#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ২৯)
নুসরাত জাহান লিজা
আনিকা রাজশাহী চলে যাবার প্রথম দুই মাসের মধ্যে কেউ কারো সাথে কথা বলেনি। ততদিনে অবশ্য তাদের পরস্পরের উপরে ক্ষোভ অনেকটা কমে গেছে। বাহ্যিক দূরত্ব কখনো কখনো দুটো মনকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। টান বাড়ে, তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয় কাছে যাবার। ওদের তেমনটাই হচ্ছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছিল না দু'জনেরই টনটনে ইগো মহাশয়ের কারণে।
দু'জনেই মনে মনে উতলা হয়ে ছিল কবে অপরপক্ষ থেকে প্রথম তার দিকে পা ফেলবে। কিন্তু নিজে থেকে এগিয়ে যাবার কথা চিন্তায়ও আনতে পারছে না।
"দোষ যার সে বলুক।" এমন ভাবখানা দুই প্রান্তেই। "আমি যাব না কিন্তু সে এলে ফেরাব না।"
এভাবে আরও মাসখানেক গড়ায়। সেই টান অবশ্য আরও বাড়ে। এরমধ্যে নিলয় দেখত প্রায় প্রতিদিন আনিকার ইন্সটাগ্রামে নতুন ছবি পোস্ট করা হচ্ছে। মেয়েটার মধ্যে এত ঘনঘন ছবি পোস্ট করার প্রতি ভারি অনীহাই নিলয় দেখে এসেছিল এতকাল! হঠাৎ এমন প্রতিদিন ছবি দেবার পেছনের কারণ যে নিলয় নিজেই সেটা সে অনুমান করে নিল। প্রতিদিন সে অন্তত একবার করে আনিকার প্রোফাইলে ঢু মেরে আসত। কখনো টানা তিন-চার দিন যদি ছবি না পোস্ট হতো নিলয় অস্থিরবোধ করত। মনে হতে সামান্য যেটুকু সুতো আছে সেটুকুও যেন কেটে যাচ্ছে।
একসময় নিলয়ই প্রথম হার মানল। প্রথমে নিজের অফিসে গেল। ওর কিছু ছুটি পাওনাই ছিল। আনিকার ছুটি নেবার ব্যপার আছে, আরও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ আছে। একটা ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথাও বলল। সামনেই নিলয় এক সপ্তাহের ছুটি নেবে, সে অনুযায়ী সুবিধাজনক সময় বের করতে হবে। এরপর ছুটল রাজশাহী। সোজা চলে এলো আনিকার অফিসে।
আনিকা একটা জরুরি কাজ করছিল, শুনল ওর সাথে একজন দেখা করতে চায়। আনিকার বাবা মা দুইবার এসেছিলেন, কিন্তু তারা অফিসে আসবেন না। এছাড়া আর কে হতে পারে ভেবে এসে দেখল নিলয়কে।
"তুমি কেন এসেছ?" আনিকার গলায় একরাশ অভিমান।
"ভাবলাম বিয়ে করলাম, কিন্তু এতদিনেও হানিমুনটা বাকি রয়ে গেছে।"
"আমার এই অফিস রুরাল এরিয়ার সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের ভাগ্য উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে, হানিমুন সার্ভিস নেই।"
"সুবিধাবঞ্চিত অসহায় পুরুষদের নিয়ে কোনো সুবিধা নেই?"
"না। তাই কথা না বাড়িয়ে চলে যাও।"
আ
"কিন্তু এই অফিসে তো আমার বউ আছে৷ বউকে ছাড়া তো আর হানিমুন হয় না।"
"এমন দেবদাস মার্কা চেহারা করে এলে বউ পটানো যায় না।" নিলয় এই কয়েকদিনে যেন কিছুটা রোগা হয়েছে, চোখের নিচে কিঞ্চিৎ কালচে ছাপ। নিশ্চয়ই অনিয়ম করে। তাই কিছুটা কড়া সুরে বলল আনিকা।
"টম ক্রুজের মতো চেহারা করার দরকার ছিল বুঝি?" আনিকা উত্তর দেয় না।
নিলয় আনিকাকে ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করে বলল, "তোমার গায়ের এই জামার রঙ কী? পেঁয়াজের খোসার মতো রঙ।"
"রঙ জেনে কী করবে?"
"এই রঙের একটা শাড়ি পরেছিলে কয়েকদিন আগে। তোমাকে ভীষণ মানায় রঙটা৷"
"তুমি কোথায় দেখলে?"
"তোমার ইন্সটাগ্রামে৷ আর তিনদিন আগে সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরেছিলে। ওইটাতেও….."
"এক মিনিট, তুমি কি আমার একাউন্ট স্টক করো?"
"এমনভাবে রেগে যাবার মতো কী আছে? অন্য নারীরটা তো করিনি! স্টক করলে নিজের বউয়ের টাই করেছি।"
"এতদিন মনে ছিল না বউ আছে?"
ওরা কথা বলছিল ভীষণ আস্তে আস্তে, ধীর স্বরে। এবার গলা আরেক ডিগ্রি নামিয়ে নিলয় বলল,
"আনিকা স্যরি। তোমাকে তখন ওভাবে বলাটা আমার উচিত হয়নি৷ আমার তোমাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হবে বলে আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারিনি।"
আনিকার রাগ অবশ্য সাথে সাথে পড়ল না, আরও একটা দিন নিলয়কে কাঠখড় পোড়াতে হলো। এরপর ওদের সম্পর্কের কালো মেঘ বরফ গলে বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ল। তার সপ্তাহ তিনেক পরেই ওরা হানিমুনে চলে গিয়েছিল নেপালেই৷ ফিরে এসে আবারও রাজশাহীতে চলে গেছে আনিকা। কিন্তু পরবর্তী ছয় মাস ওরা আসা-যাওয়া করেছে। বিয়ের প্রথম বছরটা ওদের মন্দ-ভালো মিলিয়ে চলে গেল।
***
ইরার প্রাণপণ পরিশ্রম সত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়নি। প্রথমদিকে ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। যতটা না নিজের স্বপ্নের জন্য, তারচেয়ে বেশি শাফিনের সাথে দূরত্বের আশঙ্কায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়েছিল। গত আটমাস সেখানেই আছে।
মরিয়ম মেয়েকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, "দেখ, একটা ভালো সাবজেক্টে তো পড়বি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়নি তো কী হয়েছে।"
মাকে সে আসল কারণটা বলতে পারবে না এখনি। নীরার পরিস্থিতি দেখে সে ভয় পেয়েছে। ওর মা বাবা যদি শাফিনের সাথে ওর সম্পর্ক কখনো মেনে না নেন!
সবার চোখ থেকে লুকালেও সে ইলার চোখকে ধোঁকা দিতে পারল না।
"আপু, তুই কিছুদিন আগেও বলতি বাড়ির বাইরে যাবি না। এখানকার কলেজেই ভর্তি হবি। এখন এমন হাপিত্যেশ করছিস কেন?"
"আগে অত পড়াশোনা করতাম না৷ পরিশ্রম করেছি, ফল না পেলে খারাপ লাগবে না?"
"সে তো লাগবেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ভার্সিটির চাইতে ভার্সিটির স্পেশাল কারোর জন্য তোমার বেশি টান।" বলেই ইলা বইতে মুখ গুঁজল।
ইরার অগ্নিদৃষ্টি নিভে এসে সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল বিস্ময়। ইলাকে কষে একটা চড় মারার প্রবল ইচ্ছে রোধ করল। এরকম বিচ্ছু একটা মেয়ে!
শোকতপ্ত ইরা চট্টগ্রামে ভর্তি হলো। বাড়ির বাইরে প্রথম যাওয়া। সবার জন্য প্রথম দিকে মন কেমন করত। শাফিন মাসে দুই তিনবার এখানে যাতায়াত করতে থাকল। ওদের সম্পর্ক তখন অনেকটা লং ডিসট্যান্ট রিলেশনশিপের মতো।
শাফিনের ফটোগ্রাফি চলছে সমানতালে। সে শখের পাশাপাশি প্রোফেশনাল ফটোগ্রাফি শুরু করেছে। এখন ইরা মানিয়ে নিয়েছে। নতুন বন্ধুমহল নিয়ে আর শাফিনের সাথে ফোনে কথা বলে সময় দিব্যি কেটে যাচ্ছে।
শাফিনের তোলা ওর প্রথম ছবিটা, যেটা দিয়ে ওদের পরিচয় সেই ছবিটা সে প্রায়ই দেখে। এই ছবিটা এত অপূর্ব এসেছে। নাহ্, শুধু এই ছবির জন্য ছেলেটাকে একজন ভালো ফটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
***
সবার জীবন এগিয়ে গেলেও আফনান যে এক জায়গায় থেমে আছে। সে মনিরের স্ত্রীকে ওর এক বন্ধুর কিন্ডারগার্টেন স্কুলে বাচ্চাদের পড়ানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মেয়েটা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু পরে আর পড়াশোনা সেভাবে এগোয়নি।
মনিরের মেয়ের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছে। রবিনও সাহায্য করে সবসময়।
আফনান একটা অফিশিয়াল কাজে ঢাকায় এসেছে। তাতেই রোমেল খুব করে ধরেছে ওর বিবাহবার্ষিকীতে যেন আফনান অবশ্যই থাকে। তাই গিফট কিনতে এসেছে শপিংমলে।
অকস্মাৎ চোখ আটকে গেল সামনে। বহুদিন পরে নীরাকে চোখের সামনে দেখল আফনান। এভাবে যে দেখা হয়ে যাবে সে ভাবতেও পারেনি! কিছুটা যেন পরিবর্তন এসেছে মেয়েটার মধ্যে। তবে ওর অতল চোখ এখনো একই আছে। সে চোখের দৃষ্টিসীমায় যদিও তখনও আফনান পড়েনি। হৃদয়ে বহুদিন পরে যেন প্রবল ঢেউ উথাল পাথাল খেলে গেল।
যখনই ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল মনে মনে, তখনই আফনানের দৃষ্টিসীমার মধ্যে আরেকজন প্রবেশ করল। সায়মন। বুকের গহীনে ভীষণ গোপনে যে ঢেউ ভাঙছিল তা একেবারে গোপনেই থিতিয়ে গেল, শান্ত হয়ে রূপ নিল হাহাকারে!
তবে কী নীরা নতুন জীবন শুরু করেছে! নিলয়কে কখনো সে নীরার কথা জিজ্ঞেস করেনি। ঝলমলে আলো নিমিষেই যেন বিরক্ত লাগল ওর, প্রাণপণে প্রগাঢ় অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো ওর।
........
(ক্রমশ)
রাতে ১ঃ৩০ টার দিকে এই পর্ব লেখা শেষ করেছিলাম। কিন্তু অত রাতে আর পোস্ট করিনি। আজ খানিকটা এডিট করে দিলাম।