ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

১৪তম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

১৪.

সকালে মিতুকে শাশুরির ঘর থেকে বের হতে দেখে জাহানারা অবাক হলেন। মেয়েকে একপাশে টেনে চাপা কন্ঠে বললেন, ' রাতে ঐ ঘরে ছিলি?'

' হু।'

' কেনো?'

' ভয় পেয়েছিলাম।'

' কিসের ভয়?' জাহানারার কপালে ভাঁজ দেখা দিলো। মিতুর তো ভয় পাওয়া স্বভাব নেই।

' বাদুড় দেখেছিলাম ঐ গাছে। রাতে চালে শব্দ করছিল।'

' বুড়ি তোকে থাকতে দিলো?'

' হু।'

জাহানারা ঠোট চেপে কি যেন ভাবলেন। হঠাৎ করেই তার চেহারায় দ্যুতি খেলে গেলো। সাইফুল ঘরে ছিলেন। মিতুকে সেখানে নিয়ে গেলেন জাহানারা। মিতু জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটার সামনে তার অস্বস্তি লাগে।

' এই মিতুকে আজ স্কুলে নিয়ে যাও। একটু চিনিয়ে দিয়ে এসো।'

সাইফুল উঠে বসলেন, ' একেবারে রেডি করিয়ে দাও। দশটার আগে আগে না যাই। আজ একেবারে স্কুল করেই আসুক।'

' কি রে! যাবি আজকে?' ভুরু উঁচিয়ে তাকালেন মেয়ের দিকে। মিতু ঘাড় কাত করলো।

' যাবো।'

না জানার ভান করে জাহানারা বললেন, ' কি দেখে ভয় পেয়েছিলি কাল রাতে?'

মিতু বিভ্রান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকালো। একটু আগেই তো বলল। সাইফুল মিতু দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে মিতু আমতা আমতা করে বলল, ' চালে শব্দ হচ্ছিলো। তাই..'

' কিসের শব্দ?' সাইফুল জিজ্ঞেস করলেন।

' পেছনের গাছটায় বাদুড় আছে। ওগুলোই রাতে শব্দ করছিল।’

‘ কি করা যায় বলো তো? এসব তাড়ায় কিভাবে?’ জাহানারা যেনো এই প্রশ্নের অপেক্ষায়ই ছিলেন। সাইফুলের পাশে বসে বললেন, ‘ গতকাল রাতে ও মায়ের ঘরে ছিল। রাতটা মায়ের সাথেই থাকুক। কি বলো?’

‘ মা নিলো?’ সাইফুল অবাক হলেন।

‘ হ্যাঁ।’

‘ তো থাকুক। সমস্যা কোথায়।’

মিতু গুছিয়ে সাইফুলের সাথে বের হলো। আশপাশ দেখতে দেখতে হাঁটতে থাকলো সে। এই গ্রামের নাম সে জানে না। আগে যেখানে থাকতো সেই জায়গাটা উপশহর ধরনের ছিলো। শহর শহর একটা ভাব ছিলো। এখানে সেটা নেই। মানুষের জীবনে এখনও একটা সরলতা, একটা কোমলতার ছোঁয়া আছে। কিন্তু মিতুর প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। ইতস্তত করে সে বলেই ফেলল, ‘ এখানকার পোস্ট অফিস কোথায়?’

সাইফুল নিজের চিন্তায় হাঁটছিলেন। মিতুর প্রশ্ন অবাক হলেন।

‘ কি বললে?’

‘ ইয়ে..এই জায়গার পোস্ট অফিস। কোথায়?’

‘ সেটা তো শহরে। এখান থেকে তাও আধা ঘণ্টার পথ। কেনো?’

মিতুর বুকে ধাক্কা লাগলো। ধীর গতিতে ডানে বামে মাথা নাড়ল সে।

‘ এমনি।’

এখান থেকে আধা ঘণ্টার পথ! কিভাবে যেতে হয়? বাসে নাকি অন্য কিছুতে? মিতু কিভাবে যাবে? মামুনের কাছে কিভাবে চিঠি পাঠাবে? সব প্রশ্ন একজোট হয়ে মাথায় মিছিল করতে শুরু করলেও যথাযোগ্য উত্তর কারো কাছে পাওয়া গেলো না।

গ্রামে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো স্কুল ছিলো না। অগত্যা একমাত্র হাইস্কুলেই মিতুকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো।

ছেলেমেয়েগুলোর কৌতূহলের শেষ নেই। তাকে যেনো আজব চিড়িয়া পেয়েছে। প্রথম ঘণ্টা থেকে যে দেখছে তো দেখেই যাচ্ছে। ছেলেগুলো আড়ে ঠাড়ে দেখলেও মেয়েগুলো ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে মিতু বলল, ‘ আমাকে কি কিছু বলতে চাও?’

মেয়েগুলো যেনো হকচকিয়ে গেলো। কয়েকজন সোজা ঘুরে গেলো সামনের দিকে। যেনো এতক্ষন তারা একটা প্রাণহীন পুতুলকে দেখছিল যে হঠাৎ করেই কথা বলে উঠেছে।

কয়েকজন মাথা নাড়ল। কিছুই শুনতে চায় না। তবু চোখ সরালো না। তাকিয়েই থাকলো। একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেললো, ‘ তুমি আগে কোন স্কুলে পড়তে?’

স্কুলের নাম বলল মিতু। মেয়েটা চিনলো না। মিতু জায়গার নামও বলল। পাশের জেলায়।

‘ এখানে চলে এলে যে? মানুষ তো গ্রাম থেকে শহরে স্কুলে যায়। তুমি উল্টো করলে।’

মিতু কোনরকম অস্বস্তি না করেই বলল, ‘ আমার মায়ের বিয়ে হয়েছে এখানে। তাই আমরা চলে এসেছি।’

‘ অ্যা!’ কয়েকটা কণ্ঠ একসাথে শব্দ করে উঠলো। যারা সামনে ঘুরেছিল তাদের অনেকের কান এদিকেই ছিলো। যেই মেয়েটা কথা বলছিল সে অবাক হয়ে বলল, ‘ তোমার মায়ের বিয়ে?’

‘ হ্যাঁ।’

‘ তোমার বাবা?’

‘ আমার মা বাবার ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি ছোট থাকতেই।’ মিতু জানতো এই কথাগুলো তাকে বলতে হবে। আগের স্কুলে লুকানোর চেষ্টা করেছিল। লাভ হয়নি। এসব কথা লুকানো যায় না। এবার মিতু সেই চেষ্টাই করেনি। যাই হয়েছে , না সেখানে তার কোনো ভূমিকা ছিল নাই বা কোনো অন্যায় হয়েছে। কাজেই লুকানো বা এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

‘ তুমি তোমার বাবার সাথে থাকো না কেনো?’ মিতু বিরক্ত হলো। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতো বেশি কৌতূহল দেখানো যে ঠিক না এটা কি তারা জানে না? সে চুপ করে বসে রইলো। মেয়েগুলো বুঝলো মিতু এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাইছে না। নিজেদের ভেতরে ফিসফিস করতে করতেই তারা যার যার জায়গায় ফিরে গেলো।

কিন্তু মিতুর ভেতরের চিন্তাটা কমলো না। পোস্ট অফিস পর্যন্ত পৌঁছাবে কিভাবে সে?

ইসমত আরা মুয়াজ্জিনের আগে উঠে বসে থাকেন। তার কোনো কাজই আস্তে ধীরে হয় না। ওঠার পর থেকে চারপাশে শব্দ করতেই থাকেন। সেই শব্দে মিতুর ঘুম না চাইতেও ভেঙে যায়। আযানের শব্দ শুনে সে আর বসে থাকে না। নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। কয়েকদিনে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আজ ফজরের নামাজে দীর্ঘ মোনাজাত ধরলো মিতু। তার একটাই চাওয়া। ভাইজানের সাথে তার যোগাযোগটা যেনো কখনও ছিন্ন না হয়।

বিয়ে উপলক্ষ্যে কোনো আয়োজন হয়নি। ইসমত আরা ছেলেকে ধরলেন।

‘ এই সাইফুল! এমন লুকানো বিয়ের কি মানে?’

সাইফুল অবাক হলেন, ‘ লুকিয়ে বিয়ে করলাম কোথায়? সবাই তো জানেই।’

‘ ছাই জানে। তোর একটা ভাই, দুইটা বোন কাউকে ডেকে বউ দেখিয়েছিস? পাড়া শুদ্ধ মানুষ তোর বিয়ে নিয়ে ফুসুর ফুসুর করে। একটা দিন একটু ডেকে খাইয়ে দিলেই তো হয়। বিয়ে করলে একটা আনুষ্ঠানিকতা করা লাগে না? এটা কি চুরি নাকি!’

সাইফুলের মাথায় বিষয়টা আসলেই আসেনি। সেদিনই তিনি জাহানারার সাথে আলাপ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন দুই একদিনের মাঝেই একটা আয়োজন করবেন। সেই ভাবনা অনুযায়ী দুই বোনের কাছে ফোন দিলেন। ভাইকে ডেকে বললেন। সকলের মাঝেই একটা চাপা ক্ষোভ আছে। বুঝতে পারলেন সাইফুল। সেটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামালেন না আর।

সাইফুলের ছোট ভাই সাহেব। তারপর দুই বোন মনিরা আর মায়িদা। সাহেব গা বাঁচিয়ে চলা লোক। কিন্তু তার বউ সীমা আবার সবার জীবনেই একটু নাক গলাতে চায়। মনিরার সাথে সীমার বেশ ভাব। সেদিক দিয়ে মায়িদা শান্ত ধরনের। সাহেব এবং তার পরিবার ছাড়া দুই বোন নিজেদের ছেলেমেয়ে নিয়ে অনুষ্ঠানের একদিন আগেই চলে এলো। মায়িদার মেয়েটা একেবারেই ছোট। আট মাস বয়স। মনিরার ছেলের বয়স নয়। সাথে আবার এসেছে মনিরার ননদের ছেলে আকাশ।

জাহানারাকে দেখে মনে মনে কতক্ষন হিসাব কষলো মনিরা। তারপর মা বোনের কাছে যেয়ে বলল, ‘ ভাই একখানা সেয়ানা ঘুঘু নিয়ে আসছে। দেখতে মনে হয় ভাঁজা মাছটা উল্টাইতে জানে না। অথচ ভিতরে ভিতরে মাছের কাঁটাটাও ছাড়ে না।’

মায়িদা বিরক্ত হলো, ‘ আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছো আপা। ভাবির সাথে ভাব করবা কোথায় তা না!’

‘ ভাব তো করতেই হবে রে মায়িদা। নাহলে ভাইকে আর হাতে রাখা যাবে না।’

‘ এসব কি ধরনের কথা আপা? ভাইকে হাতে রাখবা কেনো? সে কি হাতে রাখার জিনিস?’

‘ না হলে মা’কে ছাড়া বিয়ে করে কিভাবে? ঐ মহিলার খপ্পরে পড়েই ভাই মা’র হাত থেকে ছুটে গেছে। এখন শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে।’

মায়িদা রেগে গেলো, ‘ একদম স্বার্থপরের মতো করে বললা আপা। ভাই আমাদের জন্য দেশ ছেড়েছে। আমাদের উচিত ছিল না দেখেশুনে ভাইয়ের একটা বিয়ে দেয়া? তোমরা কোনোদিন সেসব নিয়ে ভাবনি। আমি কিছু বললেই আমাকে চুপ করিয়ে রেখেছো। তাই ভাই নিজের মতো করে সব করেছে। এখানে তার দোষটা কোথায়? ভাই কি সারাজীবন তোমাদের দিয়েই যাবে? তার নিজের জীবন নাই?’

‘ আহা! দেখলেন মা! আপনার ভাই দরদী মেয়ে। আমাদের এখন আর গুনবেই না। তার ভাই আর ভাবীই সব। বুঝেছি, ভালোই।’ মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলো মনিরা। মায়িদা বিরক্ত বোধ করলো। ঘুমন্ত মেয়ের গায়ের কাপড় ঠিক করতে করতে ভাবলো আপার মনে প্যাঁচ আর কমলো না।

ইসমত আরা এতক্ষণে কথা বললেন। আসর বসেছে তার ঘরে। মিতু স্কুলে থাকায় নিজেদের মতো করে গল্প করছে সবাই।

‘ ঐ মেয়ের চেহারা দেখেই আমি বুঝছি। বয়স হইছে। মানুষ চিনব না?’

মনিরা যেনো উৎসাহ পেলো।

‘ বললাম না আমি? না হলে কি দেখে ভাই আরেক বাড়ির মেয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে আসবে!’

‘ মেয়েটা কই? দেখলাম না তো!’ মায়িদা বলল।

ইসমত আরা বললেন, ‘ গেছে স্কুলে। কি আর দেখবি। মা একজনের ঘর দখল করে মেয়ে আরেকজনের বিছানা দখল করে। ওরে ঘাটানোর দরকার নাই। আলাভোলা মেয়ে। বাদ দে।’

মনিরা কপালে ভাঁজ ফেলে সবটা শুনলেন। জাহানারার মেয়ে আলাভোলা? তাহলে তো তাকে দেখতেই হচ্ছে!

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন