ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

১০ম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

১০.

সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হয়ে গেছে। চোখ কান বন্ধ করে পড়তে পারছে না মামুন। ফুলিকে নিয়ে বেশ ছুটোছুটি করতে হচ্ছে। তার চেয়ে বেশি ছুটছেন বকুল মিয়া। তার লুকানো পা প্রকাশ্যে এনে কাজ খুঁজে চলেছেন। এই কয়েকদিন না হলেও দশ বারো জায়গায় ঘুরেছেন একটা কাজের আশায়। শীর্ণ শরীর দেখে কেউই তাকে কাজ দিতে আগ্রহী হচ্ছে না। ভদ্রলোক আগে বোঝেননি কাজ খোঁজা বা করা এতো কঠিন হবে। বুঝবেন কিভাবে? কাজের জন্য চেষ্টাই তো করেননি। চিন্তায়ও ছিল না কোনোদিন কাজ করতে হতে পারে। চিন্তার বাইরে ঘটনাই তার সাথে ঘটছে। মেয়েটার জীবন সংশয় তৈরি হয়েছে এবং তার জন্য তিনি একটা কাজ খুঁজে ম’রছেন।

আজ ছুটে গেলেন মামুনের মেসের সামনে। খবর পেয়ে বেরিয়ে এলো সে। বকুল মিয়ার হাতে একটা ফাইল। সম্ভবত ফুলির রিপোর্ট।

‘ আমার কিডনি কি ফুলিরে দেওয়া যাবে? ডাক্তার কি কয়?’ রিপোর্টটা বাড়িয়ে দিলেন বকুল মিয়া। চুপচাপ সেটা টেনে নিলো মামুন। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো মেডিকেলের ভাষা। ফুলি এবং বকুল মিয়ার কিডনি ম্যাচ করেনি। টিস্যু আলাদা। সে মাথা নাড়ল, ‘ না চাচা। আপনার কিডনি ফুলিকে দেয়া যাবে না।’

বকুল মিয়ার মুখ কালো হয়ে গেলো। শুকনো কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘ আমি তো কোনো দিশা পাই না। না পারি ওষুধ কিনতে না পারি চিকিস্যা করতে। কি করি আমি?’

মামুন কিছু বলতে পারলো না। বুকে হাহাকার নিয়ে এক ব্যর্থ পিতা তার সামনে থেকে চলে গেলো। মামুন চুপচাপ দেখলো। কি মনে করে নিজেও একবার টেস্ট করে এলো। মিললো না তার কিডনিও। মামুন বুঝলো সময় অতি নিকটে।

~

দুই তলা বিল্ডিংয়ের দোতলায় কাজী অফিস। প্রধান সড়ক থেকে একটু দূরে হওয়ায় গাড়ির হর্নের ক্ষীণ শব্দ সেখানে পৌঁছায়। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসা বাতাস কিছু পর পরই গায়ে হিম ধরিয়ে দিচ্ছে। লাল রঙের সাদামাটা একটা শাড়ি সেই ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারছে না। একটু কেঁপে কেঁপে উঠছেন জাহানারা। মনকে বোঝাচ্ছেন এই কাঁপাকাঁপি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নয়। জাঁকজমকভাবে তার বিয়ে আগেই হয়েছে। কাজেই লজ্জাবতী তরুণীর প্রথম অভিজ্ঞতার মতো তার অবস্থা ততোটা জবুথবু নয়।

রুমের পরিবেশ কিছুটা গুমোট হয়ে আছে। আবেদার আলী চুপচাপ বসে আছেন। তার মুখের ভাব গম্ভীর। রাকিবের অতো চিন্তা নেই। সে এসেছে বোনের বিয়ে দেখতে। ঘর ভাঙ্গা বোন ঘর পাবে ভেবে যতোটা না ভালো লাগছে তার চেয়ে বেশি ভালো লাগছে এই ভেবে যে জাহানারাকে নিয়ে রাবেয়ার ক্যাঁচ ক্যাঁচ আর শুনতে হবে না। থেকে থেকে সাইফুলের দিকে তাকাচ্ছে রাকিব। নাহ, দেখতে ভালই আছে।

সাইফুল উশখুশ করছেন। মেয়ের বাবা তাকিয়েই দেখছে না আর মেয়ের ভাই চোখই সরাচ্ছে না। তার সাথে দুজন বন্ধু এসেছে। করুন চোখে তাদের দিকে তাকালেন সাইফুল। কেউই একটু ভরসা দিতে পারল না। তাদের বিয়ের আট দশ বছর পেরিয়ে গেছে। বিয়ে নিয়ে সেই উত্তেজনার কিছুই তাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই। কেউ দুষ্টুমিও করছে না অথবা ভরসা দেয়ার কথাও ভাবছে না। কাজী সাহেব গলা ছেড়ে মুখস্থ কণ্ঠে দোয়া আওড়াতে শুরু করলেন। তার জন্য গৎবাঁধা সেই একই নিয়ম, একই কথা। তবে সাইফুলের জন্য একেবারে আনকোরা অনুভূতি। ভেতরে ভেতরে অস্থির হলেও বাইরে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেন সাইফুল। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই বিয়েটা হয়ে গেলো। রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে কনে পক্ষ থেকে আসা কনের বাবা ভাই সহ মোট চারজন এবং সাইফুলের দুজন বন্ধুকে মিষ্টি খাওয়ালেন সাইফুল। আবেদার আলী নির্বিকার ছিলেন শুরু থেকেই। যাবার কালে শুধু বললেন, ‘ মিতুর কি ব্যবস্থা হবে?’

রাকিব ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠলো। কাষ্ঠ হেসে বলল, ‘ দুলাভাইকে তো পাষাণ ধরনের মানুষ মনে হচ্ছে না। মেয়েকে কি মা থেকে আলাদা করবেন উনি?’

জাহানারা আড়চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। বউয়ের আঁচল বেশ ভালোভাবেই ধরেছে। ছেলেকে এক পলক দেখে মেয়ের দিকে তাকালেন আবেদার আলী। তার নিজের পেছনে শক্ত দেয়াল নেই যেটায় পিঠ ঠেকিয়ে মিতুর ভার সহজেই বইতে পারবেন। মেয়েটা বাঁধানো কপাল নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে। সেই কপাল তাকে ভাসিয়ে বেড়াচ্ছে এই কূল থেকে ঐ কূলে।

সাইফুল এতক্ষণে কথা বললেন, ‘ মিতুর মায়ের দায়িত্ব যখন নিয়েছি মিতুর দায়িত্বও নিতে পারবো ইনশাআল্লাহ্।’

জাহানারার ঠোঁটে একটা হাসি খেলে গেলো। কেমন বিজয়ী ধরনের একটা ভাব। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সেই হাসিটা জোরালো হলো। যেনো নিজের পছন্দের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানোর একটা প্রয়াস। তবে আবেদার আলীকে ততোটা খুশি বলে মনে হলো না। মিতু পুরোনো ঘাট ফেলে নতুন ঘাট পেয়েছে ভেসে যাওয়ার জন্য। আনন্দের কি আছে?

সাইফুল যাওয়ার পথে বাড়িতে ফোন দিয়ে নিজের বিয়ে খবর দিলেন। ক্ষোভে ফেটে পড়লেন তার বয়স্কা মা। আর কাউকে তেমন চিন্তিত বলে মনে হলো না। সাইফুল অবশ্য সেসবের ধার ধারলেন না। জাহানারার সাথে চলে গেলেন তার ফ্ল্যাটে। রাকিব এবং আবেদার আলীকেও নিয়ে এলেন জাহানারা।

শুক্র এবং শনিবার বিকেলটা মিতুর অলস কা’টে। মামুনের পুরোনো সব চিঠি একসাথে করে পড়তে বসে। আজও সেটাই করছিলো সে। কলিংবেলের আওয়াজে দরজার কাছে গেলো। আই হোলে মায়ের মুখ দেখে খুলে দিলো সহসাই। তবে হকচকিয়ে গেলো পাশে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে। জাহানারা ভেতরে ঢুকে গেলেন। সাইফুল বললেন, ‘ কেমন আছো মিতু?’

মিতু বলল, ‘ ভালো আছি।’ কন্ঠটা কেমন চেনা চেনা লাগলো। ধা করে মনে পড়ল এই কণ্ঠের সাথেই সেদিন রাতে তার কথা হয়েছিল। কিন্তু লোকটা কে?

রাকিব বলল, ‘ কি রে ঢুকতে দিবি না?’

মামাকে দেখে আরো অবাক হলো মিতু। মামা তো কখনোই আসে না। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাদের ঢুকতে দিল মিতু। জাহানারা ততক্ষণে নাশতা সাজিয়ে এনেছেন। সম্ভবত সবকিছু গুছিয়েই রেখেছিলেন। মায়ের দিকে তাকালো মিতু। তাকে কেমন যেন নতুন নতুন দেখাচ্ছে। পরিবর্তনটা ঠিক ধরতে পারলো না মিতু। আবেদার আলী তাকে টেনে নিজের পাশে বসালেন। মিতু যন্ত্রের মতো বসলো।

রাকিব সাইফুলের সাথে টুকটাক কথা বলছিল। এর মাঝে জাহানারা মিতুকে ডাকলেন।

‘ অ্যাই মিতু! এদিকে আয়।’

মিতু মায়ের কাছে গেলো, ‘ মা ঐ লোকটা কে?’

জাহানারা এক পলক মেয়েকে দেখলেন, ‘ তোর নতুন বাবা।’

মিতু কয়েক পল চুপ করে রইলো। বুঝতে চেষ্টা করলো এই কথার মানে। ধীর কণ্ঠে বলল, ‘ তুমি বিয়ে করেছ?’

‘ হুঁ।’

‘ আমাকে তো বললে না।’

‘ এই যে বললাম।’

মিতু ঢোক গিললো। মা নিশ্চয়ই হুট করে যেয়ে বিয়ে করে ফেলেনি। আগে থেকেই কথাবার্তা চলছে। কেউ তাকে কিচ্ছু বলল না। কেনো? সে কি কিছুই না?

ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো মিতু। জাহানারা গেলেন। সহাস্যে কথাবার্তা বললেন। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আজ মিতু তার নানা বাড়ি যাবে। জাহানারা সাইফুলের সাথে ঘুরতে যাবেন। কয়েকদিন পর এসে জাহানারাকে নিয়ে যাবেন নিজের বাড়ি।

মিতু শুকনো চোখে উচ্ছ্বসিত মা’কে দেখলো। তার চপল পায়ের ছুটোছুটি, ব্যাগ গোছানো সবই দেখলো মিতু। ব্যাগ তিনি মিতুরটাও গুছিয়ে দিলেন। হাসিমুখে কতো কথা বললেন! মায়ের হাসিমুখ দেখে মিতুর ভালো লাগলো। তবে তাকে নানার হাতে তুলে দিয়ে জাহানারা যখন উল্টো পথে গেলেন তখন মিতুর মনে হলো তার মা চলে যাচ্ছে। আর বোধহয় কোনোদিনই তার মা হয়ে তার কাছে ফিরবে না।

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন