#কৃষ্ণচূড়া🍂
নুসরাত সুলতানা সেজুথি
পর্ব--২২
স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে ছবি।তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে আকাশের দিকে চোখ নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য। দুজনের মধ্যেই গুরুগম্ভীর নিরবতা। দুচোখ বন্ধ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস নেয়ার পর পেছন ফিরলো কাব্য।
দুহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ক্ষনে ক্ষনে চোখে জমে আসা পানিগুলো মুছে নিচ্ছে ছবি।
ছবিকে চোখ মুছতে দেখে ভ্রু ক্রুটি করে ওর দিকে এগিয়ে এলো কাব্য।
--- কাঁদছেন কেনো ছবি??
--- কই নাতো,,,,,
--- আপনার কি আমার ওপর রাগ হচ্ছে??
--- রাগ?? রাগ কেন হবে??
--- ওই যে বললাম,,,আপনাকে আমার গুটি হিসেবে চেলেছি আমি।
কাব্যের এহেন কথায় ঠোঁট প্রসস্থ হয়ে এলো ছবির।
--- না,,,এতে আমি রাগ করিনি,,,,
--- তবে..??
--- আমি ভাবছি অন্য কিছু।
---- কি ভাবছেন??
---- ,,,কোনও পুরুষ তার স্ত্রীকে আদৌ এতোটা ভালোবাসতে পারে বুঝি..??
--- পারে। ভালোবাসা থাকলেই পারে।
!
--- এই ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও যদি আমার বাবা নামক লোকটার তার প্রথম স্ত্রীর জন্যে থাকতো,,,তবে আমার মা তার দ্বিতীয় স্ত্রী হতেন না .....
---- হয়তো আপনার মা হতেন না,,,অন্য কেউ তো হতে পারতো....
--- তা পারতো,,,,,
---- একটা জিনিস ভেবে দেখেছেন??
--- কি বলুন তো..??
--- ইরফান কিন্তু আপনার বাবাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।
---- রক্ত তো রক্তের মতোই হবে,,,
---- এটা কিন্তু পুরোটাই ভুল ভাবনা আপনার ,,,আপনি শুনতে বা মানতে না চাইলেও সত্যি এটাই যে ইরফান আপনার চাচাতো ভাই। সে অনুযায়ী ওই একি রক্ত আপনার শরীরেও বইছে। তাহলে আপনি কেনো ওদের মতো নন?? ওদের থেকে আলাদা কেনো??
--- কি জানি,,,হয়ত আমার মা আমাকে সেই ভাবে গড়েছেন।
--- চরিত্র কি অন্যকে গড়ে দেয়া যায়?? এটাতো পুরোটাই নিজের। আপনি যেভাবে একে গড়তে চাইবেন এ ঠিক সেরুপেই আপনাকে ধরা দেবে।
--- বুঝেছি। আপনার সাথে কথায় পারার মতো সাধ্য আমার নেই( হেসে)
---- হতে পারে...( হেসে)
---হ্যা । তবে আপনি ইরফান কে যা শাস্তি দিয়েছেন এক্কে বারে উচিত হয়েছে। যারা মেয়েদের সন্মান করতে জানেনা তাদের জন্য এটাই উপযুক্ত।
--- ধন্যবাদ। এবার
চলুন যাওয়া যাক। বৃষ্টি হতে পারে....
--- বৃষ্টি কেনো হবে?? এইতো কত সুন্দর কুয়াশা,,,,চারদিকে...
---- সাজেকের একটা বিশেষত্ব আছে,,,এখানে চব্বিশ ঘন্টায় তিন রকম আবহাওয়া দেখতে পাওয়া যায়। এই ধরুন এখন কুয়াশা দেখছেন একটু পরেই ঝরঝর করে বৃষ্টি নামতে পারে,আবার ,বৃষ্টি শেষ হতে না হতেই হাড় কাপানো ঠান্ডা পরতে পারে। যেকোনও কিছু যখন তখন হতে পারে,,,
---- সত্যিই এরকম হয়??
--- হুম হয়তো।
--- ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং তো....
--- তাহলে এবার যাওয়া যাক??
--- জ্বি...
বাম দিকে তাকিয়ে একটু দূরে অবস্থিত রাজিব কে দেখে হাত উচিয়ে ডেকে উঠলো কাব্য।
--- রাজীব,,,ফিরতে হবে চলো...
--- হ্যা স্যার আসছি,,, স্যার আসছি।
দেরি না করে ছুটে এসে কাব্যর পাশে দাড়ালো রাজীব।
----অনেক ছবি তুলেছি স্যার। হোটেলে ফিরে সব দেখাবো আপনাকে।
--- বুঝলাম। চলো এবার।
কাব্য আর রাজিবের পিছু পিছু হাটছে ছবি। চোখে মুখে তার কাব্যের প্রতি একরাশ ভালোলাগা ছেয়ে যাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে।
একটা মানুষ কাউকে ঠিক কতোটা ভালোবাসলে বছরের পর বছর তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে অপেক্ষমান থাকে!!
_______________________
________
____________________
_____
"
"
"
"
---- আজকের সব কথা শুনে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বোধ আরো বেড়ে গেলো মিস্টার রেয়ান......
🍂
,🍂
🍂
🍂
দরজায় কড়াঘাতের শব্দ ক্রমে বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে। যার দরুন ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় উঠে বসলো ছবি। জানলা দিয়ে একবার বাইরে দিকে বুঝতে পারলো এখনও ভোরের আলো ফোটেনি।
--- এই সময় কে আমার রুমে আসবে??
বিছানা ছেড়ে নেমে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো ছবি। দরজার লকের মোড় ঘোরানোর আগে ঠোট কামড়ে আরো একবার কিছু একটা ভেবে নিলো সে।
এভাবে দরজা খুলতে মন সায় না দেয়ায়,,, সেখানেই নিজেকে দমিয়ে রাখলো ছবি। গলা ঝেড়ে একবার কেশে নিয়ে মৃদূ আওয়াজে বলে উঠলো....
---- কে??
----আমি,দরজা টা খুলুন।
আওয়াজ শুনে চিনতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি ছবির। নিশ্চিন্তে দরজার লক খুলতে হাত বাড়ালো সে।
__________
____
___
দরজার বাইরে উশখোখুশকো চুল নিয়ে অনেকটা অগোছালো ভাবে দাড়িয়ে আছে কাব্য। কাব্যের এইরুপ ছবির নিকট অনেকটাই অপরিচিত। প্রয়োজনের তুলনায় কাব্য একটু বেশিই পরিপাটি কিনা!! ফলশ্রুতিতে কিছুক্ষন ভ্রু ক্রুটি করে তাকিয়ে রইলো ছবি।
---- মিস্টার রেয়ান,এই সময় আপনি এখানে??
--- আব,,আসলে ছবি আপনার সাথে কিছু দরকার ছিলো....
--- হ্যা বলুন।
--- আসুন আমার সাথে....
--- কোথায় যাবো...( অবাক হয়ে..)
--- বললাম তো আমার সাথে আসুন।
ছবির দিক থেকে উত্তর না পেয়ে আগে আগেই পা বাড়ালো কাব্য। কিন্তু পেছন থেকে ছবির সাড়া না পাওয়ায় পরক্ষনেই থেমে গেলো সেখানে।
ছবি স্থির হয়ে একিভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
অনেকটা বিরক্ত হওয়ার ভঙিমা করে আবারো ছবির দিকে এগিয়ে গেলো কাব্য।
--- আপনার কি ভয় হচ্ছে আমার সাথে আসতে...?
--- না না তা নয়,আসলে আমি... আমি আসলে...
--- আসলে নকলে পরে হবে,হাতে বেশি সময় নেই চলুন তাড়াতাড়ি।
ছবির এক হাত নিজের হাতে নিয়ে দ্রুতগামী পা চালাতে শুরু করলো কাব্য। ছবির জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টি আরো বিস্তারিত করতে হোটেলের গেট ছেড়ে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কাব্য।
---- মিস্টার রেয়ান কি করতে চাইছেন?? আর এভাবে আমাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন-ই বা কোথায়??
( মনে মনে)
ছবির ভাবনার মাঝেই গাড়ির দরজা খুলে ওকে বসিয়ে দিলো কাব্য। ঘুরে গিয়ে নিজেও জায়গা দখল করে নিলো তারপর।
--- ভালো করে সিট বেল্ট বেধে নেবেন। পাহাড়ি রাস্তা উল্টো পাল্টা যে কোনও কিছু হতে পারে।
--- কিন্তু আমরা যাচ্ছিটা কোথায়..??
--- এতো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় এখন নয়। চুপচাপ বসে থাকুন।
কাব্যের এহেন রাগীস্বরে দিরুক্তি করার আর ইচ্ছে হলোনা ছবির।
"""যাক যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যাক....তাতে আমার কি??
কিন্তু কোথায় যাচ্ছি এইটুকু জানালেই হতো....
🍁
🍁
গাড়ি চলতে শুরু করতেই কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে বসলো ছবি। অন্ধকারের মধ্যেও বাইরে তাকিয়ে গন্তব্য বুঝতে পারার সামান্যতম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন জায়গা হওয়ায় চিনে উঠতে পুরোপুরি ব্যার্থ হলো ছবি।
--- এভাবে উঁকিঝুঁকি দিয়ে লাভ আছে ছবি?? আপনি কি দেখলেও বুঝতে পারবেন আমরা কোথায় যাচ্ছি? আর কেনো যাচ্ছি??
---- লাভ নেই,,তবে ক্ষতিও তো নেই,,আপনার কাছে তো সেই কখন থেকে জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছি,,,উওর ই দিচ্ছেন নাহ,তাই নিজের সাহায্য নিজেই করছি....
---- কিসের সাহায্য??( ভ্রু কুচকে)
--- কৌতূহল মেটানোর সাহায্য।
--- ওহহহহহহহহ। বেশ করতে থাকুন,,,
🍁
🍁
🍁
🍁
হ্যালিপ্যাডের একটি উঁচু পাহাড়ের নিচে গাড়ি ব্রেক কষলো কাব্য। দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে এসে ছবিকেও নামালো।
পূর্বের মতো এবারো ছবির হাত ধরে পাহাড়ে ওঠার জন্যে ব্যাবস্থাকৃত সিড়ি বেয়ে আস্তে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করলো ।
এবার আগের থেকেও বেশি অবাক না হয়ে পারলোনা ছবি। এখানে শুধু সে আর কাব্যই একা তা নয়,বরং গোনার বাইরে ভ্রমনকারীদের উপস্থিতিতে গিজগিজ করছে চারিপাশ টা।
আশপাশ খুব ভালো ভাবে দেখা সেড়ে ওপরের দিকে মন দিলো ছবি। একেবারে উঁচু জায়গায় তাকে নিয়ে পৌছেছে কাব্য।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাজানো লাইটের আলোতে ছবি পাহাড় থেকে নিচের দিকে তাকাতেই ধুক করে উঠলো তার বুক। এখান থেকে কোনও ভাবে পরলে একেবারে আরো ওপরে চলে যাবে। ভয় কাটাতে কাব্যের শার্টের হাতা কিছুটা আকড়ে নিলো ছবি।
--- কি হয়েছে??
--- কিছুনা।মিস্টার রেয়ান আমরা এখানে কেনো এসেছি???
--- লাফিয়ে পরতে,,,
--- কি???
--- হ্যা। খুব ভয় হচ্ছে...??
--- উহু...
---তবে..
--- এই সময় ঘুম নষ্ট করে আপনার আর আমার মতো এরাও কি লাফিয়ে মরতে এসেছে??
ছবির কথায় বেশ শব্দ করে হেসে উঠলো কাব্য। তাৎক্ষণিক হাসি থামিয়ে বলে উঠলো...
--- একটু পরেই আপনার সব কৌতূহলের অবসান ঘটবে। আজকে আমি আপনাকে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর জিনিস দেখাবো। যা আপনি আগে কখনও দেখেননি।
--- কি সেটা..??
--- ওইদিকে তাকিয়ে থাকুন...( আকাশের দিকে আঙুল ইশারা করে...
ক্ষানিক বাদেই পূর্ব দিক বিস্তৃত করে সূর্যীমামার উদয় ঘটতেই আশেপাশে উৎসব মুখর পরিবেশ গমগম করে উঠলো একেবারে।... ক্ষুদ্র আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে পর্যটক দের হাতে বয়ে আনা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ গুলোও জ্বলে উঠতে শুরু করলো একে একে।
অন্ধকার মাথা নত করে বিদায় নিয়ে আলোর ঝল্কানিতে মুখরিত হতে শুরু করলো চারিদিক। সেইসাথে দু একটা পাখির ডাক,, সব মিলিয়ে বিমোহিত পরিবেশে মুখরিত সবটা।
ঠোঁটে হাসি মেখে চোখ ঘুরিয়ে ছবির দিকে তাকালো কাব্য। ছবির চোখে এখনও বিষ্ময় আর মুগ্ধতা দুটোই সমপরিমানে ছেয়ে আছে।
--- এতো সুন্দর....!! সূর্যদয় এতো কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি....
--- আমি জানি....
ছবি হাসছে। শব্দহীন হাসি। সেই সাথে হাসছে ছবির সুশ্রী মুখমন্ডল। মৌন থাকা সত্ত্বেও ছবির হাসি বলে দিচ্ছে আজ সে খুশি। ভীষণ খুশি।
--- আপনার এই খুশিটাই তো দেখতে চেয়েছিলাম আমি( মনে মনে) হাসুন ছবি আরো হাসুন,,,প্রান ভরে হাসুন,আপনার এই হাসিতে কিছুতো আছে,,,,যা কাব্য রেয়ানের চোখেও নেশা ধরায়....
সামনে থেকে চোখ সরিয়ে কাব্যের দিকে ফিরতেই চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো কাব্য।
পরক্ষনে সামনে ফিরতে নিতেই ছবি বিদ্যুৎ বেগে জড়িয়ে নিলো কাব্যকে..
ফলে কিছুটা পিছুময় ধাক্কা অনুভব করলো কাব্য।
"
"
"
ছবি এখনো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে কাব্যকে। হাত বাড়িয়ে ছবির পিঠে রাখতে গিয়েও নিজেকে থামিয়ে নিলো কাব্য । হয়তো ছবি অতি আনন্দে ভুলবশত জড়িয়ে ধরেছে।
---- তবুও আপনার একটু খানি স্পর্শ ,,, আমার মধ্যে কাপন ধরাতে যথেষ্ট ছবি.....