#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১৮)
নুসরাত জাহান লিজা
"মাথা কাজে লাগাও, সবসময় সেটা গরম করে কাজ হয় না।"
আজমলের কথায় আরিফ উত্তর দিল, "ওইটারেও উধাও করে দেই?"
"আহ্! তাতে আমাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এমনিতেই কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে প্রেসার আসছে। সব তোমার জন্য। এমন কিছু করো, যাতে সাপকেও বশ করা যায় আর লাটিতেও হাত না লাগাতে হয়। টোপ ফেলো। একটা অব্যর্থ টোপ কিন্তু তোমার হাতে আছে।"
আজমল খান এতটাই ঠান্ডা আর নিষ্পৃহ গলায় কথাটা বললেন যে আরিফ কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে।
"বুঝতে পারোনি এখনো?" এবার তার গলায় ছেলে উদ্দেশে মৃদু ভর্ৎসনা।
আরিফ ক্ষণেক চিন্তা করেই তার ইঙ্গিত ধরতে সক্ষম হলো। এভাবে তো সে আগে ভাবেনি। রবিন যে বেঁচে আছে, এই খবর আগে আফনানকে দিতে হবে। এরপর সময় বুঝে কোপ।
আফনানকে যে জাগতিক কোনো প্রলোভনে হাত করা যাবে না, এমনকি জীবন নাশের হু ম কি দিয়েও নয়, এটুকু এই কয়েকদিনে ওরা খুব ভালো করে বুঝে গেছে। তবে যে ওদের হাতে আছে তার জীবনের দাম ওই তরুণের কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে৷
ছেলে যে তার কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছে এতে আজমল খান খানিকটা প্রসন্ন হলেও আরও আগে এটা ভাবেনি কেন ভেবে অনেকটা অপ্রসন্নও তিনি। তার তিলতিল করে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্য, যেখানে প্রাচুর্য আর ক্ষমতা দুইয়ের সহাবস্থান, সেটা তার সন্তান কতটা ধরে রাখতে পারবে, তাই নিয়ে তিনি সন্দিহান।
মায়ের মতো স্বল্প বুদ্ধির হয়েছে তার সন্তান, তার বুদ্ধির ধার এজন্যই পায়নি আরিফ। বিয়ে করার সময় এই জিনিসটা তার মাথায় রাখা উচিত ছিল। অবশ্য স্বল্প বুদ্ধির স্ত্রীর বিনিময়ে শ্বশুরের বাৎসল্যে তিনি আজ এত পাকাপোক্ত ভিত্তি পেয়েছেন পায়ের তলায়। তবে তার উত্তরাধিকার কিন্তু যোগ্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।
***
আফনান ইদানিং ভীষণ ক্লান্তিবোধ করছে। সবকিছু কেমন করে যেন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিলয়ের কল্যাণে মিডিয়া এখনো তৎপর। নতুন ইস্যুতে এই ইস্যু স্যোশাল মিডিয়ার নজরের বাইরে চলে গিয়েছিল, সেটাও পুনরায় জেগে উঠছে। তবুও ঘরের পরিবেশ দেখলে আফনানের মনে হয় সে যেন বৃথাই এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আজ নয়দিন হয়েছে একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষ নিখোঁজ হবার। তার কোনো চিহ্নই যেন অবশিষ্ট নেই। পৃথিবী থেকে মানুষ এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়! কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই?
আজ থানায় এসেছিল। ওসি শাফকাত আলীর সাথে কথা হয়েছে। তারা যে কী করছে, তার-ও কোনো তাল মিল নেই। কেমন গা ছাড়া ভাব তাদের মধ্যে। যেন অন্যদিকের ইশারার অপেক্ষা করছে। অদৃশ্য কারোর অঙ্গুলিহেলন ব্যতিরেকে তাদের সচল হবার কোনো সম্ভাবনা সে দেখছে না।
ওদিকে শায়লাকে ওদের বাসায় নিয়ে যেতে চাইলেও সে সম্মত হয়নি। বলেছে, "মানুষটা কত ক্লান্ত হয়ে ফিরবে বলো তো। তখন আমাকে তো খুঁজবে সবার আগে। আমি ছাড়া ওর তো আর আপন বলে কেউ নেই। আমি এখানেই অপেক্ষা করব।"
অগত্যা সে আর মা শায়লার সাথেই থাকছে।
এরইমধ্যে একদিন ওদের বাবা একদিন এসেছিলেন এই বাসায়। আয়েশাকে কথা শোনাতে এসেছিলেন। মেয়েকে কেন বড় ঘরে বিয়ে দিতে পারেনি, এই নিয়ে। তবে আয়েশা অবশ্য তাকে ছেড়ে কথা বলেননি।
"আমি আমার মেয়ের ব্যাপারে যা ভালো, তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাইরের লোকের কথা শুনতে চাই না।"
"আমি বাইরের লোক? ভুলে যেও না, ওরা আমারও সন্তান।"
"সেই কথা এতদিনে মনে হয়েছে? আসলে আপনি সবসময় আমার ভুল খুঁজতে চেয়েছেন সবসময়। কোনো ভুল হলেই যেন আমাকে খোঁচা দিতে পারেন। তাই আজও আপনি চিন্তিত হয়ে আসেননি, এসেছেন খুশি হয়ে। আমাকে ভুল প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছেন ভেবে। তবে আমি আমার সন্তানদের মানুষ করে তুলতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। তারা সাদা কালো চিনতে পারে। আরেকটা কথা, আমাকে এখন আর তুমি বলবেন না। একজন ভদ্রমহিলার সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলবেন"
মা'য়ের এই দৃঢ়তা আফনানের বড্ড ভালো লাগে৷ এতকিছুর সাথে লড়াই করেও সমস্ত প্রতিকূলতা সত্বেও তিনি কোনোদিন মুহূর্তের জন্য নুয়ে পড়েননি। আফনান মনোবল পায় এতে৷ এই যে ভেঙে পড়া সময়, বিমর্ষতা, সব যেন এক তুরিতে সহস্র ক্রোশ দূরত্বে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সে লড়াই থামাবে না, রবিনের ঘটনায় যারা যারা জড়িয়ে আছে, সবার মুখোশ সে টেনে খুলবে।
এরপর লোকটা হম্বিতম্বি করলেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। শায়লাকে বলেছিলেন,
"তোর মায়ের জন্য তোর আজ এই অবস্থা। তাও তোর ওই মহিলার সাথে গদগদ?"
শায়লা রেগে গিয়ে বলেছিল, "এটা আমার বাড়ি। আমার বাড়িতে আমার মা থাকবে। আপনি চলে যান প্লিজ। খারাপ কিছু বলতে চাই না।"
আফনানকে অবশ্য তিনি ঘাটাবার সাহস করেননি। সে-ও মা আর বোনের জবাবের পরে আর কিছু বলেনি। শুধু তার সাথে বের হবার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছে, "আপনার মিথ্যে কনসার্ন আমাদের দেখাবেন না দয়া করে। আপনি আর কখনো না এলে খুশি হবো। আমাদের জন্য কখনো আপনি ছিলেন না, এখন নেই।"
***
ইরা ফেসবুকে ভীষণ এক্টিভ। পড়ার ফাঁকে একটু ছুতো পেলেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে লগইন করে নিউজফিড স্ক্রল করতে থাকে। সেখানে অবশ্য রবিন নামের একজনের নিখোঁজ হবার খবর সে পড়েছে, কিন্তু খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি৷ আজ নিলয়ের করা রিপোর্ট ওর সামনে এলো। ভাইয়ের প্রতিবেদন ওর খুব ভালো লাগে বলেই দেখছিল। সেখানে আফনানের নাম দেখল। এলাকাটাও ওদের। এরপর সে এই বিষয়ক আরও পোস্ট ঘেঁটে নিশ্চিত হলো, এটা আফনান ভাইয়া। ভেতরে কোথাও যে ধ্বক করে উঠল।
সে ছুটে গেল নীরার ঘরে। নীরা ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে একদমই সময় দেয় না। ওর নাকি ভালো লাগে না৷ হঠাৎ কখনো সখনো মন চাইলে আসে। এসব নাকি ভূতের বেগার খাটুনি। সে যে এসব জানে না, তা ইরা নিশ্চিত।
নীরা তখন নিজের ঘরেই ছিল। কী একটা বই পড়ছিল গভীর মনোযোগের সাথে।
"আপু, তুমি জানো আফনান ভাই…"
বাকিটা বলার আগেই নীরা বই থেকে মুখ না তুলেই স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "তোর পড়াশোনা নেই?"
ইরা বুঝল এভাবে হবে না, অন পয়েন্ট বলতে হবে। নইলে থেমে যেতে হবে।
"নীরা আপু, একজন গু ম হয়েছে, জানো? আফনান ভাইয়…"
এবার নীরা ঝট করে মুখ তুলল, মুখে উৎকণ্ঠার ছায়া পড়েছে।
"কী.."
প্রশ্ন করার আগেই ইরা বলল, "আফনান ভাইয়ার বোন শায়লা আপুর হাজব্যান্ডকে কয়েকদিন ধরে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এসবের মধ্যে পলি টি ক্যাল ইস্যু জড়িয়ে গেছে। আফনান ভাইয়া ওদের বিরুদ্ধে গিয়ে….."
এবার নীরার চোখেমুখে আশঙ্কার ছাপ, জিজ্ঞেস করল, "তুই কী করে জানলি?"
"নিলয় ভাইয়াদের টিভি চ্যানেলের পেইজ থেকে।"
বলেই ওর ফোনটা বাড়িয়ে দিল। নীরা শান্তভাবে দেখল। এরপর প্রশ্ন করল, "নিলয় ভাইয়াকে একটা কল দিতে হবে।"
"আফনান ভাইয়ার সাথে কথা বলবে না? বেচারা একটু স্বস্তি পেত।"
নীরা উত্তর দিল না। চুপচাপ বসে রইল নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে। এই মেয়ের মনে কী চলছে তার থই পাবার সাধ্য ইরার নেই।
***
আফনান এখান থেকে ওখানে, এর কাছ থেকে ওর কাছে ছুটে ফিরছে। শফিককে আপাতত শো-রুমটাই সামলাতে বলেছে সে। নিলয় অন্যান্য ব্যস্ততা সামলে আবারও এসেছিল দু'দিন আগে।
আজ মনে হচ্ছিল কেউ ওর পিছু পিছু আসছে। এই গলিটা নিরিবিলি। ঘুরে তাকাতেই দেখল একটা লোক কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। চেনা চেনা লাগায় এগিয়ে এলো। বয়স ওর থেকে অনেক কম। তাই বলল,
"আমাকে ফলো করছিলে কেন?"
ছেলেটা যেন নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল। এবার গলা উঁচিয়ে ধমকে উঠল আফনান, "কথা বলছো না কেন? উত্তর দাও!"
"আমি, আমি, ওই যে ওই রবিন, তারে আমি দেখছি।"
"কোথায়?" এবার আফনান আরও এগিয়ে এসে ওর হাত চেপে ধরল, "কথা বলবি না? না বললে…"
"আমি আরিফ ভাইজানের ওইখানে কাম করি। ট্যাকার জন্যে। লেখাপড়া বেশি করি নাই৷ তাই এই কাম করি, পেটের দায়ে। কিন্তু চোখের সামনে এসব অন্যায়…"
একটু বলে লোকটা থামল, আফনানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল ক্রমশ।
"উনারে ধইরে আরিফ ভাইয়ের একটা সিক্রেট হাউসে রাখছে। মারধর করতে দেখছি একদিন।"
এবার আফনান উত্তেজিত হলো, "সিক্রেট হাউজ কই?"
"আমি চিনি না। একটা কাজে আমারে নিয়া গেসিল। কিন্তু রাস্তাঘাট কিচ্ছু দেখতে পারি নাই। চোখ বাঁ ইন্ধা নিয়া গেসিল। কয়েকজন ছাড়া কেউই জানে না ওইটা কোন জায়গায়।"
"তুমি সত্য বলছ তার নিশ্চয়তা কী? তুমি যে আরিফের লোক না বিশ্বাস করব কেন?"
"বিশ্বাস না করা আপনের ব্যাপার। কিন্তু আমি গরীব মানুষ। অন্যায় করলেও, ভিতরে এহনও একটা মানুষ বাইচ্যা আছে। আমারে ছাইরা দ্যান ভাই। কেউ দেখলে আমার জান যাইব। ঘরে পরিবার অপেক্ষা করে।"
আফনান এবার আর অবিশ্বাস করতে পারল না। বলল, "তুমি আমাকে আরিফের আস্তানার খোঁজ দিতে পারবে? তোমার ভালো জীবনে আসার পথ আমি করে দেব যদি বেঁচে থাকি।"
"আমি চেষ্টা করমু। আমার মোবাইল নাম্বার।"
"তোমার নাম?"
"মনির।"
একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে লোকটা বিদায় নিল। আফনান এত নিরাশার মাঝে কিঞ্চিৎ আশার আলো পেল যেন৷ না, না, সে বৃথা খড়ের গাদায় সূঁচ হাতড়াচ্ছে না। কিছুটা হলেও আশা এখনো বেঁচে আছে। নতুন উদ্যমে বুক বাঁধল।
***
মনির তখন মহাসুখে আরিফের সাথে কথা বলছিল।
"তোর কথা বিশ্বাস করছে?"
"ভাইজান, আমি ষোলো বছর বয়স থেকে থিয়েটার করছি। কাঁচা অভিনয় আমি করি না। তবে আফনান লোকটা ধূর্ত না। তাই অত প্যাঁচায় নাই। আমার জন্য কাজটা সহজ হইসে।"
"তোর টাকা পায়ে যাবি।"
"ছিঃ ভাইজান! কী বলেন! আপনে খালি আপনার নেক নজর আমার উপরে রাইখেন। আর কিছুই লাগব না।"
***
আফনান রাতে মায়ের সাথে কথা বলছিল। তখনই ওর মোবাইল বেজে উঠল। কিন্তু ধরার আগেই কেটে গেল। মিসড কল সে গুরুত্ব দিল না প্রথমে। তবে হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকটা মেসেজ এলো পরপর।
সেখানে আসা ছবিতে ওর চোখ স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। রবিনের ছবি। হাত পা চেয়ারের সাথে কষে বাঁধা। চোখেও কালাও পর্দা দেয়া। মনির সত্যিই বলেছিল তবে।
"যা করছো, তা যদি বন্ধ না হয়, কোনো আভাস পাওয়া মাত্র এর গল্প শেষ হবে। তার পর কা টা আ ঙ্গু ল পাঠাইতে আমাদের ভুল হবে না। বেচাল কিছু করার চেষ্টা করলেই একটা একটা করে আঙ্গুল হাওয়া হবে।"
লেখাটার দিকে তাকিয়ে ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল আফনান৷ তখনই ঘরে এলো শায়লা।
………..
(ক্রমশ)
ওরা হু ম কি ই দিল, তবুও মনিরকে কেন পাঠিয়েছে বলুন তো?
লেখা শেষ হতেই ইদানিং পোস্ট করছি, পরে ফ্রি হলে বানান ভুল আছে কিনা সেটা দেখা হচ্ছে৷ আপনারা ভুলগুলো কমেন্টে জানাতে পারেন৷ আর গল্প কেমন লাগছে জানাতে ভুলবেন না।