#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ০৯
#মাকামে_মারিয়া
মকবুল হাতে সংবাদপত্র নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে ঢুকেছে কেবল। এমনি দেখলো দেখতে ভদ্রসভ্য এক লোক চোখ মুখ বন্ধ করে চিল্লাচ্ছে। মকবুল দ্রুত রওনকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তাকে ডেকে বললো —
'ভাইসাব! চোখ খুলুন কিছু হয়নি।'
রওনক মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে জান ফিরে পায় যেনো। দ্রুত চোখ খুলে সামনের মানুষটাকে ভালো করে না দেখেই জাপ্টে ধরে বলে —
'আআ আমারে বাঁচান। এই কুত্তা আমার ইজ্জত শেষ করে দিলো।'
ততক্ষণে বাড়ির ভেতর থেকে সবাই চলে আসছে। তারা এসে দেখছে যে এক ব্যাটা লোক আরেক ব্যাটা লোকে জাপ্টে ধরে চেচাচ্ছে। তাশফিয়া হাসতে হাসতে কোমর ধরে বসে পড়লো, জেরিন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো।
নাফিজ এগিয়ে গিয়ে রওনকের কানে ঢলা দিয়ে বললো —
'কুত্তার রুচি এতোটাও খারাপ নয় যে তোর ইজ্জতে হাত দিবে।' নাটক বন্ধ কর এবার।'
মানুষের শোরগোল শুনতে পেয়ে রওনক মকবুলকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তখনও বেচারা বিরবির করে দোয়া পড়ে যাচ্ছে। বুকে দুই তিন বার ফু দিয়ে নাফিজের সামনে এসে বললো —
'সব দোষ তোর! তোর জন্য এসব হয়েছে।'
নাফিজ দাঁত কিড়মিড় দিয়ে বললো —
'কি হয়েছে? কুত্তা তোর চিৎকার শুনে উল্টো ভয় পাইছে।' এমন বলদামি করবি জানলে কখনও আসতে বলতাম না। আমার মানসম্মান আর রাখলি না। স্বর্ণা চৌধুরী এসে না আবার বিয়েটা ভেঙে দেয় শিট!!
রওনক চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে। সে তড়িঘড়ি করে মেইন ডোরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বর্ণার পায়ের কাছে হাঁটু ঘেড়ে বসে পড়লো। পাগলের প্রলাপ গাইতে লাগলো—
' আন্টি, দয়া করুন! আমার বন্ধুর বিয়েটা ভেঙে দিবেন না৷ তাহলে সে আমাকে আস্ত রাখবে না। কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
স্বর্ণা সহ উপস্থিত সবাই রওনকের আকস্মিক এই কান্ডতে ভেবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো। নাফিজের রাগে ইচ্ছে করলো নিজের মাথায় নিজেই ইট মারতে।
স্বর্ণা মকবুলের দিকে ইশারা করে বললো —
' মকবুল এরে সামলাও! আর মেহমানদের আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করো।'
কথাটা বলেই ভেতরে চলে গেলো। মকবুল এসে রওনকের হাত ধরে টেনে উঠালো। নাফিজের দিকে আঙুল তাক করে দেখিয়ে বললো —
' ওই ভদ্রলোক কি সত্যি আপনার বন্ধু?'
রওনক বোকার মতো মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোধক বুঝাতেই মকবুল নাফিজের উদ্দেশ্য বলে —
'ভাইজান! এই মালটারে সামলান কেমনে? মারাত্মক একখান মাল। তয় মেহনাজ আপা আপনি কিন্তু জিতবেন। ভাইজানের ম্যালা ধৈর্য আছে।'
মেহনাজ সবার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল মুখ লুকিয়ে। মকবুলের কথা শুনে পারছে না মাটির নিচে লুকিয়ে পড়ে। নিজেকে আরেকটু৷ লুকানোর চেষ্টা করেও পারলো না৷ এদিক সেদিক করতে করতেই নাফিজের চোখে চোখ পড়ে গেলো।
নাফিজের চেহারা লাল বর্ণ হয়ে আছে। মেহনাজ মনে মনে আওড়ালো, 'এই তো দেখি সত্যি সত্যি মফিজ! বন্ধুটা তো সামান্য মজাই করলো। এটাকেও হজম করতে পারলো না!
___________
জেরিন আর মকবুল একসাথে মেহনাজদের বাড়ি থেকে বের হয়েছে। বড় রাস্তা ধরে হাঁটছে দুজন। কারো মুখে কথা নেই। মকবুল উসখুস করছে কিছু একটা বলে শুরু করবে। কিন্তু জেরিনের মধ্যে তেমন কোনো আহাজারি নেই কথা বলার। সে তার মতো হাঁটছে, গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াই তার উদ্দেশ্য, কোনো পিছুটান নেই। যত পিছুটান মকবুলের একার।
মকবুল জানে জেরিনের সাথে হৃদয়ে হৃদয় লাগিয়ে কোনো কথা বলতে পারবেনা সে। জেরিনের সাথে সম্পর্ক তো সাপেনেউলে। তা-ই খোঁচা মেরে বললো —
'কিরে জরিনা? মুখে কিছু মাখাস? দিন দিন চেহারা ছুরত সুন্দর হইয়া যাইতেছে।'
জেরিন মকবুলের দিকে তাকিয়ে বললো—
' এই যে মকবুল ভাই! এইটাই আপনার সমস্যা! মানে আমার প্রশংসা করা লাগলো তো করেন না! কিন্তু না আপনি তো খোঁচা মাইরা কইবেন সব কথা।'
' এহহ! আসছে! তোর প্রশংসা করুম ক্যান? তোর কি রুপ যৌবন বাড়ছে?' তোরে তো পূর্ণিমার রাইতেও খুইজা পাওন যাইবোনা।'
জেরিনের ভালো মনটা এক সেকেন্ডে খারাপ করে দেওয়ার জন্য মকবুলই যথেষ্ট। জেরিন একহাত দূরত্ব রেখে হাঁটতে লাগলো। মকবুল দূরত্ব কমিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলো —
'কিরে! আমার লগে হাঁটলে কি তোর সুন্দর শরীরে ফোসকা পড়বো?'
'যদি পড়ে! তাই সাবধানতা অবলম্বন করছি।'
'বেশি বাড়িস না জরিনা! ভালা হইবো না কইলাম!'
'কি খারাপ হইবো শুনি? আপনারে কি আমি ভয় পাই নাকি মকবুল ভাই?'
'তা পাবি কেন জরিনা! ভয় পাওয়ার মতো তো কিছু করি নাই এখনো।'
জেরিন আর কথা বাড়াতে চায় না। এই লোক ভালো কথা বলতে জানে, কিন্তু কেনো জানি সেগুলো জেরিনের সাথে বলে না। জেরিন হাটাঁ থামিয়ে ছলছল চোখে মকবুলের দিকে তাকিয়ে বললো —
'আমার লগে ভালো ভাবে কথা কওয়া যায় না মকবুল ভাই?
মকবুল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জেরিন নিজের রাস্তা আলাদা করে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়। মকবুলের পা চলে না। সে কি করে নিজেও জানে না। ঠিক কোনটা করলে জেরিনের সান্নিধ্যে নিজেকে নিতে পারবে তার জানা নেই।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে মকবুল বাড়িতে ফিরে। মেহরিমা দৌড়ে আসে মামার দিকে। হাসি হাসি মুখে কোলে চড়ে বসে। হাতের দিকে তাকায় কিছু নিয়ে আসছে কিনা। মকবুল বুঝতে পারে সেটা। বুকপকেট থেকে তিনটা চকলেট বের করে মেয়েটার হাতে দিতেই মকবুলকে জাপ্টে ধরে গালে চুমু খায়। যেনো রাজ্যের সুখ তার মামা তার হাতে এনে দিয়েছে।
মেহরিমা দৌড়ে আবার তার খেলনা হাঁড়িপাতিল এর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে। মকবুল তাকিয়ে থাকে, ছেলেটার ইচ্ছে করে এই ছোট মেহরিমার ছোট দুটো হাতে দুনিয়ার সব সুখ কিনে এনে দেক! কিন্তু সার্মথ্য নেই যে!
মালাইকা এসে গায়ে ধাক্কা দিতেই মকবুলের হুঁশ ফিরে। মালাইকা বলে —
' কি হইছে বাপ? এই অবেলায় কই থেকে আসলি?'
গায়ের ঘামে ভেজা শার্টটা খুলতে খুলতে মকবুল বলে —
' আমার আবার বেলা অবেলা আছে আম্মা?'
'তোর আছে টা কি বাপ?'
' অনেক কিছু আছে আম্মা! চোখ ভর্তি স্বপ্ন, একবুক আশা! তোমাদের জন্য সুখ কিনে নিয়ে আসা। আরও কত কি!
মালাইকা বেগম নিশ্বাস ছাড়ে। ছেলেটাকে সুযোগে বহুত কঠিন কথা শুনায়। কিন্তু আবার মায়াও হয়। মালাইকা কাছে এসে বলে —
'তোর বাবা যখন মারা যায় তখন আমাদের অবস্থা খুব শোচনীয় ছিল। তোর বয়স তখন তেরো। তুই প্রায় এসে আমারে জিজ্ঞেস করতি, আম্মা চলেন বাজারে যা-ই!
আমি বলতাম কেনো বাবা বাজারে কেনো যাবি?
তুই বলতি, বাজারে সুখ কিনতে পাওয়া যায় না? আব্বা থাকতে তো ব্যাগ ভর্তি সুখ নিয়ে ফিরতো। তখন আপনার মুখে কত হাসি থাকতো। এখন তো আপনি হাসেন না আম্মা।
মকবুল কিছু বলে না। মায়ের মুখে তার এই গল্প সে হাজার বার শুনেছে। যেকোনো প্রসঙ্গে মালাইকা এই গল্পটা শুনায়। মকবুল বুঝতে পারে এই গল্প তার মায়ের খুব পছন্দ।
ততক্ষণে রাতের আধার চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছে। মকবুলদের বাড়িটা এলাকা থেকেই এতোই দূরে আর নির্জন একটা বাড়ি যে এখানে বিদুৎদের ব্যবস্থাও নেই। মকবুল আলাপ করেছে গ্রামের মেম্বার এর সঙ্গে। সে জানিয়েছে বসতি বাড়াতে হবে। শুধু একটা ঘরের জন্য তো আর বিদ্যুৎ আনা সম্ভব নয় তবে অনেক টাকার ব্যাপার স্যাপার।
হারিকেনে লাল আগুন জ্বলছে। সেই আলোতে মেহরিমা পড়তে বসছে। মকবুল কিছুটা দূরে বসে আছে। মালাইকাকে ডেকে বললো —
'আম্মা একটা কথা আছিলো।'
মালাইকা অন্য রুমে মোমের আলোয় এশারের নামাজ শেষ করলো। ছেলের ডাকে তসবি জপতে জপতে কাছে এসে জানতে চাইলো কি হইছে?
' চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ের বিয়া লাগছে। স্বর্ণা চৌধুরী কইছে আপনে যেনো থাকেন কয়দিন।'
মালাইকার চেহারা উজ্জ্বল হলো। হয়তো কোনো কাজের সন্ধান পেয়েই মনটা আনন্দিত হলো! কিংবা আল্লাহ দোয়া কবুল করছেন। রিজিকের ব্যবস্থা তো হলো।
'কবে বিয়া রে?'
মকবুল মাথা চুলকালো। কবে বিয়ে এটা তো জানতে চায়নি। কি মুশকিল হয়ে গেলো!
'ওসব জানি না। আপনেরে বলছে কালকেই যাইতে। যান তারপরই দেখবেন সব। স্বর্ণা চৌধুরীর লগে কথাবার্তাও কইলেন।'
মালাইকা দাঁত কপাটি খুলে হাসলেন। বিরবির করে মেহনাজের জন্য দোয়া করলেন। মেয়েটাকে সে-ই ছোট বেলায় কত আদর করছেন তিনি। সেসব মনে পড়লে ভালো লাগে। কত আনন্দের সে-ই দিন গুলো। মকবুল মায়ের এই আনন্দমাখা মুখখানা দেখে জানতে চাইলো —
'আম্মা আপনারে এতো খুশী লাগতাছে? মনে হইতেছে আপনের মাইয়ার বিয়া।'
মালাইকার চোখ টলমল করে। তার মেয়েটাও তো মেহনাজের বয়সীই ছিল। একবছরেই বড় ছিল কিন্তু সমবয়সীর মতোই ছিল তাদের চলাফেরা। মৃত মেয়ের অধ্যায় মনে করতে চায় না মালাইকা তাই ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো —
'কিছু মানুষদের সান্নিধ্য আমাদের আনন্দ দেয়।'
কিছু মানুষের সঙ্গে থাকলে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে আব্বা।'
চৌধুরী বাড়ির মানুষগুলোও ওমন! খাইয়া না খাইয়া শান্তি পাওন যায়।
কথাগুলো বলেই মালাইকা চলে গেলো। মেহরিমা খুব আগ্রহ নিয়ে মামার কাছে এসে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলো —
'মামা আমারা কি কোথাও যাবো? নানুমনি অনেক খুশী কেন!
মকবুল মেহরিমাকে টেনে কাছে আনলো। এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললো —
'হুম ময়না! তোমাদের দাওয়াত দিয়েছে।'
মেহরিমা খুশী হলো।মামার বাহু জাপ্টে ধরে আহাল্দি হয়ে জিজ্ঞেস করলো —
'মামা আমার ভালো নাম মেহরিমা! আমাকে মেহরিমা বলে ডাকবে। নানুমনি বলেছে আমি খুব সভ্য আর ভদ্র হয়ে যেনো চলাফেরা করি, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলি।
'এটা তো খুব ভালো কথা ময়না! আমিও চাই তুমি খুব সভ্য হও।
'তাহলে আমাকে ময়না বলো কেনো?' আমার নাম তো মেহরিমা।'
' তুমি সবার মেহরিমা আর আমার ময়না।' আমি তো আদর করেই ময়না বলি!'
মেহরিমা কিছুক্ষণ মকবুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মামাকে নিয়ে তার মনে অনেক ভাবনা৷ ছোট মেহরিমার মন চায় মামাকে পাশে বসিয়ে একদিন অনেক প্রশ্ন করবে। অনেক কিছু জানতে চাইবে। খুব রাতে মামা একা ঘরের বাহিরে অন্ধকারে বসে থাকে কি ভাবে সেটা জিজ্ঞেস করবে, মামা লুকিয়ে লুকিয়ে কেনো কাঁদে এটাও জিজ্ঞেস করবে। আর এটাও জিজ্ঞেস করবে যে মামা তো খুব শুদ্ধ আর সুন্দর করে কথা বলতে পারে তাহলে সব সময় বলে না কেনো?!
মেহরিমা একধ্যানে তাকিয়ে এসবই ভাবছিলো। মকবুল ডেকে বললো —
'কি হইছে ময়না? কি ওতো ভাবো? পড়া শেষ? '
সব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মেহরিমা মকবুলকে প্রশ্ন করে বসলো —
'তুমি আমায় আদর করে ময়না ডাকো মামা! সবার কাছে মেহরিমা আর তোমার কাছে ময়না তার মানে কি জেরিন আন্টি সবার কাছে জেরিন আর তোমার কাছে জরিনা?
তাকেও আদর করে ডাকো?
মকবুল আচমকা এমন প্রশ্নের আশা করেনি। এমন কিছু তো সে নিজেও ভেবে দেখেনি। হাসার চেষ্টা করে বললো —
' ও কিছু না! আমি তো জেরিনকে রাগানোর জন্যে জরিনা ডাকি।'
' রাগানো ভালো না মামা! দেখো না আম্মুও রাগ করে চলে গিয়েছে আমায় ছেড়ে। তোমাকেও জেরিন আন্টি রাগ করে ছেড়ে চলে যাবে।'
মকবুলের বুকে চিনচিন ব্যথা হয়। মেহরিমাকে বইখাতার সামনে বসিয়ে দিয়ে বিরবির করে বলে, পড়ো ময়না।
এলোমেলো পায়ে বাহিরে চলে আসে। চোখ জ্বলছে। নিকষকালো অন্ধকার। আজ আকাশে চাঁদ নেই। এতো অন্ধকারের মধ্যেও মকবুলের মনে হয় তার জীবনটা বোধকরি এই অন্ধকার রাত থেকেও আরও বেশি অন্ধকার।
চলবে..........
আজকে মকবুলকে বেশি লিখে ফেলছি।