#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১১)
নুসরাত জাহান লিজা
রোকেয়ার সাথে সায়মনের কথা হয়েছে। ছেলেটাকে তার বেশ মনে ধরেছে। নীরা যেমন চাপা স্বভাবের মেয়ে, সায়মন আবার ঠিক ততটাই খোলা মনের। কথা বলে ভীষণ বিনয়ী মনে হয়েছে, সাথে ভদ্রতাবোধ ঠনটনে। নীরাকে যেন খুব ভালো মতো বুঝতে পারে, এমন ছেলেই তিনি তার আত্মজার জন্য চাইতেন। সাথে বাড়তি প্রাপ্তি ছেলেটা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন, দেখতেও ভালো, ভালো পেশা, বকুল সবসময় খেয়াল রাখতে পারবে। সবমিলিয়ে রোকেয়ার মনে হয়েছে সায়মনই তার মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র। হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। বকুলকে ডেকে তিনি নিজের সম্মতি জানিয়েও দিলেন। বললেন,
"তোমার ভাইয়ের সাথে একটু কথা বলি। আমার তো পছন্দ হয়েছে সায়মনকে।"
"ভাইজানেরও ঠিক পছন্দ হবে ভাবি। সায়মন সোনার টুকরো ছেলে।"
রোকেয়ার একটা চাপা কষ্টবোধ আছে নিলয়ের বিয়ে নিয়ে। ছেলের প্রতি এক ধরনের অন্ধ মমত্ববোধ তার হৃদয়ে আছে। নীরার জন্যও আছে, তবুও প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন নিলয়কে দিয়ে বলেই কিনা, কোথাও গিয়ে যেন তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়েছেন।
সেই ছেলের বিয়ে তিনি নিজে পছন্দ করে পাত্রী বাছাই করে এরপর দেবেন বলে ভেবেছিলেন৷ কিন্তু নিলয় সেই অল্প বয়সেই আনিকাকে পছন্দ করল। তার জন্য মরোমরো অবস্থা। পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বিষয়টা মেনে নিয়েছেন, বিয়েটা যেন হয় তার ব্যবস্থাও করেছেন। তবুও চাপা একটা সূক্ষ্ম যন্ত্রণা তার ভেতরে বিদ্যমান।
নীরার পাছে কারোর সাথে মন দেয়া নেয়া সেরে ফেলে এটা তিনি চান না৷ কন্যার বিয়েটা তিনি নিজের মনের মতো করে দিতে চান। তবে মেয়েটা এত জেদি, আর ঠান্ডা স্বভাবের যে তিনি মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ সমীহ করে কথা বলেন। বুঝতে পারেন না ঠিকঠাক। কোনো বাড়তি আবদার নেই, গলা উঁচিয়ে কথা বলে না, তবুও যেন বিয়ের কথাটা বলাটা তার কাছে কঠিন মনে হয়। কারণ এর আগে একবার কথা উঠতেই মেয়ে চার মাস বাসায় আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। নিলয় আর ওর বাবার সাথে আবার খুব সহজ। ওদের দুইজনের সাথে আলাপ করে নীরাকে রাজি করাবেন বলে ভেবে নিলেন৷
***
ভোর হতেই আফনান ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেড়িয়ে এলো। ভোরের আলো ফুটছে চারপাশে। গেটের কাছে এসে একবার বাড়িটার দিকে ঘুরে তাকাল সে। ঠিক তখনই চোখাচোখি হলো নীরার সাথে। আফনানের মনে হলো মেয়েটা যেন ওরই পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
রাতে একবার ওর সাথে কথা বলবে বলে ইরাকে জানিয়েছিল ইচ্ছের কথাটা।। কিন্তু নীরা এলো না। শরীর খারাপের অজুহাতে আসেনি। তাই কথা বলা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। তবে একবার দেখেছে সায়মন আর শাফিনের সাথে কথা বলতে বাগানে।
শাফিন ওর কিছু একটা দেখাচ্ছিল, নীরা স্মিত হাসছিল আর সায়মনের চোখে ছিল একরাশ মুগ্ধতা। আফনান ছাদ থেকে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল নির্নিমেষ। এরপর শাফিন যখন ভেতরে চলে গেল, তখনও দুজন আরও কিছুক্ষণ কথা বলল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আফনানের তখন চিৎকার করে জীবনানন্দ আওড়ানোর ইচ্ছে হচ্ছিল,
"সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা :
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে - আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়োনাকো আর।
কী কথা তাহার সাথে? - তার সাথে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ।"
ওর সেই নিঃশব্দ চিৎকার নীরার কান অব্দি যায় না৷ বুকের গহীন প্রকোষ্ঠ থেকে উৎসারিত ওর অভিমান ভরা আকুতি আবারও সেই চোরাকুঠোরীতেই বন্দী হয়ে যায়। তবে তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাতেই অন্তত একবার স্বার্থপর হবে, একটাবার নীরাকে নিজের হৃদয়ের কথাটা বলবে। কিন্তু ওর সাথে কথা বলার জন্য কোনো অবসর মেয়েটার হলো না।
এখন যখন সূর্য আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, পৃথিবীতে একটু একটু করে আলো ছড়াচ্ছে, আফনানের ভেতরটায় তখন সূর্য নেই। ঘুটঘুটে কৃষ্ণপক্ষ রাত সেখানে।
বাড়ির সকলের ঘুম ভাঙিয়ে আফনানের নীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো, "নীরা, একবার আমার সাথে দেখা করে একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবি? আমাকে ছাড়া তুই আর কাউকে ভালোবাসতে পারবি কোনোদিন?"
কিন্তু সে-ও হয় না, কারণ নীরা ততক্ষণে ভেতরে চলে গেছে। ভালোবাসার যন্ত্রণার মতো দূর্বিষহ যন্ত্রণা বোধহয় আর পৃথিবীতে নেই। আফনান বিড়বিড় করে বলল,
"এই বুঝি ভালো হলো। পৃথিবীর সব নাকি ফিরে ফিরে আসে। আমারও ফিরে এলো, তোকে যে কষ্ট এককালে দিয়েছিলাম, তা সুদ সমেত ফেরত এলো।"
বারান্দায় দাঁড়ানো মানবীর ছবিটা বারবার আফনানের হৃদয়পটে ভেসে উঠতে লাগল। সে জানে ওর জন্যই নীরা দাঁড়িয়ে ছিল, ওকে দূর থেকে অগোচরে বিদায় জানাবার জন্য। সে রাতে একটা চিঠি লিখে ইরাকে দিয়ে এসেছে গন্তব্যে পৌঁছে দেবার জন্য।
চিঠিটা কি সে খুলে দেখবে? নাকি ঠাঁই হবে ডাস্টবিনে?
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আজও একটা কবিতা মাথায় হুট করে উঁকি দিয়ে গেল,
"কাছে যাওয়া বড্ড বেশি হবে,
এই এখানেই দাঁড়িয়ে থাকা ভালো;
তোমার ঘরে থমকে আছে দুপুর,
বারান্দাতে বিকেল প'ড়ে এলো।"
কাছে যাওয়া আসলেও কি বেশি হয়ে যেত! আফনানের মনে হলো, সে সেঞ্চুরির সম্ভাবণা জাগিয়ে আউট হয়ে এইমাত্র প্যাভিলিয়নে ফিরে এলো, নিদারুণ হার হলো ওর। প্রতিদ্বন্দ্বী সায়মন তখনও ক্রিজে আছে অপরাজিত। বিজয় না ছিনিয়ে সে থামবে না।
বড্ড ব্যর্থ মনে হলো নিজেকে আফনানের। জীবনের এই খেলায় সে নিদারুণ ভাবে হেরে গেল আজ৷
……..
(ক্রমশ)
#অতঃপর_তাহারা বইটই'তে প্রকাশিত হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল সবাইকে।
(১৯ মে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। তাই আজকের পর কিছুদিনের বিরতি। পরীক্ষার পরে আপনাদের আগ্রহ বেঁচে থাকলে আবারও ফিরব ইনশাআল্লাহ। আমার জন্য দোয়া করবেন।)
ব্যবহৃত কবিতা ১- আকাশলীনা - জীবনানন্দ দাশ
কবিতা দুই - বুদ্ধদেব বসু