#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ০৩
#মাকামে_মারিয়া
রওনক গাড়িতে উল্টেপাল্টে শুয়ে আছে। মেজাজ খুব খারাপ। তাকে বাসায় যেতে বললেও সে যায়নি। নাফিজকে ইচ্ছে মতো ধুবে ভেবে রেখেছে।
বসে বসে নাফিজের ফোনে সমানে টেক্সট আর কল করে যাচ্ছে, উদ্দেশ্য নাফিজকে ডিস্টার্ব করা, সে যেনো শান্তিমতো পাত্রী দেখতে না পারে। তারা দুজন বন্ধু হলেও দু'জন যেনো দুজনকে শান্তিতে থাকতে দিতে রাজি না।
তাই তো নাফিজ ফলমূল আর নাস্তার টেবিলের ছবি রওনকের কাছে পাঠালো। এই ছবি দেখে রওনক বেচারা নাক কুঁচকে লিখলো—
" বদহজম হবে তোর!! হজম হবে না বলে দিলাম।
নাফিজ আড়চোখে মেসেজটা দেখে ফোনটাকে সাইড করে রেখে দিলো। জনসভায় বসে হবু বর ফোন দেখবে ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখায় না।
পিছনের দরজা দিয়ে তড়িঘড়ি করে প্রবেশ করলো জেরিন। গায়ে কুঁচকানো জামা, হাত পায়ে চিটচিটে ভাব, থালাবাসন পরিষ্কার করে ভালো করে হাত ধুয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এমতাবস্থায় সে স্বর্ণা চৌধুরীর সামনেই পড়লো।
মহিলার সামনে পড়তেই বুকে থুথু দিয়ে বিরবির করে পড়লো — লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লা।
" আ আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
স্বর্ণা জেরিনের পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিলো। ঠোঁট নাড়িয়ে সালামের জবাব দিয়ে হাতের ইশারায় ডানপাশের ওয়াশরুম দেখিয়ে বললো —
" ফ্রেশ হয়ে মেহনাজের কাছে যা-ও। সে হয়তো তোমার জন্যই ওয়েট করছে। তুমিই যদি অপরিষ্কার হও তবে আমার মেয়েকে সাজাবে কি ভাবে!!
" জি আন্টি জি! ইয়ে মানে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে!!
" বুঝেছি, দ্রুত যা-ও। ইয়াং ছেলেপেলে কই একটু স্মার্ট হয়ে চলাফেরা করবে তা না!! আমারও হয়েছে দুটো।
জেরিন মুচকি হেঁসে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুম ঢুকে গেলো।
স্বর্ণা বরাবরই এমন, প্রায় মেহনাজ আর তাশফিয়ার মতোই জেরিনকে শাসনে রাখে। সব সময় গুছিয়ে চলাফেরা করতে বলে। জেরিন খুব উপভোগ করে তার এই শাসন। আজ মা থাকলে নিশ্চয়ই উনার মতো একটু আকটু বকাঝকা করতো।
খানাপিনার পর্ব শেষ, সবাই এবার মেয়েকে দেখার অপেক্ষায়। তারা এসেছে ছেলেসহ চারজন।
তার মধ্যে নাফিজ আর নাফিজের মামা খালা উপস্থিত থাকলেও নাফিজের বন্ধু রওনক বাহিরে গাড়িতে বসে আছে।
হাশেম বাহাদুর চৌধুরী মেহমানদের সাথে বসে ছিলেন।
মেহমানরা পাত্রী দেখার তাড়া দিলেন। উনি গলা ছেড়ে ডাকলেন —
" এলিন, দাদু ভাই হলো তোমার? চলে আসো এবার।
মেহনাজকে তখন চুল বেঁধে দিচ্ছে জেরিন আর তাশফিয়া।
সাজসজ্জা মোটামুটি শেষ। চুলটা বাঁধা হয়ে গেলেই পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়া যাবে।
বাগানের তরতাজা লাল টকটকে গোলপ ফুল দিয়ে বানানো মালাটা তখন মেহনাজের খোঁপায় বাঁধা হচ্ছিল।
স্বর্ণা রুমে ঢুকেই বললো —
" কি করছো? চুল বেঁধেছো কেনো জেরি? আর এতো সময়ই বা নিচ্ছো কেনো তোমরা? মানুষ গুলো কখন থেকে বসে আছে।
" ইয়ে আন্টি চুল বাঁধবো না?
তাশফিয়া চোখ মুখ কুঁচকে বিরবির করে বললো —
" হুহ্ আসছে!! হাজারটা ভুল ধরবে এখন।
স্বর্ণা চৌধুরী তাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো — চড়িয়ে দাঁত ফেলে দিবো তাশফিয়া। ভুল করবে আর সেটা বলতে পারবো না।
" ইশশ! আস্তে আস্তে বলছিলাম তাও শুনে ফেললো!!
স্বর্ণা সব কিছু বাদ দিয়ে মেহনাজকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো। মেহনাজ যেনো একটা পুতুল, তাকে যে ভাবে ঘুরাচ্ছে সে ঘুরছে। স্বর্ণা চুলের খোঁপা খুলে দিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দিলো। শাড়ির আঁচল টেনে গোমটা দিয়ে দিলো। কানের পাশে দুটো লাল গোলাপও গুঁজে দিলো।
জেরিন আর তাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে মেহনাজকে দেখিয়ে বললো —
" আগের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে না??
জেরিন হেঁসে বললো — হ্যাঁ আন্টি খুব সুন্দর লাগছে।
তাশফিয়াও খেয়াল করলো সুন্দর লাগছে, কিন্তু সে মুখে কিছু বললো না। তবে এতোটুকু প্রমাণ সে সব সময়ই পায় যে তার মা যা-ই করুক কখনো সেটাতে তাদের খারাপ হয়নি বরং ভালোই হয় আর হয়েছে।
মেহনাজকে নিয়ে আসলেন তার দাদু ভাই। এর আগেও চারবার পাত্রপক্ষের সামনে বসতে হয়েছে মেয়েটাকে। কেনো জানি মেহনাজের ভয় লাগে না এসব। মেয়েটা একটু কম ভীতুই।ছোট কাল থেকে মা-কে ছাড়া আর তেমন কিছুই সে ভয় পায় না। তবে তার মা'ই তাকে এ ভাবে বড় করেছে যেনো শুধু তাকে ছাড়া দুনিয়ার আর কিছু ভয় না পায়, সমস্ত কিছুই যেনো জয় করতে পারে।
গায়ে মেরুন রঙের শাড়ি, খোলা চুল, সরু হাত ভর্তি চিকন চুড়ি ঠোঁটে মিষ্টি হাসির মেহনাজ উপস্থিত হতেই নাফিজ নড়েচড়ে বসলো।
নাফিজের কেমন নার্ভাস লাগছে। এর আগে সে সরাসরি মেয়ে দেখতে যায়নি, এটাই প্রথম। এর আগে অন্যরা দেখে আসতো তবে এটাতে তাকেই আগে দেখার জন্য বলা হলো।
মেহনাজের উপস্থিতি টের পেলো নাফিজ, এক অদ্ভুত সুগন্ধির ঘ্রাণ নাফিজের নাকে লাগতেই শরীরে শিহরন অনুভব করলো। প্রচন্ড নার্ভাসে সে এখনো মেহনাজের দিকে তাকায়নি। তবে মিষ্টি আর সুরেলা কণ্ঠের সালাম শুনে মনে মনে সালামের জবাব নিয়েছে।
বড় মামা প্রশ্ন করলো — ভালো আছো মামনি?
" জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি ভালো আছেন??"
সাধারণ কুশলাদি শেষে নাফিজের মামা খোরশেদ খান খুশী রহমানকে ফিসফিস করে বললো —
' আপা আপনার কিছু প্রশ্ন করার থাকলে করেন। '
খুশী একটু এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো —
তোমার নামটা যেনো কি —
' মেহনাজ এলিনা চৌধুরী।'
' বেশ সুন্দর নাম।' তোমার বাবার নাম —
আজিমউদ্দিন চৌধুরী।
তোমার মায়ের নাম —
' স্বর্ণা চৌধুরী, দাদু ভাই হাশেম বাহাদুর চৌধুরী, ছোট বোন তাশফিয়া মায়া চৌধুরী'। আমার ফ্যামিলিতে আর কেউ নেই।
খুশী রহমান একটু অন্য ভাবে মেহনাজের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়ে তার প্রশ্ন করার আগেই উত্তর দিয়ে দিলো ভেবেই নাক কুঁচকালো।
ঠিক এমন সময়ে নাফিজের বড় মা কোহিনূর কল দিলো খুশীর ফোনে। খুশী মেকি হেঁসে উঠে চলে গেলো বারান্দায়। ফোনটা রিসিভ করেই ফুসফুস করে বলতে লাগলো —
' আপা, হ্যাঁ আসসালামু আলাইকুম। হ্যাঁ হ্যাঁ মাইয়া দেখছি।'
ওপাশ থেকে বললো — কেমন দেখতে মেয়ে? আর স্বভাব চরিত্র?
' আধাঘন্টা দেখেই কি আর এতো কিছু আন্দাজ করা যায় নাকি আপা?'
' তোকে পাঠানোই তবে ভুল হইছে খুশু।
মেয়ে দেখতে পাঠানো লাগলে চতুর মানুষদের। ভাত যেমন একটা টিপলেই বুঝা যায় বাকিদের কি অবস্থা তেমনি মানুষকে দেখার সাথে সাথেই বাপের নাম বুঝে ফেলতে হয়।
' তাইলে আমারে পাঠাইছো কেন! অন্য কাউরে পাঠাইতা।
' হইছে! তারপর বল?
' তারপর আর কি মাইয়া অনেক পটু মনে হয়।'
' কি দেখে, কি দেখে এটা মনে হলো খুশু? মাইয়া কি তোদের সাথে বেয়াদবি করছে?'
' আরেহ না আপা। আচ্ছা বাসায় গিয়ে বিস্তারিত বলবো, মেয়ের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আদোও এসব বলতে আছে? '
খুশী পিছন ফিরতেই দেখলো সে যেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বড় বোনের সাথে বকবক করছিলো,ঠিক তার পাশের উল্টো দিকের বারান্দা টায় জেরিন আর তাশফিয়া দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
খুশী ভয়ে পেয়ে উঠলো। মেয়েগুলো বুঝি কথাগুলো শুনে ফেললো ভেবেই খুশির চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
আর যাইহোক খুশীকে বলে পাঠানো হয়েছে অন্তত এই বাড়ির মেয়েকে নিয়ে যেনো কোনো কানাঘুষাঁ না হয়। কারণ এটা যে সে-ই মেয়ে নয়, স্বর্ণা চৌধুরীর বড় মেয়ে৷
চলবে..........
( গাইষ আপনারা যারা বিবাহিত তারা তাদের পাত্রপক্ষ দেখতে আসার মজা কাহিনি সেয়ার করেন 🫣)