#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১৫)
নুসরাত জাহান লিজা
আরিফ খানের আড্ডাখানা যেটা তার সাঙ্গপাঙ্গের কাছে অফিসঘর হিসেবে পরিচিত, সেখানে এসেছে আফনান। উচ্ছৃঙ্খল, ব খা টে, বিপথগামী কিছু পোলাপান হচ্ছে এই আরিফের সাগরেদ। ভেতরে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। বসার কোনো জায়গা খালি নেই।
"তুমি কে? ডোনেশনের জন্য আসছো? তাইলে পরে, এখন সময় নাই।"
আফনানের মেজাজ চটে গেল, "আমি ডোনেশনের জন্য আসিনি। আপনার সাথে কথা আছে।"
আফনানের দৃঢ় গলায় ঘরের সবকটি লোক টানটান হয়ে বসল। এই ভঙ্গিতে বোধহয় কেউ এই লোকের সাথে কথা বলে না। তোয়াজ শুনতেই অভ্যস্ত।
"এই, গলা নামায়ে কথা বলো ভাইয়ের সাথে। বেয়াদবি আমরা বরদাস্ত করব না।"
আফনান জানে এখন মাথা গরম করবার সময় নয়। রবিনের খোঁজ এরা জেনে থাকলে তাতে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। তাই হাত মুঠো পাকিয়ে নিজেকে সংযত করল সে।
"রবিন কোথায়?"
আরিফ বলল, "রবিন কে?"
"যার শো-রুমে গিয়ে হুমকি ধামকি দিয়ে এসেছেন।" শান্ত গলায় বলল আফনান।
"এই ছোকরা, তোমার কি আমারে অনুসন্ধান অফিস মনে হয়? নাকি বাংলাদেশ বেতারের নিখোঁজ সংবাদ? আমি কেমনে জানব সে কই?"
"দেখুন, আপনার হুমকির পরেই সে নিখোঁজ। আপনাকে জিজ্ঞেস করলে আর কোথায় করব?"
"আমার এত খারাপ দিন আসছে যে, দুই পয়সার দোকানদাররে নিয়ে পড়ে থাকব?"
"দুই পয়সার দোকানদারের উপার্জনে কেন লোভ করেছিলেন তাহলে?"
আফনান শেষ পর্যন্ত আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না নিজেকে। এমনিতে সে ভীষণ সহনশীল। কিন্তু 'অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে তৃণ সম দহে।' এই মূলমন্ত্রে সে বিশ্বাসী। চোখের সামনে তাই অন্যায্য কিছু হতে দেখল ওর ঘাড়ের রগ ত্যাড়া হয়ে যায়।
কথাটা বলার সাথে আরিফের দুজন সাগরেদ উঠে দাঁড়িয়েছিল, বেপরোয়া ভঙ্গি তাদের হাবভাবে।
"মুখ সামলাইয়া কথা কও।" তাদেরই একজন গর্জে উঠে শাসালো আফনানকে।
আফনান সেই শাসানো গায়ে না মেখে বলল, "রবিন আমার বোনের হাজব্যান্ড। সে গতকাল থেকে নিখোঁজ। আমি আবারও জিজ্ঞেস করছি, বলুন রবিন কোথায় আছে?"
আরিফ খান এবার রণহুংকার ছাড়ল, "অনেকক্ষণ থেকে তোর এসব সহ্য করতেসি। কারোর পাখা কী করে ছাঁটতে হয় তা আনি খুব ভালো করে জানি। ভালোই ভালোই ওয়ার্নিং দিতেসি, এই মুহূর্তে বাইর হ এইখান থেকে। নাইলে তোর কপালে দুঃখ আছে।"
"ভাইয়ে কিন্তু এহনতুরি শান্ত আছে।"
"রবিনের খোঁজ চাই আমি। তাকে কোথায় রেখেছ বলো। আমি ভালোই ভালোই চলে যাই।"
"এই ঘরে কোনো জঞ্জাল চাই না। সাফ কর তো।"
তাদের তথাকথিত ভাইয়ের খেদমতে কে আগে আসতে পারে, তাই নিয়ে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছিল।
একজন এগিয়ে এসে আফনানের কলারে হাত দিতে গেল, আফনানের রিফ্লেক্স ভালো। সে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে লোকটার হাত চেপে ধরল।
"এসবের প্রয়োজন হবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি। তবে রবিনের হদিস কিন্তু আমি খুঁজে বের করবই। এটুকুই বলার ছিল।"
ভেতরে ভাঙচুর হলেও নিজেকে শক্ত রেখে দৃপ্ত পদক্ষেপে বেরিয়ে এলো আফনান। পেছনে কতগুলো ক্রোধান্বিত বিস্মিত দৃষ্টি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করল। মৌঁচাকে ঢিল ছুঁড়েছে, কিছু মৌমাছির কামড় তো খেতেই হবে। তবে একলা পারবে না সে। এমন সংঘবদ্ধ চক্রের বিপরীতে সে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে।
কী করা যায় ভাবছে আফনান। তবে এখন ওর মাথায় সবকিছু ছাপিয়ে রবিনের চিন্তা। কোথায় আছে সে! এরমধ্যেই খারাপ কিছু ঘটে যায়নি তো! আশঙ্কায় দুলে উঠে ওর সমস্ত মন।
***
আনিকা আর নিলয়ের দিনকাল চমৎকার কাটছে। হানিমুনে যাবার প্ল্যান করছে। আনিকার ইচ্ছা নেপালে যাবার, ওদিকে নিলয় চাইছিল আপাতত দেশের মধ্যেই যেতে। কারণ ওর ছুটি আর বেশিদিন নেই। বিয়ের পরে এটা নিয়ে দুজনের খানিকটা মন কষাকষি চলছে।
"তুমি আগেও খুব বেশি সময় দিতে পারতে না৷ এখনো সেই একই গল্প। বিয়ের জন্য আরও কিছুদিন ছুটি ম্যানেজ করতে পারলে না?"
"আশ্চর্য! বিয়ে কি খালি আমি একা করেছি নাকি! সবার বিয়ের জন্য কি মাসভর ছুটি দেবে নাকি!"
"তোমার অজুহাত ধুয়ে তুমি পানি খাও।"
"ঠিক আছে। ধুয়ে দাও।" হেসে বলল নিলয়।
আনিকা আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। তবে সেটা প্রকাশও করল না। বলল,
"তা মিস্টার জার্নালিস্ট, এখন তাহলে হানিমুন প্ল্যান আপাতত থাকুক। পরে যখন তুমি টাইম ম্যানেজ করতে পারবে, তখন একেবারে যাবে। সারাজীবন দুইবার হানিমুনে গেছ আমার সাথে, এই খোঁটা শুনতে পারব না।"
"আমি কবে খোঁটা দিলাম?"
"এখন পর্যন্ত দাওনি। তবে দিতে কতক্ষণ! হাজব্যান্ডরা এরকমই হয়।"
"কয়টা বিয়ে করেছ? কয়দিন হলো বিয়ে হয়েছে আমাদের। আর তুমি হাজব্যান্ডের উপরে পিএইচডি করে ফেলেছ।"
"সব এক্সপেরিয়েন্স হাতে-কলমে হয় না মশাই, এটা হলো আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।"
"ভালো ভালো। দূরদর্শী একটা বউ আমি পেয়েছি।"
"হ্যাঁ, তা তো পেয়েছই।"
"তোমার ভাইভা কবে?"
"সতেরো তারিখ। আর মাত্র দুই সপ্তাহ। টেনশন হচ্ছে।"
"নো টেনশন। তোমার জবটা হবে দেখো।"
"পোস্টিং যে কই দেবে!" নিজের এই শঙ্কাটা প্রকাশ করল না আনিকা। আগে পরীক্ষাটা হোক। টিকলে পরে না হয় দেখা যাবে!
***
নীরা বাবাকে চা দিয়ে বেরুচ্ছিল। রোকেয়া তখন ঘরে এলেন।
"তোর সাথে একটু কথা আছে নীরা।"
"বলো মা।"
"বকুলের ভাসুরের ছেলেটা সায়মন। আজ চলে যাবে। ওর সাথে তোর কথা হয়েছে?"
"কেন মা?" সন্দিগ্ধ গলায় বলল নীরা।
"তেমন কিছু না। ছেলেটা বেশ ভদ্র। আদবকায়দা জানে। খুব মিশুক।"
"হঠাৎ করে তুমি ফুপুর ভাসুরের ছেলের টেস্টিমনিয়াল আমাকে দিচ্ছ কেন মা?"
"এভাবে কথা বলিস কেন?"
"মা, শোনো, কিছু বলার হলে সরাসরি বলো। পাঁচ কিলোমিটার দূরে যাবার জন্য একশো মিটার ঘুরপথে যাওয়ার অভ্যাস বাদ দাও।"
রোকেয়া আর কথা বাড়ালেন না। মেয়ের সাথে কথা বলতে তিনি মাঝেমধ্যে খানিকটা ভয়ই পান। তারচাইতে বরং বকুল বা ওর বাবাকে দিয়েই কথা বলাবেন। বাবার কথা মেয়ে ফেলতে পারে না।
তবে সায়মনকে তার মেয়ের জামাই হিসেবে দারুণ পছন্দ হয়েছে সবদিক থেকে। ছেলেটা নীরাকে পছন্দও করেছে। তিনি কিছুতেই এই পাত্র হাতছাড়া করতে চান না।
............
(ক্রমশ)
আমি বড় করে পর্ব লিখতে চাই, কিন্তু স্কুল থেকে বাসায় এসে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে আমাকে যে আপনাদের জন্য লিখতে হবে, সেই তাড়নাটা আপনাদের কাছ থেকে পাই না। লাস্ট দুই পর্বের রেসপন্স দেখে আপনারাই বলুন তো আমার কী করা উচিত? আপনাদের উপরে ছেড়ে দিলাম এটা।