ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

২১তম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

২১.

জাহানারা কিছু বলছেন না। শান্ত হয়ে বসে আছেন। তার এই শান্তশিষ্ট রূপটাই মিতুকে আরও বেশি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর জাহানারার ফোনে কল এলো। রিংটোন বলে দিচ্ছে কলটা সাইফুলের। সাইফুল ফোন দিলে ভিন্ন ধরনের রিংটোন বাজে। জাহানারা ভিডিও কল কে’টে অডিও কল দিলেন। মিতুকে শোনানোর জন্য লাউড স্পিকার অন করলেন।

‘ জাহান এবার তুমি কি বলবে?’

জাহানারা কিছু বললেন না। তিনি জানেন তার আগেই সাইফুল সবটা জেনেছে। আরো আকর্ষণীয় বর্ণনায়।

‘ আমি আগেই বলেছিলাম মিতুকে নিয়ে। ওর জন্য ভালো প্রস্তাব আমার কাছে আছে। তুমি যদি আমার কথাটা আগে চিন্তা করতে তাহলে আজ মিতু এসব করার সুযোগ পেতো না। বলতে বাধ্য হচ্ছি, কিন্তু মিতু যা করেছে এতে আমার মান সম্মান নষ্ট হয়েছে। তুমি চাইলেও আর আমি ওকে আমার বাড়িতে রাখবো না।’

মিতুর মনে হলো জাহানারা নিশ্বাস নিচ্ছেন না। তার বুকে কোনো ওঠানামা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ফোন ধরে রাখা হাতের পেশীগুলো ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে আরো স্পষ্টভাবে। জাহানারা লালাভ ভেজা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন মিতুর দিকে। মিতুর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।

‘ কি প্রস্তাব আছে তোমার কাছে?’ শীতল কণ্ঠে বললেন জাহানারা। জাহানারা কষ্ট পেয়েছে সাইফুল বুঝতে পারছেন কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। অন্য বাড়ির একটা মেয়ে জন্য তিনি নিজে সম্মান কেনো নষ্ট করবেন? জাহানারার খুশির জন্যই তো তিনি মিতুকে নিয়ে এতদিন কিছু বলেননি। কিন্তু আর পেরে ওঠা যাচ্ছে না।

‘ মনিরা ওর এলাকার এক ছেলের প্রস্তাব দিয়েছিলো। কাপড়ের ব্যবসা করে। নিজের দোতলা বাড়ি আছে। ছোট ফ্যমিলি। বাবা নেই মা'কে নিয়ে থাকে। কোনো ভাইবোনও সম্ভবত নেই।’

‘ পড়াশোনা করেছে কতদূর?’

‘ পড়াশোনা দিয়ে তুমি কি করবে? এস এস সি দিয়েছে মনে হয়।’ বিরক্তি ঝরে পড়ল সাইফুলের কণ্ঠে।

‘ বয়স কত?’

এবার একটু সময় নিলেন সাইফুল। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘ ত্রিশ বত্রিশ হবে বোধহয়। বয়স কোনো ফ্যাক্ট না বুঝলে। সবদিক তো আর মেলে না। ওর নামে যেমন কথাবার্তা রটেছে এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর আসবে না।’

‘ মনিরার সাথে কথা বলো। আমি এই সপ্তাহেই মিতুর বিয়ে দেবো।’ খট করে কল কে’টে দিলেন জাহানারা। মিতু আর্তনাদ করে উঠলো, ‘ মা এমন করো না মা। আমাকে মারো, বকো যা মনে চায় করো কিন্তু বিয়ে দিও না মা। আমি তোমার পায়ে পড়ি!’ সত্যি সত্যি জাহানারার দুই পা জড়িয়ে ধরলো মিতু। জাহানারা তবুও নড়লেন না। মিতু চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো।

‘ মা প্লিজ আমার সাথে এমন করো না। মা!’

‘ মামুনের কাছে চিঠি দিস কেনো?’

‘ আমার ভাইজানের কাছে আমি চিঠি দেবো না?’

‘ দিবি। তোর ভাইজানের কাছে তুই চিঠি দিবি আর আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেবো।’ জাহানারা উঠে দাঁড়ালেন। মিতু তার পা ছাড়লো না।

‘ না না মা! আমার তো তুমি আছো ভাইজানের তো কেউ নেই মা। এজন্য আমি চিঠি দিই। প্রতি মাসে আর চিঠি দেবো না মা। দুই তিন মাস পরপর দেবো। তুমি আমার বিয়ে দিও না মা!’ জাহানারা মিতুকে সরিয়ে দিয়ে দরজা খুলে চলে গেলেন। বাহির থেকে দরোজা লাগালেন শব্দ করে। মিতু হু হু করে কাঁদতে লাগলো। তার নিশ্বাস আটকে আসতে চাইলো। সে কার কাছে সাহায্য চাইবে? এই বদ্ধ ঘর থেকে কে তাকে উদ্ধার করবে? কাঁদতে কাঁদতে যখন সে মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে ঠিক তখনই মুয়াজ্জিনের কন্ঠস্বর শোনা গেলো। যেনো কেউ বাতাসে পাঠিয়ে দিয়েছে চুপকথার এক চিঠি। যেনো কেউ বলছে, ‘ এই তো মিতু! আমি তোমার পাশে আছি। কাছে আছি। সবসময়!’

মিতু সময় ব্যয় করলো না। ক্রস বেল্টের ওড়নার ভাঁজ খুলে মুহূর্তেই সেটা মাথায় পেঁচিয়ে নিলো। কম্পনরত দুটো হাত মাটিতে ঠেকিয়ে অন্তরের সবটা আকুতি একসাথে ঢেলে শুধু এটুকুই বলতে পারলো, ‘ আল্লাহ!’

~

ইসমত আরার ঘরে যেয়ে বসে ছিলেন জাহানারা। ঘরের দরজা অর্ধেক খোলা। সন্ধ্যার পড়ে যাওয়া দুর্বল আলো ঘরের সবটা অন্ধকার সরাতে পারছে না। সেই আলো আঁধারির মাঝে দরজা খুলে নিজের স্বগোতিক্ত করতে করতে ঢুকলেন ইসমত আরা, ‘ এই মিতু! তোর ভাইয়ের মাসে কয়টা চিঠি পাঠানো লাগে? আমারে মাগনা পিয়ন পাইছো? ভালোই তো!’

আলো জ্বালাতেই চুপ করে গেলেন ইসমত আর। জাহানারা এখানে থাকবে তিনি কস্মিনকালেও চিন্তা করেননি। সাইফুল চলে যাওয়ার পর জাহানারা কখনোই ইসমত আরার সাথে যেচে কথা বলতে আসেননি। ইসমত আরা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ কি ব্যাপার?’

জাহানারা ঠান্ডা করবে বললেন, ‘ আমার মেয়েটাকে কিভাবে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছেন সেটা দেখতে এলাম।’

‘ তোমার মেয়ের সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই।’

‘ সেটা তো আমার সাথে আছে। আপনার ছেলেকে বিয়ে করেই আমি আপনার শত্রু হয়ে গিয়েছি। আপনার মেয়ের ইচ্ছা সফল হয়েছে। তাকে জানিয়ে দেবেন আমার জীবনে অশান্তি সে খুব সুন্দর করেই সৃষ্টি করেছে। তবে এক মাঘে শীত যায় না। এটাও যেনো আপনার মেয়ে না ভুলে যায়।’ ইসমত আরার হাত থেকে টান দিয়ে চিঠিটা নিলেন জাহানারা। মিতুর জামাকাপড় বইখাতা পাশের ঘরে থাকে। সেখানে যেয়ে বিছানাপত্র উলোট পালোট করে ফেললেন। একগাদা চিঠি পাওয়া গেলো। মিতুর স্কুলের আইডি কার্ড হাতে নিয়ে রাগে ফেটে পড়লেন জাহানারা। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। ছুটে গেলেন মিতুর কাছে।

দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মুখ ওঠালো মিতু। জাহানারা আইডি কার্ড মিতুর সামনে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, ‘ তোর বাপ কে? এই তোর বাপ কে? তোকে কে খাওয়ায় পড়ায়? মঈনুল জীবনে তোর খোঁজ নিয়েছে? বেঁচে আছিস নাকি ম’রে গেছিস এটাও তো জানতে চায়নি। কোন মুখে ওর নাম লিখিস তুই? র’ক্ত বলে কথা। বারবার নিষেধ করার পরও তুই মামুনের সাথে যোগাযোগ রেখেছিস। আমি ভাবতেই পারছি না কিভাবে আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে তুই ওকে চিঠি পাঠিয়ে যাচ্ছিলি! অবশ্য ঘরের ভেতর শত্রু থাকলে তো আর কিছু লাগে না।’ ইসমত আরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেষটুকু তাকে শুনিয়েই বললেন জাহানারা। ইসমত আরা সেটা না বোঝার মতো অবুঝ নন। তবে তিনি বুঝতে পারছেন না জাহানারা ঠিক কি করতে চাইছে।

মিতু কোনো উত্তর দিলো না। মঈনুল গত দশ এগারো বছরে তার কোনো খোঁজ নেয়নি। নেয়ার চেষ্টাও করেনি। চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই পেতো। মিতু তো হারিয়ে যায়নি। কিন্তু এসব কিছু যেমন সত্য তার সাথে এটাও সত্য মঈনুল তার বাবা। কিছু না করলেও জন্মদাতার জায়গা থেকে মঈনুলের নামটা মিতু মুছে ফেলতে পারে না।

জাহানারা শান্ত মানুষ। শান্ত মানুষ রেগে গেলে সেই রাগ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো হয়ে যায়। মিতুর ঠিক তাই মনে হলো। মিতু দেখলো তার দশ বছরের জমানো চিঠি, চিঠির ভাঁজে লুকানো মায়া, ভালোবাসার সবটা জাহানারা পু’ড়ি’য়ে ফেললেন। মিতুর চোখের সামনে। অথচ মিতু কিছুই করতে পারল না।

_______________

মিতু কখনোই এমন চিঠি লেখেনি। তাকে নিয়ে যাওয়ার আবদার চিঠির আড়ালের চিঠিতেও কখনও বলেনি। কিন্তু এবার বলেছে। খুব স্পষ্টভাবে আবদার করেছে। মামুন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি। ছুটে এসেছে চিঠি পাওয়ার দিনই। আজ সকালেই সে চিঠি পেয়েছে। দুপুর নাগাদ রওনা দিয়েছে ক্লাস মিস দিয়ে। কোচিংয়ের দায়িত্ব নিশান আর রহিমকে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা নামার আগেই পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। মামুন জানে চিঠি মিতুর কাছে সরাসরি যায় না। জবেদা নামের কারো কাছে যায়। সে নিশ্চয়ই মিতু যেখানে থাকে তার আশেপাশেই থাকে। সেই ঠিকানার উদ্দেশ্যে যেতে থাকলো মামুন। সন্ধ্যার আবহ যখন জেঁকে বসেছে তখন একটা চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছালো। মনে হলো এক কাপ চা খেয়ে নেয়া যাক।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভাবতে বসলো মামুন। কিভাবে সরাসরি মিতুর কাছে পৌঁছানো যায়। জাহানারাকে না জানিয়ে মিতুকে পাওয়াটা কঠিন। হঠাৎ বেশ কিছু লোক একসাথে দোকানে এলো। কিছু একটা নিয়ে তাদের মাঝে তুমুল উত্তেজনা চলছে।

‘ আরে যেই নাম হইছে ঐ মেয়ের এর চেয়ে ভালো বিয়ে আর কি হবে?’

‘ তাই বলে এমন লোকের সাথে? ওর আগের বউ পালায় গেছে ওর অ’ত্যা’চারের জন্য।’

‘ এসব মনে হয় ওর মা জানে না।’

‘ জানলেও আর কি করার। আরেক ঘরের মেয়ে এতদিন ধরে সাইফুল পালছে সেই তো অনেক। মনে হয় ওদের ভেতরে কিছু হইছে। বুঝেন না?’ লোকটা চোখ টিপ দিলো। সাইফুলের নাম শুনে বিদ্যুৎ গতিতে তাকালো মামুন। সাইফুল জাহানারার স্বামী। এই এলাকায় কি আরো সাইফুল আছে?

‘ এদিকে বিয়ে নাকি চাচা?’ স্বাভাবিক গলায় বলল মামুন।

‘ হ্যাঁ। তোমাকে তো চিনলাম না?’ প্রথম লোকটা বলল।

‘ আমি এক আত্মীয় বাড়ীতে এসেছি। এই যে সামনেই। কার বিয়ে বলেন তো! এক দাওয়াতে দুই বাড়িতে খেয়ে যাই।’

‘ তুমি আর কি খাবা গো! বাড়ির পাশের মানুষ আমরা তাই দাওয়াত পাচ্ছি না। সাইফুলের বউয়ের আগের ঘরের মেয়ে। শহরে যেয়ে নাগর জুটিয়ে এসেছে। সেসব শুনে ওর মা তিরিশ বছরের বিয়ে ওয়ালা লোকের সাথে বিয়ে দিচ্ছে। হাহ!’ দ্বিতীয় লোকটা গুতো দিলো, ‘ এতো কথা বলো কেনো মিয়া! কে না কে! তার কাছে এসব বলার দরকার কি?’

মিতুর বিয়ে হচ্ছে! মামুনের মাথা মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেলো

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন