ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

২৭তম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

২৭.

পরীক্ষার প্রথম দিনই মঈনুলের কাছে ফোন দিয়েছিল মামুন। নাম্বার বন্ধ দেখিয়েছে। সম্ভবত সেই সিমটা আর ব্যবহার করছেন না মঈনুল। চলমান নাম্বার মামুনের কাছে নেই। থাকার কথাও না। জীবন থেকে ডিলিট হওয়া মানুষটার নাম্বার কখনও কন্ট্যাক্ট লিস্টে থাকে না। হায়দার আলমের কাছে ফোন দিয়ে বাবার খোঁজ নিয়েছে মামুন। তিনি ভালো আছেন। বেশ ভালো আছেন।

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা যেদিন শেষ হয়ে গেলো সেদিন মিতুকে নিয়ে গাছ কিনতে গেলো মামুন। তার নাকি বারান্দায় গাছ লাগানোর শখ হয়েছে।

মিতুর আনন্দ বাঁধন ছাড়া হয়েছে। একে পরীক্ষা শেষ তার উপরে কতদিনের বাগান করার শখ পূরণ হচ্ছে। বাইরে বের হলেই মিতু মামুনের হাত দুহাতে আঁকড়ে ধরে হাঁটে। সেই বন্ধন দেখে কেনো জানি মামুনের বুকটা থেকে থেকে ব্যাথা করে ওঠে। মঈনুল বেঁচে না থাকলে হয়তো এই ব্যাথাটা থাকতো না। কে জানে!

দুটো বাগান বিলাসের চারা আর একটা ডায়ানথাসের চারা নিয়ে মামুন বলল, ‘ মিতু এগুলো কিন্তু আমি কিনে দিচ্ছি না।’ বলতে বলতে পকেট থেকে টাকা বের করলো মামুন। মিতু কপাল কুঁচকে বলল, ‘ তাহলে কে কিনে দিচ্ছে? ভূত?’

‘ নাহ। দাদাজান।’

‘ দাদাজান?’

‘ হ্যাঁ। তোর পরীক্ষা শুনে টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে কিনলাম। আরো কিছু টাকা বাকি আছে। সেগুলো দিয়ে কি কিনবি বল। চাইলে তোর কাছে ক্যাশও রাখতে পারিস। তোর ইচ্ছা।’

মিতু চুপচাপ সবটা শুনলো। আস্তে করে বলল, ‘ এই কথা আমাকে আগে বললে না কেনো?’

‘ বললে কি করতি? আগেই সব নিয়ে নিতি?’ মিতু রুষ্ট চোখে তাকালো। পলক ফেলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ কতো টাকা আছে আর?’

‘ হাজার খানেক হবে।’

‘ চলো দুই একটা চাদর কিনি।’

‘ চাদর আমারও আছে তোরও আছে। আবার কিনে কি করবি?’

‘ কাউকে দিয়ে দেবো। চলো কিনি।’

ঘটনার সারমর্ম ধরতে পেরে মামুন মনে মনে অবাক হলো। মিতু দাদাজানের দেয়া টাকা রাখতে চায় না। নিজের জন্যও ব্যবহার করতে চায় না। মিতুর হাত শক্ত করে ধরে রাস্তা পার হয়ে বলল, ‘ সব টাকা শেষ করবি?’

‘ হুঁ।’

‘ কেনো? একজন শখ করে দিলো।’

স্মিত হেসে মিতু বলল, ‘ শখ টখ আর অতো নেই ভাইজান। যে আমাকে ভুলে গেছে তার কাছে তো আরোই না।’

মামুন অপলক দেখলো মিতুকে। তার একমাত্র বোনকে।

ভালো দেখে দুটা চাদর কিনল মিতু। রাস্তার ধারে শীতের সময় কিছু অস্থায়ী দোকান বসে। বেশ ভালো ভালো জিনিসই পাওয়া যায়। মিতু ঘুরে দেখেছে, যেসব জিনিস এখানে দুশো টাকায় পাওয়া যায় সেগুলো কাঁচ ঘেরা দোকানে পাঁচশোর কমে মেলে না। জায়গা ভেদে জিনিসের কি আশ্চর্য রকম মূল্যভেদ! মিতুর বুকটা ভারী হয়ে আসে। রাস্তার ধারের দোকানগুলোর সুদৃশ্য ঐ সোয়েটারের সাথে তার আর মামুনের বড় মিল। কাঁচ ঘেরা দোকানে যাদের জায়গা হয়না।

বেরিয়ে আসার পথে নিশানের সাথে দেখা হলো। মিতু মনে মনে বিব্রত বোধ করলো। নিশান হেসে বলল, ‘ কি রে! কি কিনলি?’ মিতু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিকে তাকিয়েও দেখলো না নিশান। সে খেয়াল করেছে এই জিনিসটা। যতবার এই লোকটার সাথে দেখা হয়েছে ভুল করেও কখনও তার দিকে তাকাতে দেখেনি।

অস্থায়ী এই দোকানগুলোর সম্মিলিত নাম ‘পিপীলিকা’। ধনী মানুষদের খুব একটা এদিকে দেখা যায় না। সেজন্যই মিতুর যতো সংকোচ। তাদের ভেতরের সংকট কেউ জেনে যাক সেটা নিয়ে তার তুমুল অস্বস্তি। মামুনের পেছনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে নিলো মিতু। চাদরের প্যাকেটটা লুকিয়ে রাখলো সন্তর্পনে।

‘ এই চাদর কিনলাম।’

‘ কোথায় যাবি এখন? বাসায়?’

‘ দেখি মিতু কোথায় যেতে চায়। পরীক্ষা শেষ হলো তাই ভাবলাম একটু ঘুরি।’

‘ ভালো করেছিস। টি বাঁধে যাবি নাকি? ওদিকে আজকে যাওয়ার দরকার নেই। পাশ দিয়ে এলাম। দুই চারটা গ্রুপ এসেছে। একেবারে হাউকাউ অবস্থা।’

‘ ওহ আচ্ছা। আমি অবশ্য ঠিক করিনি কোথায় যাবো। ঠিকাছে।’

‘ থাক তাহলে। যাই।’

নিশান চলে গেলে মামুন বলল, ‘ তুই কি নিশানকে ভয় পাস?’

মিতু চোরা চোখে একবার তাকালো। ধরা পড়তে চাইলো না ভাইয়ের কাছে, ‘ ভয় পাবো কেনো?’

‘ মনে হয়। নিশানকে তোর কেমন ছেলে মনে হয়?’

‘ জানি না।’

একটু হেসে মামুন বলল, ‘ ওর মায়ের ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ চলছে। এই মাসটা যাবে কি না সন্দেহ।’

চোখ বড় করে তাকালো মিতু। কথাটা হজম করতে পাক্কা দু মিনিট লাগলো।

‘ দেখে তো মনে হয় না।’ আবারো হাসলো মামুন। নিভতে থাকা সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আমাদের দেখে মনে হয়?’ মিতু থমকে গেলো। দাঁড়িয়ে গেলে মামুন তার হাত টেনে সামনে এগিয়ে গেলো। সবুজ আলো জ্ব'লে গেছে। রাস্তা পার হতে হবে।

~

বলে কয়ে মামুনকে দিয়ে নারিকেল আর খেজুর গুড় আনিয়েছে মিতু। মামুন বলল, ‘ এক কেজি খেজুর গুড়ের দাম জানিস?’

‘ না। দাম জেনে আমি কি করবো? একটু খেয়ে চেয়েছি বলে খোটা দিচ্ছো?’

মামুন চুপ করে গেলো। বাথরুমে ঢোকার আগে বলল, ‘ খুব উন্নতি হয়েছে। ঝগড়া করা শিখে যাচ্ছিস।’

জিনিসপত্র নিয়ে আছিয়ার কাছে চলে গেলো মিতু। আছিয়া লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে ছিল। মিতু তাকে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘ ভাবি আসো ভাঁপা পিঠা বানাই।’

লেপের ভেতর থেকেই বিমর্ষ ঘুম ঘুম কণ্ঠে আছিয়া বলল, ‘ নারিকেল নাই রে।’

‘ ভাইজান নিয়ে এসেছে। আসো বানাই।’

কয়েকদিন ধরেই আছিয়া বলছিল তার নাকি ভাঁপা পিঠা খেতে মন চাইছে। সুমন আনবো আনছি করে নারিকেল আনতে ভুলেই যায়।

উঠে বসলো আছিয়া। ভারী পেটটা নিয়ে নড়তে কষ্ট হয়।

‘ এনে তো ফেলেছিস। নিচে বসবো কিভাবে?’

‘ বসতে হবে না। তুমি বলো কিভাবে বানাবো আমি বানাই।’

‘ পারবি?’

‘ চেষ্টা করেই দেখি।’

স্টোভের সামনে যেয়ে বসলো মিতু। আছিয়া ধাপে ধাপে নির্দেশ দিলো। ময়দা আর নারিকেল মেখে একপাশে রেখে দিলো। মিতু বলল, ‘ এটুকু গুড়ে হবে ভাবি?’

‘ ঐ কৌটায় দেখ একটা টুকরো আছে। ওটাও বের করে নে।’

পাটালি গুড়ো করলে আছিয়া বলল, ‘ ঢাকনাটা নিয়ে আমার কাছে আয়। দেখিয়ে দিই।’

মাটির ছোট ঢাকনাটা নিয়ে আছিয়ার কাছে গেলো মিতু। আছিয়া দেখিয়ে দিল কিভাবে ভাঁপ দিতে হবে। প্রথম দুটো এলোমেলো হলেও পরেরবার থেকে বেশ সুন্দর করে বানালো মিতু। খুশি হয়ে আছিয়াকে বলল, ‘ দেখো হচ্ছে না?’

‘ হ্যাঁ শুনেই হচ্ছে।’

ছোট ছোট করে আটটা পিঠা বানানো হলে আছিয়া দেখলো আর আটটা হয়তো বানানো যাবে। মিতুকে বলল, ‘ তোর ভাইকে দিয়ে আয়।’

‘ ঘরে যেয়ে বানাবো ভাবি।’

‘ তাহলে এখুনি যা।’

আছিয়া আরো দুটো মিতুকে দিয়ে দিতে চাইলো। মিতু বলল, ‘ তুমি তিনটা খাবে, বাব তিনটা খাবে। বাকি দুটো বড় ভাই খাবে।’

আছিয়া হাসলো। মিতু ঘরে ঢুকে দেখল মামুন টেবিলে বসে আছে।

‘ ভাইজান আসো পিঠা বানাই।’

আগ্রহ নিয়ে তাকালো মামুন, ‘ কি পিঠা?’

‘ ভাঁপা পিঠা।’

‘ তুই বানাতে পারিস?’ উঠে এসে মিতুর পাশে বসলো মামুন। সে স্টোভ ধরিয়ে হাড়ি বসালো।

‘ পারি।’

চটপট করে একটা বানিয়ে প্লেটে দিলো মিতু। মামুন পিঠার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ ভালোই তো বানিয়েছিস।’ মাঝখান থেকে ভেঙে ধোঁয়া ওড়ালে কিছুটা গরম কমে এলো। এক টুকরো মিতুর মুখে দিয়ে নিজেও খেলো মামুন।

মিতু বলল, ‘ ভাইজান তোমাকে ত্রিশ সেকেন্ড সময় দিলাম। এর মাঝে তুমি আমাকে যেই প্রশ্ন করবে সেই প্রশ্নের উত্তরই দেবো। ইনশাআল্লাহ্।’

মামুন সাথে সাথেই বলল, ‘ বাবাকে মনে পড়ে তোর?’ মিতুর মুখে হাসিতে চিড় ধরলো না। আরেকটা পিঠা নামিয়ে সেখান থেকে একটু নিজের মুখে দিলো সে। কি গরম!

‘ তুমি না থাকলে মনে পড়ত ভাইজান। এখন বেশি একটা মনে পড়ে না। কষ্টও হয় না। কতো মানুষের তো বাবা মা কেউই নেই। আমার তো তুমি আছো।’

মামুন কিছু বলল না। আহ! সেও যদি মিতুর মতো ভাবতে পারতো! বাবার মুখে একটা ডাক শোনার জন্য তার কেনো এতো কষ্ট হয়?

মিতুকে বলল, ‘ দুটো চারটা পিঠা রাখ।’

‘ কেনো?’

‘ একটা রহিমকে দেবো আরেকটা নিশানকে।’

‘ একটা আবার মানুষকে দেয়া যায়?’

‘ যায়। যতটুকু আছে সেই অনুযায়ীই তো দেবো। তুই রাখ।’

পিঠা বানানো শেষ হলে হাত ঝেড়ে মামুন বলল চল বাইরে যাই।’

আঁতকে উঠলো মিতু, ‘ এই শীতে কোথায় যাবো?’

‘ গেলেই দেখবি। চল।’

মিতুকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো মামুন। মিতু পথঘাট সেভাবে চেনে না। রিকশা থেকে নামার পর দেখলো জায়গাটা স্টেশন। মিতুর হাত ধরে কোন দিক দিয়ে কোন দিকে মামুন নিয়ে গেলো মিতু ঠাহর করতে পারল না। তবে এদিকের ট্রেনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত এখন তারা বিশ্রামে।

ট্রেনের ওপাশে সারি সারি মানুষ শুয়ে আছে। নোংরা, ছেড়া কম্বল অথবা চাদরে পেঁচিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে প্ল্যাটফর্মে। মামুন একটা চাদর তার হাতে দিয়ে বলল, ‘ একটা কাকে দিবি দে।’

মিতু বিপাকে পড়ল। এভাবে কি কাউকে দেয়া যায়? একবার মনে হলো আহা! সবাইকেই যদি একটা করে দেয়া যেতো!

এক কোনায় এক দুই বছরের বাচ্চাকে বুকের ভেতরে নিয়ে এক মহিলা শুয়ে ছিল। তার পাশেই একটা লোক নিজের শুকনো হাত দিয়ে মা আর বাচ্চাকে যতটুকু পারা যায় ওম দেয়ার চেষ্টা করছে। মিতু নিঃশব্দে সেদিকে এগিয়ে গেলো। বাচ্চাটার গায়ের উপর আস্তে করে চাদরটা ছড়িয়ে দিলো। মামুনের কাছে ফিরে আসতেই সে মিতুকে নিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলো। একটা ছেলে মাথা বের করে শুয়ে আছে। অল্প বয়স। কিন্তু পৃথিবীর পোড় খেয়ে তার বয়সের আগে পরিপক্বতা চেহারায় চলে এসেছে। ঘুমন্ত মুখেও সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মামুন মিতুর হাতে বাকি চাদর আরেকটা পিঠা দিয়ে বলল, ‘ ওর গায়ে দিয়ে আয়।’

মিতু এগিয়ে যেয়ে দেখলো ছেলেটার গায়ে একটা চালের বস্তা। সেটার উপরেই চাদর বিছিয়ে দিলো মিতু। আরাম পেয়ে চাদরটা টেনে নিলো ছেলেটা। হাতের কাছে চাদরের ভেতরে পিঠার প্যাকেটটা ঢুকিয়ে হাত বের করতেই ছেলেটার মাথায় মিতুর হাত লাগলো। কুয়াশার জাল বিছানো শীতে ঘুমন্ত ছেলেটা গুঙিয়ে উঠলো, ‘ ফুলি! ও ফুলি!’

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন