নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়লাম। কানে বাজছে আরিয়ানের সেই কণ্ঠস্বর—
"ও আমার বাড়িতে দেখাশোনা করার জন্য আছে।"
কী অদ্ভুত!
এক বছরে একটা পশুপাখিও মায়ার বাঁধনে আটকে যায়, আর আরিয়ান আমাকে এই এক বছরে শুধু একটা 'সার্ভিস' হিসেবেই দেখল? আমার চোখের জল,, একাকীত্বকে উনি কোনোদিন বুঝতে চায়নি।
বাইরে নাতাশার উচ্চস্বরে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের ডাক শুনলাম।
"মিথিলা! এদিকে এসো।"
চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম। আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম নাক-মুখ লাল হয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিয়ে লিভিং রুমে গেলাম। নাতাশা আরিয়ানের পাশে সোফায় বসে আছে। আরিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল,
"নাতাশা আজ থেকে এই বাড়িতেই থাকবে। ওর থাকার ব্যবস্থা করো। গেস্ট রুমটা গুছিয়ে দাও।"
নাতাশা বাঁকা হাসিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"শোনো মিথিলা, আমার ডায়েট চার্ট খুব স্ট্রিক্ট। কাল সকাল থেকে আমি যা বলব ঠিক সেটাই রান্না করবে।
আর হ্যাঁ, আরিয়ানের ওষুধের ফাইলগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিও, ওগুলো এখন থেকে আমি দেখব।"
আমি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যে ফাইলগুলো আমি এক বছর ধরে সযত্নে আগলে রেখেছি, —আজ নাতাশা এসে সেই জায়গাটা কেড়ে নিতে চাইছে। আরিয়ান একবারও প্রতিবাদ করল না। বরং নাতাশাকে বলল,
"থ্যাংকস নাতাশা। তুমি পাশে থাকলে আমি হয়তো খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠব।"
আরিয়ানের এই কথাটা আমার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তবে কি আমার এক বছরের সেবায় কোনো কাজ হয়নি? নাতাশা আসতেই উনি সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে?
আমি গেস্ট রুম গুছিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে গেলাম। রাতে ওদের জন্য ডিনার বানালাম। টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে আমি নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিলাম, তখনই নাতাশা চেঁচিয়ে উঠল,
"এক্সকিউজ মি! এই চিকেনটা এত স্পাইসি কেন? আরিয়ান তো স্পাইসি খায় না। তুমি কি জানো না?"
আরিয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলল, কাল থেকে রান্নার ব্যাপারে যেন কোনো কমপ্লেন না আসে।"
আমি অপলক দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই সেই মানুষ, যার জন্য আমি ঝাল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি কারণ উনি ঝাল পছন্দ করে না।
আমি শান্ত স্বরে বললাম, "খাবারটা আমি ওনার পছন্দমতোই করেছি। আরিয়ান জানেন আমি কোনো ভুল করিনি।"
"আর্গুমেন্ট করবে না মিথিলা! চলে যাও এখান থেকে!" আরিয়ানের ধমকে আমি কেঁপে উঠলাম।
আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম না। নিজের ঘরে এসে ব্যাগটা বের করলাম। আমার সৎ মা ঠিকই বলেছিল, আমি রাজপ্রাসাদ পেয়েছি, কিন্তু সেই প্রাসাদের আমি রাজরানী নই—আমি কেবল এক অভাগী দাসী।
মাঝরাতে হঠাৎ আরিয়ানের ঘর থেকে গোঙানির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি অভ্যাসবশতই দৌড়ে ওনার ঘরের সামনে গেলাম। দরজাটা কিছুটা খোলা। দেখলাম আরিয়ানের মাথার যন্ত্রণা বেড়েছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। পাশের ঘরে নাতাশা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। যে নাতাশা সকালে বড় বড় কথা বলছিল, সে এখন আরিয়ানের কষ্ট টেরও পাচ্ছে না।
আমি ভেতরে ঢুকতে যাব, কিন্তু থমকে গেলাম। আরিয়ান তো আমাকে চায় না। উনি তো নাতাশার ছোঁয়াতেই সুস্থ হতে চায়। আমি দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। যার কষ্টে আমার প্রাণ যায়, তার কাছেই আজ আমি নিষিদ্ধ।
পরদিন সকালে নাতাশা ড্রয়িং রুমে বসে কফি খাচ্ছিল।
নাতাশা কফির কাপে চুমুক দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে খুব চনমনে গলায় বলল, "আরিয়ান, আই হ্যাভ আ প্ল্যান! আমি ভাবছি আজ একটা ছোট গেট-টুগেদার পার্টি দেব আমাদের বন্ধুদের নিয়ে। আমি যে ফিরে এসেছি,।
আরিয়ান বলল ঠিক আছে!
নাতাশা বলল তোমার ওই নার্স... আই মিন মিথিলা সব ম্যানেজ করে দেবে।"
আরিয়ান একবার আমার দিকে তাকাল।
নাতাশা আমার দিকে ফিরে আদেশের সুরে বলল, "শোনো মিথিলা, আজ সন্ধ্যার মধ্যে দশ-বারো জন গেস্টের জন্য ডিনার আর স্ন্যাকস রেডি করবে। সব যেন খুব ক্লাসি হয়। আর শোনো, রান্নাবান্না শেষ করে নিজের ঘরেই থেকো। গেস্টদের সামনে আসার দরকার নেই।"
অপমানে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। নিজের বাড়িতেই আজ আমি ব্রাত্য! আমি আরিয়ানের দিকে তাকালাম, আশা করেছিলাম ও অন্তত বলবে—
"মিথিলা আমার স্ত্রী, ও কেন ঘরে থাকবে?" কিন্তু না, আরিয়ান মুখ নিচু করে ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। ও যেন নাতাশার সব অন্যায় মেনে নেওয়ার শপথ নিয়েছে।
সারাটা দিন আমি এক মুহূর্ত দম ফেলার সময় পেলাম না। একা হাতে দশ জনের রান্না করা যে কতটা কষ্টের, তা কেউ বুঝল না। শরীরের ক্লান্তির চেয়েও মনের ক্লান্তি আমাকে বেশি গ্রাস করছিল।
সন্ধ্যায় পার্টি শুরু হলো। বাইরে থেকে বন্ধুদের হাসাহাসি আর মিউজিকের শব্দ আসছিল। আমি রান্নাঘর পরিষ্কার করে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, এমন সময় শুনতে পেলাম নাতাশা কার সাথে যেন হাসিমুখে গল্প করছে—
"আরে না, ও আমার আরিয়ানের পার্সোনাল কেয়ারটেকার। খুব ভালো কাজ করে, তাই সাথে রাখা। জানোই তো, আরিয়ানের মতো মানুষের একজন সার্বক্ষণিক সাহায্যকারী লাগে।"
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল আমার। ড্রয়িংরুমের ওই হাসাহাসি আর আমাকে নিয়ে বিদ্রুপ আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গেলাম একটু পানি খেতে। গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়েও হাতটা কাঁপছিল। নাতাশার কথাগুলো যেন তপ্ত তীরের মতো বিঁধছে আমার গায়ে—"সেবার জন্য তো মিথিলা আছেই।"
পানিটুকু খেয়ে গ্লাসটা রাখতে যাব, এমন সময় হঠাৎ অনুভব করলাম পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চমকে ফিরে তাকাতেই দেখলাম আরিয়ানের এক বন্ধু। লোকটার চোখে-মুখে এক কুৎসিত হাসি, দৃষ্টিটা ভীষণ অস্বস্তিকর। সে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসে আঠালো গলায় বলল,
"আরে, কেয়ারটেকার ম্যাম যে একা এখানে?
আরিয়ান লাকি! এত সুন্দর একটা মেয়ে ওর পা টিপে দেয় আর ওষুধ খাওয়ায়। তা আরিয়ান তো এখন অচল... ওর বন্ধুদের সাথে একটু সময় কাটালে ক্ষতি কী?"
লোকটা আমার দিকে হাত বাড়াতে চাইল। আমি আতঙ্কে চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘরের দরজায় আরিয়ানের হুইলচেয়ারের শব্দ পাওয়া গেল। আরিয়ান সেখানে মূর্তিমান আতঙ্কের মতো দাঁড়িয়ে। ওর ধূসর চোখদুটো আজ আগুনের গোলার মতো লাল হয়ে আছে, চিবুক শক্ত হয়ে উঠেছে চরম রাগে।
আরিয়ানকে দেখে লোকটা থতমত খেয়ে হাত নামিয়ে নিল। ও একটু ভয় পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "আরে আরিয়ান! তুই? না... আমি জাস্ট পানি খেতে এসেছিলাম। ওনার সাথে এমনিই কথা বলছিলাম।"
আরিয়ান ওনার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে হুইলচেয়ারের হাতলটা এতটাই জোরে চেপে ধরলেন যে হাতের রগগুলো ফুলে উঠল। ও খুব নিচু কিন্তু ভয়ার্ত গলায় বলল,
"কী করছিলি এখানে? মিথিলার সাথে ওভাবে কথা বলার সাহস তোকে কে দিল? গেট আউট অফ মাই কিচেন! এখনই বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে!"
আরিয়ানের গর্জন শুনে লোকটা আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে বাইরে চলে গেল। রান্নাঘরে তখন শুধু আরিয়ানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। আর আমি? আমি দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছি।
আরিয়ান এবার আমার দিকে তাকালো। ওর চোখের রক্তবর্ণ রাগ এখনো কমেনি। হুইলচেয়ার নিয়ে আমার একদম কাছে এগিয়ে এলো। আমি ভাবলাম হয়তো এখন আমাকেই ধমক দেবে, বলবে কেন আমি গেস্টদের সামনে আসলাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব ধীর স্বরে বলল, "তুমি ঠিক আছো?"
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু মাথা নাড়লাম। আমার দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না। চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে গেলাম।
চলবে ~
#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________২
#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট