা সামলাবে?
বলেই নিজে ও তাদের মুখদর্শন করলো। পকেট থেকে দুটো সুন্দর চুড়ি বের করলো মেয়ের হাতে পড়িয়ে দিলো যত্ন করে। তারপর ছেলের জন্য একটা আংটি পড়িয়ে দিলো হাতে। ছোট্ট হাতখানায় জ্বলজ্বল করছে চুড়ি ও আংটি দুটো। জাহাঙ্গীর এগিয়ে এলেন মেঘের কাছে। বলেন,
---- হুট করেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম নয়তো কবে আসতাম। কেমন আছিস মা এখন?
---- আলহামদুলিল্লাহ ভালো বড়বাবা। আপনি ঠিক আছেন তো? অসুস্থ শরীর নিয়ে আসার কি খুব প্রয়োজন ছিলো?
তিনি জোর গলায় হাসি মুখে বলেন,
---- আমার মেয়ে নাতি নাতনিদের না দেখলে আমি সুস্থ হবো?
সবাই হেসে উঠলো। বাবুদের দেখলেন তিনি মন ভরে। সবার আনন্দ যেনো ঘরটা আনন্দপুড়ীতে রুপান্তরিত হলো।
চলবে.......