এভলিন বাড়িতে পা রাখতেই চারপাশে যেন হঠাৎ নেমে এলো নীরব আতঙ্ক। যে যার জায়গায় স্থির—কেউ চোখ তুলতেও সাহস পাচ্ছে না। তার মুখের গম্ভীরতা, চোখের দহন—সবকিছুই বলে দিচ্ছে, আজ তার মেজাজ আগুনের চেয়েও তীব্র।
তৃণা বেগম দূর থেকে তাকিয়ে আছে—চোখে অদ্ভুত মায়া, অথচ সেই মায়া কখনো পৌঁছায়নি এভলিনের কাছে।
এভলিনের জন্মের পরই এভলিনের মা মারা যায় এভলিনের বাবা মায়াজ আহমেদ তৃণাকে বিয়ে করে এই বাড়িতে এনেছিল। বিশাল এই অট্টালিকায় তৃণা পেয়েছে শুধু দায়িত্ব, ভালোবাসা নয়। মায়াজ চেয়েছিল তাদের আরেকটা সন্তান হোক, কিন্তু তৃণা রাজি হয়নি—এভলিনের জন্যই নিজের মাতৃত্বকে আটকে রেখেছিল সে।
তবুও সেই এভলিনের মুখে কোনোদিন “মা” শব্দটা শোনেনি তৃণা।
আজও সে অপেক্ষা করে—একটা ডাকে, একটা স্বীকৃতির জন্য।
কিন্তু এভলিনের ভেতরে জমে আছে অন্য এক আগুন।
“সৎ মা”—এই পরিচয়টাই তার কাছে ঘৃণার কারণ।
তাদের মাঝে কোনোদিন কথার আদান-প্রদান হয়নি, শুধু নীরব দূরত্ব আর অস্বীকার।
অন্যদিকে, আদ্রিয়ান শিকদার চুপচাপ বসে নীরার পাগলামি দেখছে।
সকাল থেকে মেয়েটা একই জায়গায় বসে—কখনো হেসে, কখনো অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে।
শুরুতে বিরক্ত লাগলেও এখন আর লাগে না। বরং কোথাও যেন একধরনের অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে।
ডিউটি শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল।
নীরাকে রেখে বেরিয়ে যেতে যাবে, এমন সময় নীরা জোরে বলে উঠল—
—ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেমে তো পড়বেন… এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা!
আদ্রিয়ান থামল না, একবারও ফিরে তাকাল না। নীরবতাকেই উত্তর বানিয়ে চলে গেল।
রাত গাঢ় হলে পার্থ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাঁটা তিনটা ছুঁতেই সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়।
এভলিনের ঘরের দরজার সামনে এসে থামে—এক মুহূর্ত দ্বিধা, তারপর আচমকা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
খাটের ওপর এভলিন ঘুমিয়ে আছে—নিঃশব্দ, স্থির, অদ্ভুত শান্ত।
এই রূপটাই যেন পার্থকে ভেঙে দেয়।
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে—চোখ ভিজে ওঠে অজান্তেই।
ভালোবাসে সে… ভীষণ ভালোবাসে।
কিন্তু সেই ভালোবাসা তার জন্য নিষিদ্ধ।
এভলিন একটু নড়ে উঠতেই পার্থ তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যায়—যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর এভলিনের ঘুম ভাঙে।
সে উঠে বসে—চোখ দুটো চারপাশে ঘোরে।
প্রতিদিনের মতোই তার মনে হয়—এই ঘরে কেউ এসেছিল।
কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু প্রতিবারের মতোই কোনো প্রমাণ থাকে না—শুধু এক উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়
শুভ চৌধুরী এখন অসহায়।
বোনের এই অদ্ভুত আচরণ থামাতে পারছে না কিছুতেই।
প্রতিদিন নীরা হাসপাতালে গিয়ে বসে থাকে—অপেক্ষা করে এক মানুষের জন্য।
সকাল হতেই হাতে ফুল নিয়ে হাজির হয় সে।
আদ্রিয়ানকে দেখেই দৌড়ে এসে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলে—
—আমি আপনাকে ভালোবাসি, ডাক্তার!
এই কয়েক দিনের উন্মাদনায় আদ্রিয়ান নিজেও অদ্ভুত এক তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে।
একটা মেয়ে নিজের ইচ্ছায়, কোনো দ্বিধা ছাড়াই এমন পাগলামি করছে—এটা তার অহংকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
সে ফুলগুলো নিয়ে হালকা হেসে সামনে এগিয়ে যায়।
নীরা পেছন পেছন ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে—
—তারমানে কি… আপনি আমাকেও ভালোবাসেন?
—ভালোবাসি কিনা জানি না… তবে বিষয়টা খারাপ না।
নীরার চোখ চকচক করে ওঠে—
তাহলে বিয়ে ফাইনাল?
আদ্রিয়ান অবাক—
—বিয়ে?
—হ্যাঁ! এসব প্রেমটেম ভালো না… চলুন সরাসরি বিয়ে করে ফেলি।
একটু চুপ থেকে আদ্রিয়ান বলে—
—তোমার ভাইকে আসতে বলো।
এইটুকু বলেই সে চলে যায়।
নীরা আর এক মুহূর্ত দেরি করে না—দৌড়ে হাসপাতালের নিচে নেমে বাড়ির দিকে ছুটে যায়।
এভলিনের মা মারা যাওয়ার পর মায়াজ আহমেদ তার সমস্ত সম্পত্তি এভলিনের নামে লিখে দেয়।
কিন্তু এভলিন কখনো সেই সম্পদের দিকে ফিরে তাকায়নি।
সব কিছু পড়ে আছে—অযত্নে, অপ্রয়োজনীয় হয়ে।
তৃণা কে শুধু “মা” না ডাকায় মায়াজ আহমেদ রাগে এভলিনের গায়ে চাবুক চালিয়েছিল।
কিন্তু তাতে কিছুই বদলায়নি—বরং সম্পর্কটা আরও ভেঙে গিয়েছে।
ছোট্ট এভলিন সেদিনই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
তারপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে অন্ধকারে—রাস্তাঘাট, মারামারি, অপরাধ।
আজ পুরো শহর তাকে ভয় পায়।
এমনকি রাজনীতিবিদরাও সীমা লঙ্ঘন করতে সাহস করে না।
কারণ—এভলিন সবার গোপন সত্য জানে।
আর সেই সত্য ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সে সবাইকে নিজের মুঠোয় বন্দী করে রেখেছে।
এইভাবে সে গড়ে তুলেছে নিজের এক অন্ধকার সাম্রাজ্য—
এক পাপের রাজত্ব।
যেখানে প্রতিদিন কারো না কারো রক্ত না ঝরলে—
এভলিনের ঘুমই আসে না।
রাস্তার মাঝখানে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে এভলিন—দুই আঙুলে ধরা সিগারেট, ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে আসছে। গোলাপি ঠোঁটে সেই সিগারেট—বেমানান, তবুও অদ্ভুতভাবে ভয়ংকর সুন্দর।
পার্থ একটু দূরে দাঁড়িয়ে—হাত দুটো অস্থির। ইচ্ছে করছে এগিয়ে গিয়ে সিগারেটটা ছিনিয়ে ফেলে দিতে, কিন্তু সাহস নেই। কারণ সে জানে—এভলিনকে থামানোর অধিকার তার নেই।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে এভলিনের দলবল। কেউ মাটিতে, কেউ পায়ের কাছে—ঠিক যেন রাজসিংহাসনের নিচে বসে থাকা প্রজারা। কেউ মাথা তুলছে না, কেউ প্রশ্ন করছে না—শুধু নিঃশব্দ আনুগত্য।
পাশেই বসে থাকা পনেরো বছরের এক ছেলেটা—হোটেলের কাজের ছেলে, নাম বাবু। তার চোখে ভয় নেই, বরং কৌতূহল।
সে সরাসরি তাকিয়ে বলে উঠল—
—ভাই, আপনে সিগারেট ছাড়েন। মানলাম দেখতে পুরুষদের মতো, তাই বইল্লা সিগারেট টানবেন?
কথাটা শেষ হতেই চারপাশে হালকা টানটান নীরবতা নেমে এলো।
সবাই বুঝতে পারছে—ছেলেটা সীমা ছাড়িয়ে ফেলেছে।
এভলিন ধীরে সিগারেটটা মাটিতে ফেলল।
তারপর জুতোর তলায় পিষে ফেলতে ফেলতে ঠাণ্ডা গলায় বলল—
—শোন সালা… এই দেশের প্রধান খাদ্য হচ্ছে সিগারেট। এইডা তুই বুঝবি না। বাঙালি ভালো খাবার কিনতে গেলে দরদাম করে, আর এই বিষ কিনতে গেলে একটাও শব্দ করে না।
—এইডার সাথে সিগারেট খাওনের সম্পর্ক তো বুঝলাম না ভাই।
—আরে, আমিও তো সেই কাতারের লোক রে সালা।
কথাটা বলেই সে পার্থের দিকে তাকাল—চোখে আবার সেই কঠোরতা ফিরে এসেছে।
—পার্থ, রাতের সব ব্যবস্থা করছিস?
পার্থ একটু এগিয়ে এলো, কণ্ঠে চাপা উৎকণ্ঠা—
—Queen… আপনি একা যাবেন না। আমি আপনার সাথে যাই?
এভলিন ধীরে উঠে দাঁড়াল।
এক লহমায় পার্থের কলার চেপে ধরল—টেনে একটু নিচু করে আনল তাকে।
তারপর আচমকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিল—বলল
—Queen-এর কখনো চামচা লাগে না। আমি একাই যথেষ্ট।
একটু থেমে—
—বন্দুক দে।
পার্থ এক মুহূর্ত দেরি করল না।
পকেট থেকে বন্দুক বের করে এগিয়ে দিল—চোখে অদ্ভুত অসহায়তা।
এভলিন বন্দুকটা হাতে নিয়ে একবার ঘুরিয়ে দেখল—
তারপর কোনো দিকে না তাকিয়েই সোজা হাঁটা দিল।