কৃষ্ণচূড়া🍂
নুসরাত সুলতানা সেজুথি
পর্ব--২৭
সমাপ্তি পর্ব
আমাদের সম্পর্কের মানে নেই..?? ঠিক বুঝলাম না
কাব্যের কথার পিঠে খানিকটা ঠোঁট বিস্তৃত করে স্ফীত হাসলো ছবি। মুখ হাসলেও এই হাসির অন্তরালের কষ্ট টা যে চোখের পাতায় দাগ তুলে তাকিয়ে আছে।
--- কি হলো বলুন..??
পুনরায় কাব্যের প্রশ্নে নির্জীব এক ফাকা ঢোক গিললো ছবি। খানিকটা দম নিয়ে বলতে শুরু করলো...
---- আমি জানি মিস্টার রেয়ান,, এই বিয়ে সম্পূর্ন পরিস্থিতি সামলানোর জন্যে করেছেন আপনি। অন্য কোনও কারন নেই এতে। আপনি চান নি,,,একটা অসহায় মেয়ের সন্মান এভাবে নষ্ট হোক,,,,,আর তাই আপনার আর আমার দুজনের সন্মান বাচাতেই আমাদের এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া আপনার।..
পাশাপাশি আমি এটাও জানি যে আপনার সবটা জুড়ে শুধুমাত্র আপনার প্রথম স্ত্রী রচনা রয়েছেন। আমি নামে মাত্র আপনার স্ত্রী হলেও ভালোবাসার স্ত্রী কখনওই হতে পারবোনা। কারণ বিয়েটাতে যে ভালো বাসাই ছিলোনা.....!!
কিন্তু এসব নিয়ে আপনি ভাব বেন না। আমি কখনওই স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আপনার কাছে আসবোনা। আমাদের সম্পর্ক আগে ঠিক যেরকম টা ছিলো এখনও সেরকম টাই থাকবে।
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে নিয়ে থামলো ছবি। মেঝের দিক থেকে চোখ উঠিয়ে কাব্যের উত্তর এর আশায় ওর দিকে তাকালো অতঃপর।
কাব্য চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে ছবির মুখের দিকে। ছবির কথাগুলো ঠিক কতটা ভড়কে দেয়ার উপযুক্ত সেটা হয়তো স্বয়ং সে নিজেই জানেনা।
কাব্যের এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার নিজের দৃষ্টি স্থাপন করে পরক্ষনে আবারো মেঝের দিকে চোখ নিবদ্ধ করলো ছবি।
--- মিস্টার রেয়ান রাত অনেক হয়েছে। আপনি বিছানায় শুয়ে পরুন,আমি সোফায় শুচ্ছি....
কথা টা বলে নিয়ে পিছু ফিরে পা বাড়াতে যেতেই ছবির এক হাত টেনে ধরলো কাব্য। গোলগোল দৃষ্টি নিয়ে সেদিকে ফিরতেই আচমকা এক হ্যাচকা টানে নিজের কাছে ছবিকে নিয়ে এলো কাব্য।
---- কি... কি হলো মিস্টার রেয়ান...??
--- অনেক ক্ষন ধরে আপনার অনেক কথা শুনলাম,,এবার আমি একটু বলি.???
হকচকানো চোখ মুখ নিয়ে ওপর নিচ মৃদু মন্দ মাথা নাড়লো ছবি। সায় পেয়ে ভ্রুক্রুটি করে কাব্য বলে উঠলো...
--- কি বলছিলেন এতক্ষন?? আমি এই বিয়ে আপনাকে অসন্মানের হাত থেকে বাঁচাতে করেছি..?? ভালোবেসে নয়..?? মেনে নিলাম,,, কিন্তু আপনি এই বিয়ে কেন করলেন.??? আপনিও তো আমাকে ভালোবাসেন না তাইনা..?? তবে কি আপনিও উদ্ধার হতে বিয়েটা করেছেন..??
উত্তরটা "" না। তাইতো তো..?? আপনি এই বিয়ে করেছেন কারণ আপনি আমাকে ভালোবাসেন ছবি। আপনি মুখে না বললেও আমি আপনার চোখে আমার জন্যে ভালোবাসা দেখেছি। অনুভব করেছি। আচ্ছা ভালো না বাসলে এক বার বলাতেই কেউ বিয়ে করে নেয়..?? নেয়না।
দ্বিতীয় কথা হলো.. আমি রচনা কে ভালোবাসি কিনা..?? হ্যা আমি ওকে এখনও ভালোবাসি। আর বাকিটা জীবন বাসবো.. কিন্তু তাই বলে আপনার আর আমার সম্পর্কের মাঝে কোনও দেয়াল বরদাস্ত করবোনা আমি।
এখন আপনি আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন যে আমি কি আপনাকে ভালোবাসি ..??
এর উওর আমি জানিনা। তবে আমি আপনাকে চাই।খুব করে চাই। আমি বুঝে গিয়েছি আপনাকে ছাড়া এক মুহুর্ত ও চলবেনা আমার।
জানেন তো..?? আজ সকালে যখন কিছু সময় এর জন্যে খুজে পাচ্ছিলাম না আপনাকে?? আমার নিঃশ্বাস ই বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিলো... তাহলে বাকিটা জীবন আপনাকে ছাড়া কিভাবে চলবে বলুন..??.
বিয়ে যখন করেছি আপনি আমার স্ত্রী। আর আমি আপনার স্বামী। এতো মিষ্টি সম্পর্কের মাঝে বেকার এইসব সোফা,,, বিছানা,,, সিনেমার কাহীনির মতো আলাদা ঘুমোনো,,অধিকার আদায় এইসব টেনে কি লাভ বলুন।
আপনাকে ছাড়া যে আর একটা মুহুর্ত ও কাটাবোনা এটাতো ঠিক করেই নিয়েছি আমি। যেই মুহুর্তে আপনি কবুল পড়েছেন সেই মুহুর্ত থেকে আমি আমার প্রত্যেকটা নিঃশ্বাসের সাথে মিশিয়ে নিয়েছি আপনাকে । এখন আপনি দূরে গেলে আমার দম আটকে আসবেনা ..?
আজ ভালোবাসি কিনা হয়তো সেই উত্তর আমি দিতে পারিনি,,,কিন্তু
আমি আপনাকে ভালোবাসবো ছবি ,,,অনেক বেশি ভালোবাসবো। পৃথিবীর সব ভালোবাসা আপনার দুহাতে তুলে দেবো। রচনার মত করে নয়,,,আমি আপনাকে,,, আপনার মত করে ভালোবাসবো। ভীষণ ভালোবাসতে চাই আপনাকে।ভীষণ।
শুধুমাত্র সেই ভালোবাসা গ্রহন করার জন্য তৈরি হয়ে যান আপনি।
( একটু থেমে)
আজ আমার দ্বিতীয় বাসর রাত হলেও আপনার জন্যে প্রথমবার। কি বলুন তো..?? ধরিত্রীর বুকে এমন মধুর রাত আর দুটি নেই । তাই মিথ্যে যুক্তি সাজিয়ে এমন সুন্দর সময় নষ্ট করার কি মানে.??? পরিনয় যখন হয়েছে রাতটাও তার পরিনতি পাক। আমার প্রনয়ের পরিনীতা বানাবো আপনাকে...হবেন না..?? দেবেন না আপনাকে ভালোবাসার সুযোগ...
( একটু থেমে)
অবশ্য আপনি না বললেও আমি শুনছিনা। বিয়ে যখন করেছি আপনার ওপর আমার পুরো অধিকার আছে তাইনা..?? আপনাকে স্পর্শ আমি করতেই পারি...। আপনি বউ সাজে না থাকলেও,,, আমার বউ এর পরিচয় কিন্তু বদলে যাবেনা।...!!
মুখ হা করে কাব্যের মুখের দিকে আশ্চর্যকিত হয়ে তাকিয়ে আছে ছবি..?? এ কোন কাব্য দাঁড়িয়ে আছে তার সম্মুখে..?? কাব্যের এহেন আচরনে,,, এক নির্জীব ডালে সবুজ পাতা গজানোর মত আনন্দ উপলব্ধি হচ্ছে তার।
তবে কি সে নিজেই ভুল ছিলো? ... কাব্যের মনের কোথাও না কোথাও সে আছে..?? সত্যিই আছে..?? বিয়েটা তাহলে শুধুমাত্র দয়া,,করুনা,,পরিস্থিতি এসব থেকে নয়,,,অনুভূতি থেকে হয়েছে..?? হ্যা হবেই তো,,,এই যে কাব্যের চোখ মুখে ভালোবাসাময় দৃষ্টি বর্ষন হচ্ছে...!!
ভাবতেই খুশিতে চকচক করে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠলো ছবির মুখমন্ডল। ততক্ষনে দুহাতের আজোলে ছবির লজ্জ্বায় লাল আভা ধারনকৃত মুখস্রী তুলে নিলো কাব্য।
মৃদু শব্দের উৎপত্তি ঘটিয়ে দু চোখ বুজে এক গভীর চুমু বসিয়ে দিলো ছবির কপালের মধ্যবরাবর। মুহুর্তেই প্রবলভাবে এক হিম বায়ু প্রবাহিত হয়ে গেলো ছবির শরীরের সব টা ঘিরে....!
বাইরের জোৎস্ন্যার আলো হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করছে কক্ষের অভ্যন্তরে। ,,,বিছানার ওপর ঠিকড়ে পরা এহেন আলোতে বিছিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি গুলোও যেন অধিক সৌন্দর্যে অভিভূত।
চূড়ান্ত অভিব্যাক্তি ধারনকৃত ছবির মুখশ্রী থেকে হাত নামিয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে কক্ষের আলো নিভিয়ে দিলো কাব্য। এমন সুন্দর নিশিতে চাঁদের আলো যে আরো রোমাঞ্চকর।তাই তা উপভোগ করাই শ্রেয়।
অতঃপর এগিয়ে এসে পাজাকোলায় ছবিকে তুলে নিলো কাব্য। ধীর পায়ে এগোতে শুরু করলো তাদের ভালোবাসায় মোড়ানো সময় এর দিকে....!!
🍁
🍁
🍁
🍁
🍂
🍂
ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙলো ছবির। একেবারে কাব্যের
বাহুডোরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে সে। এহেন দৃশ্যে পুনরায় লজ্জ্বায় হরেক রকম রঙিন প্রজাপতি উড়ে গেলো ছবির অভ্যন্তরে। অতি সন্তর্পনে কাব্যের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে,,,,বিছানা ছেড়ে নেমে পরলো সে।
___________________________
__________________
প্রায় অনেক দিন পর বারান্দার গ্রীল ধরে দাড়ালো ছবি। আগে বিষন্ন মনের শূন্যতা দূর করতে,,,আর আজ নিজের পূর্নতার হিসেব কষতে,, পার্থক্য শুধু এইটুকুই,,
প্রত্যেক টা রাতের পরেই তো সকাল হয়। কিন্তু আজকের সকাল বিশেষ,,,, বিবাহিত জীবনের প্রথম ভালোবাসাময় সকাল এটা। মধ্যরাতে কয়েক দফা ভালোবাসাবাসির পর ঘুমন্ত চোখে জেগে ওঠার পর আগত সকাল অত্যন্ত মধুর ,,, । তার সহিত দূর থেকে ভেসে আসা পাখিদের মিষ্টি কলকাকলির শব্দে এ সকাল হয়ে উঠেছে আরো সুন্দর,, আরো উচ্ছ্বসিত।
অবশেষে জীবন কোথ থেকে কোথায় নিয়ে এলো তাকে। একটা সময় যে জিনিস গুলো তার অপছন্দ ছিলো,,,, তার মধ্যে সিনেমা জগত ছিলো শীর্ষে,,,যদিও সেসব তার বাবার দৌলতে। কিন্তু আজ সেই সিনেমার এক হিরোই তার স্বামী। ব্যাপারটা বিষ্ময়কর। অতিকায় বিষ্ময়কর। আবার কিছুটা হাস্যরসাত্মক ও বটে।
বিয়েটা করতে একটা বারের জন্যেও ছবি না বলেনি। আর কেনোই বা বলবে,,,,কাব্যের প্রতি তার মনে অনেক কিছুই তো ছিলো। যদিও সেসব লুকায়িত ছিলো,,,,তবুও ধরা তো পড়েই গিয়েছে কাব্যের হাতে। অজান্তে কখন অন্তস্থল জুড়ে গিয়েছে কাব্য সেসব তো টের-ই পাওয়া হয়নি তার। কাব্য সামনে এলেই অভ্যন্তরীণ ঢিপঢিপ আওয়াজ গুলো তার সাক্ষী ছিলো,,,,সাক্ষী ছিলো আপনা আপনি ঠোঁট জুড়ে বিস্তৃত কারী মুচকি হাসিটাও।
--- আপনি আমাকে ভালোবাসতে চান । ,,,,আর আপনার সেই ভালোবাসা গ্রহন করার জন্যে আমি সর্বদা প্রস্তুত কাব্য। সর্বদা প্রস্তুত।
মৃদূ আওয়াজে কথাটা বলেই সামান্য হেসে উঠলো ছবি। সে এক ভালোলাগা ময় হাসি।
কিছু সময় পার হতেই আচমকা কারো গরম নিঃশ্বাস কাধের কাছে পরায়,,, শীতল হয়ে এলো ছবির হাত পা। পেছন ঘুরে দেখতে যাওয়ার আগেই লোকটি আটকে দিলো তাকে। উল্টে কোমড়ে বাম হাত ঠেকিয়ে আর একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে এসে,,,,থুতনী চাপালো ছবির কাধ বরাবর।
লোকটা যে কাব্য ব্যাতীত অন্য কেউ নয়,,,এতক্ষনে বুঝে নিয়েছে ছবি। ফলশ্রুতিতে তাৎক্ষণিক রঙধনুর সাত রং খেলে গেলো ছবির মুখজুড়ে।
ততক্ষনে ঘুম জড়ানো স্বরে কাব্য বলে উঠলো...
--- শুভ সকাল নববধূ।
--- শুভ সকাল,,,
--- রাতে ঘুম হয়েছে...??
কাব্যের কথায় তাৎক্ষণিক লজ্জ্বায় মাথা নামিয়ে নিলো ছবি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে,,, দুষ্টুমিতে এক ঠোঁট চাপা হাসি হাসলো কাব্য।
--- কি দেখছিলে এতক্ষন..?? আমার কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোকে..??
---- আপনার কৃষ্ণচূড়া..??
--- হ্যা।
--- আপনার বুঝি খুব পছন্দ...??
--- বলতে পারো...
--- আমি তবে আপনার কৃষ্ণচূড়া হবো....
ছবির কথার পিঠে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো কাব্য। মধ্য বিন্দুতে ছবিকে রেখে নিজের দু হাত প্রশস্থ করে এলিয়ে দিলো বারান্দার গ্রিলের দিকে।
--- তাই,,,তা কেন??
--- কারণ ও আপনার প্রিয়,,,
--- প্রিয় কেনো জানো..??
--- উহু,
--- কারন ওর আর আমার জীবনের ভীষণ সাদৃশ্য ছিলো এতদিন। বাইরে থেকে টকটকে,,,রঙীন,,,সুন্দর,, চাকচিক্যে পূর্ন। কিন্তু ভেতর টা,,,গন্ধহীন,,নিরস ,নির্জীব। একটু ছুয়ে দিলেই যেন মুড়িয়ে যাবে।
কিন্তু এখন আমার জীবনে রঙ এসেছে। কারণ তুমি এসেছো,,, আর সেটাও পার্মানেন্টলি ।
আর তাই
তুমি আমার কৃষ্ণচূড়া নও,,,তুমি হবে আমার শুভ্র সাদা রজনীগন্ধা। যার বাইরে টা রঙহীন হলেও প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুবাস নিহিত থাকবে...!!
ছবির কপালে আবারো এক ভালোবাসা ময় চুমু একে দিলো কাব্য। আর নিজের হৃদয়ের সবটুকু গভীরতা দিয়ে সেই ভালোবাসা অনুভব করে নিলো ছবি। অতঃপর কাব্য সেখানে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মৃদূ স্বর তুলে বলে উঠলো...
--- রিসেপশনের জন্যে তৈরি হয়ে যাও মিসেস কাব্য রেয়ান। আজ পুরো দুনিয়াকে জানাবো আমি,,,,,আমাদের নতুন জীবনের কথা....!!
🍁
🍁
ভালোবাসা দিয়েই সব সম্পর্ক গড়ে ওঠে এমন তো নয়,,, কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক থেকেও প্রবল ভালোবাসার তৈরী হয় ।
ছবি আর কাব্যের গল্প টা না হয় এমন--ই থাকুক।
সমাপ্ত....