ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২য় পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ০২

#মাকামে_মারিয়া

দোস্ত তোর শাশুড়ি তো ইয়াং লেডি!

" মুখটা বন্ধ রাখ।"

উনাকে দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেলো তো! বন্ধ রাখবো কি ভাবে! আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম এটাই পাত্রী কিনা! পরে তো শুনি এটা মেয়ের মা, মেয়ের মা-ই যদি এতো ইয়াং হয় তবে মেয়ে না জানি কত...

বন্ধু রওনকের বাকি কথাটা শেষ করতে দিলো না নাফিজ। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে ঠেকিয়ে উঠে চলে গেলো।

রওনক বসে আছে বড় ড্রয়িং রুমটার এককোনায়, শুধু বসে নেই, বসে বসে শিয়ালের বাচ্চার মতো এদিক সেদিক করছে। পাশেই নাফিজের বড় মামা খোরশেদ খান আর ছোট খালা খুশী রহমান বসে আছেন।

রওনক বার বার স্বর্ণা চৌধুরীর দিকে নজর দিচ্ছে। মেয়ের মা এতো সুন্দর হলে মেয়ে না জানি কত সুন্দর ভাবতেই রওনকের মাথা ঘুরাচ্ছে।

স্বর্ণা চৌধুরীর বয়স চল্লিশের বেশি নয়, গায়ে চকচকে গহনা সাথে বেগুনি জামদানী শাড়ি। বয়সের ছাপ ততটাও নেই বললেই চলে। লাক্সারি জীবনযাপন তার। প্রায় অনেকেই মেহনাজের সাথে তাকে গুলিয়ে ফেলে। কেউ কেউ তো মা'কে মেয়ের বান্ধবী মনে করে কখনো বা বড় বোন।

রওনকের ডাক পড়লো, সে আর বেশি কিছু ভাবতে পারলো না। দূর থেকে নাফিজ হাতের ইশারায় ডাকলো।

" কি হয়েছে ডাকছিস কেনো? কে কল করেছিলো?

নাফিজ গম্ভীর কন্ঠে বললো — আন্টি কল দিয়েছে তোকে ইর্মাজেন্সি বাসায় যেতে বললো।

" আন্টি! কোন আন্টি?

" নয়মাস একুশ দিন তোকে পেটে ধরেছে যিনি তোর মা জননী, আমার সেই বন্ধু্ত্ব আন্টি।

" আম্মু কল করেছে। কিন্তু হঠাৎ আমি বাসায় কেনো যাবো ব্রো?

" যেতে বলেছে তাই যাবি।

" আমি এখানে পাত্রী দেখতে আসছি ব্রো। আম্মুকে বল আমি তোদের সাথেই ফিরবো।

" বিয়েটা তোর না আমার, সো পাত্রী আমি দেখবো। তোর না দেখলেও চলবে। যাহ গেট আউট।

" কিন্তু...

" কোনো কিন্তু নয়। তোকে যেনো আর এখানে না দেখি।

" তোকে আমি দেখে নিবো শ্লা।"

বিরবির করতে করতেই রওনক দাঁত কিড়মিড় করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।

নাফিজের ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি, রওনকের কথার বিপরীতে ফিসফিস করে আওড়ালো —

" আমাকে তো সে-ই ল্যাংটা কাল থেকেই দেখেতেছো ডার্লিং! আমার হবু বউয়ের দিকে নজর না গেলেই হয়।

রওনক খুব ভালো করেই জানে তার মা কল টল কিছু করেনি। নাফিজ নিজেই তাকে তাড়ানোর জন্য এসব করেছে।

___________

কলপাড়ে থালাবাসন জমে আছে। জেরিন রান্নার কাজ শেষ করে একটু জিরিয়ে নিবে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠলো।

" হ্যালো, হ্যাঁ মেহনাজ বল শুনছি?

ওপাশ থেকে রুক্ষ কন্ঠে মেহনাজ বললো —

" বাসায় আয় তো।

" বাসায়? তোগো বাসায়? হঠাৎ ক্যান? কিছু হইছে?

" আসতে বলছি তাই আসবি। এতো কথা বলতে পারবো না। মন চাইলে আসিস, না হয় দরকার নেই।

একনাগাড়ে কথাগুলো বলেই ফোনটা কেটে দিলো।

জেরিন তাজ্জব বনে গেলো। বান্ধবীর স্বভাব তার জানা, তাই বুঝতে অসুবিধা হলো না যে মেহনাজের কিছু একটা হয়েছে।

কিন্তু হাতের কাজকাম সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে তো চলে যাওয়া যায় না। তাই গলা ছেড়ে ডাকলো —

" দাদী?? ওও দাদী?? একটু কলপাড় আহো না! একটু হাতে হাতে কামটা ধরলে তো ভালো হইতো।

জেরিনের দাদীর নাম শেফালী বেগম। বয়স ষাটোর্ধ, বয়স্ক হলেও গৃহস্থালি কাজকর্ম বেশ ভালোই পারে। পারলেও সব সময় করতে চায় না। জেরিনাকেই করতে হয়।

এই যে এখন হাঁকডাক করলো মহিলা আসলো না। সে পাড়ার তিন চারজন বৃদ্ধাকে নিয়ে আসড় জমিয়েছে। এখন সেই আসড় ছেড়ে আসার মতো মানুষ তিনি নয়।

আসবে না জেনেও জেরিন তাকে ডাকলো।

ডেকে নিজেই কিছুটা তাড়াহুড়ো করে কাজে হাত লাগালো।

মেহনাজের কি কি হতে পারে ভেবেই আনমনে থালাবাসন সাবান পানি দিয়ে মাজতে লাগলো।

হঠাৎ পিছন থেকে মকবুল এসে জেরিনের সাথে কাজে হাত দিয়েছে। সে একহাতে টিউবওয়েল চেপে দিয়ে অন্য হাতে সিগারেটে শেষ টান দিলো।

" ওমা গো! মকবুল ভাই আমি ডরাইছি তো।

জেরিনের ভয়ার্ত মুখটা দেখে মকবুল ফট করে হেঁসে দিয়ে বললো — তুই ডরাইলেও তো তোরে দেখতে সুন্দরই লাগে জরিনা।

" ছিহ! কি বিশ্রী কথাবার্তা কইতেছেন মকবুল ভাই! আর আপনে এইহানে আইছেন ক্যান? বাইর হন আমাগো বাড়িত থাইকা।

" তোরে একটু সাহায্য করবার আইছি। চুপচাপ কামে হাত দে। আর একটা শব্দ করলে চুলে টান খাইবি।

জেরিন আর কিছু বললো না। এখন মকবুলের সাথে চুলোচুলি করারও সময় নয়। মেহনাজ ডেকেছে তাই দ্রুত যেতে হবে।

মকবুল টিউবওয়েল চেপে পানি দিচ্ছে আর জেরিন থালাবাসন গুলো ধুচ্ছে।

আইচ্ছা জরিনা, তোর ওই বড়লোকের ব্যাটি মেহনাজ এর লগে বন্ধুত্ব কেমনে হইলো?

" প্রশ্ন করলে কিছু জাতের প্রশ্ন কইরেন মকবুল ভাই । এমন অজাতের প্রশ্ন কইরেন না।

" ধ্যাতেড়ি! প্রশ্নেরও আবার জাত অজাত আছে। কি যে কস না জরিনা।

" তো কি! বন্ধুত্ব কি ধনী গরীব দেইখা হয়? আপনে যেমন প্রশ্ন করলেন।

" যাকগে তুইও কি ওই বাড়িতে যাইবি নাকি? দেখলাম অনেক মানুষজন আইছে।

জেরিন মকবুলের মুখের দিকে তাকালো, একটু থেমে বললো — মানুষজন? কিয়ের মানুষ আইছে জানেন কিছু?

" ডরাইস না জরিনা, ডরাইস না। মরা বাড়ি না। কেউ মরে নাই।

বিয়া বাড়ি। তোর বান্ধবীর মনে হয় বিয়া লাগবো।

জেরিনের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসলো। বান্ধবীর বিয়ে, মানে মেহনাজের বিয়ে। এই জন্যই মেয়েটা এমন ত্যাড়ামি করলো।

________

বাহিরে কড়া রোদ, রোদের তাপ বারান্দা বেদ করে রুমে এসে পড়ছে। মেহনাজ তখন বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে।

স্বর্ণা চৌধুরী মেজাজ তুঙ্গে উঠিয়ে মেয়েকে চাপা গলায় ডাকলো।

মেহনাজ মায়ের ডাক শুনলেও প্রথম বারেই রেসপন্স করলো না। কিছুক্ষন পর মনে হলো যা হওয়ার হবে, মানুষ গুলো নিজেদের ঘরে এসে বসে আছে অতএব এখন বেয়াদবি করলে কপালে দুঃখ আছে।

দরজা খুলে উঁকি দিতেই স্বর্ণা সামনে এসে দৃশ্যমান হলো। মেহনাজ মায়ের পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নাক কুঁচকালো। তাশফিয়া পিছন থেকে ফুসফুস করছে। দুটো মেয়ের কোনো মেয়েই মা'কে ততটাও দেখতে পারে না।

" চোখ মুখের একি অবস্থা করেছো তুমি???

স্বর্ণার রুক্ষ ধমকে মেহনাজ একটু কেঁপে উঠল।

" এই চেহারা নিয়ে তুমি পাত্রপক্ষের সামনে যাবে?? হাও ইস্টুপিট গার্ল!!

মেহনাজের বলতে ইচ্ছে করলো — হ্যাঁ হ্যাঁ তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে। তুমিই যা-ও না তাদের সামনে আমাকে দেখে কি করবে? আমার কোনো মতামতের দরকার আদোও ছিল?? সব তোমার চয়েস মতো হয়েছে অতএব বাকিটাও হোক।

কিন্তু এগুলো কল্পনা অব্দিই ঠিক আছে। মেহনাজ মায়ের সাথে গলা উঁচু করে কথা বলতে শিখেনি। মা'কে সে যথাসম্ভব ভয় পায়। মা-ও তাকে এমন ভাবেই শাসনে রেখেছেন।

গতকাল কলেজ থেকে ফিরে বিয়ের নিউজ শুনার পর থেকে মেহনাজ চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি সারাটা রাত। কিসের এতো চিন্তা সে জানতো না। কিন্তু খুব অস্থির লাগছিলো।আজ হোক বা কাল,বিয়ে তাকে মায়ের পছন্দ মতোই করতে হবে এটা সে খুব ভালো করেই জানতো। তাও কোনো এক অজানা কারণে মেয়েটার চোখ মুখ সত্যি চুপসে গিয়েছে।

স্বর্ণা চৌধুরী তাশফিয়াকে ডেকে বললো —

" মেহনাজের জন্য বরফ পানি লেবুর রস মিশিয়ে নিয়ে আসো।

তাশফিয়া মুখ ভেঙচি মেরে বললো — উঁহু পারবো না। খালাকে বলো।

" আমার মেয়ের স্কীনকেয়ারের বিষয় এটা। এখানে খালা কেন আসবে?? তাকে রান্নাঘর -দোর পরিষ্কার করার জন্য রাখা হয়েছে আমার মেয়ের স্কীন পরিষ্কার করার জন্য নয়।"

তাশফিয়া বড় বড় চোখ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

সে মেহনাজের মতো মা'কে ওতোটাও ভয় পায় না। স্বর্ণাও মেহনাজের মতোই তাশফিয়াকে কাবু করতে পারে না।

" মানুষ গুলো চলে যাওয়ার পর দুটোকে ধরবো। "

রাগী কন্ঠে কথাটা বলেই গটগট পায়ে স্বর্ণা চলে গেলো।

তাশফিয়া ব্যঙ্গ করে বললো — এহহহ দুটোকে ধরবো!! পারো তো এটাই। কিছু হলেই দুটোকে ধরে উড়াধুড়া মাইর।

" আহা তাশফু! বেয়াদবি হচ্ছে কিন্তু। "

" চুপ থাকো আপু। তোমার এই ঢংয়ের কারণে আম্মু আরও বেশি শাসন করে আমাদের। "

" করলে করুক! চল বের হ আমি রেডি হবো।"

" তুমি রেডি হবে তো আমি থাকতে পারবো না??

" নাহ আমার লজ্জা লাগবে জানিস না??

" ওপসসস আপু!! তুমি একটা,,, ইশশ তুমি যে কি!! তুমি একটা ঢেঁড়স!! কই ছোট বোন সাজগোছে বড় বোনকে হেল্প করবে আর তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো!"

" ওহো!! আসছে হেল্প করতে৷ আম্মু যে বললো বরফ পানি আনতে, গিয়েছিলি??

" আরেহ! ওটা তো আম্মুর উপর রাগ দেখিয়ে বলেছি।"

" তোর আবার কিসের রাগ আম্মুর উপর?? রাগ করার মতো তোর সাথে আদোও কিছু করেছে? নাকি করতে পেরেছে? সব সময় আমার সাথেই পারে উনি। ছোট কাল থেকেই একটু উনি বিশ হলে সমস্ত রাগ আমার সাথে মিটিয়েছে।"

" আচ্ছা হয়েছে হয়েছে আপু ইমোশনাল হয়ো না তো। বাহিরের ঘরে হবু দুলাভাই বসে আছে। লজ্জায় একটু লাল নীল হও।"

মেহনাজ এবার তাশফিয়ার হাত ধরে টেনে রুম থেকে বের করে দিয়ে বললো —

" লজ্জায় লাল নীল হওয়ার মতো মেয়ে অন্তত আমি না।

ভুলে যাবি না আমি স্বর্ণা চৌধুরীর মেয়ে। যতটা আলাভোলা ভাবিস ততটাও না। "

চলবে..........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন