ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

২০তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ২০)

নুসরাত জাহান লিজা

"তোমার এই জব এতটাই জরুরি? সবে আমরা নতুন সংসার শুরু করলাম। তুমি এখন রাজশাহীতে চলে যেতে চাইছ? তোমার কীসের অভাব? আমি কিছুর কমতি রেখেছি?"

নিলয়ের কথায় প্রথমদিকে নিজের নেয়া সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যায় কিনা ভেবে দেখতে চাইছিল আনিকা। কিন্তু শেষের কথায় ওর মেজাজ খিচড়ে গেল।

"আমি কি অভাবের জন্য, নিজের বেসিক নিডস ফুলফিল করার জন্য তোমাকে বিয়ে করেছি নিলয়? আমার বাবা মাকেও তুমি অসম্মান করলে। তারা কিন্তু বিয়েতে রাজিই ছিল না।"

"তাদেরকে কোথায় অসম্মান করলাম? একটা সামান্য কথাকে এতবড় করছ শুধু শুধু।"

"শুধু শুধু? এটা সামান্য কথা? তুমি আমাকে আজ এটা বলতে পারছ, দু'দিন পরে আরও বড় কথা বলবে না তার নিশ্চয়তা কী? ভাগ্যিস জবটা হলো, নইলে তোমার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু পুরুষের মতো মেল ইগো আছে, সেটাকে আবিষ্কারই করতে পারতাম না।"

"অনু, প্লিজ, তুমি যেভাবে ভাবছ আমি মোটেও এতকিছু ভেবে কিছু বলিনি। তবে এই জব তুমি করবে না। ঢাকায় হলে আমি মোটেও বাঁধা দিতাম না। বুঝতে চেষ্টা করো।"

আনিকা প্রাণপণ চেষ্টায় কান্না চেপে রেখেছে। সে নিলয়ের কাছ থেকে এমন কথা আশা করেনি। বহু বছর ধরে সে নিলয়কে চেনে। বিয়ের পর থেকেও তো ঠিকই ছিল। কিন্তু আজ ওকে মারাত্মক অসম্মান করতে পারল! তার উপরে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। না না, সে রাজশাহী যাবে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো আনিকা।

"তোমার কাছে আজ এটা খুব সামান্য বলে মনে হচ্ছে। সামান্য থেকেই শুরু হয় নিলয়। তুমি যদি আমাকে মিস করবে বলতে, আমাকে দূরে যেতে দিতে চাও না সেজন্য, বলতে। আমি হাসিমুখে মেনে নিতাম। কিন্তু তুমি আমার আত্মসম্মানে আঘাত করেছ। আজ এটা মেনে নিলে দু'দিন পরে আরও বড় কিছু বলবে না তার নিশ্চয়তা দিতে পারো?"

নিলয়েরও এবার রোখ চেপে গেল, সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "তোমার যা খুশি করো। আমি আর কখনো দেখতে যাব না।"

বলেই বেরিয়ে গেল, স্তব্ধ হয়ে বসে রইল আনিকা। আজ এপয়েনমেন্ট লেটার পেয়ে চাপা টেনশন হচ্ছিল, একবার মনে হচ্ছিল এত ভালো একটা সুযোগ, পরক্ষণেই মনে হলো নিলয় যে কীভাবে নেয়! হয়তো পাগলামি করবে, যেতে দিতে চাইবে না। সে প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিল জয়েন করবে না। তবুও সঙ্গীর ভালোবাসাটুকু চাক্ষুষ করতে ইচ্ছে হয়েছিল। সবসময় তো ভালোবাসা প্রকাশ করা হয় না!

কিন্তু এমন কিছু হবে সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি। চেপে রাখা কষ্ট এখন কান্না হয়ে ঝরতে লাগল গাল বেয়ে। নিলয়কে কি সে ভুল চিনেছে! সব পুরুষই কি একইরকম!

***

নীরা নিলয়ের বাসায় এসেছে চারদিন হলো। আজ নিলয়ের ঘরে আসছিল আফনানের ব্যপারে জানতে। একদিন কথা উঠতে একটা সামারি শুনে নিয়েছিল। বেশি প্রশ্ন করতে পারেনি সংকোচে। তবে আজ ভাবল, এভাবে হবে না। ভাইয়া যা ভাবার ভাবুক, ওকে সব আগাগোড়া জানতেই হবে। তারপর অন্তত একবার হলেও আফনানের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আর কিছু না পারলেও পাশে দাঁড়িয়ে একবার কিঞ্চিৎ সাহস তো দিতে পারবে!

কিন্তু ওদের ঘরের কাছাকাছি এসে পা থেমে গেল। ভাই ভাবির মতানৈক্য না চাইতেও ওর কানে এলো। এরপর নিলয়কে বেরিয়ে যেতে দেখল। নীরা একবার ভাবল ভেতরে গিয়ে আনিকার সাথে একবার কথা বলবে কিনা। পরমুহূর্তেই চিন্তাটা বাতিল করে দিল। এটা এখনো অব্দি তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা। ওর নাক গলানো মানে অনধিকার চর্চা। অন্তত এখন তো নয়ই। পরে একসময় কথা বলা যাবে ভেবে ফিরে গেল নিজের ঘরে।

বকুল ফুপু কল করেছে। নীরা রিসিভ করল না। রাগ হচ্ছে ভীষণ। ফুপুর উপরে নয়, সায়মনের উপরে। সেদিন আসার সময় সায়মন ওকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিয়েছিল আবার। নীরা ভাবলেশহীন গলায় প্রত্যাখ্যান করেছে।

"কেন সম্ভব নয় নীরা?" মরিয়া গলায় প্রশ্ন করেছিল সায়মন।

নীরা উত্তরে বলেছিল, "দেখুন, আমনার মনে যেই অনুভূতি, বন্ধুত্ব হলে সেটা আপনি ভুলতে পারবেন? আমিও সহজ হতে পারব না। আপনার মনে একটা হোপ তৈরি হবে আবারও। এটা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। আমি জানি আপনি বুঝবেন।"

"কারণটা…"

সায়মনকে থামিয়ে দিয়ে নীরা শক্ত গলায় বলেছিল, "সব কিছু সবার জানতে নেই সায়মন। আশা করি এধরণের প্রশ্ন করে নিজেও বিব্রত হবেন না, আমাকেও বিব্রত করবেন না।"

সায়মন অনেকক্ষণ পরে ওদের মধ্যকার নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বলেছিল, "কী নিষ্ঠুর তুমি নীরা।"

সেই বলায় রাগ, ক্ষোভ, হতাশা কত-শত আবেগের একটা অদ্ভুত সম্মীলন ছিল তা নীরা উপলব্ধি করলেও এড়িয়ে গিয়েছিল। কারণ সে নিরুপায়।

বকুল ফুপু আবার কল করছেন। নীরা এবার কলটা ধরল। সে জানে, না ধরা পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হবেন না। ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো বকুল ফুপুর প্রায় ক্ষুব্ধ গলা,

"তুই কী রে নীরা? যেই ছেলেটা সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকে সবাইকে মাতিয়ে রাখে, ওকে ফোন করলে এখন ভালো করে কথাই বলতে চায় না।"

"একেবারে সরাসরি ওদিকে চলে গেলে ফুপু? আমি কেমন আছি তাও জানতে চাইলে না?"

"আমি জানি তুই কথা ঘুরিয়ে ফেলতি। তোকে আমি চিনি নীরা। তোকে অনেক ভালোবাসি আমি। তাই অধিকার বোধ থেকে কথাগুলো বললাম।"

নীরা হাসিমুখে শান্ত গলায় বলল, "ফুপু, আরও অনেকেই তো আমাকে প্রপোজ করেছে। রিজেকশনে তাদের মনও খুশিতে নাচেনি। তাদের সকলকে ভালো রাখতে চাইলে তো সবাইকে এক্সেপ্ট করতে হবে। সেটা কি সম্ভব?"

"কিন্তু সায়মন অন্যদের মতো না, ও…"

"উনি তোমার খুব আদরের, তাই এভাবে বলছ ফুপু। আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। প্লিজ এমন করে বলো না। তোমার মন খারাপ করে দিতে চাইছি না।"

"নীরা, প্লিজ একবার…"

"ফুপু আমার ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। পরে কথা বলি, প্লিজ।"

এরপর কেটে দিয়ে বসল বিছানায়। এই পাশের বারান্দা থেকে আকাশ দেখা যায় না। নীরার ভীষণ ইচ্ছে হলো আকাশটা দেখতে। আকাশের বিশালতায় নিজের কষ্টগুলোকে ভাসিয়ে নিজেকে হালকা করতে। কিন্তু সেটা হবার নয়। তাই শুয়ে চোখ বুঁজল।

***

নি র্বা চ নী প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। আজমল খান, আরিফসহ দলের সকলেই ভীষণ ব্যস্ত। আগামী পরশুর পর আর প্রচারণা করতে পারবে না, নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে।

এরমধ্যে ওদের একজন কর্মী বে ঈ মা নি করেছে। বি রো ধী শি বি রে ওদের ভেতরের কিছু গো প ন কথা ফাঁ স করেছে। অথচ এতদিন সে এদের জন্য কত ঝুঁ কি নিয়েছে প্রাণের। তবুও সেসবের এখানে মূল্য নেই। তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে পৃথিবী থেকে। এখানে স্বা র্থ ই শেষ কথা, তাতে টান লাগলে আপন পর হয়ে যায় নিমিষেই।

মনটা বিষিয়ে গেল মনিরের। ফয়েজ তার কাছের লোক ছিল। কোনোদিন যদি ওকেও… আর ভাবতে চায় না সে।

"আজকে আমার মেয়েটার জন্মদিন ভাই। বাচ্চা মেয়ে, বায়না করতেসে সারাদিন আমার সাথে থাকার। আজ সন্ধ্যাটা যদি ছুটি দেন।"

"তোর মেয়ের বয়স কত হলো রে?"

"পাঁচ, ভাই।"

"তোর বয়স কত?"

আরিফের প্রশ্নের কোনো মাথামুণ্ডু বুঝতে পারে না মনির, দ্বিধাবিভক্ত হয়ে বলল, "সঠিক হিসাব জানি না, তবে চব্বিশ, পঁচিশ।"

"তুই তো বাল্যবিবাহ করছিস তাইলে রে শা লা। শোন, এই বয়সটা কাজের। দুই হাত ভরে টাকা কামাই করার। বুঝলি। ফালতু ইমোশনে ভাসার না। আজকে সন্ধ্যায় কাজ আছে, জানিস না? যা, বলছিস যখন, রাত দশটার পরে যাইস।"

"ভাই, বাচ্চা মানুষ তো, তখন ঘুমায়ে পড়তে পারে।"

"কোন অযাচিত দুর্বলতা তৈরি হইলে কী করা হয় ভুলে গেলি মনির?"

সহসা গা হিম হয়ে গেল মনিরের, তার স্ত্রী আর সন্তানই তো তার একমাত্র পিছুটান। না না, একটা জন্মদিন স্যাক্রিফাইস করলে আরও অজস্র জন্মদিন তো সামনে আসবে ওই ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়েটার। ওর হৃদয়ের একটা অংশের। মনে হলো সপাটে চাবুক হেনেছে কেউ, শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল ওর। অভিনেতা সত্তা জেগে উঠল, বলল,

"দুর্বলতা না ভাই, জন্মদিন তো পরে আরও আসব। আমি আছি আপনার খেদমতে। নিজের জান হাজির, ইমোশন টিমোশন কিচ্ছু না ভাই।"

আরিফ পৈশাচিক হেসে বলল, "এই তো সুবুদ্ধি হইসে। যা তাইলে বের হ।"

বেরিয়ে আসতে আসতে মনিরের মনে হলো আফনানের কাতর মুখটা। প্রিয়জনের জন্য আশঙ্কা যে কতটা ভয়াবহ অসহায় করে দেয়, আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল মনির। তবুও কেমন অকুতোভয় চিত্তে ঘুরতে পারে আফনান। আপোষ করতে নারাজ। কিন্তু সে ফিরতে পারবে না! একবার এখানে জড়িয়ে গেলে সেই জাল কেটে বের হওয়া অসম্ভব। তবুও কেন যেন আফনানের সেদিন সন্ধ্যার চেহারাটা তার প্রস্তাব ভুলতে পারে না।

প্রথম দিকে কাঁচা পয়সা আসত হাত ভরে, জীবন রঙ্গিন লাগত। এখন লাগে না। সে ওদের কাছে কীটপতঙ্গের মতোই মূল্যহীন। এটা ফয়েজ ভাইয়ের পরিণতি ওকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। সে জানে আফনানের প্রস্তাব সে গ্রহণ করতে পারবে না। মনিরকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করে না আরিফ খান। ওর পিছনেও ঠিক টিকটিকি লেগে আছে। যদি ওই সাহসী ছেলেটাকে সাহায্য করতে চায় সেটাই মনিরের শেষ দিন।

***

আফনান আজ অফিসে যায়নি। দু'দিন আগে একটা আউটলেটে চুরি হয়েছে। চুরি হয়েছে বলাটা ঠিক নয়, বরং বলা যায় চোর ঢুকেছিল। কিন্তু কিছু নেয়নি। অল্প যা টাকা ছিল, সেগুলো সেভাবেই আছে। তবে সবগুলো ড্রয়ার ভাঙা। কিন্তু কিছুই খোয়া যায়নি। এটাতে প্রথমে বিস্মিত হয়েছিল। তবে বুঝতে পেরেছে কাদের কাজ।

নিলয়ের বদান্যতায় মিডিয়ায় আবার তোলপাড় শুরু হয়েছে বিষয়টা নিয়ে। অনেক রকম বিশ্লেষণের মধ্যে আফনানের নিজের মনে ঘুরতে থাকা একটা সম্ভাবনা মিলে গেছে। তাই তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছে।

রবিনের নিখোঁজ হবার দিন সে সকালের পরে আর বাসায় যাবার সুযোগ পায়নি। তার মানে এমন একটা কিছু আছে, যেটায় কোনো স্বাক্ষ্য পাওয়া যাবে ওদের বি রু দ্ধে। সেটাই খুঁজতে এসেছিল। পেয়েছে কী?

আফনান চুরি যাওয়া আউটলেটের সব ঘেঁটে কিছু পেল না। পরে অন্যটায় এলো। এটা একটু ভেতরের দিকে এখানে তারা আসেনি। কারণ সুযোগ পায়নি।

আফনান সেখানে আঁতিপাঁতি খুঁজল। দুটো পেনড্রাইভ পেল। ল্যাপটপে সংযোগ করে দেখল কিছু আছে কী না! কিন্তু ব্যবসায়িক কিছু ডকুমেন্টস বাদে অন্যকিছু নেই। এরপর একটা কসমেটিকস এর খোলসে পড়ল ধাক্কা লেগে। তাতে আরেকটা পড়ল।

এটা লুকিয়ে রাখা, আবার যাতে চেনা লোকের চোখে পড়ে সেটাও নিশ্চিত করেছে। এটা কানেক্ট করে কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে গেল। হার্টবিট বেড়ে গেল আফনানের! এই জন্যই তাহলে এতকিছু!

……..

(ক্রমশ)

যারা পড়ছেন চেষ্টা করবেন এক দুই লাইনে হলেও কিছু বলতে। নতুন পর্ব কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না, তাতে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। আমার ই-বুক গুলো যারা পড়েছেন তারা রিভিউ লিখতে পারেন। না পড়া থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন। তিনটাই স্বল্পমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন