ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

৩০তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৩০)

নুসরাত জাহান লিজা

নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হলো আফনানের।

"আরে, আফনান ভাই? অমাবস্যার চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হলো আমার।"

নীরার গলায় মেকি উচ্ছ্বাসে কটাক্ষের বিষ মাখা। আফনানের পা থেমে গেল।

"কেমন আছিস নীরা?" আফনানের গলায় মৃদু কম্পন।

"খুব ভালো আছি। এখানে কেন এসেছ? বিয়ে টিয়ে করছ নাকি গার্লফ্রেন্ডের জন্য গিফট?"

"তোকে দেখে ভালো লাগল।" কটাক্ষ এড়িয়ে বলল আফনান।

"ডাহা মিথ্যা কথা। তোমাকে মানায় না। আমাকে দেখে তুমি ভয় পাচ্ছ, আবারও যদি তোমার ঘাড়ে চাপতে চাই। ভয় নেই, তেমন কিছু হবে না। আমি এতটাও হ্যাংলা নই।"

নীরা ভীষণ শক্ত মনের মেয়ে, আফনান সেটা জানে। তবে আজ এই মেয়ে সমস্ত জেনে-বুঝে হাসিমুখে মর্টার শেল বিঁধিয়ে দিচ্ছে আফনানের হৃদপিণ্ডে। হাসিমুখে একজন হৃদয় হন্তারক যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে আফনানের সামনে।

"তোকে আমি হ্যাংলা ভাবব? এতবড় নির্বোধ আমি নই।"

ততক্ষণে সায়মন এগিয়ে এসেছে। কুশল বিনিময় হলো দুজনের। এই মুহূর্তে আফনানের ইচ্ছে করছিল, পৃথিবীর বুক থেকে এই প্রিভিলেজড ছেলেটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে৷ নিস্ফল, অক্ষম ইচ্ছেতে, সে নিজেই এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছিল।

"তোমার নিশ্চয়ই অনেক তাড়া আফনান ভাই। তোমার দেরি করিয়ে দিলাম। আসি। চলো সায়মন। আমাদেরও অনেক কেনাকাটা বাকি।"

আফনানের ভীষণ ইচ্ছে করছিল বলতে, "আর কিছুক্ষণ থাক না নীরা। তোর সাথে একটু গল্প করি।" কিন্তু বলা হয় না, নীরা হাসিমুখে পা বাড়িয়ে চলে যাচ্ছে, সায়মনের সাথে। দু'জনের চোখেই যেন সুখ উথলে পড়ছে। "চলো, সায়মন। আমাদেরও অনেক কেনাকাটা বাকি।" কথাটা ওর মস্তিষ্কে বারংবার আলোড়ন তুলছে। কষ্টের বুদবুদ শব্দে ওর শ্রবণেন্দ্রিয় যেন বিকল হয়ে যাচ্ছে।

টলোমলো পায়ে আফনান বাইরে চলে এলো। একবার কিছু একটা পায়ের সাথে লেগে শক্ত হোঁচট খেল। সে তখন যেন পৃথিবীতে নেই। পৃথিবীর সবচাইতে বিধ্বংসী বিষ যেন ওর সমস্ত পরিপাকতন্ত্রকে গ্রাস করছে ক্রমশ। তীব্র নীল নীল যন্ত্রণায় সমস্তটা ছেঁয়ে গেল আফনানের। মনে হলো সমস্তটাই বৃথা ওর।

***

ইরা শুয়ে শুয়ে ফেসবুকের নিউজফিডটা স্ক্রল করছিল। হঠাৎ শাফিনের পেইজ থেকে একটা ছবি এলো সামনে। ভীষণ সুন্দরী এই মেয়েটার ছবি সে তুলেছে৷ অকারণ এক ঈর্ষা ভর করল ইরার মধ্যে। সাথে সাথে শাফিনকে কল দিল।

"ইরা, আমি তোমাকে দশটা মিনিট পরে কল করি?"

"দশ বছর পরেও আর দরকার নাই।" বলে কল কাটল ইরা।

হতভম্ব শাফিন সাথে সাথে কল ব্যাক করল। ইরা রিসিভ করল না। শুধু একটা মেসেজ লিখল,

"যাদের ছবি তোলো, তাদের সাথে থাকো।"

শাফিন বারবার কল দিতে থাকল, কিন্তু ব্যর্থ হলো। এরপর সেও লিখল,

"ইরা, ওদের ছবি তুলি, কারণ তারা আমাকে পে করে। তাদের জন্য আমার সাথে রেগে থাকবে?"

"অত সুন্দরী মেয়েদের ছবি তুলতে তুলতে তোমার মন ঘুরে যাবে আমার দিক থেকে।"

"তোমার সাথে আমার আত্মিক সম্পর্ক। সেটা এত ঠুনকো নয়।"

"তবুও মানুষের মন, কখন কোনদিকে যায়।"

"ইরা, আমি আমার কাছে সৌন্দর্যের পারসেপশন আলাদা। আমার চোখে তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। কারণ তোমার হৃদয় স্পর্শ করতে পারি। ওদেরকে কখনো আমি পড়তে যাই না।"

এবার ইরা খানিকটা শান্ত হলো। শাফিন আবার লিখল, "মাথা ঠান্ডা হয়েছে?"

"কিছুটা।"

"এইজন্য বাচ্চা মেয়ের সাথে প্রেম করতে নেই।"

"নিজে যেন প্রস্তর যুগের মানুষ!"

শাফিন শব্দ করে হেসে ভয়েস মেসেজ দিল এবার। উত্তরে ইরা লিখল,

"আগামী দুইদিন তোমার সাথে আমার কথা বন্ধ। তোমার শাস্তি এটা।"

"আমি কী করলাম?"

"বাচ্চা মেয়ে বলবে, আবার তার সাথে প্রেমও করবে তা তো হবে না।"

"আরে, আমি তো মজা করেছি।"

"কিন্তু আমি মোটেও মজা করছি না।"

বলেই ফোন বন্ধ করল ইরা। একটু আগে ভীষণ রাগ হচ্ছিল, সেটা এখন নেই। দু'দিন তো বড় গলা করে বলল, সে নিজে থাকতে পারবে তো!

***

"নীরা, চলো রেস্টুরেন্টে বসি। সেই এগারোটায় বেরিয়েছ এখন সাড়ে তিনটা বাজে৷ খেয়ে নিই।" সায়মনের দিকে ঘুরে নীরা বলল,

"আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।"

"তুমি নিজে কষ্ট পাবে, তবুও ওর সাথে এভাবে কথা বললে কেন?"

"ওর কষ্টের প্রতি ভয়াবহ অবসেশন আছে। গোলাপ দিতে চাইলে কাঁটাই নেবে। আমি চিনি আফনানকে।"

"তবুও আমাকে দেখে হয়তো ভুল ভাবছে।"

"ভাবুক, কে কী ভাবছে তার দায় আমার নয়।"

ওরা রেস্টুরেন্টে এসে বসল।

"তুমি তো আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ৷ আফনানের সাথে সামনে এগুবে না?"

"না।"

"কেন?"

"সায়মন, আমি একেবারে অল্প বয়স থেকে আফনানকে পছন্দ করেছি। একবার কষ্ট পেয়ে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম৷ কিন্তু অনুভূতি মিলিয়ে যায়নি। এই যে লম্বা সময় ধরে ভালোবাসা, অভিমান, অনুযোগ সব শুধু একজনকে কেন্দ্র করে ঘুরেছে। তাই আমার পক্ষে অন্য কাউকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। স্বার্থপরের মতো অন্য একজন মানুষকে আমি বঞ্চিত করতে বা ঠকাতে পারব না। তাই তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তবুও আফনানকে আমি আর গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নই।"

"সেটাই জানতে চাইছি নীরা, এত ভালোবেসেও কেন দূরে থাকবে, সে-ও তো তোমাকে ভালোবাসে।"

নীরা ম্লান হেসে বলল, "আফনান গোটা দুনিয়া কী ভাবে সেটা চিন্তা করেছে। আমাকে ফিরিয়ে দেবার আগে সে আমার জন্য নাকি ভেবেছে। অথচ আমাকেই বুঝতে চায়নি। একবারও আমার চাওয়াকে, আমার অনুভূতিকে সে গুরুত্ব দেয়নি। বিয়েটা দ্বিপাক্ষিক বিষয়। তাই একা নিজের মতো করে একটা সিদ্ধান্ত নিতে সে পারে না। আমার ইচ্ছেকে পায়ে দলে আমাকে অপমান করার সুযোগ আমি আরেকবার ওকে দেব না। ওর এই অতিরিক্ত মহানুভবতা আমার পছন্দ নয়, যদি সেটায় নিজের ইচ্ছের মৃত্যু হয়। ও নিজের মনের সাথেই প্রতারণা করেছে।"

থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, "তুমি এখন তোমার বিয়েতে ফোকাস করো। এসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে।"

……..

(ক্রমশ)

এই এক বছরে নীরা, ওর মা আর সায়মনের মধ্যে কী ঘটেছিল তা আগামী পর্বে ইনশাআল্লাহ। আরেকটা কথা, গল্প দেবার কথা ছিল দু'দিন পরপর, টানা দুই পর্ব দিয়েও এক দিন বিরতিতেই আরেকটা পর্ব দিয়ে দিলাম।

গত পর্বে আমার উপরে মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন কারা? আজকের পর্বেই আপনার অনুভূতি কী?

আর দুই পর্ব হতে পারে, একটা বাড়তেও পারে ইনশাআল্লাহ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন