#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৪)
নুসরাত জাহান লিজা
নীরা চায়ের কাপ হাতে বাবার ঘরে ঢুকল। আজ সবাই ভয়াবহ ব্যস্ত। সকালে বাবার চা দেয়া হয়নি। নীরার ঘুম থেকে দেরিতে উঠার অভ্যাস। তার উপর গতকাল রাতে ছাদে রাত তিনটা পর্যন্ত হৈ রৈ চলেছে। উঠেই শুনল বাবা চা চাইছেন। রান্নাঘরেও ব্যস্ততার রেশ। সকালে খাবার আয়োজন চলছে প্রায় ষাট জন লোকের। আরও অনেকেই আজ দুপুরের মধ্যে আসবে। নীরা ওর ঘরে ওয়াটার হিটারে চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে বাবার জন্য আর নিজের জন্য।
"মা, আয়। ভাবলাম আজ আর চা পাব না।"
নীরা হেসে বলল, "বাবা, কয়েকদিন সবাই ভীষণ ব্যস্ত থাকবে। তুমি সকালে আমাকে জাগিয়ে দিও। আমি চা করে দেব।"
চায়ে চুমুক দিয়ে মঈদুল সাহেব বললেন, "তাহলে আমার চায়ের একটা হিল্লে হয়।"
"তোমার শরীরটা এখন কেমন? শ্বশুর হয়ে যাচ্ছ তো।"
"আমি একদম ফিট আছি। নো চিন্তা।"
নীরা মৃদু হেসে বলল, "এই তো চাই।"
চায়ে আরেকবার চুমুক দিয়ে মঈদুল বললেন, "আমি জানি এভাবে বলা ঠিক নয়। তবুও তোর প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব আছে। কেন জানি না, সবসময় নিলয়ের চাইতে আমার স্নেহের সিংহভাগ তুই পেয়েছিস।"
"যেমন মায়ের আছে ভাইয়ার জন্য।"
"তোর আক্ষেপ হয়েছে কখনো?"
"আক্ষেপের জায়গা তুমি পূরণ করে দিয়েছ বাবা। ভাইয়ার হয়তো আছে।"
"ওরটা তাহলে তোর মা পূরণ করে দিয়েছে।"
"আমার কাছে তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।"
মঈদুল একগাল হেসে বললেন, "তুই দেখিস মা, তুই জীবনে খুব সুখী হবি। পৃথিবীর যত সুখ তোর পাওনা।"
সকালটা চমৎকারভাবে শুরু হলো নীরার। বাগানে এসে দাঁড়াল। আফনানকে গাছে পানি দিতে দেখে সরে এলো। সুন্দর সকালের রেশটা নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না।
***
আফনান নিলয়ের সাথে বেরিয়েছে।
"তুইও এবার বিয়েটা করে ফেল শালা। আর কতদিন ব্যাচেলর থাকবি?"
"আমার সুখের উপরে এত নজর দিস কেন শালা? নিজে করছিস, তাই নিয়ে হ্যাপি থাক না!"
"আফনান, তুই আমার সবচাইতে ভালো বন্ধু। আন্টির শরীরটাও তো দেখতে হবে নাকি!"
আফনান হাঁটতে হাঁটতেই বলল, "তোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তুই সেইসময় সাহায্য না করলে মা হয়তো আজ.."
"আফনান, গাট্টা খাবি কিন্তু এবার। তুই কিন্তু সব টাকা শোধ করেছিস। আমি কিছুই করিনি।"
"তবুও, সেসময় আমি বেকার ছিলাম। তোর সেই ঋণ আমি কোনোদিন ভুলব না।"
"আফনান, এসব কেন বলছিস? তোর মা কি আমার মায়ের মতো নয়? আর কখনো এসব কথা বলবি না।"
আফনান আর কিছু বলল না। নীরার মুখটা ভেসে উঠল। নীরা ওর চোখের সামনেই হাঁটছে, কথা বলছে, হাসছে তবুও কত অধরা। অবশ্য আগেও মেয়েটা যখন ধরা দিতে এসেছিল, তখনও তো সে অধরাই ছিল। মনে মনে একটা কবিতার লাইন আওড়াল আফনান,
"বন্ধুরা সব বিত্তে বাড়ে, চিত্তে বাড়ে
বাড়ে শনৈঃ গৃহস্থালি,
আমার তবু বয়স হয় না, বুদ্ধি হয় না।"
আসলেই তো ওর জীবনে তেমন কিছুই হলো না!
"নীরাটা কেমন বড় হয়ে গেল। আমি বিয়ে করছি। এবার ওকে একটা ভালো ছেলে, ভালো পরিবার দেখে সমর্পণ করতে পারলে স্বস্তি। মেয়েটা অভিমানী। ওকে বুঝবে এমন একজন মানুষ না হলে সেটা হবে না।"
"হ্যাঁ। এই তো কয়দিন আগেই দৌড়ে বাড়ি মাতিয়ে রাখল।"
"তোর সন্ধানে ভালো ছেলে আছে?"
"কেমন ছেলে চাস?"
"নীরা যেখানে ভালো থাকবে। ওর ইচ্ছেগুলো পূরণ হবে। বিশ্বস্ত হাত, মেয়েটা হৈচৈ ভালোবাসে। একটা পরিপূর্ণ পরিবার থাকবে। সবার ভালোবাসা পাবে এমন।"
"আমি পেলে তোকে অবশ্যই জানাব।"
সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলল আফনান। নীরার যোগ্য সে নয়৷ ওকে সে কখনো ভালো রাখতে পারবে না। ওর মতো একটা ভাঙা পরিবারে মেয়েটাকে সে রাখতে পারবে না। তার থেকে দূরে থাকাই ভালো। একবার অন্তত সামনাসামনি কথা বলার ইচ্ছেটাকে এই ভর দুপুরের সুনসান রাস্তায় মাটিচাপা দিয়ে ফেলল। ওই সুগভীর চোখ, ওই সুমিষ্ট হাসি ওর জন্য নয়। অন্য কারোর। যে নীরাকে পৃথিবীর সব সুখ দেবার যোগ্যতা রাখে!
…….
(ক্রমশ)
কবিতাঃ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
(কয়েকদিন পরের এই ছোট্ট পর্বের জন্য দুঃখিত। তবে এরপর থেকে ১০০০-১২০০ শব্দের পর্ব আসবে ইনশাআল্লাহ। সবাইকে লাইক, কমেন্ট করে পাশে থাকার অনুরোধ রইল।)