ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

৭ম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৭)

নুসরাত জাহান লিজা

নীরাদের বাড়ি নতুন অতিথির আগমনে আজ মুখরিত হয়ে উঠেছে। একেবারে বয়োবৃদ্ধ এবং শিশুরা বাদে সকলেই রাত প্রায় তিনটা পর্যন্ত মেতে রইল নতুন বউ নিয়ে। এরপর আরও রাত বাড়তেই ধীরে ধীরে সব স্তিমিত হয়ে এলো। আনিকার ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। এত ভারী সাজপোশাক, গহনা তো সচরাচর পরা হয় না। তাছাড়া সেই কোন সকালে এসব গায়ে তুলেছিল। নিলয় ওকে আগেই বলেছিল বউ সাজে কাছ থেকে ওকে দেখবে। সেজন্য এখনো সবটাই সেভাবে রয়েছে। তবে সারাদিনের ধকলে এখন আর পরিপাটি নেই।

নিলয় তবুও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলল, "তোমাকে অন্যরকম লাগছে, বউ বউ লাগছে।"

আনিকা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল। বলল, "বউ সেজেছি, আজ বিয়েও করলাম। বউ বউ না লাগলে হয়!"

"আমাকে কেমন লাগছে দেখতে?"

"মেয়েরা ছেলেদের রূপের প্রশংসা করে না, জানো না?"

"কোন সংবিধানে লেখা আছে এটা?"

"মেয়েদের নিজস্ব সংবিধানে।"

"আজ ব্যতিক্রম হোক।"

"একদম না। এখন বিয়ে করে ফেলেছ। তাই আর এসব ঢং মানায় না তোমাকে, বুঝলে? সুন্দর লাগুক, অসুন্দর লাগুক তা তো একজনেরই। তাই ওসব না বলাই ভালো। বুঝলে?"

"তুমি কিন্তু খুবই টিপিক্যাল বউদের মতো কথা বলছো।" হেসে বলল নিলয়।

"কিছু জিনিস টিপিক্যাল হলেও সুন্দর। যেমন আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। এখন হাজব্যান্ড ওয়াইফ। বিষয়টা সুন্দর না?"

"ভালো ভালো।"

কথায় কথায় খুঁনসুটি একসময় থেমে যায়, আজ ওদের চির আরাধ্য প্রাপ্তির রাত। এই যে পাওয়া, তা যেন ওদের জীবনে অক্ষয় হয়, এই কামনা করল দু'জন সর্বান্তকরণে।

***

এই ক'দিন আফনান ঘুমিয়েছে নিলয়ের সাথে। আজ ওর জায়গা হয়েছে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে। আত্মীয়স্বজনের আগমন উপলক্ষে এই ঘরকে বসবাস উপযোগী করা হয়েছে। ওর সাথে সায়মনেরও এখানেই জায়গা মিলেছে।

সায়মকে দেখে আফনানের প্রথমেই নীরার হাসিমুখের ছবিটা ভেসে উঠল। কতদিন পরে নীরাকে এভাবে হাসতে দেখল! আফনান কেবলই চোখের জল উপহার দিয়েছিল।

"আফনান, কী এত ভাবছেন বলুন তো?"

আফনান চমকে সায়মনের দিকে তাকায়। ঘরে একটা বড় খাট, ছোট্ট একটা টেবিল আর একটা কাঠের চেয়ার আছে। সায়মন সেই খাটে বসে প্রশ্নটা করেছে।

"না, এমনি কিছু না।"

"ঘুমাবেন না? অনেক রাত হয়ে গেল।"

"হ্যাঁ, ঘুমাব। আপনি ঘুমান। আজ আর মনে হয় আমার ঘুম আসবে না। আমার একটা বদ অভ্যাস হলো, ঘুমের সময় পেরিয়ে গেলে পরে আর হয় না।"

সায়মন হেসে বলল, "আমার আবার এমন কিছু নেই। যেখানেই রাত, সেখানেই কাৎ৷ আর শুলেই কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম।"

আফনান হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, "আপনি তো ভীষণ সুখী মানুষ তাহলে।"

"তেমন দুঃখ পাবার মতো কিছু ঘটেনি আমার লাইফে। আসলে আমি জায়গা দেইনি।"

আফনানের মনে হলো ওর সামনে বসা সদালাপী ছেলেটা আসলেও যেন অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। কেবলই ওরই যেন সব অপ্রাপ্তি।

"আপনার বাড়িতে কে কে আছে?"

"মা আর বোন। বোনের অবশ্য বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আর আমাদের সাথে থাকে না।"

"স্যরি, আপনার বাবা…"

"স্যরি বলার মতো কিছু নেই। উনি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন৷ তবে আমাদের সাথে তার কোনো লেনাদেনা নেই। তার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি কিংবা সহানুভূতি যাই বলি, সেসব কিছু নেই।"

আফনানের এই বিষয়ে কথা বলতে ভীষণ অনীহা। তবুও এটাই ওর জন্য বহুল চর্চিত বিষয়। লোকটা ওর সাত বছর বয়সের সময় গোপনে আরেকটা বিয়ে করেছিলেন। ওর মা জানতে পেরে সাথে সাথে বেরিয়ে এসেছিলেন ওদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে। বাস্তবতার রুক্ষ মাটিতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে দেখেছে সে তার মা'কে। সেই শৈশব থেকে তাই সখ্যতা গড়ে উঠেছিল জীবনের প্রতিকূলতার সাথে। তবে কিছু ভালো বন্ধু সে নিজের চারপাশে পেয়েছে। যারমধ্যে নিলয় সবচাইতে কাছের। ওদের সাথে থাকলে সে অন্য আরেক জীবনকে খুঁজে পায়। তাদের সান্নিধ্যে হৈ রৈ'তে মেতে থাকে। ক্লেদটুকু এখন আর ওর জীবনে নেই। কিন্তু 'ব্রোকেন ফ্যামিলি'র বাসিন্দা কথাটা নানাসময় নানা লোকে মনে করিয়ে দিয়েছে একসময়। মা ওর জীবনে কত বড় আশীর্বাদ সেটা কেবল সে-ই উপলব্ধি করতে পারে।

আফনান মন্দ সময়ে যাদের একান্ত সান্নিধ্যে সব ভুলতে পেরেছিল, তাদেরকে আঁকড়ে ধরতে চায়। বন্ধুতা হারাতে চায় না। নীরা যখন ওর কাছে নিজের কিশোরী বেলার সমস্ত আবেগ জড়িয়ে প্রথম ভালোবাসাটুকু ওকে সঁপে দিতে চেয়েছিল, সে তা গ্রহণ করতে পারেনি। ভয় পেয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল নীরাকে সে কখনো নিলয়ের বোন ছাড়া অন্য দৃষ্টিতে দেখেনি। তাই সে চরম অবহেলা ভরে ফিরিয়ে দিয়েছিল, ভেবেছিল মেয়েটা ভুল করছে। তাই ওমন ভুল যেন ভবিষ্যতে না করে। ওকে নিয়ে যেন অন্য কিছু না ভাবে আর। তাই সেই প্রগাঢ় আবেগ জড়ানো ভালোবাসা শেকড় সমেত সমূলে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। আফনান চেয়েছিল মেয়েটা ভালো থাকুক।

কিন্তু ওর অবচেতন মন ওকে নিজের কৃতকর্মের কথা ভুলতে দেয়নি। মনের কোথাও সূক্ষ্ম কাঁটা হয়ে আলতো করে খুঁচিয়ে দিয়ে যেত। এখানে সে আসাও বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রাণমনে চেষ্টা করেছে অবচেতন মনের প্রলোভন উপেক্ষা করতে। এই ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছে, নীরা ভালো আছে। এত বছরে নিশ্চয়ই সব ভুলে জীবনে এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু নিলয়ের বিয়ে উপলক্ষে এত বছর পরে যখন প্রথম মেয়েটাকে দেখল, তখন বুঝল ওর ধারণা ভুল। নীরাকে বুঝতে ওর ভুল হয়েছিল। যতই লুকিয়ে রাখুক, আফনান জানে, নীরা আজও ওর মনে তাকে পুষে রেখেছে, হয়তো ভালোবাসায় নয়, হয়তো প্রগাঢ় অভিমানে। যেটাই হোক, তবুও ওই অতল চোখের মেয়েটার হৃদয়ে এখনো অন্যকেউ আসেনি। তবে এটাও উপলব্ধি করতে পারছে, এই মুহূর্তে ওর সামনে বসা প্রায় ওরই বয়সের ছেলেটা, সায়মন, সে-ই হয়তো…

"আপনি নিলয় ভাইয়ের খুব ভালো বন্ধু, এই বাড়িতে আপনার যাতায়াত কেমন?"

"স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় প্রচুর আসতাম। এবার অনেকদিন পরে এসেছি।"

"ও আচ্ছা।"

আফনান খেয়াল করেছে সায়মনের চোখে নীরার জন্য অন্যকিছু একটা ছিল যেন৷ ওর বোঝার ভুলও হতে পারে। তবে একজন পুরুষ হবার সুবাদে অন্য পুরুষের মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিগুলো কেমন হয় সে ভালোই জানে। সায়মনের দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ছিল, ঠিক প্রেমে পড়ার আগ মুহূর্তে যে-ই মুগ্ধতা থাকে, ঠিক তেমন। সরাসরি জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এতটা অভব্যতা করার মতো অশিষ্ট সে হতে পারে না। তবে এভাবে থাকতেও পারে না। একটা অসহ্য অস্থিরতা ওকে অসহায় করে তুলে।

সায়মন তখন শুয়ে পড়েছে। জিজ্ঞেস করবে না করবে না করেও আফনান বলেই ফেলল শেষ পর্যন্ত, "নীরা, ইরাদের সাথে আপনার বেশ ভালো বন্ধুত্ব আছে নিশ্চয়ই।"

"আছে, তবে সেভাবে আগে ছিল না। আসলে নীরার সাথে আমার বিয়ের একটা প্রাথমিক প্রস্তাবনার প্রক্রিয়া চলছে। বকুল চাচির কাছে শুনে শুনে ছবি দেখে একটা কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল মেয়েটা অন্যরকম। আজ সামনা-সামনি অনেকক্ষণ কথা বলে সেই কৌতূহল বদলে গেল। আচ্ছা, আফনান, আপনার সাথে ওদের ভালো সম্পর্ক নিশ্চয়ই! নীরা মেয়েটা ভীষণ চমৎকার, তাই না?"

আফনানের ভেতরের ছোট্ট আ গু নে র ফুলকিটা আচমকা দা বা ন লে রূপ নিল। হৃদপিণ্ড যেন দাউ দাউ করে জ্ব ল ছে। ভস্মীভূত হচ্ছে, ছাই হয়ে সেটা উড়ে যাবে সুদূরে। বাকি জীবনটা ওকে বেঁচে থাকতে হবে হৃৎপিণ্ড ছাড়াই। সে-ই বাঁচা কী বেঁচে থাকা! আর কিছুই ভাবতে পারে না। তবুও সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গলায় জোর এনে বলল,

"হ্যাঁ, চমৎকার। নীরা ভীষণ চমৎকার একটা মেয়ে। আপনি ভীষণ সৌভাগ্যবান সায়মন। আপনার সুখী জীবন আরও সুখে ভরে উঠবে।"

বলল বটে, কিন্তু শুভাশিষটুকু মন থেকে আর এলো কই। সায়মনের মতো জীবনে সব পাওয়া মানুষদেরই ভাগ্য সবকিছুতে অনুকূলে থাকে। আর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাপ্তি হীন একটা জীবন কাটিয়ে দিতে হয় আফনানদের। সব অপ্রাপ্তি কেবল ওর ঝুলিতে জমুক। এই জীবনে ওর একমাত্র প্রাপ্তি বোধহয় একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অপ্রাপ্তির ঝুলি!

একসময় মনে হলো সে যেভাবে বলেছে, সেভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। সায়মনের মতো বুদ্ধিমান ছেলে নিশ্চয়ই ওকে পড়ে ফেলবে। সে দ্রুত হাতে পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেটটা খুঁজে বের করল। এরপর গলার স্বর প্রাণপণে স্বতঃস্ফূর্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, "সিগারেট চলবে সায়মন?"

সায়মনের কপালে ভাঁজ সরল এতক্ষণে, উত্তরে সে বলল, "না। এই জিনিসে ঠিক অভ্যস্ত হতে পারিনি।"

"তাহলে আপনাকে আর বিরক্ত না করি। আমি ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসি। কেমন?"

ছাদে আসতেই একটা শীতল বাতাস আফনানের গায়ে এসে লাগল। তবে ওর হৃদয় বাড়ির জ্ব ল ন্ত ভিসুভিয়াস এই বাতাস নেভাতে পারল না। বরং আরও যেন উস্কে দিয়ে গেল।

সে সিদ্ধান্ত নিল ঘুম থেকে উঠেই সে চলে যাবে। এমনিতেও পরশ সে চলেই যেত। কিন্তু নীরাকে সে চোখের সামনে অন্যের পাশে দেখে সহ্য করতে পারবে না। এতটা মনের জোর ওকে সৃষ্টিকর্তা দেননি। তাই চলে যাওয়ায় ঢের ভালো। সে একলা পুড়ুক, কেউ তা না দেখুক।

………

(ক্রমশ)

১১৯৪ শব্দের পর্ব। লেখা শেষেই পোস্ট করেছি, বানান বা অন্যকোনো ভুল থাকলে জায়গাগুলো কমেন্টে জানাতে পারেন। আমি একটু ফ্রি হলে ঠিক করে নেব ইনশাআল্লাহ। এগারোটার আগে আর ফ্রি হতে পারব না বলে এভাবেই পোস্ট করা হলো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন