#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১২.১)
নুসরাত জাহান লিজা
"নীরা,
তোকে আমার একটাই কথা বলার ছিল। খুবই ছোট্ট একটা কথা, কিন্তু তাতেই পুরো আমিটাই আটকে আছি। না বুঝেই তোর ফেলা ছিপের বড়শী গলায় বিঁধে গেছে। কথাটা না বলা পর্যন্ত আমার মুক্তি নেই। আমি জানি তুই ইচ্ছে করেই আমাকে এড়িয়ে গেলি। এতে যদি তুই সুখে থাকিস, তবে আমি সেই ছোট্ট অথচ অপরিহার্য কথাটা বলব না। যা গোপনে আছে, তা অন্তঃপুরেই থাকুক নাহয়। তবে আমাকে এড়িয়ে যেতে গিয়ে যদি তোরও বুকে টনটনে ব্যথা হয়, একবার শুধু আমায় জানাস, আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, ছুটে চলে আসব তোর কাছেই। না বললেও তুই বুঝতে পেরেছিস, জানি। তোর উত্তরটাও জানি হয়তো। তবুও বুকে আশার হিমালয় জমিয়ে রাখলাম।
গতকাল তোকে নিয়ে ভীষণ মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন, বাস্তব সবজায়গায় তোর অবাধ বিচরণ ইদানিং। তুই যদি পিছু না ডাকিস কখনো, তবে সেই স্বপ্নটুকু অন্তত আমার সাথে থাকবে। সেটা তুই হাজার চেষ্টা করলেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবি না। ওটুকু অনধিকার চর্চার দোষ আমি মাথা পেতে নিলাম। যা ইচ্ছে সাজা দিস।
জানি, ভালো থাকবি। এলেবেলে বকবক শুনে বিরক্ত হলে চিঠিটা আগুনে পুড়িয়ে ছাঁইগুলো শূন্যে উড়িয়ে দিস।
ইতি,
পেয়েও হারিয়ে ফেলা হতভাগ্য আফনান।"
নীরা ঘরের দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে বিছানায় বসে চিঠিটা অত্যন্ত মন দিয়ে পড়ল, পরপর তিনবার। যেন পুরো চিঠিটা আত্মস্থ করে নিল সর্বান্তকরণে।
এরপর ফ্যানটা বন্ধ করল। জানালা ভালো করে এঁটে নিল। কয়েল ধরাবার জন্য একটা দিয়াশলাই ছিল ওর কাছে। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে রাখল। চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরে আরেকবার সাদা কাগজের কালো অক্ষরগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় আফনানের দেয়া প্রথম চিঠিটার একটা প্রান্ত সেঁধিয়ে দিল। টুপ করে আগুন ধরে গেল সেখানটায়। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো চিঠিটায়।
নীরার হৃদয়ের ছাঁইচাপা অগ্নিকুণ্ড যেন লেলিহান দাবানল হয়ে আফনানকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছিল। কেমন পৈশাচিক এক আনন্দ হচ্ছিল নীরা, কেমন বিষাদ মুড়ানো সুখ ওকে তৃপ্তি দিচ্ছিল। জ্বলন্ত চোখে সে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল সেই সুখ।
ভেবেছিল, এবার ওর প্রতিশোধ চরিতার্থ হলো। ষোলকলা পূর্ণ হলো বুঝি। কিন্তু ভালোবাসা আর ঘৃণার প্রতিশোধ যেন একটা ঠিক একটা শাঁখের করাত। ওই প্রান্তে পুড়িয়ে যে সুখ, তাতে এই প্রান্তও যে জ্বলে খাঁক হয়ে যায় তা নীরার জানাই ছিল না আজকের আগে।
যে মুহূর্তে চিঠিটা ভস্মীভূত হলো, সেই মুহূর্তে ছাইগুলোকে মনে হচ্ছিল নিজের ভালোবাসাকে আপন হাতে দাহ করল সে। আচমকা বুক জুড়ে নীল নীল ব্যথার টনটনে এক অনুভূতি ওকে গ্রাস করল। ছাই উড়িয়ে দিতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠল নীরা।
তবে সে পিছু ডাকবে না, কিছুতেই না। কখনোই না। ওর মানসপটে হানা দিল দুঃস্বপ্নের শুরুর দিনটা, যখন ওর মনে জোয়ার তুলেছিল আফনান। যার জন্য বোকার মতো ভেসে যেতে চেয়েছিল নীরা।
..........
#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১২.২)
নুসরাত জাহান লিজা
নিলয়ের বন্ধুদের যখন এই বাড়িতে আনাগোনা শুরু হয়, তখন আদ্যোপান্ত এক কিশোরী মেয়ে নীরা। এই বাড়ির ছেলেরা বাদে অন্য কোনো ছেলেদের সাথে সংশ্রব ছিল না। পড়ত গার্লস স্কুলে। ওই বয়সে স্বভাবতই নীরার বন্ধুদের মধ্যে প্রেম নিয়ে নানারকম ফ্যান্টাসির জন্ম হচ্ছিল। কয়েকজন তো বয়েজ স্কুলের ছেলেদের সাথে চুটিয়ে প্রেমও করছিল। ওরও তখন প্রবল ঝোঁক মাথায় চেপে বসেছিল। কিন্তু রাস্তাঘাটে যারা কখনো সখনো এগিয়ে এসে কথা বলতে চাইত, নিজের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে তাদেরকে সে ভাবতে পারত না।
সে-বার নাইনের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পর কিছুদিন বন্ধ ছিল স্কুল। ওদের দোতলার বারান্দা থেকে বাইরের ঘরটা স্পষ্ট দেখা যেত। ছাদ থেকে পুরোপুরি দৃষ্টিসীমায় পুকুর পাড়। চার-পাঁচজন অপরিচিত মানুষ আসত নিলয়ের সাথে। ইচ্ছেমতো শিকারে যেত, রাতে বাড়ির ওই ঘরটার ছোট্ট খোলা ছাদে তুমুল আড্ডা চলত, গিটার বাজিয়ে সমবেত স্বরে গান হতো, ঝালমুড়ি ছিল সেই আড্ডার অনুসঙ্গ। তখনই নীরার আটকেছিল একটা ছেলেকে দেখে। হালকা নীল আর খয়েরী রঙের দুটো শার্ট পরত সবসময়। কিছুটা কুঁচকানো থাকর ইস্ত্রি না করার কারণে। তবুও নীরার মনে হতো ওই রঙটা বোধহয় সেই ছেলেটার জন্যই তৈরি হয়েছিল। পুকুরপাড়ের আড্ডাতেই কেবল ছেলেটা খানিকটা নিষ্প্রভ ছিল। একমনে ছিপ ফেলে অপেক্ষা করত। সৌম্য চেহারায় কী যেন একটা চৌম্বকীয় শক্তি ছিল, যা প্রবলভাবে আকৃষ্ট করত ওকে। নিলয়ের কাছ থেকে জেনেছিল ছেলেটার নাম আফনান।
নীরার বাবা সবসময় বলতেন, "আমি জানি আমার ছেলেমেয়েরা ভুল করবে না। এতটুকু বিশ্বাস আমার তাদের প্রতি আছে।"
তাই তেমন বিধিনিষেধ ছিল না কোনোকিছুতেই। নিলয়ের সাথে গিয়ে সে পরিচিত হয়ে এসেছিল তার বন্ধুদলের সাথে। ওরাও প্রত্যেকে ভীষণ বন্ধুসুলভ ছিল যে নীরাও খুব সহজেই ওদের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল।
পরেরবার নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার পরে যখন তারা আবার এসেছিল, নীরা আফনানকে চেপে ধরে সে বড়শী দিয়ে মাছ ধরতে শিখবে। প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও পরে সাচ্ছন্দ্যে রাজি হয়ে যায়। প্রথম দিকে সে কেবল আফনানকেই দেখত। ঘামে ভেজা মুখটা যত্ন করে ওড়না দিয়ে মুছে দেবার লোভ হতো ভীষণ। মনে হতো তারপর আফনান প্রশ্রয়ের সুরে হয়তো বলবে, "এটা কী হলো?"
নীরা ভুবনমোহিনী হেসে বলত, "তুমি আমাকে মাছ ধরা শেখাচ্ছ, এটা তার পারিশ্রমিক।"
"এত কষ্টের এই যৎসামান্য পারিশ্রমিক?"
"বা রে, আমার ভালোবাসাটা বুঝি ঠুনকো?" অভিমানী গলায় বলে দূরে গিয়ে বসে থাকবে, আর আফনান তখন ওর অভিমান ভাঙাবে। কিন্তু কিছুই বলা হয় না। আফনানের ঘার্মাক্ত মুখ দখিনা বাতাসে শুকিয়ে যায়। পাছে ধরা পড়ে যায়, সেই ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় নীরা।
ওর মনে এরকম নানা দৃশ্যপটের জল্পনার আঁকিবুঁকি চলতে থাকে। বেলা শেষে খেলা ভাঙার মতো নিলয়ের বন্ধুরা যার যার নিজস্ব গন্তব্যে ফিরে যায়।
নীরার জন্য তখন সময়টা অসহনীয় প্রতীক্ষার। এমনিতে যখন হুটহাট তারা আসত, তখন ওর সাথে কারোর দেখা হতো না। সেই আবারও মাস ছয় সাত মাস পর নতুন করে নতুন আয়োজনে তারা হাজির হতো। নিলয় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেল, আফনানও। তখন নীরার সামনে এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততা। তবুও সে আফনানের সাথে কথা বলতে গেল।
নিলয় যেমন কাঙ্ক্ষিত জায়গায় চান্স পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত তেমনটা যেন আফনানের মধ্যে তখন ছিল না একেবারেই। অন্যবারের চেয়ে ভীষণ মৃয়মান মনে হচ্ছিল। কী হলো মানুষটার, কয়েকবার প্রশ্ন করেও উত্তর মিলল না। পরে নিলয়ের কাছে শুনল আফনানের মায়ের কী যেন অসুখ করেছে৷ চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ওদের পারিবারিক অবস্থার কথা শুনে সেদিন ছেলেটার জন্য এত কষ্ট হয়েছিল, যে সেদিন পড়তে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল নীরা৷
মঈদুল পর্যন্ত এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কী হয়েছে তোর মা? কেউ বকেছে? কেউ কিছু বলেছে?"
নীরা তবুও আকুল হয়ে বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে কেঁদেছে। বাবাকে বলেছে, "কিছু হয়নি বাবা। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। কেন, জানি না।"
মঈদুল সেদিন বেশ কিছুক্ষণ মেয়ের পাশের চেয়ারে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।
নীরার কিছু করতে ইচ্ছে করছিল আফনানের জন্য। নামাজে দোয়া করেছে তার মায়ের সুস্থতার জন্য। হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটার মুখ অমন ম্লান হলো বলেই বুঝি ভালোবাসা হু হু করে বাড়ল। নীরা সেই কৈশোরকে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করল, ওই হাসিমুখ সে সারাজীবন দেখতে চায়। ঘুম ভেঙে প্রতিদিন ওই সৌম্য মুখটা চোখের সামনে চায়৷
নীরার গত জন্মদিনে ছোটচাচা একটা সোনার চেইন উপহার দিয়েছিলেম, সেটা খুলে নিয়ে সে গিয়েছিল হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে নিলয় বাবাকে বলে টাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। তখনই যেন নীরা ভীষণভাবে চাইল আফনানকে। নিলয়ের বন্ধুদের নতুন নতুন প্রেমের গল্প শুনে মনে হলো, আফনান নিশ্চয়ই ওর জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবে না। যা বলার তা দ্রুত বলতে হবে। নইলে যদি হারিয়ে যায়।
তাতেই সে ডুবল। সেইদিনের কথাটা নীরা আজ আর মনে করতে চাইল না। তবুও মন তো প্রবোধ মানে না। চিঠির ছাই ওর হাতে লেগে আছে এখনো। থাকুক, আফনান ওকে বয়স নিয়েও জ্ঞান বিতরণ করেছিল। নীরার বয়স হয়তো বেড়েছে, কিন্তু বয়সের ব্যবধান তো মেটেনি। যখন সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে আফনানকে চেয়েছিল, তখন সে আসেনি। এখন চাইলেই ওকে ধরে ফেলা যাবে! এটা যদি ভেবে থাকে তবে সে ভুল। নীরা মোটেও সহজলভ্য কিছু নয়।
***
"মা ফোন করেছিল। আমাকে যেতে বলছে একেবারে।" ওষুধ খেয়ে বিতৃষ্ণ মুখে বলল শায়লা, তবে মুখে হাসি।
"তুমি কি বলো?" শায়লার কথায় রবিন প্রশ্ন করল।
"মা বলল, মেয়েদের প্রথমবার প্রেগন্যান্সির সময় মায়ের কাছে থাকতে হয়।"
"সেটা তো যত্নের জন্য। এখানে কি তোমার যত্ন হচ্ছে না ঠিকঠাক?"
"হচ্ছে, কিন্তু তুমি তোমার কাজকর্ম, ব্যবসা ফেলে সারাদিন বাসায় বসে থাকো, আমার খারাপ লাগে।"
রবিনের ব্যবসায় বড়সড় একটা ঝামেলা চলছে। এটা এই অবস্থায় স্ত্রীকে বলে চিন্তায় ফেলতে চায় না। তাই সে বলল,
"কেন? আমি পাশে থাকলে তোমার ভালো লাগে না? চাও না?"
"নিজের সৌভাগ্যকেও মাঝেমধ্যে ঈর্ষা হয়। আমি কী করে তোমার পেলাম বলো তো?" গর্বিত একটা ভঙ্গি শায়লার মুখাবয়বে ফুটে উঠল।
"তাহলে?"
"আমিও তোমাকে নিয়ে অনেক ভাবি বুঝলে! তোমার জন্যই..."
"আফনানের কী খবর বলো তো?" প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে শ্যালকের কথা জিজ্ঞেস করল রবিন। নিজের স্ত্রীকে তো চেনে সে, নইলে দেখা যাবে আবেগপ্রবণ হয়ে কান্নাকাটি করতে শুরু করবে।
শায়লা সহসা মনে পড়েছে এমনভাবে বলল, "ওর কথা আর বলো না। আমি ভীষণ রাগ করেছি এবার। সেই এসে আমাকে দেখে গেল, এরপর বন্ধুর বিয়েতে গেছে। মা বলল আজ নাকি ফিরবে।"
রবিনের তিনটা শো-রুম রয়েছে স্থানীয় শপিং কমপ্লেক্সে। বছর দুয়েক হয় এই এলাকায় এসেছে ওরা। এতদিন কোনো ঝামেলা না হলেও গত কয়েকদিন ধরে হু ম কি - ধা- ম- কি আসছে চাঁ /দা/ র জন্য। সে দিতে রাজি নয়। এলাকার প্রভাবশালী লোকের চ্যালাপেলা এটা নিয়ে ঝামেলা করছে। রবিনের কাছে নিজের সততাটুকু আগে। সে সৎভাবে ব্যবসা থেকে উপার্জন করছে, কেন শুধুশুধু অন্যকে তার ভাগ দেবে। জিডি করেও লাভ হয়নি। ক্ষ ম তার কাছে কখনো কখনো সততা বড্ড অসহায় হয়ে যায়। তবে সে চায় মীমাংসা হোক, কিন্তু এভাবে আপোষ করতে চায় না।
........
(ক্রমশ)
নতুন চরিত্রগুলো কিন্তু ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ।