#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৬)
নুসরাত জাহান লিজা
নীরার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। সে খেয়াল করে দেখেছে, যখনই ওর কোনো প্রয়োজন থাকে তখনই এই সমস্যাটা হয়। যেমন এমনিতেই ভালোই থাকে সব, কিন্তু পরীক্ষার সময় এগিয়ে এলেই মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। একবার রাতে ফুরফুরে মেজাজে শুয়েছে, সকালে বাড়ির সবাই মিলে একজায়গায় ঘুরতে যাবে, শুরু হলো মাথা ব্যথা। যেন ওর প্রয়োজনের সাথে সাথে ওই বিশ্রী ব্যথারও নীরার মাথাটাকে দরকার হয় আয়েস করে বসবার জন্য৷ একটু ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করে বসেছিল, তখনই একজন বলল,
"আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?"
"কেন? আশেপাশে তো অনেক জায়গা আছে সেদিকে যান।"
নীরার এমন কাঠখোট্টা জবাবে ছেলেটি প্রথমে যদিও খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল, তবে ক্ষণেক পরেই সেটা কাটিয়ে উঠে বলল, "আপনি তো নীরা, তাই না?"
"তাতে কী হয়েছে? আপনি আমার পাশে বসার অনুমতি পেয়ে গেছেন?"
"আপনি আমাকে চিনতে পারেননি হয়তো।"
নীরা এবার ভালো তীক্ষ্ণ নজরে ছেলেটাকে দেখল। মনে হলো কোথাও আগে দেখেছে, কিন্তু মনে করতে পারছে না। তবে যারা যেচেপড়ে আলাপ করতে আসে, এমন ধরনের লোকজনকে সে পাত্তা দেয় না। এদের সাথে সামান্য ভদ্রতা দেখিয়ে কথা বললে এরা পেয়ে বসে। ভাবে মেয়েটা পটে যাব যাব করছে। গাধাগুলো সৌজন্যতাই বোঝে না৷ মেজাজের পারদ চড়েছে ওর। তাই সে স্বভাবসুলভ রসকষহীন গলায় বলল,
"কেন? আপনি কি দেশের বিশাল বড় সেলিব্রিটি গোছের মানুষ যে জনে জনে আপনাকে চিনবে?"
এপর্যন্ত বললে অন্যরা দমে যায়, কিন্তু এই বেচারা দমল না। বরং ধৈর্য সহকারে গলায় সমস্ত বিনয় ঢেলে বলল, "না, আমি তেমন কেউ নই। তাই জনে জনে চেনার কথা না। তবে আপনি যেহেতু বকুল চাচির ভাইঝি…"
এইবার নীরা চিনতে পারল। বকুল ফুপু শ্বশুর বাড়ি অন্তঃপ্রাণ। ওখানকার সবাই ওদের বাড়িতে আসত। এই ছেলেকে বোধহয় সামনা-সামনি দেখেনি সে, কিন্তু ফুপুর বদৌলতে তার সাথে আনা এ্যালবামে এই গুণধর ব্যাক্তিকে দেখেছে। তবে সামনা-সামনি কিছুটা অন্যরকম দেখতে। ছবিতে দেখে মনে হতো লাজুক, গোবেচারা ধরনের মানুষ। কিন্তু এখন উল্টোই মনে হচ্ছে। কথার পিঠে কথা বলায় অত্যন্ত পারঙ্গম বলেই মনে হচ্ছে।
"এখন বসতে পারি?"
"বসুন।"
"আমার নাম সায়মন।"
"এটা বলার জন্য এত ঝক্কি ঝামেলা সহ্য করে বসলেন?"
সায়মন হেসে ফেলে বলল, "শুরু থেকেই আমাকে ভড়কে দেবার একটা প্রবণতা আপনার মধ্যে দেখছি। হয়তো ভাবছেন আমার উদ্দেশ্য আপনাকে বিরক্ত করা। কিন্তু আমি তেমন অল্প বয়সী কেউ নই যে কারো অনিচ্ছা সত্বেও তার বিরক্তির কারণ হব। আর আমাকে ভড়কে দেয়া এত সহজও নয়।"
নীরা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, "আপনার উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, আমি কিন্তু বিরক্তই হচ্ছি।"
সায়মন হাসিটা চওড়া করে বলল, "সেটা হয়তো আমার ব্যর্থতা। আমি কিন্তু আপনার বিরক্তি এক তুড়িতে কাটিয়ে দিতে পারি।"
"কেন? আপনি কি লাফিং গ্যাস স্টোর করে এনেছেন? তুড়ি মেরে সেটা আমার নাকের সামনে ছেড়ে দেবেন? নাকি হাইলি স্কিলড ম্যাজিশিয়ান? কোনটা?"
"কোনোটাই নই। আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। ম্যাজিক ট্যাজিক জানি না।"
"দেখুন ভাই, আপনি যদি ভেবে থাকেন আমি কিশোরী মেয়েদের মতো আপনার কথায় পটে যাব কিংবা আপনার চেহারা দেখে ফিট খেয়ে পড়ে থেকে তিন বেলা আপনার নাম যপ করব তাহলে ভুল ভাবছেন।"
"যাক, অন্তত কিশোরী মেয়েদের মাথা খারাপ করবার মতো কোয়ালিটি তাহলে আমার মধ্যে আছে, এটা স্বীকার করলেন। এটা আমার বিশাল বড় প্রাপ্তি। তবে আমি আজ অব্দি এমন কিছুতে সফল হইনি।"
নীরা চেয়ারের হাতলে কনুই রেখে হাতের তালুতে নিজের মাথায় চেপে ধরে বসল। ওদিকে বাংলাদেশ বেতারের মতো সায়মনের কথা বেজেই চলেছে। বাংলাদেশ বেতারে তবুও খানিকটা বিরতি আছে। এই লোকের তা-ও নেই দেখা যাচ্ছে। নীরার খুব কঠিন গলায় বলতে ইচ্ছে করল,
"আরে গ আকার ধ আকার, তুই মেয়ে পটাতে পেরেছিস কী পারিসনি সেই কেচ্ছা শুনে আমার কাজ কী?" কিন্তু বকুল ফুপুর কথা চিন্তা করে বিরত থাকল। তার আদরের সায়মনকে কিছু বললে তার কলিজাতেও তীর বিঁধবে।
"আমার জীবনের সবচাইতে লজ্জাজনক এবং একমাত্র প্রত্যাখ্যানের গল্পটা বলি তাহলে। তখন আমি সবে টেনে পড়ি। উঠতি বয়স, তাই প্রেম নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব ফ্যান্টাসি তৈরি হচ্ছিল মনে। ভালোবাসা যে কী সেটাই বুঝতে শিখিনি তখনো আসলে। তখন আমাদের ক্লাসেরই একটা মেয়েকে নিয়ে বন্ধুরা ক্ষেপাতে শুরু করল। কারণ আমার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল কেমিস্ট্রি আর মেয়েটার নাম ছিল অনু। যে আবার ছিল কেমিস্ট্রি স্যারেরই আদরের মেয়ে৷ তো বন্ধুদের ওই অতিমাত্রায় ফাজলামোর জন্যই কিনা জানি না, হঠাৎ মনে হয়েছিল অনুর প্রতি বুঝি আমি কোনো কিছু ফিল করছি। প্রি-টেস্ট পরীক্ষার পরে একদিন অত্যন্ত সাহস করে গেলাম নিজের অনুভূতির কথা ওকে জানাতে। বন্ধুরাও আড়ালে লুকিয়ে ছিল দেখার জন্য। আমিই ওদের সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম যাতে একা একা ভীত না লাগে। আমি যেই ভালোবাসার কথা বললাম, ওমা মেয়েটা রাস্তার মধ্যেই এমন কান্নাকাটি শুরু করল যে আমি তখন মান সম্মান নিয়ে পড়িমরি করে কেটে পড়ি। বন্ধুদের মধ্যে মুখ দেখানোর উপায় নেই। পরেরদিন স্যার ডেকে দিলেন উত্তম-মধ্যম। কী লজ্জার কথা। সেই থেকে আজ অব্দি আর সাহস করে কোনো মেয়েকে পটানোর সাহস করিনি।"
নীরা সশব্দে হেসে ফেলল। সে উপলব্ধি করল ওর বিরক্তি সত্যিই নেই সাথে মাথা ব্যথাটাও কমে গেছে। ছেলেটার মধ্যে সহজাত একটা ভঙ্গি রয়েছে। নীরার চারপাশের দুর্ভেদ্য প্রাচীর সামান্য চিড়ে কেউ ওকে নির্মল হাসাতে পারল, এই প্রথমবার।
"আপনার হাসিটা ভীষণ সুন্দর নীরা।"
নীরা হাসতে হাসতেই বলল, "আমি জানি। আর একটা খুবই সৎ পরামর্শ দেই ফ্রি অফ কস্ট। আপনি কোনো মতলবে যদি এসেও থাকেন, অন্য রাস্তা দেখুন প্লিজ। হেসেছি বলে ফেঁসে যাইনি, তেমন সম্ভাবণাও নেই।"
"বন্ধু ভাবা যায় না?"
"এত তাড়াতাড়ি কাউকে বন্ধু ভাবার মতো অতি বিশ্বাস আমার নেই। আসছি।"
নীরা যেতে যেতে একবার নিলয়দের দিকে তাকালো। সেখানে হৈ হল্লা, হাসাহাসির মধ্যে বসে থেকেও একজন যেন ঠিক নির্জন দ্বিপের মতোই একা। এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবার মতো বিষাদ আফনানের চোখেমুখে। সেই বিষণ্ণ চোখ দুটোর সাথে ওর চোখের স্পর্শ বিনিময় হলো যেন দৃষ্টির মাধ্যমে। নীরা চোখ সরিয়ে নিল দ্রুত। নিজেকে আড়াল করতেই বাড়ির ভেতরে কণের কাছে চলে গেল।
***
ইরা দেখল শাফিন ক্যামেরা হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরছে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল,
"এভাবে অলস ঘোরাঘুরি না করে আমার কিছু ছবি তুলে দিলেই তো পারেন।"
"সেদিন ছবি তুলেছিলাম বলে ঝগড়া করেছেন। আজ কেন তুলব?"
"সেদিন অনুমতি ছাড়া কাজটা করেছিলেন যেটা অন্যায়। আজ আমি নিজেই বললাম। ওই যে ওখানে স্টেজের পাশে যে দেয়ালে সুন্দর করে ডেকোরেট করা, ওইখানে চলুন। কী হলো, আসুন! আপনার পেমেন্ট নিয়ে টেনশন করবেন না। আমি কৃপণ নই।"
স্বল্প পরিচিত কারোর মধ্যে এমন অধিকারবোধ সচরাচর দেখতে অভ্যস্ত নয় শাফিন। সে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, "আপনি হঠাৎ আমাকে বিশ্বাস করে ছবি তুলে দিতে বলছেন কেন? প্রথমদিন তো.."
"নীরা আপুর জন্য। আপু যেহেতু আপনাকে বিশ্বাস করে, তাই আমিও করি। নীরা আপু কোনো আজাইরা হেঁজিপেঁজি মানুষকে তার আশেপাশে এ্যালাউ করে না।"
নানানরকম পোজের ফটোসেশান চলল প্রায় মিনিট বিশেক। আরও অনেকেই এদিকে আসছে বলে ওরা সরে গেল। হঠাৎ পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে শাফিন বলল,
"আমার নাম্বারে একটা কল দিন না, আমার মোবাইলটা খুঁজে পাচ্ছি না।"
ইরা হেসে নিলয়ের বন্ধু রোমেলকে এদিকে ডেকে বলল, "ভাইয়া, উনার ফোন খুঁজে পাচ্ছেন না৷ তুমি একটু তার নম্বরে কল দাও তো।"
শাফিন প্রমাদ গুনে বলল, "ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমার ব্যাকপ্যাকে রেখেছিলাম৷ লাগবে না ভাইয়া।"
ইরা হেসে রোমেলকে বলল, "আচ্ছা রোমেল ভাইয়া যাও, ভাইয়ার কাছে যাও।"
রোমেল যাবার আগে বলল, "কোনো সমস্যা হলে ডাকিস।"
শাফিনের অভিব্যক্তি এখন ঠিক ছিঁচকে চোররা ধরা পড়লে যেমন হয় তেমন। ইরা মিষ্টি করে হেসে বিষ ঢালল যেন শাফিনের লজ্জাবনত মুখে।
"সরাসরি আমার কাছেই নম্বরটা চাইলে দিয়ে দিতাম। ত্যাড়াব্যাকা রাস্তা ধরেই সমস্যাটা করেছেন। এমন সস্তা ট্রিক এ-যুগে কেউ করে! আমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়ের সাথে এমন বোকা বোকা কাজটা করে আমার বুদ্ধিকেই ছোট করলেন আপনি! কী যে দুঃখ পেল আমার শার্প ব্রেইন।"
শাফিনের বলতে ইচ্ছে করল, "ধরণী দ্বিধা হও।"
এখন শাফিন মুখ দেখাবে কী করে এই মেয়ের কাছে! একটা বোকা বোকা ভুল, সারাজীবনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। নীরা জানলে কী ভাববে ওকে। কোন মতিভ্রম যে ওর হয়েছিল কে জানে!
.........
(ক্রমশ)
সায়মন আর আফনান কাকে কেমন লাগছে?