ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম তুমি

১ম পর্ব

লেখক: ইনায়া জারিশ

( 🚫কেউ গল্প কপি করে কারো পেজে দিবেন না! আর কোনো youtube চ্যানেল ও না,, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাহলে,, already নেওয়া হয়েছে! ❌)

আমাকে এমন একজনের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে যে হাঁটতে পারে না। এক বছর— আগে এই বাড়িতে আমি বউ হয়ে আসি।আর মনে একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে আসা।

​সৎ মা যেদিন বলেছিলেন, "ছেলের পা দুটো অচল তাতে কী? রাজপ্রাসাদ পাবি তুই," সেদিনই বুঝেছিলাম আমার ইচ্ছের কোনো দাম নেই। আরিয়ানের সাথে আমার বিয়েটা হয়েছিল অনেকটা জোর করেই। আরিয়ান—যে মানুষটা হুইলচেয়ারে বন্দী ঠিকই, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব আর জেদ পাহাড়ের মতো অটল।

​আমি আরিয়ানের ঘরের দরজায় টোকা দিলাম। ভেতরে ল্যাপটপের নীল আলোয় তার গম্ভীর মুখটা দেখা যাচ্ছে।

গত এক বছর ধরে সে আমাকে মেনে নেয়নি। তার ধারণা, আমি তার সম্পত্তির লোভে এই বিয়েতে রাজি হয়েছি। মাঝেমধ্যে খুব খারাপ ব্যবহার করে সে, যেন আমি তার সামনে থাকা কোনো একটা আসবাবপত্র।

আরিয়ান ট্রের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন একটা কোড মেলাচ্ছিল। আমি নিঃশব্দে প্লেটটা এগিয়ে দিলাম। সে যান্ত্রিকভাবে খাওয়া শুরু করল। একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করল না, "মিথিলা, রাত একটা বাজে, তুমি খেয়েছ?"

বিয়ের দশ দিন পর থেকেই আমরা জার্মানিতে। এই বিদেশের মাটিতে আমার আপন বলতে কেউ নেই, অথচ যার ঘরের ভেতর চব্বিশ ঘণ্টা থাকি, সে-ই সবথেকে বেশি পর।

তার খাওয়া শেষ হলে আমি পানি এগিয়ে দিলাম। আরিয়ান হাত ধুয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, "কাল সকালে আমার একটা ইমপর্টেন্ট মিটিং আছে। সব যেন রেডি থাকে!

আমি মাথা নাড়লাম। তার সব প্রয়োজন আমি ঘড়ির কাঁটা ধরে পূরণ করি। তার ফিজিওথেরাপি, ওষুধ, কাপড়চোপড়—সব আমি সামলাই। অথচ সে এমনভাবে কথা বলে যেন আমি কোনো বেতনভুক্ত নার্স। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়, মনে হয় সব ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই মানুষটার দিকে তাকালে মনটা কেমন জানি হয়ে যায়।

রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎ আরিয়ান ডাকল, "মিথিলা?"

আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভাবলাম হয়তো বলবে, 'তুমি খেয়ে নিও'।

কিন্তু বলল, "কালকের কফিতে চিনি একটু কম দিও। আজকেরটা বেশি মিষ্টি ছিল।"

বুকের ভেতরটা একটু মোচড় দিয়ে উঠল। এক বছর হয়ে গেল, তবুও আমার অস্তিত্ব তার কাছে শুধু একটা নিখুঁত পরিষেবার মতো। ডাইনিং টেবিলে আমার জন্য রাখা খাবারগুলো এখন একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছিল উনি , আমি ওনার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো প্রয়োজন যেন অপূর্ণ না থাকে, সেটা নিশ্চিত করাই আমার অলিখিত রুটিন।

ঘরে গিয়ে আলমারি খুলে আজকের পোশাক গুছিয়ে রাখলাম। বিছানার ওপর একটা নীল রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট বের করে রাখলাম। নীল রঙটা ওনার খুব প্রিয় কি না জানি না, তবে এই রঙে ওনাকে ভীষণ মানায়।

আসলে আরিয়ান মানুষটা দেখতে অসম্ভব সুদর্শন। ওনার গায়ের গঠন বেশ চওড়া আর বলিষ্ঠ, নিয়মিত শরীরচর্চা না করলেও জন্মগতভাবেই একটা আভিজাত্য নিয়ে জন্মেছে যেন । তবে সব থেকে বেশি যেটা আমাকে টানে, সেটা হলো ওনার চোখের রঙ। একদম ধূসর, অনেকটা ঝড়ের আগের মেঘলা আকাশের মতো। সেই চোখে তাকালে বোঝা যায় না ভেতরে ঠিক কী চলছে—

সে যখন ঘরে ঢুকল, আমি শার্টটা দেখিয়ে বললাম,

"আজ নীল রঙটা পরলে ভালো লাগবে।

আরিয়ান নীল শার্টটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার আমার দিকে চোখ ফেরালো। ওই ধূসর চোখে আজ ক্ষণিকের জন্য একটা অদ্ভুত শীতলতা দেখলাম। সে কোনো উত্তর দিল না। নিজের হাতেই শার্টটা টেনে নিল। সে কখনোই চায় না আমি ওকে পোশাক পরতে সাহায্য করি,।

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় আড়চোখে একবার তাকালাম। মানুষটা এত সুন্দর, অথচ তার ব্যবহারটা যদি একটু কোমল হতো!

আমি রান্নাঘরে এসে নিজের জন্য এক কাপ চা বানালাম।

কলিং বেলের শব্দে আমার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। দরজা খুলতেই দেখলাম সামনে এক সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে। পরনে অত্যন্ত আধুনিক বিদেশি পোশাক, চোখে দামি সানগ্লাস। আমায় দেখে সে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো, যেন আমি এই বাড়ির কেউ নই, বরং অনাহুত কেউ।

সে ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল, "হোয়্যার ইজ আরিয়ান? আরিয়ান কোথায়?"

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে বললাম, "উনি তো রুমে আছেন। কিন্তু আপনি..."

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে আমাকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

"হু আর ইউ? এই বাড়িতে তোমাকে তো আগে দেখিনি! সার্ভেন্ট?"

ওর কথা শুনে নিজের অজান্তেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি উত্তর দিতে যাব, ঠিক তখনই ঘরের দরজায় আরিয়ানের হুইলচেয়ারের শব্দ পাওয়া গেল। আরিয়ানকে দেখামাত্রই মেয়েটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আরিয়ান বিস্ময় আর ঘোরের মধ্যে শুধু বলতে পারল,

"নাতাশা! তুমি? এখানে?"

নাতাশা নামের মেয়েটি আর কোনো কথা না বলে দৌড়ে গিয়ে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে সে ডুকরে কেঁদে উঠল, "আই মিসড ইউ সো মাচ আরিয়ান! আমি আর তোমাকে ছেড়ে থাকব না।"

আরিয়ানকে আমি গত এক বছরে কখনো এভাবে কারো সাথে মিশতে দেখিনি। নাতাশার কান্নায় আরিয়ানের কঠিন মুখটা কেমন যেন নরম হয়ে এল। সে নাতাশার পিঠে হাত রাখল, যেন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। আমি এই মানুষটার কত অযত্ন, কত অবহেলা সহ্য করে তার সেবা করছি—অথচ আজ এই মেয়েটির এক নিমিষের আলিঙ্গন আমাকে বুঝিয়ে দিল আমি এখানে সত্যিই কতটা গুরুত্বহীন।

আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে চলে এলাম। ঝাপসা চোখে শুধু মনে হচ্ছিল, "তবে কি এই নাতাশাই সেই কারণ, যার জন্য আরিয়ান আমাকে কোনোদিন আপন করে নেয়নি?"

নাতাশার প্রতিটি কথা আমার কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল। ও কাঁদছে আর বলছে, "আরিয়ান, আমি জানতামই না তোমার এই অবস্থা! সেই রাতে আমাদের ঝগড়াটা না হলে হয়তো আজ তুমি..."

নাতাশার কথা থেকে বুঝতে পারলাম, আরিয়ানের জীবনের এই অন্ধকারের পেছনের মূল কারণ আসলে এই মেয়েটিই। সেদিন ওদের ঝগড়া হয়েছিল বলেই আরিয়ান রাগের মাথায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল, আর সেই ভয়ানক এক্সিডেন্ট ওনার দুই পায়ের শক্তি কেড়ে নিয়েছে। অথচ যে মানুষটার জন্য ওর এই অবস্থা, সেই নাতাশা এতদিন খবরও নেয়নি; আমেরিকা চলে গিয়েছিল ।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। ধূসর চোখ দুটো এখন নাতাশার দিকে স্থির। আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলাম। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। যার জন্য আরিয়ান আজ হুইলচেয়ারে, তাকে দেখেই ও এতটা বিচলিত? আর আমি? আমি গত এক বছর ধরে ওনার প্রতিটি বিষয়ের খেয়াল রাখছি, ওর প্রতিটি কটু কথা মুখ বুজে সহ্য করছি, তবুও আমি ওনার কেউ নই।

নাতাশা আরিয়ানের হাত ধরে মিনতি করছে, "আমাকে ক্ষমা করে দাও আরিয়ান। আমি জানতাম না তুমি হাঁটতে পারো না। আমাকে কেন কেউ কিছু জানায়নি?"

নাতাশা ওনাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এরপর হঠাৎ ওর নজর পড়ল আমার দিকে। আমি তখনো রান্নাঘরের দরজার কাছে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। নাতাশা আরিয়ানকে জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু আরিয়ান, এই মেয়েটি কে? ও কেন এভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে? ও কি তোমার নার্স?"

আমার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। আরিয়ান একবার আমার দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই, নেই কোনো মায়া। সে কি বলবে যে আমি তার স্ত্রী? নাকি নাতাশার সামনে আমাকে শুধু একজন সেবিকা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমার এক বছরের ত্যাগের অপমান করবে?

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে বলল, "নাতাশা, ও মিথিলা। আমার বাড়িতে দেখাশোনা করার জন্যই ও আছে।"

'স্ত্রী' শব্দটা ওর মুখ দিয়ে বেরোলো না। আমার এক বছরের সেবা, যত্ন আর সবটুকু আবেগ এক নিমিষেই 'দেখাশোনা করা'র সংজ্ঞায় হারিয়ে গেল। আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, চোখ ফেটে জল আসছিল। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলাম।

চলবে ~~

পরের পর্বের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে।

#প্রেম_তুমি

#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন