#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৩২)
নুসরাত জাহান লিজা
সেদিন নীরাকে সায়মনের সাথে দেখার পর থেকে অদ্ভুত এক অস্থিরতা গ্রাস করেছে আফনানকে। ভুলে যাওয়ার জন্যই এত কসরত করে পালিয়ে বেড়ানো, অথচ কিছুতেই ভোলা হলো না। বরং মনের মধ্যে উচাটন হচ্ছে। এই নক্ষত্রের নিচে ওর এই অসহ্য যন্ত্রণার কোনো উপশম নেই যেন। আজ মনে হলো একটু স্বার্থপর হলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যেত। সে তো এটুকুই চেয়েছিল নীরা সুখী হোক। সুখীই তো মনে হলো, তবুও অন্য কারোর সাথে সেই সুখ থেকে আফনান কেন এতটা দগ্ধ হচ্ছে! এমনটা তো হবার কথা ছিল না।
ঘুম বিদায় নিয়েছে ওর চোখ থেকে। নীরার কি সত্যিই বিয়ে হয়ে গেছে! ওর কোনো আশাই কী আর অবশিষ্ট নেই! নিজের এমন ভাবনায় নিজেকেই শাসায় আফনান। নীরার জন্য এমন ভাবনার অধিকার ওর আর নেই। তবুও হৃদয় বড্ড অবোধ। সে মস্তিষ্কের কথা শোনে না। তবে ওর একবার জানতেই হবে নীরার বিয়ে হয়ে গেছে কি-না। যদি না হয়ে থাকে সে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব।
মনের কোনো এক কোন থেকে ধিক্কার আসে, "নীরা কোনো খেলনা নয়। অমূল্য রত্নকে হেলায় ফেলে রাখলে তাকে আর ধরা যায় না। আর তুই ভাবছিস এতবার করে অপমানিত হবার পরেও সামনে দাঁড়ালে সে হাসতে হাসতে তোর গায়ে ঢলে পড়বে? ভুল, তুই মস্ত বড় ভুল।"
নিজের সাথে নিজেরই যু দ্ধ হয় আফনানের। যাকে পেতে অনন্ত সাধনা প্রয়োজন, সে যখন নিজেই ওর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল, সে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আজ আর কিচ্ছু বাকি নেই।
সকালে আয়েশা এলেন আফনানকে ডাকতে। কপালে হাত দিতেই উপলব্ধি করলেন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ছেলের। গত একবছর থেকেই তিনি ছেলের মধ্যে পরিবর্তন দেখছেন৷ কেমন যেন ছাড়াছাড়া ভাব। ছন্নছাড়া চলাফেরা। অথচ আফনান ছেলেবেলা থেকে ভীষণ গোছানো স্বভাবের। যা করে একাগ্রতা দিয়ে করে। অবশ্য এমন আচরণের কারণ সম্পর্কে তিনি অবগত।
নীরাকে তার ভারি পছন্দ হয়েছিল। আফনানের প্রতি মেয়েটার প্রবল টান তার চোখ এড়ায়নি। এর মধ্যেও তো তেমনই দেখেছিলেন। তবুও কিছু হলো না।
আফনানকে ডেকে তুলে খাইয়ে দিলেন, ওষুধ খাইয়ে মাথায় পানি দিয়ে দিলেন। দুপুরের দিকে জ্বর নামল খানিকটা।
শায়লা এলো বিকেলে। কোলে ছোট্ট রায়া। আফনান জ্বর গায়েও ওকে কোলে নিয়ে বসে রইল। এই পুচকেটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে। কী মিষ্টি করে হাসে। দাঁড়াতে শিখেছে, হাত ধরলে এক পা দুই পা হাঁটে। অস্পষ্ট বুলিতে কী বলতে চায় কিছুই বোঝা যায় না, তবুও ভালো লাগে ভীষণ। এক চিলতে হাসি ফুটে।
শায়লা ওর মোবাইলটা রেখে গেছে। হঠাৎ বেজে উঠল। শায়লা মায়ের সাথে রান্নাঘরে কী যেন করছিল, সেখান থেকে বলল,
"কলটা ধর আফনান। রবিন মনে হয়।"
আফনান মুঠোফোন হাতে নিয়ে নামটা দেখল। রবিন নয় নীরা। কোন নীরা! সে শায়লাকে আর ডাকল না। কৌতূহল নিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরল।
"শায়লা আপু, রায়া সোনামণি কেমন আছে?"
এপাশ থেকে আফনান নীরব। ওর যেন ভাষা বিস্মৃতি ঘটেছে। একটা কথাও বের হচ্ছে না।
"হ্যালো, হ্যালো….. হ্যালো শায়লা আপু, শুনছ?"
"কেমন আছিস নীরা?"
অবশেষে প্রায় অস্ফুটস্বরে বলল আফনান।
"খুব ভালো আছি। শায়লা আপুকে বোলো, ফ্রি হলে কল দিতে।"
বলেই রাখল নীরা। আফনান আচ্ছন্নের মতো বসে রইল। রায়ার ছোট্ট হাতের খামচি খেয়ে সম্বিৎ ফিরল।
"কী রে, রবিন কী বলল?"
"তোর নীরার সাথে যোগাযোগ আছে?" গলায় অস্থিরতা ওর।
"ওর সাহসিকতার জন্য আমি আর রায়া অক্ষতভাবে বেঁচে আছি আফনান। ওর সাথে যোগাযোগ থাকবে না?"
"হ্যাঁ, তাই তো। আমাকে বলিসনি তো!" অনেকটা বোকা বোকা মনে হলা নিজেকে।
"ওর সাথে কথা হয়, সেটা তোকে বলে কী হবে?"
উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল সে, "আচ্ছা শায়লা, ওর কি বিয়ে হয়ে গেছে?"
"আফনান, এসব জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন আছে কী এখন? তুই তো ওকে তোর ডিসিশন চাপিয়েই দিয়েছিস।" কঠোর শোনায় শায়লার গলা। নীরার সাথে এই বিষয়ে ওর কথা হয়নি। কেবল সেই সময় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আফনানের কাছ থেকে শুনেছিল। জানার পরে ভাইয়ের উপরে কিঞ্চিৎ রাগও হয়েছিল। সেই রাগ এখনো বহাল তবিয়তে আছে।
"বল না প্লিজ।"
"জেনে কী লাভ? বিয়ে হয়ে গেলে কী করবি? এক বোতল মদ নিয়ে ওর শ্বশুরবাড়ির সামনে গিয়ে মাতলামো করে মরবি? দেবদাস হবি?"
"ভুল করেছি। সেটা একবার শুধর নেবার চেষ্টা করব।"
"না বিয়ে হয়নি। তবে সারাজীবন নিশ্চয়ই তোর জন্য বসে থাকবে না।"
বলে শায়লা আফনানের কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বরের উত্তাপ তেমন একটা নেই। রায়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেল সে। আফনান বসে রইল। নতুন পাওয়া এই তথ্যটা ওকে প্রশান্তি দিল খানিকটা। তবে সামনে হয়তো সায়মনকে বিয়ে করবে।
আফনান নিলয়কে কল দিয়ে প্রশ্ন করার ভাবনা শুরুতেই বাতিল করে দিল। কন্টাক্ট লিস্ট ঘেটে দেখল ওর কাছে ইরার নম্বর আছে। সে ডায়াল করল।
"ইরা, আমি আফনান।"
"আমাকে মনে পড়ল তোমার? কোনোদিন কল দাও না।"
"তোর হেল্প লাগবে রে। এই ভাইটাকে হেল্প করবি না?"
"তার বিনিময়ে কী পাবো?"
"কী চাস তুই?"
"চকলেট। ভয় নেই, তোমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব না।"
"পেয়ে যাবি। তোকে চকলেটের পুকুরে চুবিয়ে রাখব।"
"তোমার মতলব কী আফনান ভাই? ঝেড়ে কাশো তো!" হেসে বলল ইরা।
সংকোচ নিয়ে বলল আফনান, "নীরা আর সায়মন….
ওকে শেষ করতে না দিয়ে ওই প্রান্তে ফিঁক করে হেসে ফেলল ইরা, "তাই তো বলি, তোমার এতদিনে আমার কথা কেন মনে পড়ল। শোনো, সায়মন ভাইয়ার বিয়ে হয়ে গেছে গতকাল। নীরা আপু সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে চিরকুমারী সংঘের লাইফটাইম মেম্বারশিপ নেবে। তোমার চান্সও খুব কম।"
"এরকম কোনো সংস্থা আছে নাকি দেশে?"
"না থাকলে নীরা আপু বানাবে। সে হবে পাইওনিয়ার। যদি নীরা আপুকে রাজি করাতে না পারো তবে তুমিও ওখানকার মেম্বারশিপ নিয়ে নিও।"
"এত ফাজিল হয়েছিস তুই? সামনে থাকলে মাইর দিতাম। এখন একটা উপায় বল, কী করা যায়?"
"আমাদের বাড়িতে যাও। বাঘ আর সিংহের মোকাবেলা করে দেখো। যদি জিততে পারো, তাহলে কেল্লাফতে। আমরা একটা বিয়ে খেতে পারব। নীরাপুর বিয়ে নিয়ে মনে মনে কত প্ল্যান ছিল, বেচারি বিয়ে না করলে সেসব কিচ্ছু হবে না।"
"তোদের বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দেবে?"
"দাঁড়াও, আমি ইলার সাথে কথা বলি। আমি বাড়িতে এসেছি আজই। তোমাকে কিছুক্ষণ পরে জানাচ্ছি।"
"ইলা? ও ছোট মানুষ।"
"ভুল আফনান ভাই। বলো ছোট মরিচ। সাইজে ছোট, কিন্তু ঝাল বেশি।"
এর প্রায় আধাঘণ্টা পরে ইরা আর ইলার সাথে আবার কথা হলো। আফনান ঠিক করল, আগামীকালই সে যাবে। মেয়ে বাঘ, মা সিংহ। বনের রাজত্ব দখল করতে চাইলে এই দুটো পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকে জয় করতে হবে। ভীষণ কঠিন এক লড়াই।
নীরাকে সে চেনে। জানে সহজ হবে না শুধরানো। হয়তো কিছুই হবে না। তবুও ভাগ্য যেহেতু ওর জন্য এখনো চেষ্টা করার সুযোগ রেখেছে, সে এবার হাল ছাড়তে চায় না। আরেকটা বাঁধা আছে, নিলয়। বন্ধু হলেও সে নীরার বড় ভাই। কীভাবে নেবে সে। ভুল বুঝবে না তো!
***
রোকেয়া রান্নাঘরে ছিলেন। এখনো রান্নাটা তিনি আর মরিয়মই করেন। সেখানে ইলা এসে দাঁড়ালো। হাতে আচার। ওর আচার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে এরচাইতে মজার কোনো খাবার পৃথিবীতে নেই।
"তোর পড়াশোনা নেই?"
"মা, আমি একটা কথা ভাবলাম। তুমি বলতে না, পড়াশোনা না করলে বিয়ে দিয়ে দেবে? তাই দাও। পড়তে ভালো লাগে না। ফেল্টু মেয়েকে কে বিয়ে করবে। পরে দেখা যাবে নীরাপুর মতো থাকতে হবে।"
রোকেয়া বললেন, "নীরার রেজাল্ট জানিস তুই?"
"নীরাপুকে ফেল্টু বলিনি। চিরকুমারী থাকার ব্রত নেয়া লাগবে, তাই বললাম।"
মরিয়ম বুঝতে পারছেন পাজি মেয়েটা কথা অন্যদিকে নিতে চাইছে। রোকেয়া রেগে যাচ্ছেন। তাই সামলানোর জন্য মেয়েকে ধমক দিলেন,
"ইলা, যা তো। কানের মধ্যে ফ্যাচফ্যাচ করিস না।"
"নীরাপু কোনোদিন বিয়ে করবে না। বলেছে তো। আচ্ছা আমার মনে হয় এর একটা ওষুধ আছে। আফনান ভাইকে দিয়ে একবার চেষ্টা করা যায় না? বেচারা দু'টোর একটা গতি হয়। নইলে নীরা আপু সারাজীবন একাই কাটিয়ে দেবে।"
বলে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। ওর কাজ শেষ। বেড়ালের গলায় ঘণ্টি বাঁধা কমপ্লিট। এখন সেটা বাজার অপেক্ষায়। রোকেয়াকে ইলা ভয় পায় কিছুটা। তবে এটুকু করতেই হতো। দেখা যাক কতটা কাজ হয়।
………
(ক্রমশ)
লেখা শেষ হয়নি এখনো। তবে প্রায় ৪০০০ শব্দের হবে ইনশাআল্লাহ পরের পর্ব। তাই আজ একটা পর্ব দিয়ে দিলাম। লাস্ট দুই পর্বে রেসপন্স আরও কমে গেছে। কমেন্ট ছাড়া ভাল্লাগে না।