ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

১৯তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ১৯)

নুসরাত জাহান লিজা

শায়লার মিষ্টি মুখে এই কয়েকদিনে বিষাদের পাকাপাকি ছাপ পড়ে গেছে। সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখে হাসির লেশমাত্র নেই। কথা দিয়ে মাতিয়ে রাখা মেয়েটা যেন কোন ভোজবাজিতে বোবা বনে গেছে। চোখ কোটরাগত। বোনের দিকে তাকিয়ে আফনানের ভেতরটায় একরাশ হাহাকার হু হু করে উঠল।

আয়েশা গিয়ে হাত ধরে শায়লাকে এনে বিছানায় বসিয়ে দিলেন। আরও স্ফীত হয়ে উঠেছে উদর, আর অল্প হয়তো অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীতে সে জন্ম দেবে নতুন একটা প্রাণ। ওর এই মুহূর্তে কত স্বপ্ন দেখার ছিল, যার সান্নিধ্য সবচাইতে বেশি প্রয়োজন ছিল, সে… আর ভাবতে পারল না আফনান।

"মা রে, এভাবে থাকলে তোর যদি একটা অনর্থ হয়ে যায়!"

আয়েশার শঙ্কিত গলায় আফনান সচকিত হলো।

নিজের পেটে হাত বুলিয়ে শায়লা বলল, "মা, আমি বেঁচে আছি খালি এর জন্য। রবিন কেন কথা রাখল না?"

ওর গলার কম্পন আফনান অনুভব করল। নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হলো। ভাই হিসেবে অযোগ্য মনে হলো। ওর এত প্রিয় বোনটা এত যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে কিছুই করতে পারছে না।

"রবিন ফিরবে শায়লা, তুই এত ভাবিস না। আল্লাহ তোর কাছে ওকে ঠিক ফিরিয়ে দেবে। দেখিস।"

বলার সময় আফনানের বুকের ভেতরে তোলপাড় হয়ে গেল। সত্যিই সে কিছু করতে পারবে তো! নাকি মিছে আশ্বাস দিল সে জানে না।

"আফনান, ও বেঁচে আছে তো! রবিন আমাকে আর বাবুকে নিয়ে কত প্ল্যান করেছিল, জানিস? বলত, ছোট্ট একটা প্রাণকে প্রথম কোলে নিয়ে সে কী কী করবে! বলত মেয়ে হবে না ছেলে তা জানি না। আমাদের সন্তান যেন সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসে। আরও বলত, 'তুমি এত কষ্ট করছ এখন, ওর পৃথিবীতে আসার পর দেখবে আমি সব সামলে নেব।' পেটে প্রাণের অস্তিত্ব জানন দিলে কেমন ছেলেমানুষি করত, তুই দেখিসনি। মানুষটা এত পাগল।"

বলতে বলতে কোন সূদুরের স্বপ্নালু জগতে হারিয়ে গিয়েছিল যেন। আচমকাই বাস্তবতা সম্পর্কে সচকিত হলো, এরপর বলল, "ওকে দেখতে পারবে তো রবিন?" বলেই কেঁদে ফেলল। সেই কান্নায় সাত সমুদ্রের সবটুকু বিষাদ ফেনিয়ে উঠল।

আফনান আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ওর চোখও কখন যেন আর্দ্র হয়ে এসেছে। তবে পানিটাকে সে বহু কষ্টে সংবরণ করল। আয়েশা আঁচলে মুখ চাপলেন। আফনান ভেবেছিল একটু আগে কলের ব্যাপারটা শায়লাকে জানাবে না। কিন্তু রবিন বেঁচে এই আশ্বাসটুকু যে বোনকে দিতেই হবে।

তাই বলল, "রবিন বেঁচে আছে শায়লা, অক্ষত আছে। আমি জানতে পেরেছি।"

"মিথ্যে সান্ত্বনা দিস না। আমি…"

আফনান অপারগ হয়ে ছবিটা দেখাল। ছোঁ মেরে ওর ফোনটা হাতে নিল শায়লা। এরপর অপ্রকৃতিস্থের মতো ছবিতে হাত বুলাল। মনে হলো ছবি নয়, ওটাই যেন রক্ত মাংসের রবিন।

এরপর নিচের মেসেজটুকু দেখে ফেলল। প্রমান গুনল আফনান। হু ম কির কথাগুলো পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল শায়লা। প্রথম দুদিনের পরে যে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছিল, আজ আবার সেখানে প্রাণের স্পন্দন খেলল যেন। তবুও আতঙ্কিত বোধ করল আফনান।

কিন্তু কাঁদতে বাঁধা দিল না। আয়েশা শায়লার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

আফনান অস্ফুটস্বরে কেবল বলল, "আমি বেঁচে থাকা অব্দি হাল ছাড়ব না শায়লা। দেখিস।"

মনিরের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ আপাতত ওর সামনে নেই।

***

নীরা ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্থির বোধ করছিল। রবিন সংক্রান্ত অসংখ্য পোস্ট সে পড়েছে। মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। আগে ভেবেছিল এক সপ্তাহ পর থেকে ক্লাস শুরু করবে সে। কিন্তু বাড়িতে একটুও ভালো লাগছে না আর। মা সারাক্ষণ সায়মনের নাম জপ করছেন কানের মধ্যে।

তাই আজ দুপুরেই রওনা হবে ঢাকায়। আগে নিলয়ের বাসায় উঠবে। হলে এক সপ্তাহ পর থেকেই থাকবে। নিলয়ের সাথে কথা বলা ওর ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু হুটহাট ফোন করে আফনানের জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে কোথাও যেন তীব্রভাবে বাঁধা পেয়েছে। তাই ওখানে থাকলে বিস্তারিত খবরাখবর অন্তত সে জানতে পারবে।

ব্যাগে সব নিয়েছে কিনা দেখছিল, এরমধ্যে রোকেয়া এলেন।

"সায়মন এসেছে। বকুল বলল সে-ও ঢাকায় যাবে। আমি বললাম তোর সাথে যেতে। ভরসা পাই।"

"মা, আমি বেশিরভাগ সময় একাই গেছি। তোমার ভরসা ছিল না?"

থতমত খেয়ে গেলেন রোকেয়া, কোনোমতে বললেন, "না, তুই যেরকম ভাবছিস সেরকম না আসলে। একই জায়গায় একই দিনে যাবি। তাই…"

"মা, প্লিজ, আমার এসব ভালো লাগে না।"

"দেখ, ছেলেটা বড় মুখ করে বলেছি, তুই না করে দিলে খুব খারাপ দেখায়। আমি ছোট হয়ে যাব।"

"আগ বাড়িয়ে বলার দরকারটাই বা কী ছিল?"

"তুই সায়মনের সাথে যাবি, আর কিচ্ছু শুনতে চাই না।"

নীরার মেজাজের পারদ বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করলেও শান্ত থাকল। এই বিষয়ে আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করল না। মায়ের প্রস্তাব আজকের মতো মেনে নিল।

আফনানকে একবার কল করার ইচ্ছে কয়েকদিন থেকে প্রাণপণ প্রচেষ্টায় দমিয়ে রেখেছে। পাশে দাঁড়িয়ে কিছু করতে না পারল, শুধু শুধু কথা বলে লাভ কী। নীরা জানে না, প্রিয়জনের একটা ভরসার কথাও মস্ত বড় অনুপ্রেরণা হয়ে সঞ্জিবনী শক্তি দেয়।

***

ইরা পড়ায় ভীষণ মনোযোগী হয়েছে হঠাৎ করে। যে করেই হোক, ওকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে হবে। নইলে শাফিনের সান্নিধ্য পাবে কী করে!

"ইরাপু, আফনান ভাইয়ার কী অবস্থা? টিভিতে খবরে দেখলাম। নীরাপু এটা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। জানিস?"

চমকে উঠে ইলার দিকে তাকাল ইরা।

"নীরা আপুর কথা তুই…"

"আমাকে যত ছোট মনে করো, আমি কিন্তু তত ছোট নই। তবে অত বড়ও নয়। আরও বড় হলে আমি নিজেই চলে যেতাম আফনান ভাইয়াকে সাহায্য করতে।"

ইরা নিজেও বিমর্ষচিত্তে ভাবতে লাগল, কী আছে ভবিতব্যে!

***

আফনান গতকাল রাতেই মনিরের সাথে যোগাযোগ করেছে। আজ সন্ধ্যার পরে নদীর দিকের যে নিরিবিলি রাস্তাটা, সেখানে আসতে বলেছে।

আফনান ওর কথা মতোই এসেছে। লোকটাকে কতটুকু বিশ্বাস করা যায় সে ব্যাপারে এখনো সে সন্দিহান। তবে আর উপায় কী! আর কোনো রাস্তা তো নেই। জলে ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, সে-ও সেভাবে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর সম্ভাবণা নষ্ট করতে চায় না।

........

(ক্রমশ)

এই পর্বে কমপক্ষে ২০০ রিয়্যাক্ট এলে পরের পর্ব আসবে ইনশাআল্লাহ, সেটা যদি আগামীকাল হয় তো আগামীকাল আর পরে হলে যখন হবে তখন ইনশাআল্লাহ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন