‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
২৫.
মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাড়ি পাওয়া একই সাথে কষ্টকর এবং খরুচে। পুরো একটা ফ্ল্যাট নেয়া মামুনের পক্ষে সম্ভব না। আবার সাবলেট নিতে হলেও মানুষ দেখে নিতে হবে। সে তো আর একা নেই। মিতু থাকবে বাড়িতে। খুঁজে টুজে বিনোদপুরে একটা এক রুমের সাবলেট পেলো মামুন। দু রুমের ছোট একখানা ফ্ল্যাট। ছোট একটা ডাইনিং। দুটো বাথরুম। গলির পরে গলি পেরিয়ে বাড়িটা প্রধান সড়ক থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে। চারপাশে উঁচু উঁচু বিল্ডিং থাকার কারণে এক তলার এই বাড়িটায় আলো বাতাস তেমন একটা আসে না। একটু ঘুপসি ধরনের। চাপা একটা অন্ধকার রাত দিন সবসময়ই থাকে। সেই অন্ধকারের প্রাচীন গন্ধে মামুনের মনটা কেমন করে ওঠে।
অল্প বয়সী এক দম্পতি থাকে এখানে। সুমন ছেলেটার বয়স মামুনের চেয়ে বড় জোর দুই চার বছর বেশি। সুমনের স্ত্রী আছিয়ার বয়সও আশেপাশেই হবে। দুজনেই বিসিকে কাজ করে। সারাদিন বাড়ি এক প্রকার খালিই থাকে। দুজনের সাথে কথা বলে মামুনের কাছে খুব বেশি খারাপ লাগলো না। এক দেখায় মানুষ চেনা যায় না। কিন্তু ভেতরটা তো আর এটুকু সময়েই বোঝা সম্ভব নয়। নিজ চেষ্টা শেষে বাকিটুকু তাকদীরের উপর ছেড়ে দিয়ে চার দিনের মাথায় মিতুকে নিয়ে এই বাড়িতে উঠলো মামুন। রহিম বলল, ‘ তোর বোনের জন্য ছেড়ে দিলাম। নয়তো আটকে রাখতাম।’
নিশান বলল, ‘ সংসার শিখে নে ব্যাটা। জীবন যু’দ্ধে এক কিলো এগিয়ে যা। দোয়া করে দিলাম।’ কম্পিউটারের দোকানের কাজটা ছেড়ে দিয়েছে নিশান। কোচিং থেকে ভালোই আয় হচ্ছে। নিজে পড়ার জন্য কিছু সময়ও দরকার।
তন্ময় মোটামুটি ভাবলেশহীন ছিলো। যাবার কালে বলল, ‘ যাচ্ছিস যা বোনটাকে একবার দেখিয়ে দিয়ে গেলি না? ছেলে কি আমরা খারাপ নাকি?’
ছেলে হিসেবে তন্ময় কেমন মামুন বলে না। বলতে চায়ও না। তবে মুভি দেখার সময় জুম করে বিশেষভাবে নায়িকাদের দেখা, কোনো মেয়ের ছবি সামনে এলেই তার এক্স রে, পোস্ট মর্টেম সবটা যে দুচোখ দিয়েই করতে পারে তার সঙ্গে বোনকে পরিচয় করে দেয়ার সাহস মামুন পায় না। জীবিত অথবা মৃ'ত কোনো অবস্থাতেই মিতুর অমন পোস্ট মর্টেম মামুন বেঁচে থাকত হতে দেবে না। রোগ থেকে বাঁচতে হলে বুদ্ধিমান মানুষ আগে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাতে কাজ না হলে তারপর নেয় প্রতিকার। মামুন সেটাই করবে। মিতুকে নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি সে নেবে না। সর্ব প্রথম প্রতিরোধ হলো এমন রাক্ষুসে চোখ থেকে মিতুকে ঠিক হীরার মতো আগলে রাখা।
মামুন হেসে তন্ময়কে বলে, ‘ কোনোদিন জরুরী দরকার হলে একাই চিনে নিতে পারবি। আপাতত তো কোনো দরকার দেখছি না।’
হাসির আড়ালে মামুনের চাপা ক্রোধটুকু নিশানের চোখ এড়ায় না। ছেলেটাকে এতো নিখুঁতভাবে সে চিনে ফেললো কিভাবে? কি আশ্চর্য!
তোষক একটা আগে থেকেই ছিল। নতুন একটা বানিয়ে নিয়ে এলো মামুন। ঘরটা লম্বায় ছয় হাত হবে বড়জোর। বই আর বিছানা গোছাতেই কেমন ভরাট দেখতে লাগলো ঘরটা। দুটো ঘরের মাঝে একটা কমন ডাইনিং আছে। সেখানে একটা বাথরুম। আরেকটা বাথরুম সুমনদের রুমে। আসার পর থেকে ওদিকের ঘর খুলতে দেখেনি মামুন। এক দিক দিয়ে স্বস্তির হয়েছে। মিতু কেমন গুটিয়ে আছে। মামুন তাকে স্বাভাবিক করার জন্য গল্প করতে শুরু করে, ‘ পড়াশোনার কি অবস্থা তোর? স্কুলে ফর্ম ফিলাপের কথা কিছু বলেছিল?’
‘ না তো। ভালো কথা মনে করেছো ভাইজান। আমি এখন কোথায় পড়ব?’
ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে মামুন বলল, ‘ আমার ভার্সিটির ভেতরে একটা স্কুল আছে। ওখানে তোকে ভর্তি করে দেবো।’
‘ তাহলে তো আগের স্কুল থেকে টিসি নিতে হবে।’
‘ তা তো নিতেই হবে।’
‘ কিভাবে টিসি নেবো?’ বিমর্ষ মুখে বল মিতু।
‘ আমি যাবো একদিন। দেখি কাল পরশুর ভেতরেই যেতে হবে। নাহলে ফর্ম ফিলাপের ডেট দিয়ে দিলে সমস্যা।’
‘ তুমি যাবা! সত্যি?’
‘ হুঁ।’ শীতল কণ্ঠে বলল মামুন। সেই কণ্ঠ শুনে মিতু আর বলতে পারলো না সে একটু মা আর সায়রাকে দেখে আসতে চায়।
দুপুরে দিকে আছিয়া দরজায় ধাক্কা দিলো। মামুন তখন গোসল করছে ডাইনিংয়ের কমন বাথরুমে। মিতু দরজা খুললো। তার চোখে মুখে জড়তার ছাপ।
আছিয়া হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে দুটো থালা হাতে নিয়ে। চটপট করে বলল, ‘ এই তোমার নাম মিতু?’
উপর নিচ মাথা দোলালো মিতু, ‘ জি।’
‘ আমার নাম কি বলো তো?’
মিতু বিভ্রান্ত হলো। তার কি জানার কথা?
‘ জানি না তো।’
‘ কুরআন শরীফে আমার কথা এসেছে আর আমাকে চেনো না! এই মেয়ে তুমি কুরআন পড় না?’ মেকি গাম্ভীর্য কণ্ঠে ঢেলে শেষটুকু বলল আছিয়া। মিতু ভাবতে বসলো। ভেবে টেবে বলল, ‘ কুরআনে তো একজন মহিলারই নাম আছে। আপনার নাম মরিয়ম?’
‘ তুমি তো বেশ বুদ্ধিমতী! না আমার নাম মরিয়ম না। আমি আছিয়া। তাই বলে আমার বর কিন্তু ফেরাউন না। বুঝলে?’ ফিক করে হেসে দিল আছিয়া। সেই হাসিতে অজান্তেই যোগ দিলো মিতু।
‘ আমার বরের নাম সুমন। নামের মতোই ওর মনটা সু বুঝেছো? এই তোমার হুতুম পেঁচা ভাইটা কই? ভেতরে?’ ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল আছিয়া। মিতু মুখটা ছোট করে বলল, ‘ আমার ভাইজান মোটেই হুতুম পেঁচা নয়। ভাইজান গোসল করছে। আপনি ভেতরে আসেন।’
‘ তোমার ভাইজান অবশ্যই হুতুম পেঁচা। শুধু তোমার সাথে কোকিল কণ্ঠে কু কু করে এছাড়া সারা দুনিয়ার সাথে সে পেঁচার মতোই। সে একদিক দিয়ে অবশ্যি ভালো। আমি ছেলেদের সাথে কথা বললে আমার বর আবার হিংসায় জ্ব’লে পু’ড়ে যায় নইলে তোমার ভাইকে বেশ একটা টাইট দিয়ে দিতাম।’ অনবরত কথা বলে চলেছে আছিয়া। মেয়েটাকে মিতুর মনে ধরে গেলো। মুখে যে কথা বলে চোখেও সেটাই ভেসে ওঠে। স্বচ্ছ দুটো চোখ। পরনে সুতির একটা মলিন শাড়ি। গায়ের রং সাদা হলেও রোদের আ’ক্র’মণে সেটা পাল্টে গেছে। মিতু চুপচাপ মেয়েটার কথা শুনে গেলো।
‘ এই নাও। খেয়ে দেয়ে প্লেট দুটো দিয়ে আসবে। ধুয়ে দিলে ফেরত নেবো না। আজকে শুক্রবার তো তাই আলু ভর্তা, মশুর ডাল আর তেলাপিয়া ভাজা। আমার বরের খুব পছন্দ বুঝলে! ছুটির দিন হলেই ওর এসব খেতে হবে।’
মিতু থতমত খেয়ে গেল। আদতে খাওয়ার ব্যবস্থা কিছুই হয়নি। কিন্তু প্রায় অপরিচিত একটা মানুষের দেয়া খাবার গ্রহণ করতেও তার সংকোচ বোধ হচ্ছিল। আছিয়া হঠাৎ বলল, ‘ এই মিতু! তুমি আমাকে কি বলে ডাকবে?’
‘ কি বলে ডাকবো? আপনিই বলুন।’ মিতু ভাবছে মামুন এখনও বের হচ্ছে না কেনো। কতদিনের গোসল সে একবারে করছে?
‘ শোনো আমাকে ভাবি বলে ডাকবে কেমন? আর আমার বরকে বড় ভাই বলবে। সে কিন্তু মামুনের চেয়ে বয়সে বড়। আমার দেবর ননদের এতো শখ ছিলো! অথচ বিয়ে হলো এমন লোকের সাথে যার দু কূলে কেউ নেই। আর তোমাকে আমি তুই করে বলবো। বলবো মিতু?’ এতো মায়া করে আছিয়া বলল যে মিতু নিষেধ করতে পারল না। ঘাড় এলিয়ে বলল, ‘ বলুন ভাবি।’
আছিয়া উৎফুল্ল হয়ে মিতুর দুহাত আঁকড়ে ধরলো, ‘ আমি তুই বললে তোকে তুমি বলতে হবে।’ আছিয়ার চোখদুটো চকচক করছে। মিতু তাকিয়ে তাকিয়ে সেই খুশির চকমকি দেখলো। খুশিটা নষ্ট করতে মন সায় দিলো না, ‘ তুমি করে বলবো ভাবি।’
আছিয়া কি যেনো চলতে চাইছিল। তার আগেই আছিয়ার ঘর থেকে কাশির শব্দ শোনা গেলো। বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে আছিয়া বলল, ‘ ঐ হয়েছে তোমার ভাইয়ের। আমার সময় শেষ। চোখের সামনে থেকে একটু সরতেই পারি না। তার কাশাকাশি শুরু হয়ে যায়। খেয়ে নিও তোমরা দুজনে কেমন? প্লেট ধুতে হবে না। ভাবিকে দিয়ে যেও।’ তড়িঘড়ি করে ছুট দিলো আছিয়া। মিতুর মনে হলো আছিয়া এই মেকি কাশির শব্দের অপেক্ষায়ই ছিল। তার মুখের বিরক্তিটা ছিলো খোলস। সেই খোলসের আড়ালে ছিলো তৃপ্তি। কাশি শুনে তৃপ্তি। কি অদ্ভুত!
গোসল সেরে এসে মামুন খাবার দেখে বলল, ‘ কে দিলো?’
‘ আছিয়া ভাবি।’ হাসিমুখে বলল মিতু। মামুন ভুরু উঁচু করলো, ‘ এর মধ্যে ভাবিও হয়ে গেছে?’
‘ হ্যাঁ।’
‘ এতো বেশি খাতিরের দরকার নেই। অপরিচিত মানুষ। কার মনে কি আমরা কি বলতে পারি?’ গম্ভীর মুখে বলল মামুন। তার তত্ত্বকথা মিতুর মনে ঢুকলো না। সে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিলো।
মামুন মনে মনে কৃতজ্ঞ হলেও মুখে প্রকাশ করলো না। খাবার কিছুই কেনা হয়নি। একটা স্টোভ কিনতে হবে। বিকেলেই যেতে হবে।
স্টোভ, থালা বাসন সহ আরও কিছু দরকারী জিনিস সন্ধ্যার পর নিয়ে এলো মামুন। মিতু তক্কে তক্কে ছিলো। মামুন যখন গোছানোয় ব্যস্ত তখন সে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ ভাইজান মা’য়ের কাছে একটা ফোন দেবো?’
মামুন হাত দুটো থামিয়ে দিলো এক মুহূর্তের জন্য। পকেট থেকে ফোন বের করে মিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ অবশ্যই বলবি। তোর মা আছে তুই তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবি কেনো? সম্পর্ক কি হাঁটে বাজারে কিনতে পাওয়া যায়?’
খুশি হয়ে মুখস্থ নাম্বার এক নিমেষেই ডায়াল প্যাডে তুলে ফেললো মিতু। ফোন কানে দিতেই তার বুকের ধুকপুকানি জোর আওয়াজ করতে লাগলো।
‘ হ্যালো? কে?’
‘ মা! আমি মিতু।’ অতঃপর দুপাশেই নীরবতা। মিতু কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘ কেমন আছো মা?’
‘ যেমন রেখে গিয়েছিস।’
‘ আমি তো তোমাকে ভালো রাখতেই চলে এসেছি মা। আমার জন্যই তো তোমার এতো সমস্যা।’
‘ খুব বেশি বোঝা শিখে গেছিস তুই।’ জাহানারার কণ্ঠের কম্পন টের পেলো মিতু। হেসে বলল, ‘ সায়রা কেমন আছে?’
‘ ভালো আছে।’
‘ আমাকে নিয়ে মনিরা ফুপু আর তোমাকে খোঁচাতে পারবে না।’ জাহানারা কিছু বললেন না। মিতু বলল, ‘ শোনো মা ভাইজান একটা বাসা সাবলেট নিয়েছে। আমরা এখন ওখানেই আছি। ভাইজানের ভার্সিটির সাথে একটা স্কুল আছে ওখানে আমাকে ভর্তি করে দেবে।’
‘ ভালোই তো।’
অনেকক্ষণ মিতু চুপ করে রইলো। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘ মা আমার উপর কি তোমার অনেক রাগ ছিলো? তুমি আমার এমন বিয়ে কিভাবে দিতে চাইলে?’
জাহানারা কোনো উত্তর দিলেন না। মিতু আস্তে করে কল কে’টে দিলো। চোখের অশ্রু শুকিয়ে যেতেই মামুনের সাথে হাত লাগালো।
রাত বাড়লে নিজের তোষক ডাইনিংয়ে বিছিয়ে নিলো মামুন। তাই দেখে না না করে উঠলো মিতু।
‘ তুমি ওখানে থাকবে কেনো ভাইজান?’
‘ আমার ইচ্ছা।’
‘ এসব হবে না! এসব হবে না! ঘরে কি জায়গা নেই? ঐ পাশে তো সুন্দর মতো হয়ে যায়।’
‘ হোক। আমি ঘরে থাকবো না। তুই দরজা একেবারে আটকে দিস না। একটু খোলা থাক। যা শুয়ে পড়।’ মিতুর শত অনুরোধের তোয়াক্কা না করেই মামুন ডাইনিংয়ে কম্বল পেঁচিয়ে শুয়ে পড়ল মামুন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মিতু নিজেও শুয়ে পড়ল। নির্ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলো মাথার উপরের নতুন ছাদ।
|চলমান|