ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

২৮তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ২৮)

নুসরাত জাহান লিজা

"বাবা, আমি তোমাকে স্নেহ করি, নিলয়ের বন্ধু হিসেবে। এটা নিয়ে তোমার কোনো দ্বিমত আছে?"

আফনান বলল, "না আন্টি।"

"আমার ছেলেমেয়ে দুটোই ভীষণ আবেগী। তাই ওদের মা হিসেবে আমাকে বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হয়। ওদের অবুঝ আবেগকে আমি প্রশ্রয় দিতে পারি না, তাই না?"

আফনান বুঝতে পারছে আলোচনা কোন পথে যাচ্ছে। সে উত্তর দিল না। রোকেয়াও অবশ্য উত্তরের আশা করেননি। কেবল অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে ওকে পর্যবেক্ষণ করলেন। এরপর দৃষ্টি না সরিয়েই বললেন,

"ছেলেমেয়ের জন্য ভালো চাওয়াটা নিশ্চয়ই তোমার চোখে অন্যায্য নয়?"

আবারও প্রশ্ন। অকাট্য যুক্তি। আফনান তাই তা খণ্ডনের চেষ্টা করল না।

"শুধু আবেগে ভেসে জীবন চলে না। বাস্তবতা ভীষণ কঠিন। একসময় চোখের পর্দা সরে যায়, আবেগ তখন ঠুনকো মনে হয়। একসময় যেই আবেগের স্রোতে ভেসে যেতে ইচ্ছে হয়, তখন সেই আবেগকেই মনে হয় মস্ত একটা ভুল। কেন আরেকটু যুক্তি দিয়ে ভাবা হয়নি সেই নিয়ে আফসোস হয়। জীবনের কাছে আরেকটা সুযোগ চাইতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জীবন তাকে আর সেই সুযোগ দেয় না। সম্পর্ক ভেঙে যায়।"

আফনানের চোখে পাঁচ বছর আগের আর সেদিনের নীরার মুখচ্ছবি ভেসে উঠল। সেখানে কেবলই নিছক আবেগ ছিল না। আরেকটা বিষয় ছিল, তা হলো প্রলয়ঙ্কারী ভালোবাসা। আবেগের নদী শুকিয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসা মরা নদীতেও জোয়ার তুলতে সক্ষম। সেটা মরুভূমি হয়ে যাওয়া এতটাই সহজ! নয় নিশ্চয়ই। তাই এবার প্রথম আফনান উত্তর দিল,

"আন্টি, আপনার কথা সত্যি। তবে কিছু আবেগ কখনো ঠুনকো হয় না বোধহয়। কিছু সম্পর্ক হয়তো টেকে না। আমার মা তার জীবন দিয়ে বুঝেছে। কিন্তু তবুও কিছু মানুষ বছরের পর বছর একসাথে এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়। সেটা কি নিছকই আবেগের বশবর্তী হয়ে?"

রোকেয়া ক্ষণেকের জন্য থমকালেন। এরপর বললেন, "একসাথে সংসার করতে গেলে শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয় বাবা। সেখানে আরও অনেক অণুসঙ্গ প্রয়োজন হয়। সেটা হলো নিরাপত্তা। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সুখের নিশ্চয়তা, জীবনের নিরাপত্তা। তুমি চাইলেও নীরাকে সবটুকু দিতে পারবে না।"

"কেন পারব না আন্টি?"

"আমি সেসব বলে তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।"

"আমি শুনতে চাই আন্টি।" দৃঢ় অথচ ভীষণ কাতর গলায় বলল আফনান।

"তুমি বুদ্ধিমান ছেলে আফনান। এই কদিনে যা করেছ, তা রীতিমতো সাহসিকতা। তবুও তুমি নিজেই জানো ছেলেবেলায় তোমরা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছ। আমি চাই না আমার মেয়ে সেসবের আঁচ পাক। তোমার মায়ের স্ট্রাগলকে আমি সম্মান করি। তবুও সমাজ নিয়ে চলতে হয়। তোমার বাবা একজন প্রতারক। তোমার শরীরে যেমন তোমার মায়ের রক্ত আছে, তেমনি তোমার বাবার রক্তও আছে। তুমি অস্বীকার করলেও আছে। তুমিও যে কখনো তোমার বাবার মতো কাজ করবে না, সেটার নিশ্চয়তা কী?"

আফনান প্রচণ্ড অসহায়বোধ করল। ওর সবচাইতে স্পর্শকাতর অংশে আঘাত করেছেন রোকেয়া। যে লোকের সাথে কথা বলতেও ওর ঘৃণা হয়, যে লোকের জন্য ওর মায়ের জীবন শেষ হয়ে গেছে, সেই লোকটা শুধুমাত্র জন্ম দিয়ে ওর বাবা হয়ে বসে আছে। না থেকেও ওর ভালোলাগা বেছে নেবার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সম্ভব হলে সে শরীর থেকে ওই জঘন্য মানুষটার রক্ত ধুয়ে মুছে বের করে দিত।

আফনান মনেপ্রাণে তো কবেই সমস্ত ধুয়েমুছে দিয়েছে, সে কেবলই তার মায়ের সন্তান।

"আন্টি, আপনি বললেন আমার মায়ের রক্তও আমার মধ্যে আছে। তবে সেটার প্রতি ভরসা রাখতে পারেন না?"

"পারি না। কোনো বাবা মা এমন অনিশ্চয়তা নিয়ে মেয়ের হাত তুলে দেয় না। একটা বিশ্বস্ত হাত খুঁজে নেয়।"

"আমি আমার মায়ের শিক্ষায় বড় হয়েছি আন্টি। তার শিক্ষা, বিশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য মুখ থুবড়ে পড়ে, এমন কিছুই আমি কোনোদিন করব না। এই নিশ্চয়তা আমি আপনাকে দিতে পারি।"

"তুমি যখন বাবা হবে তখন আমার কষ্টটা বুঝতে পারবে আফনান। আমি তোমার চাইতে বয়সে অনেক বড়, তোমার মায়ের মতো। আজ আমি একটা অনুরোধ করছি তোমার কাছে, আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও। তুমি আমার মেয়েকে ভালোবাসো। ভালোবাসা তো অপরপাশের মানুষটার সুখ চায়। সায়মন অনেক ভালোবাসে নীরাকে।"

আফনান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো বাবা-মায়ের সামনে তাদের অত্যন্ত স্নেহ-ভালোবাসার মেয়ের জীবন সঙ্গী বেছে নেবার জন্য অপশন হিসেবে আফনান আর সায়মন দাঁড়ায়, আফনানরা সেখানে বহু আগেই হেরে যায়। মিছেই সে বালুচরে ঘর বেঁধেছিল। পলকা ঢেউয়ের তোড়ে কেমন জলে মিশে গেল সব।

আফনানের মনে হলো সে ওর সমস্তটুকু নিয়ে সাম্পান ভাসিয়েছিল সাগরে। মাঝসমুদ্রে এসে বৈঠা হারানো এক নিঃস্ব নাবিক বলে মনে হচ্ছিল নিজেকে। যে কেবলই একটা প্রবল স্রোতে ডুবে গেল অতলে। সাঁতার সেখানে অর্থহীন।

"কিন্তু নীরা আমাকে ভালোবাসে।" শেষ চেষ্টা হিসেবে যেন ভেসে উঠার জন্য পণ মিশে রইল।

"কত মানুষই তো ভালোবাসে। কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। মানিয়ে যায়।"

"আমি চাই নীরা সুখী হোক।"

পরাজিতের মতো বলল আফনান, কিন্তু কোনো দীর্ঘশ্বাস আসতে দিল না, তাতে যদি নীরার সুখ বিঘ্নিত হয়। ওর সুখের কাঁটা সে হতে চায় না। নিজের ভাগ্যের পরিহাসে একটা তীব্র বিষাদ মেশানো হাসি ফুটল। সে হাসি পাষাণের হৃদয়ও এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে সক্ষম।

***

আফনানের দেখা সারাদিনে নীরা পেল না। আপাতত শায়লা আর রবিনসহ আফনানদের বাসায় এসেছে আপাতত। ওরা সুস্থ হলে বাসায় ফিরে যাবে।

নীরা একবার আফনানের ঘরে এলো। আফনান হয়তো ভাবেনি, নীরা এই ঘরে আসবে এখন। ঘরটায় একটা বেশ বড়সড় বইয়ের তাক রয়েছে। তাতে নীরার দেয়া 'শেষের কবিতা' বই শোভা পাচ্ছে। বইয়ের ভাঁজে শুকনো ঘাসফুল। সেটাও ওর দেয়া ছিল। সেটা সরাতেই দেখল একটা খাতার কিছু ছেঁড়া পাতা। একবার একটা অংকের কিছুতেই সমাধান করতে পারছিল না সে। আফনানের শরণাপন্ন হয়েছিল। আফনান করে দিয়েছিল ঠিক, কিন্তু একটা তাচ্ছিল্য করেছিল ওকে৷

নীরা রেগে খাতার সেই দুটো পাতা ছিঁড়ে ফেলে এসেছিল আফনানের সামনে। সেই পাতাটাকে কুড়িয়ে কী ভীষণ যত্নে রেখে দিয়েছে ছেলেটা! নীরার ভীষণ ভালো লাগল। একটা অবর্ণনীয় সুখ প্রজাপতির মতো পেলব স্পর্শে মেখে দিয়ে গেল ওর সমস্ত হৃদয়ে।

কিন্তু সেই রেশটুকু স্থায়ী হলো না। সারাদিনে আফনানের অনুপস্থিতি নীরাকে কটাক্ষ হেনে যেন বলল,

"তুই আবারও একই বোকামি করলি।"

সেই রাতের ট্রেনে ওরা বাড়ি ফিরল। তবে নীরা এবার কাঁদল না। ওর কঠিন হৃদয় সামান্য আর্দ্র হয়ে আসছিল, তা আবারও প্রস্তরীভূত হলো। কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠল।

***

আফনান ঘরে এলো তার পরেরদিন। একটা ছোট্ট চিরকুট পেল,

"যাকে ফিরিয়ে দিয়েছ, তার স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে রাখাটা অন্যায়। তাই আমার জিনিস আমি ফিরিয়ে নিলাম।"

নীরার দেয়া বই, সাথে বাকি জিনিসগুলোও উধাও। কষ্ট যেন দলা পাকিয়ে বুকের ব্যথা বাড়িয়ে দিল আফনানের। কী ভীষণ ব্যথা যে হচ্ছে সেখানে। শূন্য হৃদয়েও ব্যথার সুর ঝঙ্কার তুলল।

***

সময় থেমে থাকে না। চিরায়ত নিয়মেই তা চলমান। ক্যালেন্ডার বদলে গেল, কয়টা ঋতু এলো গেল, সব ঠিকঠাকই তো চলছিল। শুধু আফনানের শূন্য হৃদয় নিঃস্ব হচ্ছিল। পাঁজর ভাঙছিল প্রতিনিয়ত। ভাগ্যিস পাঁজর ভাঙার শব্দ অন্যেরা পায় না!

…….

(ক্রমশ)

কপি করা নিষেধ। টানা দুইদিন দুই পর্ব ভীষণ ক্লান্তি নিয়ে লিখেছি। আগামীকাল গত এবং আজকের পর্বের মন্তব্যের উত্তর দেব ইনশাআল্লাহ। আমার স্কুল প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে বেশিরভাগ সময় ইন্টারনেট ব্রাউজ করার মতো নেটওয়ার্ক থাকে না। তাই রিপ্লাই দিতে দেরি হলে কেউ মন খারাপ করবেন না, আমি দেরিতে হলেও চেষ্টা করি উত্তর দিতে।

কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! এত পরিশ্রম করে লেখার পর আপনাদের এপ্রিসিয়েশন পেলে কষ্ট স্বার্থক হয়, নইলে ভীষণ মন খারাপ হয়। লেখার উৎসাহ কমে যায়। মনে হয় খুব বেশি খারাপ লিখেছি যে পাঠকের মন্তব্য করার ইচ্ছে হয় না?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন