#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৩)
নুসরাত জাহান লিজা
ইরা একটা লাল রঙের শাড়ি পরেছে। নীরা শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করে দিচ্ছিল, আর বোনকে পর্যবেক্ষণ করছিল। মেয়েটার অভিব্যক্তিতে আনন্দ ঝলমল করছে।
"আমাকে কেমন দেখাচ্ছে নীরা আপু?"
"খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে। তা এত খুশির কারণ কী?"
"তুমি জানো, মা আমাকে শাড়ি পরতে দেয় না। গত পহেলা বৈশাখে কত যু দ্ধ করে যে পারমিশন নিয়েছি! আজও বলল, 'কাল একেবারে হলুদে পরিস।' আমি এটা-সেটা বুঝিয়ে আজই পরলাম।"
ইরার উচ্ছ্বাস নীরাকে স্পর্শ করল।
"তুমি পরবে আজ?"
"নাহ্! আজ পরে কাজ কী, একেবারে কাল পরব আর পরশু ভাইয়ার বিয়ের দিন পরব।"
"পরো না!"
নীরা ভাবলেশহীন মুখে সামান্য হাসি ফুটিয়ে বলল, "না রে। তুই গিয়ে চাচিকে দেখিয়ে আয়। তোকে এত চমৎকার দেখেচ্ছে, চাচি খুব খুশি হবে।"
ইরা বেরিয়ে গেলে নীরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একসময় ওরও এমন কত রকম ফ্যান্টাসি ছিল শাড়ি পরা নিয়ে। শাড়ি, সাথে একটা ছোট্ট টিপ, চোখ ভর্তি কাজল। ওর ভালোবাসার মানুষ এক পৃথিবী মুগ্ধতা নিয়ে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকবে। আর নীরা লজ্জাবনত মুখটা নামিয়ে রাখবে। মাঝেমধ্যে আঁড়চোখে তাকিয়ে মানুষটার মুগ্ধ দৃষ্টি অনুভব করবে। কী যে বোকা-বোকা ভাবনায় ডুবেছিল। ওমন মতিভ্রম কারোর হয়!
নইলে সেই ফ্যান্টাসি-কে কোন নির্বুদ্ধিতায় বাস্তবে রূপ দিতে মরিয়া হয়ে মনের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে ওই লোকটার সামনে গিয়েছিল! ওর সমস্ত পৃথিবীটা সেদিন অপমানে, লজ্জায় ভেঙেচুরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল পাথুরে শক্ত মাটিতে। কী লজ্জা, কী ভয়ংকর লজ্জা!
নিজের প্রতি কী ভীষণ ধিক্কার আসে সেই স্মৃতি মনে পড়লে! অথচ ওই ঘটনাটা সে কিছুতেই বিস্মৃত হতে পারে না। সেইদিন থেকে প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর কোনোদিন কারোর জন্য নিজেকে সাজাবে না। নিজের জন্য সাজবে, নিজের জন্য হাসবে। কাঁদবে না আর, কোনোদিন কাঁদবে না।
***
ইরার মা মরিয়ম সত্যিই ভীষণ আনন্দিত হলেন মেয়েকে দেখে। সারামুখে হাত বুলিয়ে আদর করলেন।
ইরা বেরিয়ে বাগানে হাঁটাহাঁটি করল বহুক্ষণ। সেলফি তুলল ইচ্ছেমতো। কিন্তু আয়নায় ওকে যতটা চমৎকার দেখাচ্ছিল ছবিতে তেমন আসছিল না। নীরার সাথে ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলেও খানিকটা সমীহ করে সে। আশাপাশে কাউকে খোঁজার জন্য তাকাচ্ছিল, তখনই ওর ঠিক সামনে কিছুটা দুরত্বে একটা অচেনা ছেলেকে দেখল, হাতে ক্যামেরা। ইরার ঘোরতর সন্দেহ হলো যে, ছেলেটা ওর ছবি তুলছে।
ওদের আত্মীয়স্বজনদের সকলকেই ও চেনে। এটা কে! এই অযাচিত অনুপ্রবেশকারীর দুঃসাহস দেখে সে বিস্মিত হলো, ক্ষুব্ধও হলো। ওর এভাবে সরাসরি তাকানোতে ছেলেটাও অপ্রস্তুত হয়ে গেছে।
"আপনি এখানে কী করছেন? কে আপনি? কারো ছবি তোলার আগে যে অনুমতি নিতে হয় এই ভদ্রতাটুকু জানেন না? আপনি বাড়িতে ঢুকেছেন কীভাবে?"
ভ্যাবাচেকা খেয়ে ছেলেটা বলল, "দেখুন, আপনি ভুল বুঝছেন, আমি…"
"কী ভুল বুঝছি? দেখি আপনার ক্যামেরাটা দিন, মিথ্যে বলার জায়গা পান না?"
"আমি.."
"কী আমি? দিন বলছি। হাতেনাতে চোর ধরব আজ। আমার ছবি পেলেই আপনার ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত করা হবে।"
ইরা কথাটা বলেই ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে ক্যামেরাটা হস্তগত করতে গেল। ছেলেটা সভয়ে পিছিয়ে গেল। মুখে বলল,
"আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, প্লিজ, একটু শুনুন.."
"কী শুনব? ফাজলামো হচ্ছে? ক্যামেরা হাতে থাকলেই মেয়েদের ছবি তোলার লাইসেন্স পেয়ে যান নাকি আপনারা?"
"শুনুন, দেখুন…"
"দেখতেই তো চাইছি। ক্যামেরাটা দিন। আজ ওটা আমি ভাঙব।"
"কী হয়েছে এখানে?" নীরার গলা পেয়ে দু'জনেই পেছনে ফিরল।
"শাফিন? কখন এলি?" নীরাকে দেখে শাফিনের ফ্যাকাশে চেহারায় রঙ ফিরে এলো।
"নীরা আপু…" ইরা আর শাফিনের যৌথ কণ্ঠে একইসাথে উচ্চারিত হলো। একজনের গলায় অভিযোগ, অন্যজনের গলায় স্বস্তি।
"তুমি একে চেনো?" ইরার গলায় একইসাথে ক্ষোভ আর বিস্ময়।
"আপু আমাকে এই উন্মাদ মেয়ের কবল থেকে উদ্ধার করো।" শাফিন হাঁফ ছেড়ে নীরার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল।
"কী হয়েছে সেটা একজন একজন করে বল।" নীরা এখনো বুঝতে পারছে না এখানে হচ্ছেটা কী!
"এই অসভ্য ছেলেটা আমার ছবি তুলেছে।"
"আপু, আমি বলছি, তোমার কাছে কল করে বাড়ি চিনে ঢুকলাম। বাগানটা খুব সুন্দর। তুমি তো জানো, আমি শখের বসে ছবি তুলি। একটা ফুলের উপরে সুন্দর নীল রঙের একটা প্রজাপতি বসেছে। এত সুন্দর সাবজেক্ট। লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি নিজের মনে ফুলের ছবি তুলছিলাম। পাজি প্রজাপতিটা উড়ে গিয়ে অন্য ফুলে বসল। আমি ওইটার পিছু নিয়েছিলাম। তখন উনাকে দেখি। উনি সেলফি তুলছিলেন। উনার পেছনের ফুলেই প্রজাপতি। আমি দুজনকেই ফ্রেমে ধরার চেষ্টা করলাম। কয়েকটা ছবি তুলেও ফেলেছি৷ তখন উনার পারমিশন নিতে গেলে কম্পোজিশন নষ্ট হয়ে যেত। আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ভেবেছিলাম পরে স্যরি বলে দেব।"
"আচ্ছা। ঠিক আছে। ইরা তুই আমার রুমে যা। পরে মিটমাট করে নিস দু'জনে। আর শাফিন, আয়, তোকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।"
"কিন্তু আমার ছবি…" ইরার দ্বিধা তবুও কাটে না।
"আপনার ছবি আমি ফেরত দিয়ে দেব।"
ইরা শাফিনের দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টি হেনে পা বাড়ায়। নীরা শাফিনকে নিয়ে ওর বাবা মায়ের ঘরের দিকে যায়।
শাফিনের সাথে নীরার পরিচয় হয়েছিল খানিকটা অদ্ভুতভাবেই। এক গাঢ় মেঘলা দিনে সে গিয়েছিল ব্যাংকে। কাজ শেষে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। কোনো রিকশা পাচ্ছিল না, ছাতাও নেয়া হয়নি। তখন একটা অল্পবয়সী ছেলে এগিয়ে এলো। ব্যাংকেও ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়েছিল বেশ কয়েকবার। আগে কখনো দেখেছে কিনা নীরা মনে করতে পারে না।
"আপু, আপনি আমার ছাতাটা নিন।"
"আপনার ছাতা আমি কেন নেব? আপনি কে?"
"আমাকে আপনি করে বলবেন না প্লিজ। আমি শাফিন। আপনার ডিপার্টমেন্টের-ই, দুই ইয়ারের জুনিয়র। আপনাকে আমি চিনি। ক্যাম্পাসে দেখা হলে ছাতাটা ফেরত দিলেই হবে।"
"তুমি কী করে যাবে?" সবিস্ময়ে বলেছিল নীরা।
"আমার অভ্যাস আছে। তাছাড়া আমার বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগে।"
নীরা তবুও অসম্মতি জানাচ্ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি আর ছেলেটার একপ্রকার নাছোড়বান্দার মতো জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে ছাতাটা নিয়েছিল সে। দুই একজন ছাড়া ক্যাম্পাসে ওর কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নেই। ওর কাঠখোট্টা স্বভাবের জন্য ক্লাসমেটরাও অনেকে এড়িয়ে চলে। সেখানে ছেলেটার এমন স্বপ্রণোদিত সাহায্যের হাত ফিরিয়ে দিতে পারেনি। পরেরদিন দেখা হলে নীরাই এগিয়ে গিয়েছিল ছাতাটা ফেরত দিতে।
তখন সে এই প্রশ্ন করতেই শাফিন বলেছিল, "আপনার চোখ দুটো আমার আপুর মতো। আমার দুই বছরের বড় ছিল। আমার সমস্ত খুঁনসুটি আবদার ওর কাছেই ছিল।"
"সে কোথায়?"
"নেই। সাত বছর আগে একটা এক্সিডেন্টে…!"
গলাটা বুঁজে এসেছিল শাফিনের। সেই থেকে একটা মায়া পড়ে গিয়েছিলন ওর প্রতি। কখন যেন রক্তের সম্পর্কহীন সম্পর্কটা আত্মীক একটা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে! শ্রদ্ধা, স্নেহ, মায়ায় যেন সত্যিকারের ভাইবোন হয়ে উঠেছিল।
***
আগামীকাল হলুদের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজন বলতে বাড়ির তরুণ প্রজন্মের আনন্দ উৎসব। আজ ছাদে তারা সকলেই সমবেত হয়েছে। আয়োজন নিয়ে কিছু আলোচনা শেষে শুরু হলো আড্ডা পর্ব। ক্রমেই তা জমে উঠেছে।
রাত ধীরে ধীরে বাড়ছে। চাঁদের আলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। জোছনার জল ওদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কেমন অদ্ভুত মায়াবী হয়ে উঠল পরিবেশটা।
আফনার হুট করে প্রস্তাব দিল, "চল, আমারা একটা খেলা খেলি।"
অনেকেই সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল, "কী খেলা?"
"টুকরো টুকরো কাগজে অনেককিছু লেখা থাকবে। সেটা একটা ঝুড়িতে থাকবে। যেভাবে সবাই বসে আছি, সেই অনুযায়ী ঝুড়িটা সবার সামনে যাবে। একজন একটা করে কাগজ তুলবে। যার কাগজে যা উঠবে তাকে তাই করে দেখাতে হবে।"
সবাই হৈ হৈ করে উঠল। এই বাড়িতে ওরা মাঝেমধ্যে সবাই একসাথে হলেই এই খেলাটা খেলত।
দ্রুততম সময়ে খেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। আফনান ঝুড়ি নিয়ে নিলয়ের কাছে প্রথমে গেল।
"আমি কেন?"
"তোর বিয়ে। তুই শুরু না করলে হয়। মেয়েদের মতো ঢং না করে একটা তুলে ফেল।"
নীরার 'মেয়েদের মতো ঢং' কথাটার প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হলেও নীরব রইল। পরিবেশটা সুন্দর। এই আমেজ নষ্ট করার মতো মনোবৃত্তি হলো না।
নিলয়ের কাগজে লেখা ছিল কৌতুক। সে বরাবরই আড্ডা মাতাতে সিদ্ধহস্ত। একটা মজার কৌতুক বলতেই সকলে হেসে কুটিকুটি হলো।
আফনান এবার ঝুড়িটা নীরার সামনে নিয়ে এলো। গতকাল সকালে সেই যে শূন্য দৃষ্টির সম্মুখীন হয়েছিল, তারপর থেকে সে উদগ্রীব হয়ে ছিল নীরার সাথে একটাবার কথা বলার জন্য। কিন্তু সম্ভব হয়নি। কেউ ইচ্ছে করে এড়িয়ে যেতে চাইলে তার নাগাল পাবার সাধ্য কার!
নীরার কাগজে লেখা ছিল 'আবৃত্তি'। ছাদে কোনো লাইট জ্বালালো হয়নি। চাঁদের আলো আর সারাবাড়ির আলোকসজ্জায় বড় বড় অক্ষর পড়তে কারোর অসুবিধা হচ্ছে না। নীরা শুরু করল,
"অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!"
একরাশ নিস্তব্ধতা নেমে এলো ছাদ জুড়ে। সকলেই চমৎকার আবৃত্তিতে মোহিত হলেও আফনান চাঁদের আলোয় একজন নারীকে দেখল। ভাবলেশহীন মুখের সাথে কোনো উত্তাপ না থাকলেও গলার যৎসামান্য আবেগের উপস্থিতি সে ঠিকই প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করতে পারল।
একটা বালিকার স্বপ্ন ওইভাবে মাড়িয়ে যাবার জন্য আজ এক অবর্ণনীয় বিষাদ আফনানকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। এই রাতের আনন্দ ওর জন্য ফিঁকে হয়ে গেল নিমিষেই।
.........
(ক্রমশ)
ব্যবহৃত কবিতাঃ নিঃসঙ্গতা - আবুল হাসান
গল্পটা বোধহয় আপনাদের ভালো লাগছে না। রেসপন্স দেখে সেটাই মনে হচ্ছে। এটা বন্ধ করে ঈদের পরে অন্য গল্প শুরু করব? মতামতের অপেক্ষায় থাকলাম।