ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

২৪তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ২৪)

নুসরাত জাহান লিজা

রাত তখন সাড়ে তিনটা। নিলয়, আফনান তখন দাঁড়িয়ে আছে প্রগাঢ় অন্ধকারে। ব্যাকআপ প্ল্যানও রেডি করে এসেছে। তবুও অজানা আশঙ্কায় আফনানের বুক কাঁপছে। মা তাহাজ্জুদের নামাজে বসেছিলেন। ওদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করে দিয়েছেন। এতসব পরিকল্পনার কিছুই শায়লাকে বলা হয়নি। ডাক্তার ওর ডেলিভারির যে ডেট দিয়েছে তা আগামী পরশু। এমনিতেই রবিনের শোকে কাতর, তার মধ্যে আফনাম নিজের জন্যও স্ট্রেস দিতে চায়নি এই মুহূর্তে।

নীরার মুখ থমথমে হলেও মৃদু হেসে বলেছিল, "ফিরে এসো সফল হয়ে। আল্লাহ সহায় হউন।"

আফনান ম্লান গলায় মা'কে বলেছিল, "আমার ভয় লাগছে মা।"

"ভয় সবারই করে বাবু। যারা ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে, অন্যায়ের সাথে আপোষ করে তারা ভীতু। তুমি বুক চিতিয়ে লড়ছিস। ভয়কে জয় করে মাথা উঁচু রেখেছিস। তুই সাহসী। ভাগ্য সবসময় সাহসীদের সঙ্গ দেয়৷ দেখিস, আল্লাহ তোদের সাথে থাকবে।"

এরপর দোয়া পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে দিলেন তিনি। মাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব হয় আফনানের। পরিস্থিতি যা-ই হোক, তিনি কখনো সাহস হারান না। অসম সাহস আর দৃঢ়তা দিয়ে তিনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। কখনো বা জেতেন, কখনো হারেন৷ কিন্তু মাথা কখনো নীচু হয় না তার। ছেলেবেলায় আফনান আর শায়লা কখনো অন্যের কটুক্তিতে কেঁদে বাড়িতে ফিরলে তিনি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে স্মিত হাসিমুখে বলতেন,

"আল্লাহ ছাড়া কারোর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে নিবি না। অন্যকে খুঁচিয়ে যারা সুখ পায়, তারা অনেক নিম্নস্তরের মানুষ। তাদের কথায় কিছু হয় না। তাদের নিজেদের গায়ে কাদা, তাই অন্যের গায়ে কাদা ছেটাতে চায়। ওদের স্তরে নামাতে চায়। তাদের পাত্তা দিতে গেলে নিজের মনে আর গায়েও কাদা মাখতে হয়। গায়ের কাদা ধুলেই যায়, মনে কাদা লাগলে তা সরে না। তাই কী দরকার!"

কথাটা আফনান চিরজীবন বুকে লালন করে এসেছে। শায়লার কান্নাভেজা ম্লান মুখটা মনে পড়তেই ভেতরটা টগবগিয়ে উঠল। আজ হয় রবিনকে নিয়ে ফিরবে, নয় এখানেই ওর নিজেরও ইতি। নিলয়কে বলেছিল ব্যাকআপ টিমের সাথে থাকতে, কারণ এই লড়াইটা আসলে তার একার। অন্যের বিপদ সে আনতে পারে না। কিন্তু ওর ঘাড়ত্যাড়া বন্ধু সেটা কানে তুলল না।

জায়গা পরিবর্তন করা হয়েছে। ওরা যেকোনো মুহূর্তে চলে আসবে। ভাবতেই ফোনটা ভাইব্রেট করল। হাতেই ছিল মোবাইলটা। মনিরের কল। লাউডস্পিকার অন করল, নিলয়কে শোনানোর জন্য।

"পাঁচ কদম পিছিয়ে যান।"

ওরা কথা মেনে ঠিক পাঁচ পা পিছিয়ে গেল।

এবার কথা বলল আরিফ, "কোনো চালাকি না। ডকুমেন্ট নিচে রেখে আরও পিছিয়ে যা।"

"আগে রবিনকে আমাদের সামনে নিয়ে এসো। নইলে জিনিস পাবে না।"

মিনিট খানেক অতিবাহিত হলো। সময় যেন থমকে আছে অনন্তকাল ধরে। এরপর হাত পিছমোড়া করে বাঁধা রবিন এলো দৃশ্যপটে। মনিরের হাতের পি স্ত ল রবিনের মাথায় তাক করা। একে একে আঁধার ফুঁড়ে সামনে এলো আরিফসহ আরও কয়েকজন। আফনান হিসেব করল বারো জন। পাঁচজনের হাতে আ গ্নে য়া স্ত্র। ওদের দিকেও কয়েকটা চোখ রাঙাচ্ছে।

রবিন কিছু একটা যেন চোখের ইশারায় বলতে চাইল। আফনানের ঠিক বোধগম্য হলো না। তবে মুখে বলল,

"বাহ্! আপনারা মশা মারতে কা মা ন দাগান। ভালো। এত সাহস আপনাদের! মশারা লজ্জা পাবে।"

"বেশি বেগড় বাই করবি না। আগে জিনিস দে।"

তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল আফনান, "তোমাদের বিশ্বাসের নমুনা তো দেখলামই। এরপরেও যদি আগে তুরুপের তাস ছেড়ে দিই, আমাকে লোকে একটা বিশেষণই দেবে। গ আকার, ধ আকার, একটা নিতান্ত নিরীহ প্রাণীর নামে ডাকবে। যদিও বেচারা প্রাণীর দোষ নেই। তবুও আমি মানতে পারব না।"

আফনানের কথায় আরিফ চটে গেল, "ওই শু* বা*, একবার খালি ট্রিগার টানতে বলমু। তুই তোর ওই জার্নালিস্ট বন্ধু আর এই শালা, ফিনিশ।"

"তোমরা অতি বিশ্বাসী তো। তাই ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি তোমাদের। তাই সব ডকুমেন্টস, কল রেকর্ডস, ভিডিও ক্লিপ, সব একজনের কাছে দিয়ে এসেছি। বলা আছে, ফজরের আজানের মধ্যে যদি আমরা না ফিরি তোমাদের কীর্তিকলাপ যেন দেশবাসীর সামনে চলে যায়। তাই যত সময় নষ্ট করবে ততই বিপদ তোমাদের।" আফনানের মুখভঙ্গিতে আশ্চর্য ভাবলেশহীন কঠোরতা, নিলয় পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছে।

"আমাদের কথা যদি ফাঁসই করবি, তাইলে আর তোদের যাইতে দিয়ে কী লাভ। ম র।"

"এতগুলো লা শ গুম করতে পারবে আলো ফোঁটার আগে? আরও জনবল দরকার ছিল তো।"

"সেটা পরে ভাবা যাবে। আগের কাজ আগে।"

"তোমার বাবা কিন্তু এসব করতেন না। তিনি শয়তান হলেও অনেক বুদ্ধিমান। ওমন বুদ্ধিমান একটা লোক, কী করে এমন গবেট জন্ম দিতে পারে তাই ভেবে আফসোস হচ্ছে। এই তুমি কি ব্রেইন অপারেশন করে বুদ্ধিশুদ্ধি সব ফেলে গোবর ঢুকিয়ে নিয়েছ? গোবর প্ল্যান্টেশন করিয়েছ? যুগান্তকারী কিন্তু। ডাক্তারের নামটা বলো তো আমাকে, আমার যত শত্রু আছে, তাদের ধরে ধরে নিয়ে যাব।"

আফনান চাইছে উদ্ভট কথা বলে ওদের চটিয়ে দিতে। অতিরিক্ত রাগ থেকে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। ওদের একটা ভুল যেমন আফনানদের আপার হ্যান্ডে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি হিতে বিপরীত হতে পারে। তবে নো রিস্ক নো গেইন ছাড়া এই মুহূর্তে অন্যকিছু মাথায় আসছে না।

খুবই অশ্রাব্য গালি বেরিয়ে এলো আরিফের মুখ দিয়ে। আফনান নিজের হৃদপিণ্ডের ধ্বকধ্বক শুনতে পাচ্ছে। তবে কোনোভাবেই সেটা প্রকাশ করছে না।

"তোরা আমাদের কাছে নিতান্তই শিশু। কত মহা ধূর্ত খেলুড়ে মাত হয়ে গেল। এই হাত আর কাঁপে না, অনেকগুলো মানুষের রক্ত এই হাতে লেগে আছে৷"

এই স্বীকারোক্তিটাই এতক্ষণ ধরে বের করতে চাইছিল আফনান। নিলয়ের চ্যানেলের এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট হবে এটা৷ সব সেট করা আছে। এবার আর দেরি করা সম্ভব নয়।

"ওই মনির, প্রথমে ওই দোকানীরে মা র।"

বাকিরা পজিশন নিয়েছে। নিলয়ও সিগনাল পাঠিয়েছে। আরিফের আর বাকিদের নজর আফনান আর নিলয়ের উপরে নিবন্ধ।

রবিনের হাত ছেড়ে দিয়েছে মনির। কানেকানে ফিস ফিস করে কিছু একটা বলল, এরপর ধাক্কা দিয়ে রবিনকে আফনানের দিকে ঠেলে দিয়ে নিশানা স্থির করল নিজের দলের দিকে। শুরু হলো ফা য়া রিং।

আরিফ চিৎকার করে তিক্ত গলায় বলল, "বেঈমান।"

রবিন প্রস্তুত ছিল, তবে এতদিন বন্দী দশায় থেকে পা গুলো আড়ষ্ট হয়ে আছে। তবুও প্রাণপণে কয়েক পা এগিয়ে এলো। আফনান ওকে টেনে শুইয়ে দিল। ততক্ষণে পুলিশ ফোর্স চলে এসেছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে আরিফ পেছন থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গেল। যাবার আগে দূর থেকে মনিরকে উদ্দেশ্য করে গু লি চালিয়ে দিল নিশানা ঠিক করে। আফনানকেও নিশানা করতে চাইল, কিন্তু তাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

দল নে তা যখন পাশটান দেয়, তখন বাকিরাও আসলে হেরে যায়। একটা যু দ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকা সর্বাগ্রে। সে নড়বড়ে হলে সেই যু দ্ধ বড্ড একপেশে হয়।

রবিনকে নিলয় সরিয়ে নিয়ে গেল নিরাপদ জায়গায়।। মনিরের দিকে এগিয়ে গেল আফনান। কাতরাচ্ছে ভীষণভাবে। অদ্ভুত মায়া হলো মানুষটার জন্য।

***

আজ নার্স ছুটি নিয়েছে হুট করে। তার ছেলে বাসায় সিঁড়ি থেকে পড়ে হাত ভেঙে ফেলেছে। আয়েশা না করতে পারলেন না। সন্তান সবার আগে।

আয়েশা নামাজের ফাঁকে এসে মেয়েকে দেখে যাচ্ছেন। নীরাও আজ তাহাজ্জুদ পড়েছে। এরপর এসে শায়লার পাশে এসে বসেছে। শায়লার আজ ব্যথাটা বেশি হচ্ছে। আচমকা অসহ্য ব্যাথায় কাতরে উঠল।

নীরা ওর হাত ধরে অভয় দেবার চেষ্টা করে আয়েশাকে ডেকে আনলেন। আয়েশা অভিজ্ঞ মানুষ। বললেন, "মা, ওকে হসপিটালে নেয়া দরকার।"

নীরারও তাই মনে হচ্ছিল। ঘড়িতে তখন পৌনে চারটা। নিলয় বা আফনানকে এখন কোনোভাবেই কল করা যাবে না। সবার আগে এম্বুলেন্স বা গাড়ি দরকার। কিন্তু এত রাতে, ওর কাছে কারোর নাম্বার নেই। মনে পড়ল, বাইরে সিকিউরিটি আছে। সে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। তাদের গেটের ভেতরে আর বাইরে ছিল। দুইজন।

তাদের জানাতেই তারা বিশ মিনিটের আগেই ব্যবস্থা করল। এম্বুল্যান্স রওনা হলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। তবে পেছনে যে কেউ অনুসরণ করছে সেটা খেয়াল করেনি।

***

মনিরকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। রবিনও আছে। চিকিৎসা তারও দরকার।

মনিরের মাথা আফনানের কাঁধে। পুলিশের জিপে করেই যাচ্ছে ওরা।

"এতবড় রিস্ক কেন নিলে মনির?"

মনিরের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও অস্ফুটস্বরে কথা বলছে। ওর মুখের খুব কাছাকাছি আফনানের কান থাকায় সব শুনতে পেল সে।

"ওদের সাথে থাকলেও দুইদিন আগে আর পরে ম র তা মই। তখন তাতে শান্তি থাকত না। আমার মেয়ে আর বউরে সারাজীবন মাথা নামিয়ে থাকতে হইত। একটা ভালো কাজে, অন্তত একজন মানুষের উপকারেও যদি আমার জীবনটা যায়, সারাজীবন যত পাপ করসি, সব কিছু হইলেও ক্ষয় হয় যদি। শান্তিতে মরতে পারি। আমার মতো পাপীর এরচাইতে ভালো মরণ আর কী হইতে পারে।"

থেমে থেমে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে বলল মনির। এরপর আবার বলল, "আমার ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে। ওর সাথে আমার কোনো স্মৃতি থাকব না হয়তো। ওরে বলবেন, 'ওর বাবা ওরে খুব ভালোবাসত।' আমার বউরে একটু বইলেন, আমি ভালো হইতে চাইছিলাম৷ তার আর আক্ষেপ থাকব না। একবার দেখতে ইচ্ছে করতেসে তাদের। পাবো কিনা জানি না। কিন্তু আমি তাও খুশি। কাপুরুষের মতো মরি নাই। মাথা উঁচু করে মানুষের মতো মরতেসি। একবার হইলেও নিজেরে সত্যিকারের মানুষ মনে হইতেসে।"

"মনির, সব কথা পরে বোলো, এখন এত কথা বলা ঠিক না। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। সব মানুষ কমবেশি ভুল করে। যে নিজের ভুল বুঝতে পারে, সেটা খণ্ডাতে চায়, সে সত্যিকারের মানুষ। তুমি সত্যিকার বীরের মতো লড়েছো। তুমি বাঁচবে মনির।"

মনির যেন আফনানের কথায় পরম শান্তি পেল। এতক্ষণের যন্ত্রণা যেন লাঘব হলো। চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো।

হাসপাতালে আসতে ডাক্তার মনিরকে চেক করে জানালো, "হি ইজ নো মোর।"

আফনানের বোবা কান্নারা বাঁধন হারালো। কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল একেবারে অনাত্মীয় সম্পর্কের একজনের জন্য। নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে যে হয়ে কয়েক মুহূর্তেই উঠেছিল ওর পরমাত্মীয়। আকাশ বাতাস সমস্ত যেন ভারি হয়ে এলো। এভাবেই হয়তো মনিরের মুক্তি লেখা ছিল অন্ধকার জগত থেকে। দূর থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান।

***

সেই একই হাসপাতালে একই সময়ে একটা সুখবর এলো। সুস্থভাবে জন্ম হয়েছে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের। সুখবর পাবার সাথে সাথে সুললিত আজান ভেসে এলো৷ আয়েশা আর নীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

একই সময়ে জন্ম আর মৃত্যু যেন একই সুতোয় বাঁধা পড়ল। দুটোই জীবনের সবচাইতে চিরন্তন সত্য। স্রষ্টা উপরে বসে এই নিয়তি লিখেছেন মানুষের জন্য।

একদিকে জন্মের মিষ্টি সুবাস, অন্যদিকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ৷ জন্ম মৃত্যু যেন একসূত্রে গাঁথা।

..............

(ক্রমশ)

কেমন হলো?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন