শুভ চৌধুরী গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে—চোখে অস্থিরতা, ভেতরে জমে থাকা বিরক্তি। কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তার মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছে।
বোনের জ্বালা তাকে এখানে টেনে এনেছে, কিন্তু মনের গভীরে সে এখনো চায়—এই সম্পর্কটা না হোক।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সোজা ভিতরে ঢুকে পড়ে।
আদ্রিয়ানের কেবিনে গিয়ে কোনো অনুমতি না নিয়েই দরজা ঠেলে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ে।
আদ্রিয়ান একবার চোখ তুলে তাকায়
তারপর আবার ফাইলের দিকে চোখ নামিয়ে দেয়—যেন সামনে বসা মানুষটা তার কাছে গুরুত্বহীন।
এই অবহেলায় শুভর ভেতরের আগুন জ্বলে ওঠে।
শুভ দাঁত চেপে বলে—
—আমি এখানে তামাশা দেখতে আসিনি। আমার বোন তোমাকে পছন্দ করে। তাই তুমি ওকে বিয়ে করে আমাদের বাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকবে।
আদ্রিয়ান এবার মুখ তোলে।
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি—যেন কথাটাকে গুরুত্ব দেওয়ারও দরকার নেই।
—আপনার বোন আমাকে পছন্দ করে—এটা তার ব্যাপার। আমি কী করব, সেটা আমি ঠিক করব… কারো বাড়িতে গিয়ে বসে থাকার শখ আমার নেই।
শুভর চোখ লাল হয়ে ওঠে—
—তাহলে তোমাদের বিয়ে হচ্ছে না?
আদ্রিয়ান কাঁধ ঝাঁকায়—
—হলে হোক, না হলে নেই। আমি আপনার বোনকে পছন্দ করি—ভালোবাসি না যে না পেলে কেঁদে ভাসিয়ে দেব।
এই নির্লিপ্ত উত্তরটা শুভর অহংকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
সে আর এক মুহূর্তও না থেকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে যায়।
পেছনে বসে আদ্রিয়ান হঠাৎ হেসে ওঠে—জোরে, বেপরোয়া হাসি।
তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে উঠে দাঁড়িয়ে রোগী দেখতে চলে যায়।
অন্যদিকে, পার্থ ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে।
তার চোখে ঘুম নেই, মুখে অস্থিরতা।
এভলিন তাকে সাথে যেতে দেয়নি—এই একটা জিনিসটাই তার ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলছে।
কারণ সে জানে—এভলিন যখন একা বের হয়, তখন কিছু একটা ঘটে।
কিছুদিন আগেই এক ছেলের গুলিতে আহত হয়েছিল এভলিন।
যে তাকে দিয়ে কাজটা করিয়েছিল, তাকে এখনো পাওয়া যায়নি।
কিন্তু সেই ছেলেটার খবর পার্থই দিয়েছে—
আজ এভলিন সেই হিসাব চুকাতেই বের হয়েছে।
আর এই ভাবনাটাই পার্থকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
রাত বারোটার দিকে হাসপাতালের শেষ রোগীটাকেও দেখে বের হলো আদ্রিয়ান।
আজ গাড়ি আনেনি—গ্যারেজে দিয়েছে।
হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ফিনাইলের তীব্র গন্ধ—সবকিছু থেকে বেরিয়ে আসতেই মনে হলো যেন বুকটা হালকা হয়ে গেল।
প্রধান ফটক পেরিয়ে ইশাখাঁ অ্যাভিনিউর কালো পিচঢালা রাস্তার ওপর পা রাখতেই এক ধরনের নিঃশব্দ বিস্তৃতি তাকে ঘিরে ধরল।
কিছুদূর এগোতেই—
হঠাৎ থেমে গেল সে।
মাটিতে কয়েকজন লোক পড়ে আছে—রক্তে ভেজা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
চিকিৎসক সত্তা তাকে আর দাঁড়াতে দিল না।
সে দৌড়ে গেল।
চারপাশ ফাঁকা—কেউ নেই।
শুধু নিস্তব্ধতা আর রক্তের গন্ধ।
সে একজনকে উল্টাতে যাবে—
ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো—
—ছোঁবেন না।
আদ্রিয়ান ঘুরে দাঁড়াল।
দেখল—একজন তরুণী।
প্যান্ট-শার্ট পরা, চেহারায় ছেলের মতো কঠোরতা, হাতে রিভলভার।
এভলিন।
আদ্রিয়ান কপাল কুঁচকে বলল—
—কেন ছোঁব না? দেখছেন না অবস্থাটা? এখনো নিঃশ্বাস চলছে।
এভলিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল—
—তাহলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিই?
কথাটা শেষ হতেই—
একটা শব্দ।
মানুষটা নিস্তব্ধ।
আদ্রিয়ানের চোখ জ্বলে ওঠে—
—আপনি কি করলেন! পাগল নাকি? আমি এখনই পুলিশে কল দিচ্ছি!
—আমাকে ভয় করছে না?
—আপনি কে যে ভয় পাব?
—খুনি।
—খুনি হোন বা যাই হোন—আমি এখনই পুলিশ ডাকছি।
আদ্রিয়ান ফোন বের করে কল দিতে যাবে—
ঠিক তখনই—
হঠাৎ গুলির শব্দ।
এভলিনের হাতে আঘাত লাগে।
এক পা পিছিয়ে যায়।
চারপাশে ছায়ার মতো কয়েকজন এগিয়ে আসছে।
এভলিন এক মুহূর্ত দেরি করে না—
আদ্রিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে দৌড় দেয়।
আদ্রিয়ান পুরোপুরি হতবাক—
কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না, তবুও ছুটছে।
একটা নির্জন গলিতে এসে এভলিন থেমে যায়।
তার শরীর কাঁপছে, হাত থেকে রক্ত ঝরছে।
আদ্রিয়ান তাড়াতাড়ি এভলিন কে ধরে ফেলে—
—এই! আপনার কি হয়েছে? ভয় পাবেন না… কিছু হবে না… আমি ডাক্তার!
আদ্রিয়ানের কণ্ঠে তাড়াহুড়ো, চোখে উদ্বেগ—একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা।
এভলিন তাকিয়ে থাকে—সোজা আদ্রিয়ানের চোখে।
এই প্রথম—
কেউ তার জন্য এভাবে অস্থির হয়েছে।
এভলিনের ঠোঁটে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে—অচেনা, নরম, অদ্ভুত।
আদ্রিয়ান কিছু বলার আগেই—
এভলিনের শরীর ভেঙে পড়ে তার ওপর।
এক মুহূর্ত দেরি না করে—
আদ্রিয়ান এভলিন কে কোলে তুলে নেয়।
তারপর ছুটতে থাকে—
ফিরে যায় হাসপাতালের দিকে,