ফন্ট সাইজ:
থিম:
জোনাকি প্রদীপ

৩৩তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান

#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ৩৩)

নুসরাত জাহান লিজা

রোকেয়া নীরার উপরে মনে মনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আছেন। পারলে ঠাঁটিয়ে গালে কয়েকটা চড় মেরে দিতেন। বাবার জন্য তেমন শাসন করা হয়নি বলে মাথায় চড়ে বসেছে। দুনিয়াটা ওর ইচ্ছে মতো চলবে নাকি! যার জন্য চুরি করা সেই যখন চোর বলে সাব্যস্ত করে তখন দুঃখের শেষ থাকে না।

জেদ ধরেছে বিয়ে করবে না। দুনিয়াটা এতই সহজ! দুদিন আগে যাকে তিনি অস্বীকার করে নানানরকম কথা শুনিয়ে নিরস্ত করেছেন এখন তাকেই ডেকে নিয়ে আসতে হবে, এটা ভাবতেই তার গায়ে জ্বালা ধরে যাচ্ছে। ওই ছেলে নীরাকে রাজি করাতে পারলে তাকে জামাই আদর করতে হবে। তার সাথেই কেন এমন হয়!

তিনি একজন মানুষ, তার ইচ্ছে অনিচ্ছা, পছন্দ অপছন্দের মূল্য কারোর কাছেই নেই। যাদের পেটে ধরে জন্ম দিয়েছেন, তাদের কাছেও নয়। নিলয়কে তিনি বুকে আগলে মানুষ করেছেন, অথচ ছেলে বিয়ে করল নিজের ঠিক করা মেয়েকে। ওদের বাবাও সারাজীবন চলেছেন নিজের মতো করে। তিনি যেন সংসারে ব্রাত্য।

তিনি মঈদুলকে বললেন, "নীরার বাবা, মেয়ের বিয়ের উদ্যোগ নিতে হবে না? তোমার তো কোনো হেলদোল নেই।"

"এসব তোমার ডিপার্টমেন্ট। তাছাড়া মেয়ে তো আর অবুঝ নয়। অবিবেচকও নয়।"

"তাহলে নিলয়ের বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে এসো।"

"সে কী? ওকেই যদি ডাকতে হয়, তবে মিছেমিছি জল ঘোলা করার কী দরকার ছিল?"

স্বামীর কটাক্ষ তার জ্বালা বহুগুণে বাড়িয়ে দিল। তবে তিনি পাকচক্রে পড়েছেন। এখন গায়ে এসে কাদা মাখবেই। আজ ইলার কথা শুনে তার রাগ হলেও কথাগুলো তাকে ভাবিয়েছে। মেয়েটার যা জেদ, যা বলেছে তার নড়েচড় হবার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে নিলয়ের বন্ধুকেই যেহেতু বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল, সে চেষ্টা করলে হয়তো মেয়ের মতি ফিরতেও পারে।

তিনি মঈদুলের কথার পৃষ্ঠে বললেন, "খুব মজা, তাই না? মেয়ে সারাজীবন তপস্বী হোক, তাই চাও?"

"দেখো, তুমি ছেলেটাকে যেভাবে বলেছ, তা ভীষণ অপমানজনক। মা তার দুর্বল জায়গা। সেটা নিয়েও কথা শুনিয়েছ। আমি বললেই সে আসবে এমনটা ভাবা অবান্তর।"

"তুমি বলবে না?"

"আগে তুমি কথা বলো। পরে দেখা যাবে।"

স্বামীর দিকে কটমটিয়ে তাকালেন রোকেয়া। এরপর নিলয়কে কল দিলেন।

"নিলয়, তুই একটু তোর বন্ধুর সাথে কথা বলিস তো।"

"আমার কোন বন্ধু?"

"ওইযে নীরার সাথে…"

"আফনানের কথা বলছ?"

"হ্যাঁ, ওই আফনান।" নামটা তার মনে ছিল, কিন্তু মুখে আনতে ইচ্ছে করেনি।

"কেন?"

"কেন মানে? বুঝিস না তুই? নীরার জন্য চিন্তা খালি আমার?"

"খুলে বলো তো মা তোমার প্ল্যান কী?"

"এত বলতে পারব না। তুই ওকে ডাক। বাড়িতে আসুক। তোর আদরের বোনের বৈরাগ্যের ভূত নামুক।"

"মা, এটা ছেলেমানুষি না?"

"হলে হোক। তুই কথা বল। এখনি বল। আগামীকালের মধ্যে এই বাড়িতে যদি পৌঁছাতে পারে, তবে আমি আপত্তি করব না। কিন্তু তারপর আর মানব না।"

রোকেয়া একেবারেই মন থেকে মানতে পারছেন না। তবুও তিনি চাইছেন, মেয়েটা এগিয়ে যাক। কখনো কখনো প্রতিকূলতার সাথে আপোষ করতে হয়, তিনি নাহয় আপোষ করলেন।

***

নিলয় আফনানকে কল করল, "আফনান, মা তোকে আগামীকালের মধ্যে আমাদের বাড়িতে যেতে বলেছে।"

"কারণ?"

"আফনান, শালা গাট্টা খাবি। ডুবে ডুবে জল খাওয়ার জন্য আমার বোনকেই তোর চোখে পড়ল।"

"নিলয়, তুই আমাকে ভুল বুঝিস না, আমি নীরাকে সত্যিই ভালোবাসি।"

"ঘোড়ার ডিম। এখন যদি বলি আমার আপত্তি আছে। আমি নীরার বিয়ে তোর সাথে দেব না?"

"আগে বললে ভেবে দেখতাম। এখন নীরার উপরে সব, তোর কথায় কাজ হবে না। এমনিতেই অনেক বড় ভুল করেছি। আর করতে চাই না।"

"তাইলে কালকের মধ্যেই আমাদের বাড়িতে চলে যা। মা'র এই অফার কিন্তু সীমিত সময়ের জন্য প্রযোজ্য।"

"তুই থাকবি?"

"নীরাকে রাজি করা। বিয়েতে লম্বা ছুটি নিতে চাইলে এখন আর হবে না। তুই ভালোয় ভালোয় যা। তবে তোর সাথে হিসেব-নিকেশ তোলা রইল৷ এতবড় কথাটা আমাকে জানাসনি।"

"তাই না?"

"আচ্ছা, তোর ব্যাপারটা কী? তুই যেন আগে থেকেই রেডি হয়ে ছিলি মনে হচ্ছে। এক পায়ে খাড়া, একবার সাধিলেই যাইব টাইপ?"

"পরে বলব। তোর বাড়িতে গিয়ে সফল হই আগে।"

"উইশ ইউ অল দ্যা ভেরি বেস্ট।"

নিলয় খুশি। এমন কিছুর জন্য সে অপেক্ষা করছিল। আফনান অসাধারণ ছেলে। অতি সাধারণ হয়েও ভীষণ অসাধারণ। নীরার মতো। মানাবে দুটোতে।

***

আফনান শঙ্কিত চিত্তে এসেছে বন্ধুর বাড়িতে। সদর দরজায় ইরা আর ইলার দেখা পেল। এরা একেকটা বিচ্ছু। অসাধ্য সাধন করে ওকে রোকেয়ার আমন্ত্রণে এখানে নিয়ে এসেছে।

"আগে চাচির সাথে দেখা করো। নীরাপু এই সময় ভাতঘুমে থাকে।"

"তোরা কী করে ম্যানেজ করলি?"

ইলা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, "আমি বলেছি নীরাপু তো চিরকুমারী থাকবে, আমাকে এখনি বিয়ে দিয়ে দাও।"

ইরা বলল, "এখন যদি তোকে সত্যি সত্যি বিয়ে দিয়ে দেয়?"

"এ্যাহ্! এত্ত সহজ? আমি কিশোর পাশা ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না।"

"স্বপ্নে। এটাও বল।"

"স্বপ্নেই করলাম নাহয়।"

ঝগড়া থাক, শান্তি বিরাজমান হোক।" আফনানের কথায় বিচ্ছু দুইটা শান্ত হলো। সিংহের গুহার সামনে চলে এসেছে ওরা।

"আফনান ভাই, আমরা তোমাকে রাস্তা দেখিয়ে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। আমরা যাই। এটুকু তোমরা করো।"

আফনান একবার দোয়া পড়ে বুকে ফু দিয়ে নিল। সত্যি কথা বলতে রোকেয়া আন্টির মুখোমুখি হবার ইচ্ছে ওর একদমই ছিল না৷ যেসব কথা তিনি বলেছিলেন তা এখনো ওর মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। তবে এসবের উর্ধ্বে এখন ওর ভালোবাসা। যাকে ছাড়া সে আর পালিয়ে বেড়াতে পারবে না। কেমন যেন বোকা বোকা ভাবনা বলে মনে হলো। মন যে কখন কী চায়! কেউ কী তা জানে!

"ভেতরে এসো।"

"আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন?"

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি তোমাকে নীরার জন্য ডেকেছি। আমার কাছ থেকে এরচাইতে নমনীয়তা আশা করো না।"

"আমিও আপনার মেয়ের জন্যই এসেছি আন্টি। তবুও আপনি মাতৃসম। আমার পারিবারিক শিক্ষা কিছুটা হলেও আছে।"

"আমাকে ইমপ্রেস করার চাইতে আমার মেয়েকে ইমপ্রেস করো। যাও, রেস্ট নাও। খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। খাও। এরপর কাজে নেমে পড়ো।"

"সেটা আমি নিজের তাগিদেই করব আন্টি। তবে আপনার কথাগুলো কেমন যেন ব্যবসাদার মানুষের মতো লাগছে। জীবনটা লেনদেনের নয় কিন্তু শুধু।"

"সেটা আমি জানি। তোমার চাইতে বয়সে বড় আমি ছোকরা। বেশি ফটফট করো না তো৷ যাও।"

"আপনি হঠাৎ মত বদল…"

"তোমাকে আমি সেদিন যে কথাগুলো বলেছিলাম, তার জন্য আমি লজ্জিত নই আফনান। তুমি যখন বাবা হবে আল্লাহ না করুন, সেই সন্তান যদি তোমার অমতে এমন একজনকে বিয়ের জন্য নিয়ে আসে, যাকে তোমার পছন্দ নয়, সেদিন তোমার ভূমিকা কেমন হবে আমি তা দেখার জন্য বেঁচে থাকতে চাই। আল্লাহ ততদিনে পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রাখলে আমি দেখতে চাই।"

রোকেয়া থেমে আফনান কিছু বলার আগেই বললেন, "আমার যা সঠিক মনে হয়েছে করেছি, এখনো তাই করছি। আমি আমার সন্তানদের ভালোই চেয়েছি।"

"সন্তানদের ভালো চাওয়ার সাথে সাথে তাদের ইচ্ছের গুরুত্বটুকুও মাঝেমধ্যে ভাবতে হয় আন্টি।"

এরপর আফনান আর কথা বাড়ায় না। ওর জন্য নির্ধারিত ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। ইরার কাছে শুনেছে নীরা বিকেলে ছাদে হাঁটাহাঁটি করে। তাই চিলেকোঠার ঘরেই সে থাকল।

একটা ফ্রেস ঘুম দিয়ে উঠল সন্ধ্যার আগে আগে। ছাদের এসে দেখল কেউ নেই। ভাবল ঘুমটা বেশি হয়ে গেল কি-না। নীরা কী ছাদে হেঁটে ফিরে গেছে! না, ধারণা ভুল, মিনিট খানেক পরেই নীরা এলো। ঘুমের জন্য চোখ ঈষৎ ফোলা। তবে ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। আফনানের মন ফুরফুরে হয়ে গেল।

"কেমন আছিস নীরা?"

নীরা ওকে এখানে দেখে যে আশ্চর্য হয়েছে তা স্পষ্ট হলো ওর খানিকটা চমকে উঠা দেখেই। তবে দ্রুতই সামলে নিয়েছে।

"তুমি এখানে কেন?"

"আসতে নেই?"

"কেন এসেছ?"

"তোর কাছে।"

"কারণ?"

"ভুল শোধরাবার জন্য।"

"সব ভুল শোধরানো যায়?"

"চেষ্টায় সব হয়।"

"কীভাবে ভুল শোধরাবে?"

"নীরা, পুরোনো তিক্ত অতীত পুড়িয়ে নিঃশেষ করে একবার নতুন করে সবটা শুরু করা যায় না?"

এবারের প্রশ্নের উত্তর দিতে নীরা কিছুক্ষণ সময় নিল। এরপর আফনানের চোখে চোখ রেখে আশ্চর্য দৃঢ়তায় সে বলল,

"ইউ আর লিভিং ইন এ ফুল'স প্যারাডাইজ।"

……..

(ক্রমশ)

(আগামীকাল শেষ পর্ব ইনশাআল্লাহ)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন