ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

৯ম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

৯.

সাইফুল ইসলাম, সৌদি প্রবাসী। বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের সিংহভাগ সৌদিতে কর্মরত। ফলে বাঙালি খাবারের বেশ চাহিদা তৈরি হয়েছে। চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশী খাবারের রেস্তোরাঁ। এমনই এক নামী দামী রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে কর্মরত আছেন সাইফুল ইসলাম। বাবা মা’রা যাওয়ার পর বড় সন্তান হিসেবে তাকেই পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে। ছোট ছোট দুটো বোন, একটা ভাইয়ের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কঠিন কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যৌবনের শুরুতেই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন সাইফুল। প্রথমে সিঙ্গাপুর তারপর দুবাই। ঘুরে ঘুরে অবশেষে সৌদিতে এসে ভাগ্য মিলেছে।

বাইশ বছরে পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন। আজ সতেরো বছর ধরে বাইরে বাইরে ঘুরছেন। এর মাঝে দেশে গেছেন মাত্র দুইবার। একবার যেয়ে ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছেন আরেকবার বোনের। সবচেয়ে ছোট বোনের বিয়ে ছোট ভাই দিয়েছে। তাকে আর যেতে হয়নি। সবার জীবন গোছাতে যেয়ে তার জীবনের কথাই যেনো সকলে বেমালুম ভুলে বসেছে। অদ্ভুত হলেও তার বিয়ের কথা কেউ বলে না। তাকে দেশে ফিরে যেতেও কেউ বলে না। নিজের টাকায় বাড়ি করেছেন, ভাই বোনের বিয়ে দিয়েছেন। আজকাল তিনি বড্ড হাঁপিয়ে ওঠেন। অনেক তো হলো। টাকার মেশিন হয়ে আর কতকাল বাঁচা?

কাজের ফাঁকে ফাঁকে সোশাল মিডিয়ায় কাটাতেন বেশ অনেকটা সময়। এভাবেই একদিন জাহানারার সাথে পরিচয়। কথা বলতে বলতে কখন যে সম্পর্কটা অপরিচিত থেকে পরিচিতের কাতারে চলে গেছে দুজনের একজনও বুঝতে পারনি। কথায় কথায় জাহানারার জীবনের প্রায় সব ঘটনাই শুনেছেন সাইফুল। সেসব অবশ্য জাহানারার ভাষ্য মতেই। প্রোফাইল পিকচারে দেয়া জাহানারার ছবিও দেখেছেন। বেশ মায়া হয়েছে মেয়েটার জন্য। অল্প বয়সেই কতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। আহা!

এই মায়াকে পুঁজি করেই সাইফুল মনে মনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিলেন। সেটার কথা জাহানারাকে অবশ্য কিছু জানালেন না। কিন্তু ক্রমেই যেনো তাদের সম্পর্কের গভীরতা বাড়ল। দিনের গণ্ডি পেরিয়ে কথা হতে লাগলো রাতেও। নারীর সান্নিধ্য না পাওয়া জীবনে জাহানারা যেনো সাইফুলের কাছে এক পরম পাওয়া হয়ে ধরা দিলো। নিজের মনের কথা জানালেন সাইফুল। জাহানারা হা না কিছুই বললেন না। তবে নিজের মতো স্বাভাবিক রইলেন। সাইফুল নিজেও আর ঘাটালেন না। তবে জাহানারার থেকে পাওয়া সর্বশেষ কলে তিনি রীতিমত হকচকিয়েই গিয়েছিলেন। সে যে মুখ ফুটে এই কথা বলবে সাইফুল ভাবতেই পারেননি। অবাক হওয়ার সময়টুকু না নিয়ে টিকিট কে’টে ফেললেন। তার ভেতরে কাজ করছে নিজের জীবন গুছিয়ে নেয়ার তাগিদ। এক অধরা সুখস্বপ্ন।

~

জাহানারা দিন গুনছেন। সাইফুল বলেছে খুব শীঘ্রই আসবে। তার পরিবারকে রাজি করানোর ঝামেলা নেই। জাহানারা যতটুকু বুঝতে পেরেছেন সাইফুল তার পরিবার কি ভাবছে না ভাবছে এই চিন্তাতেই যাবে না। তবে বিয়ের সময় আবেদার আলীকে লাগবে। তাকে জানানোরও একটা বিষয় আছে। খুব আগে জানানো যাবে না। আব্বা ঝামেলা করতে পারেন। ঠিক দুই একদিন আগে বলতে হবে। এর মাঝে খবর পেলেন রাবেয়া এবার নতুন আবদার নিয়ে এসেছে। তাকে আলাদা বাসায় রাখতে হবে। একই গ্রামে আলাদা বাসায় থাকার অর্থ আবেদার আলী বুঝতে পারছেন না। কোনোভাবেই তিনি ছেলে, ছেলের বউকে বাড়ির বাইরে দিতে চান না। কিন্তু জাহানারা বুঝলেন রাবেয়া শ্বশুর শাশুড়িকে নিজের সাথে রাখতে চাইছে না। আবেদার আলী মুদি দোকান চালাতেন। বেশ বড় একটা দোকান। সেটা কিছুদিন আগে ছেলেকে দিয়ে দিয়েছেন। সম্পত্তির ভাগবন্টন সেরে ফেলেছেন। এখন মাঝে মাঝে দোকানে যেয়ে বসেন। দোকানে না বসলেও আয় রোজগার সব রাকিবের হাতেই আসে। কাজেই এখন রাকিব চলে গেলে এই বুড়ো বুড়িকে চোখে অন্ধকার দেখতে হবে। এই বয়সে নতুন করে কাজে হাত দেয়ার শক্তি, সামর্থ্য কোনোটাই তাদের নেই। জাহানারা ভাইয়ের বউকে আদর করে নরম গলায় বোঝালেন। রাবেয়া ববেঁকে বসলো, ‘ আমার কিছুই আপনার মায়ের পছন্দ না আপা। যেটা করি তাতেই উনি ভুল ধরেন।’

‘ বুড়ো মানুষ তো এজন্য এমন করে। তুমি সব কথা কানে নিও না।’

‘ কানে না নিলেও তো আমারই বদনাম। আপনার ভাইয়ের কাছে নালিশ দেয় আমি নাকি তাদের কথা শুনি না।’

‘ আম্মা তো সবসময় আর ভুল বলেন না। মাঝে মাঝে একটু শুনলেও তো পারো।’ দিশেহারা হয়ে বললেন জাহানারা।

‘ কি বলতে চাইছেন আপনি? আমি আপনার মায়ের কথা শুনি না?’

জাহানারা হাল ছেড়ে মায়ের কাছে ফোন দিলেন।

‘ আম্মা এবার মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে বুঝতে পেরেছেন?’

জেসমিন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘ হুঁ।’

‘ কি আর করার আছে বলেন? শেষ বয়সে এসে এখন ঘর ভাঙবে! লোকে কি বলবে?’ ওপাশ থেকে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেলো। জাহানারা আবার রাবেয়াকে ফোন দিলেন, ‘ আমি আম্মাকে বুঝিয়েছি রাবেয়া। উনি আর তোমার কাজে বিরক্ত করবেন না। তুমি একটি মিলে ঝিলে থাকো বোন। নয়তো আশপাশের মানুষ তোমাকেই ছি ছি করবে।’ এই কথায় কাজ হলো। রাবেয়া মেনে নিলো শ্বশুর শাশুড়িকে। জাহানারা হাঁফ ছাড়লেন। কোথায় এখন নিজেকে নিয়ে ভাববেন! তা না করে ভাইয়ের সংসার নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

সত্যি সত্যি এক সপ্তাহের মাঝেই সাইফুল দেশে এলো। জাহানারা রাকিবকে ফোন দিলেন।

‘ তুই দোকানে?’

‘ না। বাসায়।’

‘ সারাদিন বাড়ির ভেতরে থেকেই তোর মাথাটা যাচ্ছে। পুরুষ মানুষ তুই। তোর সারাদিন বাড়িতে কি?’

‘ আউল ফাউল কথা না বলে যা বলতে ফোন দিয়েছিস তাই বল।’

দম ছাড়লেন জাহানারা। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘ তোর কাছে একটা সিভি পাঠিয়েছি। দেখ।’

‘ সিভি?’ রাকিবের কপালে ভাঁজ পড়ল। সিভি দেখে সেই ভাঁজ মিলিয়েও গেলো।

‘ আব্বাকে বলবো?’ রাকিব ফোন দিয়ে বলল।

‘ হুঁ।’ নিচু কণ্ঠে বললেন জাহানারা। রাকিব যা বোঝার বুঝে নিলো।

আবেদার আলী সিভি হাতে কতক্ষন চুপচাপ বসে রইলেন। জাহানারার কাছে ফোন দিয়ে বললেন, ‘ বিয়ে কবে?’

জাহানারা হকচকিয়ে গেলেন, ‘ না.. মানে তুমি খোঁজ খবর নাও।’

‘ সেসব নিশ্চয়ই আমার আশায় ফেলে রাখোনি।’

জাহানারা কিছু বললেন না। আবেদার আলী গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘ দিন তারিখ বলে দিও। আমি যেয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে আসবো।’

জাহানারার বেজায় রাগ হলো। আব্বার এভাবে রাগ করার কি মানে? তিনি কি মেয়ের একটা সুন্দর জীবন চান না? এভাবে কচুরিপানার মতোই সে ভেসে ভেসে বেড়াক, এটাই চান? সে আর আবেদার আলীকে ফোন দিলো না। এক ফাঁকে জেসমিনকে ফোন দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলো, ‘ আপনারা চান কি আম্মা বলেন তো! একা থাকলেও আপনাদের সমস্যা, বিয়ে করতে চাইলেও আপনারা মুখ কালো করে থাকেন। করবো টা কি আমি?’

জাহানারা উত্তরের আশায় থাকলেন না। খট করে ফোন কেটে দিলেন। জেসমিন হতাশ হয়ে চুপচাপ বসে থাকা স্বামীর দিকে তাকালেন। বৃদ্ধ ভগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘ আমার মেয়ে। আমাকে না জানিয়েই এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো!’

মনের কষ্ট মনে চেপেই আবেদার আলী খোঁজ নিলেন। ছেলের বাড়ি কাছাকাছি। কাজেই তথ্য জোগাড় করতে অসুবিধা হলো না। খারাপ লাগলো না তার কাছে। তার মেয়ে বিবাহিত। সেখানে একটা মেয়ে আছে। সে হিসেবে চিন্তা করতে গেলে অবিবাহিত ছেলের আশাই ছিলো না। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন আবেদার আলী। মেয়ে যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে তার হ্যাঁ-তেই কি আর না-তেই কি।

~

মিতু পড়ছিল। দশটা বাজতে না বাজতেই ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তাই সন্ধ্যার সময় যতোটা পারে পড়া গুছিয়ে রাখে। ‘তৈলচিত্রের ভূত’ গল্পটা পড়তে যেয়ে গা ছমছম করে উঠছে। গল্পের শেষ নামানো হয়নি। এমন সংক্ষেপিত গল্প পড়তে মিতুর ভালো লাগে না। বাকিটুকু কোথায় পাবে সে? লেখকের নাম দেখতে যেয়ে গুবলেট পাকিয়ে ফেললো মিতু। মানিক আর প্রবোধ কি একই ব্যক্তি? নাকি আলাদা? তৈলচিত্রে ভূতটা কোথায়?

সেই ক্ষণে জাহানারা ফিসফিস করে ডাকলেন, ‘ অ্যাই মিতু!’

মিতু লাফিয়ে উঠলো। বুকে হাতে দিয়ে সামনে তাকালে মা’কে দেখে একটু স্বস্তি পেলো। জাহানারা ফোন এগিয়ে দিলেন, ‘ কথা বল।’

ফোন হাতে নিয়ে মিতুও ফিসফিস করলো, ‘ কে?’

‘ কথা বলে দেখ।’

ফোন কানে ধরলো মিতু, ‘ আসসালামু আলাইকুম।’

‘ ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছো মিতু?’

একটা অচেনা পুরুষ কণ্ঠ। মিতু ভেবেছিল নানা নানীর কেউ। অস্বস্তি লাগলো তার।

‘ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?’

‘ ভালো। পড়ছিলে?’

‘ জি।’

‘ কি পড়ছিলে?’

‘ তৈলচিত্রের ভূত।’

‘ ভালো করে পড়। আমি তোমার কি হই জানো?’

ইতস্তত করলো মিতু, ‘ না।’

‘ এখনও তো হইনি। কয়েকদিনের মাঝেই জানতে পারবে। আমাকে মনে রেখো। খুব শীঘ্রই দেখা হবে কিন্তু। রাখি কেমন?’

ফোন কেটে গেলো। মিতু জাহানারাকে প্রশ্ন করলো, ‘ কে ছিল মা?’

জাহানারা রহস্য করে হাসলেন।

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন