ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

১০ম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

বিয়েতে তোমার আপত্তি নেই তো মেহনাজ?

মেহনাজ ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। কিছুটা অবাক হয়ে বললো, হঠাৎ আমার থেকে মতামত নিচ্ছেন যে আম্মু?

স্বর্ণা চৌধুরী হাত কচলাতে কচলাতে বললো, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়ে গিয়েছে। তুমি খুব ভালো করেই জানো তোমার থেকে আমি মতামত জানতে চাইবো না। কারণ আমার সিদ্ধান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। এটাই হয়ে আসছে ছোট থেকে।

মায়ের কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে মেহনাজ বললো, হ্যাঁ আম্মু! সেটাই তো! আমিও তো সেটাই বলছি আপনি হঠাৎ আমার মতামতের জন্য এতো উতলা হচ্ছেন কেনো?

আমি উতলা হচ্ছি না, নাহিয়ান বার বার জানতে চাচ্ছে তোমার মতামত কি? তুমি কি ভাবে বিয়ে করতে চাও! বিয়ে নিয়ে তোমার কোনো প্ল্যান আছে কিনা!

মেহনাজ স্মিথ হাসলো। লোকটা হবু বর, কিন্তু মেহনাজের মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে ভেবে মন্দ লাগছে না। কিছুটা সাহস করেই মেহনাজ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, আম্মু মতামত যে জানতে চেয়েছে তাকেই বরং মতামত জানাই?

স্বর্ণা ব্রু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকালো। মুখে কিছু না বললেও ঘাড় কাত করিয়ে অনুমতি দিয়ে চলে গেলো। মেহনাজের ঠোঁটের কোণে আবার হাসি ফুটে উঠলো এটা ভেবে যে এই প্রথম বার মায়ের সাথে কথায় পেরে উঠেছে। এটা আনন্দেরই বটে!

মির্জা বাড়িতে যেনো বিয়ে লেগে গিয়েছে। মহল্লার সমস্ত পাড়ায় নাহিয়ান নাফিজের বিয়ের গুঞ্জন। তার সাথে মির্জা নওয়াজ হাসানও এতো দিন পর বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরছে। সমস্তটা মিলিয়ে আনন্দে টইটম্বুর।

ছোট মা শামসুন্নাহার এসে নাফিজকে খেতে ডাকলো। নাফিজ বলে দিলো এখন খিদে নেই। শামসুন্নাহার ছেলের পাশে এসে বসলো। নাফিজ বুঝলো মা হয়তো কিছু বলতে চায়।

কিছু কি বলবেন আম্মা?

শামসুন্নাহার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, আমি মেয়েকে একবার দেখতে চাই।

নাফিজ ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। কিছুটা বিব্রত হয়েই জানতে চাইলো, কেনো আম্মা? আপনার কি বিয়েতে দ্বিমত আছে?

শামসুন্নাহার নওয়াজ হাসানের ছোট স্ত্রী, নাফিজের ছোট মা। সমস্ত কিছুতে তাকে আগে আগে রাখা না হলেও সে নিজেই নিজেকে সব কিছুতে আগে রাখে। কিছুটা নিজের অধিকার নিজে হরণ করার মতো।

কি হলো বললেন না তো আম্মা? বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গিয়েছে। আগামী নয় অক্টোবর, ত্রিশ আশ্বিন, বাংলায় ১৪৩২ বঙ্গাব্দে শুক্রবার আমাদের বিয়ে। আপনি হঠাৎ মেয়েকে কেনো দেখতে চেয়েছেন?কোনো সমস্যা হয়েছে?

আমার ছেলে বিয়ে করবে আর মেয়েকে দেখতে চাওয়া আমার অন্যায়? দেখলাম না!

কাঠ কাঠ কন্ঠে কথাগুলো বলেই শামসুন্নাহার উঠে গেলেন বসা থেকে। নাফিজ মায়ের হাত ধরে থামিয়ে দিলো। পাশে বসিয়ে বললো, আম্মা! রাগ করছেন কেনো? আমি শুধু জানতে চাইলাম বিয়ে পাকাপোক্ত হয়ে যাওয়ার পর আপনি হঠাৎ মেয়েকে দেখতে কেনো চাইছেন? আপনার কি দ্বিমত আছে বিয়েতে?

আমি মেয়ে দেখার অধিকার রাখি। আমাকে তো দেখতে দেওয়া হলো না। ভেবেছিলাম ছেলের জন্য দেখেশুনে মেয়ে আনবো। শামসুননাহারের কন্ঠে হাহুতাশ।

নাফিজের নাকের ঢগা লাল হয়ে গেলো। কিন্তু রাগ দেখানো যাবে না। সে শান্ত কন্ঠে বললো, আপনারাই তো দেখেশুনে বিয়ে দিচ্ছেন। আমি নিশ্চয়ই আমার নিজের পছন্দমতো বিয়ে করছি না। আর তাছাড়া বড় আম্মাও তো মেয়েকে আলাদা ভাবে দেখেনি তাহলে কাকে মিন করে এসব বলছেন!

শামসুন্নাহার যেনো এবার সুযোগ পেয়ে বসলো। সে তড়িঘড়ি করে বললো, তোমার বড় আম্মা মেয়ে নিজ চোখে দেখেনি তো কি হয়েছে! তার বোনকে পাঠিয়েছে দেখতে।

আপনার ভাইও গিয়েছে আম্মা। খোরশেদ মামা এই বিয়ের আগামাথা সবই জানে। তা-ও কেনো বিষয়টা ঘোলাটে করছেন?

শামসুন্নাহার এবার চুপসে গেলো। ছেলের কাছে একটু সুযোগ পাবে ভেবেছিলো। কিন্তু না ছেলে সে-ই সুযোগ কখনো দেয়নি আর আজও দিলো না।

নাফিজ বললো, কখন যেতে পারবেন জানাবেন আমায়। রওনকে বলবো নিয়ে যেতে। আমার বউ রাজকন্যা আম্মা। ফেলনা জিনিস নয় যে আপনার পছন্দ হলো না নেড়েচেড়ে দেখে চলে আসবেন।

শামসুন্নাহারের বোধহয় ছেলের মুখে না হওয়া বউয়ের প্রশংসা শুনে মোটেও ভালো লাগলো না। শাড়ির আঁচল দিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

নাফিজের মেজাজ কিছুটা ক্ষিপ্ত। ঠিক এই কারনে সে ফ্যামিলি থেকে নিজেকে একা রাখতে চায় কিন্তু সেটা কখনোই সম্ভব নয়। সে একটা মাত্র সন্তান তাদের। যত ঝুটঝামেলাই হোক না কেনো সবাইকে একসাথে মিলেমিশেই থাকতে হবে। নাফিজ চায় না তার বাবা এবং বউ এসে এমন ঝুটঝামেলার মধ্যে ফেঁসে যাক। তাই আগে থেকেই দুই মা'কে ডেকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবে ভেবেছে।

মা আসার আগে রওনক সহ ফ্রেন্ডস গ্রুপে ফোনকলে আলাপ হচ্ছিল নাফিজদের। নাফিজের আবদার সবাই যে যেখানে যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেনো, বিয়েতে উপস্থিত হতেই হবে। নাফিজ মায়ের সাথে কথা বলার সময়টুকু অন্যরা কলেই ছিল। শামসুন্নাহার চলে যাওয়ার পর নাফিজ দু'হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছে নিজেকে গুছিয়ে নিলো। ফোনটা পুনরায় হাতে নিলো কলে জয়েন হবে ভেবে। কিন্তু ফোন স্ক্রিনে প্রিয়তমার টেক্সট ভাসছে দেখেই বুকটা ধক করে উঠলো। মেহনাজ ছোট করে লিখেছ, কথা বলতে চাই।

নাফিজ লাফিয়ে উঠলো। ছোট একটা টেক্সট মন ভালো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এটা তার জানা ছিল না। প্রেমে পড়লে বুঝি এমন বহু অজানাকে জানা হয়ে যায়?

বন্ধুদের কলে আর জয়েন না হয়ে মেহনাজকে দ্রুত কল দিলো। কল দেওয়ার কিছুক্ষন পরেই মেহনাজ কল রিসিভ করলো। দু'পাশে নিরবতা। মেহনাজ কি বলবে বুঝতে পারছে না। কথাগুলো যেনো গলায় আটকে আসছে। ভীষণ আড়ষ্টতা ঘিরে ধরেছে মেয়েটাকে।

নাফিজের ওতো ভয় নেই। সে গলা ঝেরে সালাম দিলো।

মেহনাজ মিষ্টি কন্ঠে সালামের জবাব নিতেই। নাফিজ ফিসফিসিয়ে বললো, তোতাপাখি! হঠাৎ কি কথা বলতে চাচ্ছেন?

মেহনাজ নাক কুঁচকালো। বিরবির করে আওড়ালো, ব্যাটা লোকের এই একটা সমস্যা। সব সময় আদিখ্যেতা দেখায়। মেহনাজ আগাগোড়া সাধারণ, তার কাছে কোনো প্রকার আহ্লাদী ঠাঁই পায় না কিংবা সে ঠাঁই দিতে চায় না। অথবা হতে পারে এর আগে কেউ তাকে আহ্লাদ করেই নাই। কিংবা মেয়েটা কাউকে আহ্লাদ করতেই দেয় নাই।

আম্মু বললো, আপনি নাকি আমার মতামত জানতে চেয়েছেন?

নাফিজ বললো, জ্বি জানতে চেয়েছি।

আমার দ্বিমত থাকলে কি আপনি বিয়েটা ভেঙে দিবেন?

নাফিজের বুকের ভেতর কি যেনো হলো! ব্যথা লাগছে। কিন্তু প্রকাশ করা যাবে না। সব কিছু প্রকাশ করতে হয় না, বিশেষ করে বুকের ভেতরের গোপন ভাঙাচোরার শব্দ কাউকে শুনাতেও হয় না।

এলিন আপনি বিয়েটা করতে চাচ্ছেন না?

মেহনাজ থামলো! লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বললো, আপনাকে হোক বা অন্য কাউকে, বিয়ে তো আমাকে করতেই হবে। তাই আমার কোনো মতামত নেই। কিন্তু আমার খুব জানতে মন চাচ্ছে। আমি রাজি না হলে আপনি বুঝি বিয়েটা করবেন না?

নাফিজ এবার হাসলো, কিন্তু সে-ই হাসির কোনো শব্দ নেই। নেই কোনো বর্ণ বা গন্ধ, যেটা দ্বারা মেহনাজ বুঝতো যে উপর পাশের মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। এটাকে বলে চোরাই হাসি আবার আনন্দের হাসিও বলা যায়।

এখন আপনাকে বিয়ে করাই আমার জন্য জায়েজ হয়ে গিয়েছে এলিন! দুশ্চিন্তা না করে বরং বিয়ের প্রস্তুতি নেন।

মেহনাজ কিছু বললো না। হয়তো যেটা জানতে চেয়েছিলো সেটার জবাব পেয়ে গিয়েছে। নাফিজ চুপ রইলো না, সে পারছে না রাজ্যে গল্প শুরু করে দেয় মেয়েটার সাথে।

আজকে বাবাকে আনতে যাবো এলিন! কতদিন পর বাবা দেশে ফিরছেন। খুব আনন্দ লাগছে। সব কিছুই আপনার জন্য।

ফোনের ওপাশে বাচ্চাদের মতো আনন্দ নিয়ে কথা বলছে একজন সুপুরুষ। মেহনাজ অস্ফুট স্বরে বললো, আমার জন্য? কি ভাবে আমার জন্য?

এই যে আপনি বিয়েতে রাজি হলেন বলেই তো বিয়ে উপলক্ষে বাবা দেশে আসছেন। বাবা বলেছেন যতদিন আমি বিয়ে না করছি উনি দেশে আসবে না।

মেহনাজের মনে হলো কিছু কথা বরং রেখে দেওয়া যাক! অন্য কোনো সময় না হয় বলবে। কাঁধে মাথা রেখে কিংবা হাতে হাত রেখে চোখে চোখ রেখে। তাই তো কথায় সমাপ্তি টেনে এনে বললো, সাবধানে যাবেন। রাখি।

নাফিজ যেনো চাইছিলো আরও কিছুক্ষন আলাপ করতে। কিন্তু প্রিয়তমা সে-ই সুযোগটুকু দিলো না বিধায় অদ্ভুত এক অভিমান বুকে বাসা বেঁধেছে। অথচ সে জানতেই পারলো না তার প্রিয়তমা কিছুটা মূহুর্তে সঞ্চয় করেছে ভবিষ্যতের জন্য।

চলবে...........

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ১০

#মাকামে_মারিয়া

পাঠক, কিছুটা রেখে দিলাম ভবিষ্যতের জন্য 👀

আবার কখন লিখবো জানা নেই। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি নয়তো খুব দেরীতে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন