ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

১৬তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১৬)

নুসরাত জাহান লিজা

আরিফ খানের আড্ডাখানা থেকে বেরিয়ে শফিককে সাথে নিয়ে থানায় এলো আফনান। ওসি শাফকাত আলী নেই৷ একজন কনস্টেবল জানালো তিনি আসছেন। ওরা দু'জন থানার সামনের চায়ের দোকানে এসে বসল।

আফনানের মাথা ঝিমঝিম করছে। রাতে একফোঁটা ঘুম হয়নি। শায়লার অবস্থা শোচনীয়। মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না৷ জোর করেও খাবার মুখে তোলা যাচ্ছে না। আয়েশা বহু কষ্টে দুটো খাইয়ে দিয়েছেন।

"তোর পেটে একজন আছে। তার ক্ষতি করবি?" মা'র বলা এই কথাটাতে কিছুটা কাজ হয়েছে।

সকালে বেরুবার আগে আকুল হয়ে শায়লা বলছিল, "রবিনকে নিয়ে ফিরবি তো!"

আফনান বোনের মাথায় হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তার এই বোনটা অভিমানী হলেও বেশ বুদ্ধিমতী। স্বজন হারানোর আশঙ্কা মেয়েটাকে কেমন দিশেহারা বানিয়ে দিয়েছে। উদভ্রান্ত দৃষ্টি, মাঝেমধ্যে নিস্প্রভ হয়ে যায়। ভাই হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে।

শাফকাত আলীর সাথে দেখা হতেই তিনি জানালেন কাজ শুরু করেছেন তারা। তবে মর্গে নতুন একটা বেও য়া রি শ লা শ এসেছে। সেটাকে যদি তারা সনাক্ত করতে পারে।

আফনানের গলার স্বর রূদ্ধ হয়ে এলো। বুকে দমচাপা ব্যথা হলো। সর্বান্তকরণে প্রার্থনা করল, "হে আল্লাহ। ভেতরে যেন রবিন না থাকে।"

শায়লা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। বিয়ের পর থেকেই আফনান দেখেছে শায়লা আর রবিন একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারে না। কাজের সময়টুকু ছাড়া কোথাও গেলে একসাথে যায়। সামান্য জ্বর হলেও অন্যজন অধীর হয়ে পড়ে। কী করে সহ্য করবে!

নতুন প্রাণের আগমনী বার্তায় দুজনে মিলে কত স্বপ্ন বুনেছিল অনাগত প্রাণকে ঘিরে। সেই স্বপ্ন…

আর ভাবতে পারে না আফনান।

"কই, আসুন!"

এবার সচকিত হলো আফনান। লা শ দেখে এতক্ষণ আটকে রাখা দম ছাড়ল। না, এটা রবিন নয়।

"রবিনের সমস্ত ডিটেইলস আমাদের দেবেন।"

"আপনারা খুঁজে বের করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন তো!"

"শুনুন আফনান, আমরা প্রফেশনাল জায়গা থেকে কাজ করি। আপনি যার নামে জিডি করেছেন, তাকে বড়জোর নর্মাল জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি। এরবেশি জানি না। নিশ্চয়তা দিতে পারব না।"

"আপনি এসব খোলাখুলি আমাকে বলছেন কেন?"

"কারণ একজন মানুষ হিসেবে আমারও কিছু মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট আছে।"

শাফকাতের কথার তাৎপর্য কতটা আফনান বুঝল জানে না। তবে এটুকু বুঝল, তিনি যতই আন্তরিক থাকুন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার আসলেও কিছু করার নেই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে শায়লার বাসায় ফিরবে কিনা ভাবছিল, কিন্তু সাহস হলো না আফনানের। শফিককে কাজে পাঠিয়ে দিল। রবিন আপাতত নেই, কিন্তু ওর কাজগুলো যেন পড়ে না থাকে।

আফনান রাস্তায়, ফুটপাতে এলোমেলো হাঁটল বহুক্ষণ। হঠাৎ মনে হলো কেউ ওকে অনুসরণ করছে। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে হদিস পেল না। কতক্ষণ পরে ওর মোবাইল বেজে উঠল,

"দুই ঘণ্টা সময় দিলাম। এরমধ্যে কেস না তুইলে নিলে তোর খবর আছে।"

হুমকি, এই তো। এভাবেই গর্ত থেকে বেরুবে ওরা। তবে ওদের সাথে সে একা লড়তে পারবে তো!

সহসা ওর মনে হলো নিলয়ের কথা। এই মুহূর্তে ওর মতো একজন সাহসী ক্রাইম জার্নালিস্টের সাহায্য ওর সবচেয়ে দরকার। কাজের সূত্রেই এসব ফিল্ডের অনেক প্রভাবশালী লোকজনের সাথে ওর পরিচিতি আছে। তাদের মাধ্যমে যদি কিছু করা যায়।

মিডিয়া অব্দি যদি এই খবরটা পৌঁছানো যায়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। রবিনের ইতোমধ্যে খারাপ কিছু করে ফেলেনি তো ওরা! নইলে এতটা ডেস্পারেট হয়ে উঠেছে কেন ধামাচাপা দিতে! চকিতে মনে এমন ভাবনা এলেও প্রাণপণে তা সরিয়ে দিল আফনান৷ কোনোধরণের দুর্ভাবনা সে আগ বাড়িয়ে প্রশ্রয় দিতে চায় না।

রবিনের নিখোঁজ হবার জন্য যারা দায়ী, তাদের টেনে বের করতে পিছপা হবে না আফনান। তাতে যা হয় হোক, সে পরোয়া করে না। জীবনে বহুবার সে পরাজিত হয়েছে। এবার আর চায় না।

***

সায়মন ফেরার আগে একবার নীরার সাথে দেখা করবে ভেবেছিল। সেই মনোভাব বকুলের কাছে ব্যক্ত করল সে।

"তোমাদের আদরের পাত্থর কোথায়? তার দর্শন কি একবার পাওয়া যাবে?"

বকুল হেসে বললেন, "সব পাথরের সংস্পর্শে কী আর ব্যথা হয় রে? কিছু পাথর তো পরশ পাথর হয়! নীরা হলো পরশ পাথর।"

"সেই, আর আমি কী? তার গুণমুগ্ধ ভক্ত। কবে সেই পরশ পাথরের সুমতি হবে আর আমার প্রতি সদয় হয়ে আমার ভাগ্যাকাশের গ্রহ নক্ষত্রের গতিপথ সে পাল্টে দেবে!"

বকুল আলতো করে চাপড় মারলেন সায়মনের হাতে।

"তোর সবেতেই ফাজলামো। পাজি ছেলে!"

"দুষ্টু ছেলের সাথে মিষ্টি মেয়ের কম্বিনেশন হয় শুনেছি। নীরা দেখতে মিষ্টি, কিন্তু পাথর হৃদয়। আমার ক্ষেত্রে হবে দুষ্টু ছেলে প্রস্তর মেয়ের কম্বো। অবশ্য যদি মহারাণীর কৃপা হয়!"

"তা ওই প্রস্তর গলাতে চেষ্টা করতে হয় তো।"

সায়মন হাসলেও এই প্রথম কেন যে শঙ্কা হলো মনে। এত কঠিন কেন মেয়েটা! মাঝেমধ্যে এমনভাবে তাকায় ওর ভেতরে সমীহ জাগানিয়া ভয় হয়! পারবে তো তাকে জয় করতে!

***

ইরা পড়া থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে নিজের মোবাইলটা হাতে নিল। হোয়াটসঅ্যাপে কিছু ছবি এসেছে। নম্বরটা শাফিনের। মন আন্দোলিত হলো।

একটা ছবিতে ক্লিক করতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ওর হাতে বসা প্রজাপতি। সে মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটা এত জীবন্ত হয়েছে। নিজের ছবি দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল।

বাচাল হলে কী হবে, ছেলেটার ছবি তোলার হাত তো দারুণ। নিলয় ভাইয়ার বিয়ের ছবিগুলোও সুন্দর হয়েছে।

উত্তরে ধন্যবাদ লিখতে ইচ্ছে করল না। লিখল,

"ছবি তো সুন্দর হয়েছে। পেমেন্ট না নিয়ে চলে গেলেন যে!"

প্রায় সাথে সাথে উত্তর এলো, "আপনার পছন্দ হয়েছে। ধরে নিন এটাই আমার পারিশ্রমিক।"

"শুনেছিলাম আপনি প্রফেশনালি ছবি তোলেন। সব ক্লায়েন্টের প্রশংসা পারিশ্রমিক হিসেবে নিলে ব্যবসা তো লাটে উঠবে।"

"ভয় নেই, সবার ক্ষেত্রে এই অফার প্রযোজ্য নয় তো। স্পেশাল কারোর জন্য কেবল।"

ইরা ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ভালোলাগার এক টুকরো ফুরফুরে বাতাস হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ভীষণ ভালো লাগল কথাটা। এত অকপটে কেউ এভাবে বলে! এই ছেলেকে সে ভীতু ভেবেছিল!

............

ক্রমশ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন