‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
১১.
রাবেয়া ভেতরে ভেতরে ফুসলেও কিছু বলতে পারছে না। রাকিব জানিয়েছে মিতু কয়েকদিন থাকবে। কিন্তু রাবেয়ার মন সায় দিচ্ছে না। বিয়ে করেই মেয়েকে এখানে ফেলে রেখে গেছে। যদি না নেয়? রাবেয়া কস্মিনকালেও আরেকজনের মেয়ে পালতে পারবে না। বাপ মা নিজেদের জীবন দেখছে তাহলে সে কেনো তাদের মেয়ে নিজের ঘাড়ে নেবে?
এই চিন্তা করতে করতে রাতে ঠিকমতো খেতেও পারলো না রাবেয়া। শ্বশুর শাশুড়ি উঠে যাওয়ার পরও সে ঠায় বসে রইলো। মিতু তখনও টুকটুক করে খেয়ে যাচ্ছে। তার খাওয়ার গতি বড় ধীর। হাফ প্লেট খেতেই আধা ঘন্টা পার হয়ে যায়।
‘ এতো সময় লাগিয়ে খেলে হবে? তাড়াতাড়ি খাওয়া শিখতে হবে।’ মামীর কথায় মিতু বিব্রত হাসলো। বাটা মাছের ঝোল রান্না হয়েছিল। এক টুকরো মাছসহ কিছু ঝোল অবশিষ্ট আছে। মাছগুলো বেশ ছোট। অনেক আগেই মিতুর মাছটা শেষ হয়ে গেছে। ঝোল ফুরিয়ে গেলে মিতু বাটির দিকে হাত বাড়ালো। আরেকটু ঝোল নিয়ে এই ভাতটুকু শেষ করে ফেলার ইচ্ছা।
বাটির দিকে হাত বাড়ালেই রাবেয়া হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ আরে আরে! আর মাছ নিও না। তোমার মামা সকালে খাবে ওটা।’
হঠাৎ চিৎকারে মিতু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। হাত গুটিয়ে আনলো সে। রাবেয়া তাড়াহুড়া করে খাবার দাবার সব গুছিয়ে রাখলো। মিতু একবার বলতে চাইলো সে শুধু ঝোল নিতে চেয়েছে, মাছ নয়। কিন্তু তখনই মনে হলো রাকিব মাছ দিয়ে খায়নি। তার নাকি বাটা মাছ ভালো লাগে না। বেশি কাটা। রাবেয়া চলে গেলে বাকি ভাতে পানি ঢেলে সেটুকু শেষ করলো মিতু। সবাই ভাবে সে বোকা। ভাবুক। মিতুও বোঝাতে চায় না সে অনেকের অনেক কথাই বোঝে।
শুতে যাওয়ার আগে নানার ফোন থেকে মায়ের কাছে ফোন দিলো মিতু। জাহানারা সাথে সাথেই রিসিভ করলেন।
‘ কেমন আছো মা?’
‘ ভালো আছি মিতু। তুই কি করছিস?’
‘ খেয়ে এলাম। তুমি খেয়েছো?’
‘ খেয়েছি। শোন এখানে দারুন একটা ফ্রাইড রাইস খেয়েছি। রেসিপি নিয়ে রেখেছি। এসে তোকে বানিয়ে খাওয়াবো।’
‘ আচ্ছা। মা ঐ আঙ্কেলটা কি ভালো?
জাহানারা আড়চোখে শুয়ে থাকা সাইফুলের দিকে তাকালেন। একটু জোরেই বললেন, ‘ অনেক ভালো! তুই কিছুক্ষণ সাথে থাকলেই বুঝতে পারবি।’ সাইফুল মুখে হাসি নিয়ে তাকালেন। মুচকি হলেন জাহানারা। মিতু বলল, ‘ তোমাকে অনেক মিস করছি মা।’
জাহানারা নরম কণ্ঠে বললেন, ‘ তিনটা দিন কষ্ট করে থাক সোনা। তারপরই আমি চলে আসছি।’
মিতু ফোন রেখে দিল। এই বাড়িতে তিনটা ঘর। মিতু মায়ের সাথে আগে যে ঘরে থাকতো আজ সে ঘরেই ঘুমাতে গেলো। দরজা ঠেলে ডিম লাইট জ্বেলে বিছানায় গেলো। মিনিটের পর মিনিট পার হয়ে গেলেও চোখে ঘুম ধরা দিল না। মিতুর নিজেকে কেমন যেনো মনে হয়। যেনো অচিন কোনো গাছ থেকে উড়ে আসা পাতা। যে ঠাঁই নিয়েছে আরেক গাছে। বিনা অনুমতির সে আশ্রয়টা খুব নড়বড়ে। পানি পাওয়া যায়, সূর্যের আলো পাওয়া যায় কিন্তু কি যেনো একটা পাওয়া যায় না। কি যেনো..কি যেনো..
ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও যখন ঘুম এলো না তখন মিতু উঠে গেলো নিজের ব্যাগের কাছে। ‘পথের পাঁচালী’ কি মনে করে ঢুকিয়েছিল। এই রাতে সেটা একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে ধরা দিলো।
বিছানার পাশের টেবিলে সবসময় একটা টর্চ লাইট থাকে। মিতু একা থাকতে পারলেও অন্ধকারের ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। রাতে বাথরুমে যেতে হলে টর্চ না থাকলে সে উঠে দাঁড়াতেই পারে না। তারা বাড়ি ছাড়লেও টর্চটা একই জায়গায় রয়ে গেছে। সেই টর্চ অন করে ছাদের দিকে ঘুরিয়ে রাখলো মিতু। ছাদের সাদা রংটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে গেলো। বইয়ের অক্ষরগুলো ছোট হলেও পড়তে অসুবিধা হলো না। এক পাতা দুই পাতা করে পড়তে পড়তে কখন যে বইয়ের গভীরে ডুব দিল মিতু নিজেই বুঝতে পারল না।
হালকা ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ফ্যান চালানো হয়নি। টিকটিকি লাফ দিলেও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঘরের দেয়াল ঘেঁষে একটা কুকুর চলে গেলো ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে। একটু পরই শেয়ালের হুক্কা হুয়া শোনা গেলো। মিতু কিছুই ঠিক পেলো না। কিন্তু প্লাবন ছোটানো বর্ষার জলে ভিজে দুর্গা যখন শয্যা নিলো তখন মিতুর বুকটা কেঁপে উঠল। পরের পাতা ওল্টাতে ভয় লাগছিল এই সফেদ আলোর মাঝেও। কিন্তু কি এক অদম্য আকর্ষণ আপনাতেই মিতুকে দিয়ে উল্টে নিলো পৃষ্ঠার পরে পৃষ্ঠা। তারপর..তারপর পঞ্চবিংশ অধ্যায়ে, বইয়ের এক সাধারণ পাতায়, চেনা অক্ষরের মাঝেই দুর্গার মৃ’ত্যু’র শব্দ বোনা হয়ে গেলো। মিতুর শুধু মনে হতে লাগলো, ‘ শোন অপু, একটা কথা শোন। আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?’ হরিহর কাঁঠালের চাকী-বেলুন নিয়ে এলেন। সতৃষ্ণ নজর বুলিয়ে খুঁজলেন আপন আত্মার অংশ জোড়া। ঠিক যখন সর্বজয়া ডুকরে কেঁদে উঠলো বইটা ঝপ করে বন্ধ করে দিলো মিতু। তড়িৎ উঠে বসে বুকে হাত দিলো। রাত্রির দ্বিপ্রহরে কি এক নাম না জানা দুঃখের বোঝা যে তার বুকে চেপে বসেছে সে বুঝতে পারলো না। শুধু গলার কাছে এক ব্যথার ঘূর্ণির অস্তিত্ব টের পেলো। আর সামলাতে না পেরে মুখে হাত চেপে কেঁদে ফেলল মিতু। বালিশ টেনে নিয়ে তাতে মুখ গুঁজে দিলো। থেকে থেকে শুধু দুর্গার কথাটাই কানে ভেসে আসছে। ‘আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?’ কি নির্দোষ আবদার! অথচ পূরণ হলো না। হওয়ার নয় আর কোনোদিনও। মস্তিষ্কের কল্পনায় দূর্গাকে ধরে মিতু আপনমনে গুঙিয়ে উঠলো, ‘ ভাইজান! ভাইজান!’
________
জানতে পারার পর থেকে রোগটা যেনো লাগামহীন হয়ে পড়েছে। এতদিন যেই লুকোছাপা ছিলো সেটুকু এখন আর নেই। মুখ ফুলে ফুলির চোখ দুটো গর্তে চলে গেছে। ঘণ্টায় এখন দুই তিনবার বাথরুমে ছুটতে হয়। কদম আর এখন হঠাৎ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে পড়ে না। কাপড় ভিজিয়ে দেয়া বোনকে কোলে নিয়েই কা’টিয়ে দেয় দিনের পর দিন। মামুন আর খুব একটা এদিকে আসতে চায় না। নিজেকে কেমন অথর্ব লাগে। কিন্তু না এসেও পারে না। ফুলির ঐ ফুলো চেহারাটা দেখেই যেনো একটু শান্তি লাগে। আজ অনেকগুলো দিন পর সেদিকে গেলো মামুন। মিতু চিঠি দিয়েছে। সেটা এখনো খুলে পড়া হয়নি। খামটা বুক পকেটে আছে। এক ফাঁকে পড়ে নেবে।
ফুলি আরাম করে নড়তে পারে না। কাত হতেই দম ফুরিয়ে আসে। তবুও তার মাঝে স্থিরতা নেই। এদিক সেদিক করা চাই সবসময়। কদম তাকে বকছিল, ‘ একটা মিনিট ঠান্ডা থাকতে পারে না! তুই থামবি না আমি যাবো?’ ফুলি বড় বড় চোখে তাকালো। হাত উঠিয়ে কদমের ময়লা গেঞ্জির এক কোনা টেনে ধরে বলল, ‘ না না।’
মামুন এলো সেই ক্ষণে। ফুলির অসহায় চেহারায় দ্যুতি খেলে গেলো। হাত তালি দিয়ে বলল, ‘ ভা ভা!’
মামুন এলো। এগিয়ে দিলো হাতে থাকা চিপস দুটো। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ফুলি সেসব নিলো না। কদম বলল, ‘ খাওয়া দাওয়া করে না ভাই। দুই তিন দিন ধরে একদম বন্ধ।’
মামুন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘ তাহলে খাচ্ছে কি?’
‘ পানি খায় খালি। আর কিছু খাইতে চায় না। জোর করলেও খায় না।’
মামুন অস্থির বোধ করলো, ‘ চাচা কই?’
‘ আব্বা তো মাল টানাটানির কাজ পাইছে। দুই তিনদিন পরপর আসে। ওখানেই থাকে।’
মামুন চেষ্টা করলো ফুলিকে কিছু খাওয়ানোর জন্য। মেয়েটা খেলোই না। ঘণ্টাখানেক থাকার পর মামুন যখন উঠে দাঁড়ালো যাওয়ার জন্য তখন হঠাৎ করেই ফুলি চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। কদম ছুটে গেলো ফুলির কাছে। ছোট্ট শরীরটা আগলে নিয়ে বলল, ‘ কি হইছে? কি হইছে?’
ফুলি কোমরের দিকে হাত রেখে কাঁদতেই থাকলো। মামুন বুঝলো না কি করা উচিৎ। গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে এলো ফুলির মুখে কাছে। ফুলি মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার চিৎকার যেনো মস্তিষ্কে যেয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। মামুন বলল, ‘ কদম ওকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাই চল।’
কদম ঠিক ভুল বুঝলো না।
‘ যাবেন? চলেন।’
মামুন ফুলিকে কোলে নিতেই মেয়েটা ঘন ঘন শ্বাস নিতে শুরু করলো। শক্ত করে ধরলো মামুনের শার্টের কলার। কদম ডুকরে উঠলো, ‘ ও ফুলি! ফুলি!’
মামুন অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বিছানায় বসলো। ফুলিকে শুইয়ে দিলো কোলের উপর। কদম বোনের হাতের তালু আঁকড়ে ধরে ডলতে লাগলো।
‘ ফুলি, নিশ্বাস নে। এই যে। তাকা আমার দিকে তাকা।’
ফুলি তাকালো। শুনলো ভাইয়ের কথা। আস্তে আস্তে তার নিশ্বাসের গতি কমে এলো। নিভু নিভু চোখে হাত বাড়ালো সে কদমের দিকে। অস্পষ্ট স্বরে বলল, ‘ ভা ভা।’
দুদিন পর বাড়িতে এলেন বকুল মিয়া। দিন মজুরির সবটুকু দিয়ে ফুলির আধা দিনের ওষুধ কিনে আনার খুশিতে তার মুখটা চকচক করছিলো। ঘরে পা দিতেই দেখলেন নিথর ফুলিকে। কদম হু হু করে কাদঁছে। বকুল মিয়ার বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। কখন যে হাতের পলিথিন পড়ে যেয়ে ওষুধগুলো ছড়িয়ে পড়ল বকুল মিয়া টের পেলেন না। মামুনের কোলের উপর থেকে ফুলিকে টেনে নিতেই যেনো তার ধ্যান ভাঙলো। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। বকুল মিয়া অস্থির হয়ে গেলেন। ধীর থেকে তার কন্ঠ ক্রমেই উঁচু হলো, ‘ ফুলি! ও ফুলি! মা তাকাও। ফুলি। ফুলিইইই!’
মামুন কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি খুললো। খুচরা কিছু টাকা কাগজের ভাঁজ থেকে পড়ে গেলো। গোটা গোটা অক্ষরে চোখ বুলিয়ে গেলো মামুন। চোখটা আটকে গেলো এক জায়গায়। মিতু কি ভীষণ মায়া নিয়ে লিখেছে, ‘ তোমাকে ছাড়া কিভাবে খাই? তুমি কিন্তু একদিন খাবা ভাইজান। বলো খাবা?’
ফুলির প্রাণহীন হাতটা আঁকড়ে ধরে মামুন হু হু করে কেঁদে উঠলো। আহ মিতু!
|চলমান|