#কৃষ্ণচূড়া🍂
নুসরাত সুলতানা সেজুথি
পর্ব--১৭
সিনেমার কাজ মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যায়ে এখন। ইতিমধ্যেই দেড় মাস পার হয়েছে দেখতে দেখতে।
আগের থেকে কর্মদক্ষতায় বেশ উন্নতি ঘটেছে ছবির। এখন দুই,, একবার, বুঝিয়ে দিলেই সুসম্পন্ন হয় তার কাজ গুলি।
ইদানীং কাল কাব্য আর ছবির মধ্যকার সম্পর্কের পরিনতিও বেশ স্বাভাবিক এবং সাবলীল হয়ে এসছে । শুধুমাত্র সৌজন্য রক্ষার্থেই তাদের মধ্যে আলাপ সালাপ হয় এমন টা নয়,,,
আজকাল প্রায়শই বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাতে কফি মগ সহ কাব্যের সহিত খোশগল্পে মেতে ওঠে ছবি। কখনও বা ছবির আবদারে মাঝরাতে ছাদে গিয়ে জোৎস্না বিলাস করে আসে কাব্য।
ছবি এখনও মিস্টার রেয়ানে আটকে থাকলেও মিস ছবি থেকে কাব্যর সন্মোধন এখন শুধুই ছবিতে এসে গড়িয়েছে। যদিও আপনি শব্দটা পূর্বের মতোই বহাল রয়ে গিয়েছে দুজনের মধ্যে।
_________________________
___________
বোনের খোজ এখন অব্দি পাওয়া হয়নি ছবির।যার দরুন ইরফানের সাথে মাখো-মাখো বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। সুযোগ মোতাবেক ইরফানও এখন সারাক্ষন জোকের মত লেগে থাকে ছবির সাথে সাথে।
অনিচ্ছা থাকলেও নিরুপায় হয়ে তাতে সায় দিয়ে যেতে হয় ছবির।
ফলাফল হিসেবে ইরফান আরো সান্নিধ্য চাইছে তার।
ঘোলাটে আইরিশ গুলোর লোলুপ দৃষ্টি যার প্রত্যক্ষ প্রমান বহন করে।
এসব যেমন তেমন হলেও আজ একটু নয় বরং অনেক বেশিই সংকটে পরেছে ছবি।
ইরফানের দিক থেকে তার নিকট লং ড্রাইভে যাওয়ার প্রস্তাব এসেছে।
মুখের ওপর ইরফান কে নাকচ করে দিলে এত দিনের সব কষ্ট ব্যার্থতায় পরিনত হবে তার। অন্যদিকে ইরফানের চারিত্রিক ত্রুটির কথা ভেবে হ্যা বলতেও ভয় পাচ্ছে সে।
উদাস ভাবভঙ্গি মুখে ফুটিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় এক ভাবে বসে আছে ছবি।পাশের ডায়নিং রুমের দিকটায় কলকল ধ্বনি তুলে জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাস ভর্তি করছে কাব্য। হঠাৎ করে ছবির দিকে চোখ পরলো তার। এই সময়ে এখান টায় এভাবে ছবিকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হওয়ার পাশাপাশি তার উদাসীনতাও নজর এড়ালোনা কাব্যর।
অতঃপর ভ্রু ক্রুটি করে হাতে গ্লাস উঠিয়ে নিয়ে চুমুক দিতে দিতেই এগিয়ে গেলো ছবির দিকে।
--- এনিথিং রং ছবি??
কাব্যকে দেখতে পেয়েও কোনও উত্তর দিলোনা ছবি।ছবির কোনও সাড়া না পেয়ে কাব্য একিভাবে জিজ্ঞেস করে উঠলো....
--- কি হয়েছে??
বলুন আমায়?
এবার গাল থেকে হাত সরিয়ে কাব্যর দিকে তাকালো ছবি।
--- অনেক কিছু হয়ে গিয়েছে মিস্টার রেয়ান।
--- বলবেন তো নাকি...?
--- আপনার বন্ধু ইরফান আমাকে লং ড্রাইভে যাওয়ার প্রোপোজাল দিয়েছে।
---বাহ এটাতো বেশ ভালো খবর। এতে এতো চিন্তা করার কি আছে?
--- কি বলছেন কি?? এটা আপনার কাছে কোন দিক দিয়ে ভালো মনে হলো?
--- সব দিক থেকে।
--- কিন্তু আমার তো কোনও ভাবে এমন টা মনে হচ্ছেনা।তাহলে... আপনার কি করে মনে হতে পারে?
সামান্য হেসে হাতের গ্লাস টা টেবিলের ওপর রেখে দিলো কাব্য।
খানিক বাদে মাথা উচিয়ে বলে উঠলো...
--- আপনি যে বোকা তাই...
--- ও তাই নাকি?? তো আপনিতো বেশ বিচক্ষন ব্যাক্তি ,আপনিই না হয় বুঝিয়ে দিন আমাকে....
--- ,,,,ইরফান আর আপনি আজ লং ড্রাইভে যাচ্ছেন। এটাই তো সুযোগ ,,,ইরফানের থেকে আরাবির ব্যাপারে জেনে নেয়ার।
--- আপনিই তো বলেছিলেন জিজ্ঞেস করলেই ও বলবেনা কোনও কিছু?? তাহলে এখন আবার আপনিই বলছেন এসব.??
--- উফফ! মহা ঝামেলা তো,,,,ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ছবি,,,, তখন কার ব্যাপার আর এখন কার ব্যাপার এক নয়। এ কদিনে ইরফানের আপনার প্রতি যা ঝোক বেড়েছে তাতে আমার তো মনে হয়না ও আরাবির প্রতি এখনও আগের মতোই ইন্টারেস্টেড আছে। সুতরাং আপনি চাইলে কৌশলে জেনে নিতেই পারেন ওর থেকে।
--- আমার কিন্তু সেরকম মনে হচ্ছেনা মিস্টার রেয়ান। যেখানে ইরফানের মত চরিত্রহীন লোকের সামনে কয়েক মুহুর্তে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভয় হয়,,, সেখানে তার সাথে অত রাতে বার হওয়ার কোনও পজেটিভ দিক--ই চোখে পড়ছে না আমার।
তাছাড়া আমি যে ওনার সাথে বার হবো এটা ওনার জানামতে কেউ জানেনা। সেক্ষেত্রে কিছু উল্টো পাল্টা উনি তো আমার সাথে করে বসতেই পারেন।
তাই নয় কি??
--- হ্যা সেতো বটেই। ইরফানের ক্ষেত্রে সব- ই সম্ভব। কিন্তু আপনি যে আমার বলা কথাটাও ভুলে যাচ্ছেন ছবি।
আমি না চাইলে কেউ আপনাকে স্পর্শ করতে পারবেনা এটা আমিই বলেছিলাম একদিন। সেক্ষেত্রে আপনার সেফটির দ্বায়ভার সম্পূর্ণরুপেই আমার।
--- কি করবেন আপনি মিস্টার রেয়ান??ক্যামেরায় চোখ লাগয়ে বসে থাকবেন?? তারপর নন্দলালের দেশ স্বাধীন করার মতো ঘরে বসে উদ্ধার করবেন আমাকে??
সন্মান হানী হলে তো হবে আমার। আপনার কিছু আসবে যাবে তাতে?
--- হাউ রাবিশ!! আমার ওপর এতোটুকু ভরসা নেই নাকি আপনার?
--- না নেই।
--- ওকে, তাহলে আর কি... মন না চাইলে যাবেন না।পুরোটাই আপনার মর্জি।
আমার কেন জানিনা মনে হয়েছিলো আজকের পরেই হয়তো আরাবির খোজ পেতে পারতাম আমরা,,, সেই থেকেই ছোট্ট একটা সাজেশন দিয়েছিলাম আপনাকে। কিন্তু আপনি যেখানে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অটল রয়েছেন সেখানে আমার কোনও কিছু বলাই বেকার।
কথাগুলো বলে টেবিল থেকে ভাজ করে রাখা পত্রিকাটা হাতে উঠিয়ে নিলো কাব্য। চোখের সামনে মেলে ধরতে ধরতে পুনরায় বলে উঠলো...
--- আমি যাই বলে থাকি সেখানে স্বার্থ সব সময় আপনার ক্ষেত্রেই বেশি ছিলো। তাও যদি মানতে না চান তো আপনার মনে যা আসছে সেটাই করুন।
বোনের জন্যে এতটুকু ঝুকি নিতে পারবেন আশা করেছিলাম আমি।
কাব্যর কথায় এবার দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পরেছে ছবি। আরাবির ব্যাপারটাই যে তার একমাত্র দূর্বলতা। আর জেনেশুনে সেই দূর্বল জায়গাতেই তীর ছোড়ে এই লোকটা।
অবশেষে খানিকক্ষণ চুপ থেকে ছবি নিজেই বলে উঠলো....
--- আপনি শিওর যে আজকে ইরফান কে জিজ্ঞেস করলে উনি সত্যিটা বলে দেবেন আমায়??
ছবির কথা শুনে পত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে চোখ সরিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালো কাব্য।
--- সেসব জেনে আপনি কি করবেন?
--- প্লিজ বলুন। আমি রাজী আছি ওনার সাথে যেতে।
--- ভেবে বলছেন?
--- হ্যা।
--- তাহলে যাওয়ার পরেই মিলিয়ে নেবেন।
বাই দ্যা ওয়ে,,, ইরফান আপনাকে পিক-আপ করে নেওয়ার কথা বলেনি?
--- বলেছে??
--- এড্রেস চায়নি?
--- চেয়েছিলো...
--- দিয়েছেন??
--- উহু....
--- তবে??
--- বাইপাসের কাছে অপেক্ষা করতে বলেছি।
---বাহ ইন্টেলিজেন্ট!
জবাবে কোনও দ্বিরুক্তি প্রকাশ করলোনা ছবি। ছবির এমন নিরাশ চেহারা দেখে কাব্য আশ্বস্ত স্বরে বলে উঠলো....
--- এতো ভাববেন না। ভরসা রাখুন আমার ওপর । দুনিয়া উল্টে গেলেও আপনি সেফ থাকবেন আমি কথা দিচ্ছি।ইউ নো হোয়াট... কাব্য রেয়ানের কথায় কখনও নড়চড় হয়না।
এতো আশ্বাসের পরেও তবুও মন থেকে একবারে ভয় দূরীভূত হলোনা ছবির। সামনে তার জন্যে কি অপেক্ষা করছে কে জানে??
🍁
🍁
🍁
🍁
🍁
🍁
🍁🍁
রাস্তায় দু একটা গাড়ি ব্যাতীত আর কিছুই নজরে আসছেনা ছবির। প্রতিদিনকার তুলনায় আজকে একটু বেশিই শূনশান মনে হচ্ছে রাস্তাগুলো।
এক হাত দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছে ইরফান। অন্য হাতে ছবির এক হাত ধরে রেখেছে। তার পাশেই এক রাশ ভয় মনের মধ্যে নিয়ে বসে আছে ছবি। গাড়িতে ওঠা থেকে শুরু করে এক মুহুর্তের জন্যেও ওপর ওয়ালা কে স্মরন করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেনি সে। উশখুশানির মাত্রা টাও আস্তে আস্তে তীব্র আকার ধারন করছে তার।
ইরফান তখন থেকে হেসে হেসে বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে ছবির সাথে কথা বলে যাচ্ছে,,,কিন্তু আদৌ সেগুলো ছবির কান অব্ধি পৌছাচ্ছে কিনা কে জানে।
জেনেশুনে নেকড়ের গুহায় ঢুকে পরেছে ছবি,,, প্রান নিয়ে ফিরতে পারবে কিনা একমাত্র উপর ওয়ালাই জানেন। কাব্যর আশ্বাসে চলে তো এলো বাকি পুরোটাই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর যে উপায় নেই তার।
!!___________________
___________
_______!!
গাড়ি ব্রেক কষার শব্দে ধ্যান ভাঙলো ছবির। সামনের দিকে তাকিয়ে সাদা বর্নের একটি বাঙলো দৃষ্টি গোচর হলো তার।
ততক্ষনে ইরফান গাড়ি থেকে নেমে পরেছে। ছবির চিন্তা ভাবনার ফাকেই এগিয়ে এসে ওর পাশের দরজা টাও টেনে খুলে নিলো ইরফান। তাৎক্ষণিক ইরফানের ইশারায় মৃদূ পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো ছবি।
--- আমরা এখানে কেনো এসেছি?কার বাড়ি এটা?
--- এটা আমার এক আঙ্কেল আন্টির বাড়ি।আমার কিছু ডকুমেন্টস আছে এখানে। ওগুলো নিয়েই চলে যাবো। এসো.....
--- আপনি বরং নিয়ে আসুন। আমি এখানেই থাকি....
--- আরে না না। আমার আন্টি মহরত দেখেই তোমাকে পছন্দ করেছিলেন। ওনার ইচ্ছে ছিলো সামনে থেকে একবার দেখবেন তোমাকে। এইজন্যেই না এক সাথে দু কাজ সাড়তে এসেছি। আমার ডকুমেন্টস নেয়াও হবে সাথে আন্টির তোমাকে দেখাও হবে। চলো চলো ভেতরে যাই.......
একপ্রকার টেনেটুনেই ছবিকে নিজের সাথে নিয়ে বাঙলোর ভেতরে ঢুকে পরলো ইরফান।
______________
,,,,,,
,,,,,,
,,,,
,,,,,,,,,,,,
বিশাল সদর দরজা খুলে বাড়ির ভেতর পা রাখলো ইরফান। পিছু ফিরে ছবিকে স্থির ভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু ক্রুটি করে ফেললো সে।
--- কি হলো এসো....
কোনও রকম মনে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো ছবি। ইরফান এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
--- ইরফান.... বাড়িতে তো কেউ নেই মনে হচ্ছে...
--- আরে থাকবেনা কেন?? সবাই ওপরের ঘরে। তুমি এসো আমার সাথে....
সিড়ি বেয়ে ওপরের দিকে ইরফানের পিছু নিয়ে উঠতে শুরু করলো ছবি। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে পুরো বাড়িটি। যার দরুন ইরফানের জুতোর গটগট আওয়াজ টাও বিকট শব্দে ক্রমাগত বাড়ি খাচ্ছে ছবির কানের মধ্যে।
এদিক ওদিকে তাকিয়েও কাউকে নজরে আসছেনা ছবির। এগোতে এগোতে একটি বেড রুমের কাছাকাছি এসে দাড়িয়ে পরলো ইরফান।
--- ভেতরে এসো ছবি....
আরো একবার কাব্যর দেয়া নির্ভরতার কথা মনে গেথে নিয়ে ইরফানের কথা অনুযায়ী ভেতরে প্রবেশ করলো ছবি।
কক্ষের অভ্যন্তরে ফাকা দেখে বেশ অনেকটাই অবাক হলো সে। ইরফানের ডাকার লক্ষন দেখে সেতো ভেবে ছিলো ভেতরে কেউ না কেউ আছে হয়তো...কিন্তু এখানে তো কেউ--ই নেই....
কিছু একটার শব্দে ভাবনায় ছেদ ঘটলো ছবির। শব্দের উৎস খুজতে পিছু ফিরে তাকালো সে।
ততক্ষনে দরজার সিটকিনি তুলে দিয়েছে ইরফান।
মুহুর্তেই যেনো ভয়ে ভীত হয়ে জমে যেতে শুরু করলো ছবির সমস্ত শরীর।
--- দ....দরজা...ক..কেনো বন্ধ করলেন আপনি...??
চলবে...