‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
২০.
ক্লাস নাইন মোটামুটি নির্বিঘ্নেই কে’টে গেছে। চিঠি আদান প্রদান চলছে সীমিত আকারে। মাসে একটা বৃহস্পতিবারে স্কুলে যায় না মিতু। কোনো মাসে শুরুর দিকে আবার কোনো মাসে শেষদিকে। ফলে শ্রেণী শিক্ষক তার বন্ধ দেয়াটাকে স্বাভাবিক ভাবছেন। ঐ দিনে স্কুল ড্রেস পড়ে, বই খাতা নিয়ে সোজা বাস স্ট্যান্ডে চলে যায় মিতু। এই এক বছরে অনেক কিছুই চিনে গেছে মিতু। কিভাবে পঞ্চাশ টাকার ভাড়া কায়দা করে ত্রিশ টাকায় যেতে হয় এটাও এখন মিতু জানে। মাঝে একদিন গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অচেনা একটা স্ট্যান্ডে নেমে যেতে হয়। সেদিন হেল্পার লোকটা পঁয়ত্রিশ টাকা ফেরত দিয়েছিল। সেখান থেকে আরেকটা বাসে উঠলে মিতু এক যাত্রীর কাছে জানলো এখান থেকে শহরের ভাড়া পনেরো টাকা। অর্থাৎ তাকে নতুন এবং বোকা পেয়ে বেশি ভাড়া নিয়েছে। কিন্তু লিমা কেনো তাকে জিনিসটা ধরিয়ে দেয়নি? উল্টো সে নিজেই বলেছিল পঞ্চাশ টাকার কথা। কেনো কে জানে।
বাস থেকে নেমে বাকিটুকু হেঁটে যায়। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে আসে ঠিক স্কুল ছুটির সময়ে। চিঠি আসে জবেদার নামে। সেখান থেকে সেটা এনে দেন ইসমত আরা। এভাবেই চলছে মামুনের সাথে মিতুর যোগাযোগ।
মামুন এখন এ বাড়ির অনেক কিছুই জানে। অবশ্য যতটুকু মিতু বলে। থার্ড ইয়ারে উঠে সে রহিম আর নিশানের সাথে মিলে একটা কোচিং সেন্টার চালু করেছে। তন্ময়কেও বলেছিল অবশ্য। সে আগ্রহ দেখায়নি। তিনজন তিনটা সাব্জেক্ট পড়ায়। শুধুমাত্র ছেলেদের নিয়ে। লিলির ঘটনার পর থেকে মামুন আর কোনো মেয়ের টিউশনি করেনি। এমনিতেই তার জীবনে ঝামেলার শেষ নেই তার উপর সেধে সেধে নতুন করে ঝামেলা ডেকে আনার মানে হয় না।
মিতুর ছোট একটা বোন হয়েছে। গায়ের রংটা একদম জাহানারার মতো। কি যে ফর্সা লাগে মেয়েটাকে দেখতে! মিতু অবাক হয়ে দেখে। এটা তার বোন? অবশ্য আশপাশের মানুষ এক দেখায়ই বলে, ‘ মিতু মনে হয় ওর বাপের মতো হয়েছে না? সায়রা পেয়েছে ওর মায়ের রং। দেখলেই বোঝা যায়।’
সায়রার এক বছর হয়ে গেছে। তাকে বেশি একটা কোলে নিতে পারে না মিতু। সীমা চাচী দিতেই চান না। শুধু বলেন মিতু কোলে নিলে নাকি তার মতো দেখতে হয়ে যাবে। সীমার এখনও কোনো সন্তান হয়নি। জাহানারার মেয়েটাকে সে খুবই যত্ন করে। জাহানারা কিছু বলেন না। এদের বাড়ির মেয়ে। ওরা আদর যত্ন করুক জাহানারা এটাই চান। কিন্তু সীমার যত্নের বাউন্ডারিতে মিতু ঢুকতে পারে না।
আগামীকাল মাসের শেষ বৃহস্পতিবার। মিতু রাতে আয়োজন করে চিঠি লিখতে বসলো। কাগজের চারপাশে সিগনেচার পেন দিয়ে ডাবল মার্জিন দিলো। মাঝে চৌকো বাক্সে লিখতে শুরু করলো।
‘ আমার মায়ার ভাইজান,
সায়রা এখন অল্প অল্প কথা বলতে পারে জানো? কিন্তু আমি ওকে বেশি নিতে পারি না। আমাকে ও শুধু মি মি বলে ডাকে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ওর বাবার সাথে কথা বলতে বসে। মোবাইলের ঐপাশ থেকে ওর বাবা যে ওকে কি আদর করে! আচ্ছা ভাইজান আমি যখন ছোট ছিলাম আমার বাবাও কি আমাকে এভাবে আদর করতো? তুমি তো দেখেছো।
ভাইজান আমার মাসে কতো টাকা খরচ হয় আমি হিসাব করেছি। স্কুলে দিতে হয় দেড়শো টাকা, খাতা কলমে জন্য দুইশ টাকা, জামা কাপড়ের জন্য চার পাঁচ মাসে পাঁচশ টাকা আর খাবার খরচের কথাটা জানি না। সব মিলিয়ে মাসে তিন হাজারের ভেতরে হয়ে যাবে না ভাইজান?
ভাইজান আজকে তোমাকে আমি একটা অদ্ভুত কথা বলব। তুমি রাগ করো না। যদি তোমার ভালো না লাগে তাহলে চিঠির এই অংশের উত্তর তোমাকে দিতে হবে না। তুমি শুধু দেখো। কিন্তু রাগ করো না ভাইজান। ভাইজান, তুমি কি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারো? তোমার কাছে? আমি দুইবেলা খাবো। সকালে পাউরুটি খাবো, দুপুরে আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খাবো। কম খরচ হবে। আমাকে নিয়ে যাবে ভাইজান?
(রাগ করো না ভাইজান। নিতে না চাইলে নিও না। তাও চিঠি দিও।)
ইতি
মিতু’
কাগজটা ভাঁজ করে ঘরের পেছন থেকে নিয়ে আসা চাপা ফুলের পাঁপড়ি সেই ভাঁজে দিয়ে দিলো মিতু। এর কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ। চিঠি খামে ভরে যত্ন করে সেটা বালিশের নিচে রেখে দিলো। ইসমত আরা চোখ বন্ধ করে বললেন, ‘ মোমবাতি বন্ধ কর মেয়ে! তুই না ঘুমাস আর মানুষ ঘুমাবে না?’ চমকে উঠে ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিলো মিতু। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেলো।
~
সকাল সকালই সীমা চলে এসেছে। সায়রা তার কোলে। মিতু গোছগাছ করে সায়রার কাছে এসেছে একটু আদর করতে। হাত বাড়ালে সায়রা মি মি করে হাত বাড়িয়ে দিলো। সীমা ভুরু কুঁচকে সায়রার হাত নামিয়ে বলল, ‘ ওর কাছে যাবে না সোনা। ও কেমন দেখেছো? ও কোলে নিলে তুমিও ওরকম কালি হয়ে যাবে।’
সায়রা দুহাতে শব্দ করে বলল, ‘ তালি তালি!’
সীমার পেছনে দাঁড়ানো জাহানারার দিকে তাকালো মিতু। চোখের দৃষ্টিতে আকুতি। জাহানারা ইশারায় বললেন কিছু মনে না করতে। মিতু শ্বাস ছাড়লো। সে কিছু মনে করলেই কি।
সীমা বলল, ‘ মিতু তুমি ওকে এতো কোলে নিতে চাও কেনো?’
মিতু বলল, ‘ আমার বোনকে আমি কোলে নেবো না?’
‘ ও তোমার বোন কেনো হতে যাবে? বলো সৎ বোন।’
‘ কিন্তু আমার মা-ই তো ওর মা।’
‘ বাবার যোগে সম্পর্ক বেশি শক্ত হয়। মায়ের যোগে না। ওকে এত কোলে নেয়ার দরকার নেই।’
মিতু দাঁড়িয়ে রইলো। সম্পর্কের মা’র-প্যাঁচ সে বোঝে না। কিন্তু এই মেয়েটা তো তার বোন। তাই না?
জাহানারা বেশ কিছুদিন ধরে অশান্তিতে আছেন। মেয়েটা বড় হয়েছে। গ্রামের কিছু মানুষ এসে বলে মিতু নাকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে কোথায় যায়। অনেকে ওকে বাসে উঠতে দেখেছ। জাহানারা মানতে চান না। মিতু সহজ সরল। পেটে কিছু থাকলে সবার আগে এসে জাহানারাকেই বলতো। এসব কথা শুধু তাকেই যে বলছে এমন না। সাইফুলকেও জানানো হচ্ছে। তিনি জানেন এসব সাইফুলকে জানাচ্ছে মনিরা। সাইফুল প্রায়ই বলেন মিতুর জন্য পাত্র দেখতে। দেখে শুনে ভালো জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিতে। কোনো কিছুতে তিনি কার্পণ্য করবেন না। জাহানারা বুঝতে পারেন মনিরা শুধুমাত্র তার জীবনে অশান্তি তৈরি করার জন্য এসব করছে। মিতুকেও সুযোগ পেলে কম কথা শোনায় না মনিরা। জাহানারা একবার ভাবলেন পাত্র কি আসলেই দেখতে শুরু করবেন?
~
চিঠি দিয়ে পোস্ট অফিস থেকে বের হতেই মিতু দেখলো আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। তীক্ষ্ম চোখে তাকেই দেখছে। সেদিনের পর আকাশের সাথে দেখা না হলেও তাকে ভোলেনি মিতু। ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠল সে। না দেখার ভান করে আরেক দিকে তাকিয়ে চলে যেয়ে চাইলো। কিন্তু আকাশ তার পথ আগলে দাঁড়ালো।
‘ মিতু যে! কি অবস্থা?’
মিতু নিচের দিকে তাকিয়ে আরেকদিকে গেলো। আকাশ চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ এখানে কি করছ মিতু? তোমার মা জানে তুমি যে এখানে?’
কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মিতু। তার কপালের কোণায় ঘাম জমতে শুরু করেছে। বুক ধড়ফড় করছে। আকাশ মিতুর বড় বড় নিশ্বাস টের পেলো। মিতুর মুখটা ভয়ে ঠিক সেদিনের মতোই পাল্টে গেছে। হাসলো আকাশ, ‘ জানে না তাই না? কার সাথে দেখা করতে এসেছিলে? বয়ফ্রেন্ড নাকি হুঁ!’
‘ না। একটা কাজে এসেছিলাম।’
‘ কি কাজ যে তোমার মাও জানে না?’
‘ স্কুলের একটা কাজ।’
‘ উম..মিতু তুমি এখনো চালাক হতে পারোনি।’
আকাশের মুখে চকচকে হাসি। তাই দেখে ভয়ে শিউরে উঠলো মিতু। আকাশ কি মনে করে চট করে পকেট থেকে ফোন বের করলো। মিতুর সামনেই কাউকে ফোন দিলো।
‘ মনিরা মামী! কেমন আছেন? এই যে আমার সামনে মিতু। কথা বলবেন? পোস্ট অফিসে এসেছিল। স্কুলের নাকি কি কাজ।’
মিতুর মনে হলো তার মাথায় গোটা আকাশটা ভেঙে পড়েছে। আজ যদি বাসায় যেতে না হতো! যদি উড়তে থাকা ধোঁয়ার মতো উধাও হয়ে যেতে পারতো! আহা!
সেসব কিছুই হলো না। কম্পনরত হাত পা নিয়ে মিতু পঞ্চাশ টাকা ভাড়া দিয়েই বাড়িতে গেলো। সে জানে বাড়িতে এতক্ষণে খবর পৌঁছে গেছে। জেনে গেছে জাহানারাও।
জাহানারা জেনেছেন মনিরার ভাষ্য অনুযায়ী। যেখানে এক হয়েছে একশো। শান্ত হয়ে তিনি মিতুর অপেক্ষায় বসে আছেন। সায়রাকে সীমার কোলে দিয়ে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ইসমত আরাও বাড়িতে নেই। মিতু এলো দুপুরের সূর্য মাথায় নিয়ে। মনে হচ্ছে তার হৃদপিন্ডটা যেনো এখুনি বেরিয়ে আসবে বুক ফেঁটে।
মিতু দুর্বল পায়ে উঠান দিয়ে ইসমত আরার ঘরের দিকে যাচ্ছিল। জাহানারা ডাক দিলেন, ‘ মিতু। এদিকে আয়।’ মিতুর বুকটা ধ্বক করে উঠলো। জাহানারার সামনে যেয়ে দাঁড়ালো সে। জাহানারা তার পাশের ঘর দেখিয়ে বললেন, ‘ ঘরে ঢোক।’
মিতুর ঠোঁট ভেঙে আসতে চাইলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে অব্যবহৃত ঘরটায় ঢুকলো সে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করলেন জাহানারা। ধীর গতিতে মিতুর কাছে যেয়ে তার বেণীর গোড়া আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘ কোথায় গিয়েছিলি?’
মিতু কিছু বলল না। জাহানারা শক্তি দিয়ে চুলে টান দিলেন, ‘ বল!’ বড় নরম জাহানারার কন্ঠস্বর।
শ্বাস আটকে মিতু বলল, ‘ পো..পোস্ট অফিসে।’
‘ কার কাছে চিঠি দিয়েছিস?’
‘ ভাইজানের কাছে।’ ডুকরে কেঁদে উঠলো মিতু।
|চলমান|
(রেকর্ড আলহামদুলিল্লাহ্! এরপরে আমি তিনদিন ছুটি নিলে আপনারা যেনো কিছু বলতে পারবেন না👀)