‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
৮.
সিয়ামকে পড়াতে এলে দুই পদের নাশতা জোটে। মামুন নিষেধ করেছে কয়েকবার। কেউ সে কথা কানে তোলেনি। নাশতা নিজের গতিতে এসে যাচ্ছে। মামুনের কাছে মনে হয় এই নাশতা তার জন্য ফিক্সড করা। অন্য কাউকে এই খাবার দেয়া হয় না। মনে করার অবশ্যি কারণ আছে। বাতাসে মিইয়ে যাওয়া চানাচুর আর বহু পুরোনো বিস্কুট খুবই বিশেষ ধরনের খাবার। যাদের বাড়িতে দিনে দুই তিনবার মার্সিডিজ ধরনের গাড়ির যাওয়া আসা চলে তাদের জন্য এটা বিশেষই বটে। ধারণা করাই যায় এই বাড়ির মেহমান কেমন ধরনের হবে। তাদের জন্য যে এই খাবার পরিবেশন করা হয় না সেটা যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবে। তাদের সবার মাঝে মামুন ব্যতিক্রম। ময়লা শার্ট গায়ে, খালি পকেটে যে কিভাবে এখানে সে জায়গা পেয়ে গেলো সেটা এক বিস্ময়ের বিষয়।
তাকে কখনোই চা দেয়া হয় না। তবে তার সামনেই সিয়ামকে বিশাল গ্লাস ভর্তি দুধ চা দেয়া হয়। ছেলেটা আবার দুধ চা না হলে পড়তে পারে না। মামুন ছাত্রের খাবার নিয়ে লোভ করে না। শুধু গ্লাসের দিকে তাকিয়ে টাকার ফিতায় নিজের অবস্থানটা দেখে নেয়।
আজও সেই একই নাশতা দেয়া হয়েছে। মামুন সেসব ঠেলে একপাশে সরিয়ে রাখল। দামী দামী জিনিসপত্র। টেবিল থেকে পড়ে ভেঙে গেলে মাসের বেতন থেকে ক্ষতিপূরণ রাখতে পারে। বলা যায় না।
সিয়াম শুরু থেকে বই খাতা সামনে নিয়ে বসে আছে। পড়া শুরু করার কোনো লক্ষণ নেই। মামুনের শরীরটা দুর্বল লাগছিল। ক্লাস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। দুপুরের খাবারটা খাওয়া হয়নি। এজন্যই বোধহয় এমন লাগছে। ভাবলো মামুন। সিয়ামকে দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘ পড়া শুরু করছো না কেনো?’
‘ আজকে পড়তে ইচ্ছা করছে না।’
‘ তোমার কখনোই পড়তে ইচ্ছা করে না। এটা নতুন কিছু না। শুরু করো। যেই হোমওয়ার্ক দিয়েছিলাম সেসব কি একটাও খুলে দেখেছো?’
‘ না।’ মাথা নাড়ল সিয়াম। মামুন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ বাবার টাকা আছে বলেই কি অপচয় করতে হবে?’
‘ আমি অপচয় করলাম কোথায়?’
‘ আমাকে টাকার বিনিময়ে রাখা হয়েছে। তোমাকে পড়ানো আমার কাজ। অথচ তুমি পড়ছো না। তোমার দিক থেকে টাকাটা অপচয় হচ্ছে না?’
‘ আপনি আমাকে পড়াতে পারছেন না।’
মামুন কথা বলল না। ছেলেটা বিশ্ব বেয়াদব। কিছুক্ষণ চুপ থেকে কড়া কণ্ঠে বলল, ‘ তুমি কি পড়া শুরু করবে?’
‘ না।’ সিয়ামের শান্ত জবাব।
‘ সিয়াম!’ টেবিলে হাত চাপড় দিলো মামুন। সিয়াম একটু কেঁপে উঠল।
‘ আমি কি এখানে তামাশা করতে আসি! কি মনে হয় আমাকে তোমার?’
সিয়াম উত্তর দিলো না। সে প্রায়ই এমন করে। তবে মামুন খুব একটা রাগে না। আজ যখন রেগেছে তার মানে মামুনের মেজাজ ভালো নেই। সেটাকে আরো ঘাটানো ঠিক মনে করলো না সিয়াম। দ্রুত বইয়ের পাতা উল্টাতে শুরু করলো। তবে সবটা দেখলেন সিয়ামের মা। ঘন্টাখানেক পেরিয়ে গেলে যখন মামুন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন তিনি এলেন। শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘ তোমাকে মাসে মাসে টাকা দেয়া হয় আমার ছেলেকে বকার জন্য না। তুমি ওর টিউটর। পড়া আদায় করে নেয়া তোমার কাজ। বকা দেয়া নয়।
‘ পড়া আদায় করার উপায় টা কি?’ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল মামুন। সিয়ামের উপরের রাগটা অনেকটা কমে গেছে। মেজাজ ততোটা উত্তপ্ত নেই।
‘ সেটা আমি বলব কিভাবে! তুমি জানো না?’ মহিলা নিজের ভেতর লুকানো রাগ প্রকাশ করলেন। মামুন স্বাভাবিক রইলো।
‘ সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাকাতে হয়। জানেন না?’
‘ বেয়াদব! মুখে মুখে তর্ক করার সাহস দেয় কে তোমাকে?’
মামুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শার্টের গোটানো হাতা ঠিক করে উঠে দাঁড়ালো। শক্ত কণ্ঠে বলল, ‘ খালা, আমি আপনার ছেলের টিচার। আপনার বাড়ির চাকর না। টাকার বিনিময়ে পড়াই বলে নিজের আত্মসম্মান কারো কাছে বন্ধক রাখিনি। সিয়ামের জন্য নতুন টিচার দেখবেন। আসি।’
মামুন চলে গেলো। সিয়ামের মা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলেন। দুই ঠোঁটের মাঝে ছোট্ট একটা ফাঁকাও তৈরি হয়ে গেছে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না ছেলেটা মাত্র কি বলে গেলো। কস্মিনকালেও তিনি ভাবেননি তার ভাষায় ফকির ধরনের ছেলেটা এতো টাকার টিউশনি ছেড়ে দিতে পারে।
সিয়াম কোনো অংশেই মায়ের চেয়ে কম নয়। বরং সন্তান হিসেবে মায়ের যোগ্য। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘ সব কিছুতে তোমার ঢোকা লাগে কেনো মা? স্যারকে যেভাবে পারো তুমি নিয়ে আসবে। আমি কিছু জানিনা। অন্য কারো কাছে আমি পড়বো না। একটা অক্ষরও না।’
মহিলা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যার জন্য করলো চুরি সেই বলে চোর!
___________
মিতু স্কুল থেকে ফিরে নানা নানীকে পায়নি। মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেছে। নানীকে আজ সে ভাইজানের কথা বলতে চেয়েছিল। সেদিন কথায় কথায় জেসমিন নিজেই মামুনের কথা বলছিলেন। সে সময় তাকে দেখে মিতুর মনে হয়েছে নানী আসলে ভাইজানকে ভালোবাসে। কিন্তু বলতে চায় না। নাড়ুর কথা তো তার থেকেই জেনেছে মিতু।
ভাইজানের কথা কিছুই নানীকে বলা হলো না। মামা নাকি মামীকে নিয়ে এসেছে। এজন্যই তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন তারা। মিতু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আজ থেকে তার আবার একার রাত্রিযাপন শুরু।
তবে একই রাত জাহানারার জন্য বড় উৎকণ্ঠা নিয়ে এলো। বারোটা বাজতেই ফোন হাতে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে শুরু করলেন। স্কুলে অনেকে তার দিকে আড়েঠাড়ে তাকাচ্ছিল। ফিসফিসিয়ে কি যেনো বলছিলো। জাহানারা সবই বোঝেন। তবে এদের তোয়াক্কা করেন না। আছেনই বা আর কয়েকটা দিন! বলে নিক যতো বলতে চায়।
কিছুক্ষণের মাঝেই কাঙ্খিত কলটা এলো। লম্বা একখানা হাসি নিয়ে ফোন ধরলেন জাহানারা।
‘ মনে পড়েছে আমার কথা!’
ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা পুরুষালী আওয়াজ, ‘ মনেই তো থাকো। আলাদা করে আবার কি মনে পড়বে?’
‘ ঢঙের কথা বাদ দাও তো!’ লজ্জালু কণ্ঠে বলল জাহানারা। ‘ টিকিট হয়েছে তোমার?’
‘ যেভাবে তাড়া দিচ্ছ যেনো গেলেই কি না কি হয়ে যাবে!’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন জাহানারা। যেনো ভেবে নিলেন। তারপরই ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘ অবশ্যই হবে। বর না এলে বিয়ে হবে কিভাবে?’
‘ তুমি কি সিরিয়াস জাহান?’ লোকটা হতভম্ব হয়ে গেলো।
‘ হু।’
‘ কোনো কৌতুক নয়?’
‘ না।’
‘ আমি কিন্তু কালকের টিকিটই কে’টে ফেলতে পারি।’
‘ কে’টে দেখাও। আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। একা একা আর কতদিন থাকবো? ওদিকে একজন বিয়ে করে বাচ্চা বানিয়ে ফেলেছে।’ শেষটুকু বিড়বিড় করে বললেন জাহানারা। ওপাশের মানুষটা সেটা শুনলো না। সেই পর্যন্ত অপেক্ষাও করলো না। তাড়াহুড়া করে বলল, ‘ জাহান আমি কিন্তু আসলেই আসছি। তারপর তোমার কোনো অজুহাত আর শুনবো না।’
‘ আমি অপেক্ষায় থাকলাম।’
ফোন কে’টে দিলেন জাহানারা। তার সুখ স্বপ্নের পথে হাঁটার সময় এসে গেছে। শুধু মিতুকে নিয়ে চিন্তা। রাকিব কি ওকে রাখবে? ওকে নিয়ে কোনো ঝামেলা করতে পারবেন না জাহানারা। এখন তিনি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে চান। মিতুর বাবা যদি মেয়েকে ভুলে গিয়ে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে পারে তাহলে তিনি পারবেন না কেনো!
পাশের রুমে টর্চ লাইটের আলোয় ভাইয়ের চিঠি পড়তে থাকা মেয়েটা জানতেও পারলো না তার অস্তিত্ব কারো চলার পথে বাধা তৈরি করছে, কারো সুখস্বপ্নে অপ্রত্যাশিত অধ্যায় হয়ে গেছে ছোট্ট এই মেয়েটা।
|চলমান|