#কৃষ্ণচূড়া 🍂
নুসরাত সুলতানা সেজুথি
পর্ব--১৬
জানলার গ্রিল ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে কাব্য। শনশন শব্দে বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে বাইরে। রাত হলেও জোৎস্নার আলোতে চার পাশ টা বেশ পরিষ্কার। তার সাথে বাতাসের কিঞ্চিৎ হিম স্পর্শে একেবারে মন প্রান জুড়িয়ে আসছে তার।
এরকম স্নিগ্ধ পরিবেশে জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব টাই মাথায় ঘুরপাক খায় কাব্যর। এক সময় সব ছিলো তার কাছে। আজ ও আছে। কিন্তু মাঝখান থেকে কিছু ভালোবাসার মানুষ কে হারিয়ে ফেলেছে এই যা!
যে সিনেমা জগতের মধ্যমনি বলা হয় তাকে,,,,,সেই সিনেমা জগৎ টার প্রতি তার যে ঠিক কত টুকু বিতৃষ্ণা সেখবর তো কারোর জানা নেই। বলা হয়,,, মানুষ যে পেশায় নিয়োজিত থাকে সেটাই তার প্রান হয়। কিন্তু সব নিয়ম,,, সব প্রচলন তার বেলায় এসেই উল্টো মোড় নেয় কেনো??
---------------------------
,,,,,,,,,
,,,,,,,
,,,
,,,,,,,
খট করে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ভাবনা চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালো কাব্য। ধড়ফড় করে ছবি এসে প্রবেশ করলো কক্ষের ভেতরে।
এতে কপাল কিছুটা কুচকে এলো কাব্যর।ছবিকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ হন্তদন্ত হয়ে এসেছে সে।
--- এসময়ে আপনি?
কাব্যর এমন গম্ভীর আওয়াজে এতক্ষনের উত্তেজিত ভাবমূর্তি বহন কারী ছবি বেশ মিইয়ে এলো এবার।
বরাবরের মতোই তার ধীর গলার স্বর তুলে বলে উঠলো......
--- আসলে একটা কথা বলতে এসেছি....
--- বলুন।
--- কিছু মনে করবেন নাতো?
--- বলেই দেখুন।
কাব্যর অনুমতি পেয়ে পুনরায় চকচক করে উঠলো ছবির মুখমন্ডল। দু পা ফেলে আরেকটু এগিয়ে গেলো সে জানলার দিকটায়। যেখানে চোখে মুখে জিজ্ঞাসা ফুটিয়ে দাড়িয়ে আছে কাব্য।
এবার ছবি উৎসাহে বেশ প্রজ্জ্বলিত হয়ে বলে উঠলো...
--- আজ পূর্নিমা। আকাশে এত্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে.....
--- চাঁদ আবার এত্তো বড় হয়??
--- পুরো কথা শুনুন না...
--- বলুন
--- আমি ভাবছি ছাদে যাবো....
--- তো যান....
--- আমি একা কিভাবে যাবো....?? আমার ভয় লাগে।
--- কিসের ভয়.??
--- ভূতের ভয়।
--- ভূত?? ভূত বলতে কিছু নেই।
--- জ্বীন তো আছে। সেটার ভয় হয়।
মা বলতো রাতের বেলায় ছাদে তেনারা ঘুরে বেড়ায়। এই সময় একা একা ছাদে যেতে নেই....
--- তো না যান। ভয় লাগলে কি আর করবেন???
--- কিন্তু আমার যে চাঁদ দেখতে ইচ্ছে করছে।
--- জানলা দিয়ে উকি মেরে দেখুন।
--- আপনি এরকম কেনো?? আপনি কি বুঝতে পারছেন না আমি কি বলতে চাইছি??
--- পারছি,,,,কিন্তু আপনি সরাসরি আমাকে আপনার সাথে যেতে বলছেন না। আর তাই আমিও ইচ্ছে করেই বুঝতে চাইছি নাহ।
--- আপনি তো ভারী শয়তান লোক....
--- সেটা আজ বুঝলেন বুঝি.....
🍁
🍁
🍁
🍁
ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য। তার পাশেই ছবি।
আর সেটাও কাব্যর একেবারে পাশ ঘেঁষে।
এর কারণ অবশ্য জানা আছে কাব্যর। সবটাই ভুতের ভয় থেকে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা।
এক নাগাড়ে মনোযোগ দিয়ে আকাশের চাঁদ দেখছে ছবি।
যেনো এই মুহুর্তে চাঁদ দেখার গুরু- দায়িত্ব পরেছে তার কাধে।
কাব্যর বাড়িটি বেশ জায়গা নিয়ে বিস্তৃত। যার দরুন ধরা ছোয়ার মধ্যে আর কোনও বাড়িঘর নেই।
নিস্তব্ধ রাতে এমন জনমানব হীন পরিবেশে শুধু মাত্র দূর থেকে ভেসে আসা দু একটা শব্দ ব্যাতীত আর কোনও কিছুই শ্রুতিগোচর হচ্ছেনা দুজনের। এমতাবস্থায় নিঃশ্বাসের শব্দ গুলিও যেনো দ্বিগুন ভারী মনে হচ্ছে।
এমন গভীর নিরবতা কাটলো কাব্যর উদ্দেশ্যে ছবির প্রশ্নবোধক জিজ্ঞাসায়...
--- আচ্ছা বলুন তো চাঁদের মধ্যে ওই কালো ছাপ টা কিসের??
--- জানিনা তো... কিসের??
--- আমিও জানিনা। তবে শুনেছি,,,, ওটা চাঁদের কলঙ্কের দাগ।চাঁদ সব থেকে সুন্দর বস্তু কিনা,,,ওই কালো দাগ গুলো তার দূর্বলতা। অর্থাৎ প্রত্যেকটা সৌন্দর্যের মাঝেই কিছু খাদ থাকে তার প্রমান বহন করে চাঁদের ওই কালো দাগ গুলো।
ছবির কথা শুনে বেশ শব্দ করে হেসে উঠলো কাব্য। হাসতেই হাসতেই বলে উঠলো....
--- চাঁদের কলঙ্ক? লাইক সিরিয়াসলি??
--- এতে হাসির কি হলো? যেটা শুনে এসেছি সেটাই তো বললাম।
ছবির মুখ ফোলানো দেখে হাসি থামিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো কাব্য। কিন্তু দীর্ঘক্ষন এই স্বাভাবিকতা টিকলো না তার।যার দরুন পুনরায় হেসে উঠলো সে।
ফলশ্রুতিতে ছবির মুখের অভিব্যক্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
--- হেসেই যাচ্ছেন। কৌতুক শুনিয়েছি মনে হয়??
--- আসলে এগুলো লোকেদের প্রচলিত কথা। তবে এর একটা সাইন্টিফিক ব্যাখা আমি আপনাকে দিতে পারি...
--- কী....ব্যাখা...??
--- আকাশের ওই উজ্জ্বল চাঁদের কারণ হলো সূর্য। মূলত চাঁদের যে জায়গাটি আমরা বেশি উজ্জল দেখি সেটা সূর্যের আলোকে একটু নয় বরং কয়েক গুন বেশিই রিফ্লেক্ট করে থাকে। আর অন্য পাশের জায়গা যেখানে আছে লুনার মারিয়া..সেখানে আয়রনের মাত্রা পরিমানে অনেক বেশি।যার দরুন এখানে সূর্যের আলো অনেক কম রিফ্লেক্ট হয়।
এইজন্যে চাঁদের যে পাশটি আমাদের পৃথিবী থেকে দেখা যায়,,,ওখান থেকে যে অংশটুকু লুনার মারিয়া হয়ে রয়েছে শুধু সেই অংশটুকুই আমরা কালো দেখি।
অর্থাৎ পুরোটাই ঘটে যাস্ট এই লুনার মারিয়ার দরুন।
---এই লুনার মারিয়া টা আবার কি??
--- লুনার শব্দ এর অর্থ হচ্ছে চাঁদ,আর মারিয়া মানে হচ্ছে সমুদ্র। অর্থাৎ পুরোটা মিলে দাড়ায় চাঁদ সমুদ্র।১৭০০ শতাব্দিতে এস্ট্রোনাট ভেবেছিলেন চাঁদের কালো দাগ গুলি চাঁদের মাঝে সমুদ্র। আর তাই তারা এর নাম এরকম টা দিয়েছিলেন। যদিও সেসব এখন ভুল প্রমানিত হয়েছে।
কথা গুলো বলে নিয়ে আবারো ছবির দিকে তাকালো কাব্য। মুখ হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ছবি।
--- আপনি কত কিছু জানেন???
--- টপার ছিলাম ম্যাডাম। জানতে তো হবেই।
--- পড়াশুনায় ভালো ছিলেন...তাহলে অন্য প্রফেশনেও তো যেতে পারতেন। হিরো হতে হলো কেনো??
--- বাবার ইচ্ছে ছিলো তাই....মিডিয়ার মানুষ ছিলেন কিনা??
--- ওহহহ।
--- অনেক রাত হয়েছে... বৃষ্টিও হতে পারে। চলুন যাওয়া যাক।
---আরেক টু থাকিনা...
--- কাল সকাল ১০ টায় শ্যুটিং আছে। আমাকে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। আমি আর থাকবোনা।
--- থাকতে হবেওনা। চলে যান
--- বেশ।আপনিই থাকুন না হয়।তারপর তেনারা এসে ঘাড় মটকাক আপনার।
--- না,না,আমি কি বলেছি আমি যাবোনা।
🍂
🍂
শট শেষ করে বিরতিতে সেট থেকে নেমে এসে চেয়ার টেনে বসে পরলো কাব্য ছবি দুজনেই। কিছু সময় পর সেখানে হাজির হলো ইরফান। যথারীতি সেও ছবির পাশের জায়গা টা দখল করে নিলো।
--- হেই ছবি। কি খবর তোমার....
--- ভালো। আপনার?
--- ভালো নয়।
---কেনো?
--- শ্যুটিং ছাড়া তোমার সাথে তো দেখাই হচ্ছেনা আমার। ভালো কি করে থাকবো আমি??
ইরফানের এমন রসালো কথায় কাব্য ছবি দুজনার মাঝেই একঝাক বিরক্তি এসে ভর করলেও কোনও দ্বিরুক্তি প্রকাশ করলোনা তারা।
নিজেকে বাচাতে কাব্য উঠে চলে গেলেও ছবিকে না চাইতেও বসে থাকতে হচ্ছে।
তার চাইতেও বড় কষ্টের কারণ হিসেবে মুখে ঝুলিয়ে রাখতে হচ্ছে জোরপূর্বক হাসি।
কাব্য উঠে যাওয়াতে বেশ সুবিধে অনুভূত হলো ইরফানের।
একমাত্র তার মেয়ে পটানোর ক্ষেত্রে এই কাব্যই সাক্ষী। যার দরুন ইদানিং কেনো জানিনা একটু আকটু নার্ভাস লাগে তার নিজের কাছে।
সুযোগ পেয়ে এবার ছবির এক হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলো ইরফানের। এহেন কার্যে ভয়ে ভীত হয়ে ধুক করে উঠলো ছবির ভেতর টায়।
--- তোমার হাত গুলো বেশ সুন্দর আর সফট।
প্রত্তুত্যরে বরাবরের মতোই মৃদূ হাসলো ছবি। বেশ সন্তর্পনে ইরফানের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো সে।
চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাব্যকে খুজে যাচ্ছে ছবি।তাৎক্ষণিক ইরফানের নজরে এলো ব্যাপারটা।
--- কাউকে খুজছো??
--- নাতো....
--- আচ্ছা তোমার কন্টাক্ট নাম্বার টা দাও তো....
--- আমি ফোন ব্যাবহার করিনা।
--- কেনো...??
--- আমার ভালো লাগেনা।
--- এই জেনারেশনে এসে ফোন ব্যাবহার করেনা এরকম টা আমি প্রথম বার দেখলাম।
--- আমিও...
--- তাহলে বাসার ঠিকানা টা দাও।
--- বাসার ঠিকানা জেনে কি করবেন..??
--- তুমি আমার সিনেমার হিরোইন,,, এসব জেনে রাখা তো আমার দায়িত্ব। তাছাড়া আমরা এখন অনেক টাই ক্লোজ তাইনা....
মহা বিপদে পরেছে এবার ছবি। মিথ্যে বলে ফোন নম্বরের ব্যাপারটা কাটানো গেলেও বাসার ঠিকানা কিভাবে দেবে সে...সেতো কাব্যর বাড়িতে থাকে।
আর যাই হোক এটাতো কাউকে জানানো যাবেনা। তবে কি করবে এখন?
পুনরায় কাব্যকে নিশব্দে খুজে যাচ্ছে সে। ব্যাপারটা অবশ্য ইরফানের নজর এড়াতে পারছেনা। অবশেষে একটা বুদ্ধি মাথায় এলো ছবির। প্রসঙ্গ পাল্টানোর ভালো উপায় এটাই।
--- আচ্ছা আপনার বন্ধু কাব্য রেয়ান কোথায়??
--- কেনো..??
--- ওনাকে দরকার আমার....
--- কি দরকার....
ইরফানের কথায় ভ্রু কুচকে ওর দিকে তাকালো ছবি।
বিষয় টা বোধগম্য হতেই পরিস্থিতি সামলাতে ইরফান বলে উঠলো.....
--- না মানে আমি বলতে চাইছি যে,,, ওকে তোমার কি দরকার পরতে পারে,,,,ওতো নেই এখানে....
--- আচ্ছা। আপনি অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।
--- কোথায় যাচ্ছো??
--- আসছি।
ছবি উঠে দাড়াতেই ওর এক হাত টেনে ধরলো ইরফান।
এবার রীতিমতো চরম রকমের মেজাজ খারাপ হ তে শুরু করলো ছবির। কিঞ্চিৎ ঝাড়া মেরে ইরফানের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো সে।
--- প্রত্যেক টা ব্যাপারেই আমাকে ছুতে হবে আপনার??
--- না আসলে..... উঠে চলে যাচ্ছিলে....এড্রেস টাও দিচ্ছোনা...
ক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে ইরফান কে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সেদিন কার কাব্যর বলা কথাগুলো মনে এলো ছবির।
মুহুর্তেই রাগ সংবরন করে সামলে নিলো নিজেকে।
--- আমি বলতে চাইছিলাম যে,,,,বাসার ঠিকানা দেয়ার সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছেনা তাইনা? আরেক টু কাছাকাছি হই আমরা? তারপর যা চাইবেন সেটাই পাবেন।
দু--ঠোঁট বিস্তৃত করে এক অমায়িক হাসি ইরফান কে উপহার দিয়ে প্রস্থান নিলো ছবি।
আর সেদিকে খানিক ক্ষন স্থির ভাবে তাকিয়ে রইলো ইরফান
--- মাথা খারাপ করার মত হাসি.....এই মেয়েকে বশে আনতে আর কতদিন লাগবে কে জানে??
🍁
🍁
🍁
আপনি আসলেই ভীষণ খারাপ। ভয়ঙ্কর খারাপ....
--- আমি আবার কি করলাম....??
--- ওভাবে আমাকে একা রেখে চলে এলেন??
--- একা কোথায়?? আমিতো আপনার সাথেই ছিলাম.....
--- ভারি মিথ্যেবাদী তো আপনি.. আমার সামনে দিয়েই উঠে এলেন,,,,আর বলছেন আমার সাথেই ছিলেন?
--- স্ব-শরীরে হয়তো ছিলাম নাহ,কিন্তু আমার চোখ গুলো আপনার সাথেই ছিলো।
--- মানে??
--- ওয়েট।
পাশ থেকে ফোন উঠিয়ে ছবির সামনে ঘুরিয়ে ধরলো কাব্য।
--- এটাতো ক্যামেরার ফুটেজ মনে হচ্ছে?? কিন্তু আমাকে কেনো দেখাচ্ছে??
--- , আপনার হাতের ঘড়িটা..ই তার কারণ...
বুঝতে পারলেন নাতো...??
জবাবে দুদিকে মাথা নাড়লো ছবি। যার অর্থ সে বোঝেনি....
--- আপনার ঘড়ির সাথে ক্যামেরা লাগানো রয়েছে।সেই সাথে আমার ফোনের কানেকশন। এই ঘড়ি পরার পর আপনি যাই করবেন আমি দেখতে পারবো,,,,যেখানেই যাবেন আমি বুঝতে পারবো।
ঠিক যেভাবে তখন ইরফানকে আপনার হাত ধরতে দেখলাম,,,, সেই ভাবে।
চলবে....