ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

১৫তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ১৫

#মাকামে_মারিয়া

গাড়ি থেকে নেমে এক মূহুর্তও থামলো না মেয়েটা। একপ্রকার দৌড়ে ছুটলো বাড়ির মেইন ডোরে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মুরব্বির দিকে। জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। কন্ঠে অভিমান জারি রেখে বললো,

তুমি আমাকে আনতে যাওনি দাদু ভাই।

হাশেম বাহাদুর ফোকলা দাঁতে হাসলেন। কুঁচকে যাওয়া মুখশ্রীর চামড়া প্রসস্থ হলো।

আমার শরীরটা ভালো না এলিন ভাই। তা না হলে তোমাকে আনতে আমি কেনো যাবো না বলো?

মেহনাজ শুনেছে দাদুর সত্যি শরীর ভালো নেই। ভীষণ দূর্বল শরীর। তারউপর জ্বর এসেছে। না যাওয়াতে যদিও অভিমান হয়েছে। কিন্তু অসুস্থ শরীর নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এটাও মেনে নিয়েছে।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বণাকে আলতো করে আলিঙ্গন করলো। নরম স্বরে বললো,

আম্মু? কেমন আছেন?

ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

মেহনাজ গলা ছেড়ে চোখে চোখ রেখে হেঁসে বললো, ভালো আছি আম্মু। আপনি গেলেন না কেনো আমাকে আনতে?

স্বণা স্মিত হেঁসে বললো, আমাকে এদিকটা একা সামলাতে হচ্ছে। চলে গেলে দেখতো কে? তোমার ফুফুদের বলেছিলাম আসতে আসলো না তো।

আপনি নিজে বলেছিলেন?

স্বণা একটু গম্ভীর হয়ে বললো, তোমার বাবাকে দিয়ে দাওয়াত পাঠিয়েছিলাম।

আর খালামনিরা আসলো না যে?

স্বণা প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলো। নাফিজের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলো। নাফিজ শাশুড়ীর সামনে এসে সালাম দিলো। ভালো মন্দ খোঁজ নিলো।

মালাইকা বেগম আজ সকাল থেকে মেহনাজদের বাড়িতে আছে। স্বণার সাথে হাতে হাতে অনেক কাজে সাহায্য করছে। মেহনাজ ঘরে ঢুকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। মনে হচ্ছে বহু বছর পর শান্তির নীড়ে ফিরে এসেছে। নিজের বাড়িতে এতো শান্তি এতো শান্তি মেহনাজের খুশীতে নাচতে ইচ্ছে করলো। শরীর মন দুটোই হালকা লাগছে। শাড়ি গুটিয়ে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ করছে। যেনো কি করা উচিৎ সেটাই বুঝতে পারছে না। রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো মালাইকা গুছানো কাজ গুলো করছে।

মালাইকা চাচি। কি ব্যাপার বলেন তো?

মালাইকা কিছুটা ভড়কে গিয়ে মেহনাজের দিকে তাকাতেই মেহনাজ মালাইকাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো।

কেমন আছো মেহু মা?

আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি চাচি। কিন্তু খুব রাগ করেছি সবার সাথে।

মালাইকা কিছুটা উতলা হয়ে বললো কেনো মা? কি হইছে?

কি হয় নাই সেটা বলো তো? আম্মু যায়নি, দাদু ভাই যায়নি। তোমাকে বলেছি মকবুল ভাইকে আর মেহরিমাকে পাঠাতে তোমরাও যাওনি। আর আমার খালা ফুফুদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

মালাইকা একটু নরম গলায় বললো, মেহু মা রাগ কইরো না। মেহরিমার স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলে। আমি তোমাগো এখানে চইলা আইছি। মকবুল মেহরিমার দিকে নজর রাখছে। জানো তো মাইয়াটারে নিয়া কত আশা আমাগো।

মেহনাজ দেখলো তার কারো সাথেই রাগ টিকছে না। সবাই বড়সড় কারন দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আর সবার কারণ গুলোই যুক্তিসঙ্গত। তাই অভিমানকে এবেলা ছুটি দিতে হচ্ছে।

ড্রয়িং রুম জুড়ে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। রওনক, মনি, ঝুমা, শান্ত, রেজা আর আয়শা।

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। স্বণা তাসফিয়ার রুমে এসে নক করলো।

তাসফিয়া চেঞ্জ করছিলো। দরজার ওপাশ থেকে বললো, কি হয়েছে আম্মু?

দরজা খুলো।

আমি চেঞ্জ করছি তো আম্মু।

এতো দেরি হওয়ার কথা নয় তো। দ্রুত করো।

তাসফিয়া ভারী কাপড় খুলে রেখে পাতলা কাপড়ের একটা কামিজ পড়ে নিলো।দরজা খুলে দিতেই স্বণা রুমে ঢুকলো।

বড়সড় একটা রুম, বড় একটা খাট, এটাচ ওয়াশরুম, বারান্দা সব সুবিধা আছে বলা চলে। স্বণা রুমটাকে কিছুক্ষণ দেখে বললো, মেহমানদের তোমার সাথে রেখে দেও।

তাসফিয়া বিরক্তি নিয়ে বললো, আমি রুম সেয়ার করতে পারবো না। গেস্ট রুম ওপেন করে দেও।

গেস্ট রুম ছেলে মেহমানদের জন্য। মেয়ে তিনটে তোমার সাথেই থাকবে।

আমি রুম সেয়ার করতে পারবো না বললাম তো আম্মু।

স্বণা কড়া চোখে মেয়ের দিকে তাকালো। রুক্ষ স্বরে বললো, এটা ভদ্রতা নয়। ম্যানারলেস কোথাকার।

হ্যাঁ ম্যানারলেসই। আমার ঠ্যাকা পড়ে নাই ওতো ভদ্র হওয়ার।

তাসফিয়া কথাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারলো না। স্বণা ঠাস করে তাসফিয়ার গালে থাপ্পড় লাগিয়ে দিলো। এক মূহুর্তও রুমে দাঁড়ালো না বের হয়ে আসলো।

তাসফিয়া প্রচন্ড জোরে আওয়াজ করে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলো। ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সব মেহমানদের কানে কিছুটা আওয়াজ পৌঁছেছে। মেহনাজ সবার সাথেই কথা বলছিলো। কিছু হয়েছে বুঝতে পেরে দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে এসে স্বণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে আম্মু?

স্বণার মুখটা কালো অন্ধকার। মেজাজ চটে আছে বুঝা যাচ্ছে। তাও সে নিজেকে সংযত করে বললো, তোমার বোন!রুম সেয়ার করতে নাকি তার সমস্যা!

মেহনাজ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললো, আরও তিনটে রুম ফাঁকা আমাদের। ওর রুমই কেন সেয়ার করতে হবে?

গেস্ট রুমটাই গুছানো হয়েছে কেবল। বাকি গুলো গুছানোর সময় পাইনি। একা হাতে আমি কত করবো। তা-ও ভালো মালাইকা ভাবি ছিল বলে।

মেহনাজ জানে সেই রুম গুলো খুব অগোছালো না। যেমন আছে চলে। কিন্তু তার মা ভীষণ পরিপাটি মানুষ, সে ওই রুম গুলোতে মেহমানদের থাকার উপযুক্ত মনে করবে না ততক্ষণ, যতক্ষন না সে নিয়ত করে সেগুলোকে গুছাবে যে এখানে মেহমান থাকবে।

আমি গুছিয়ে দিচ্ছি আম্মু।

স্বণা সাবধান করে দেওয়া স্বরে বললো, একদমই না। তোমাকে হাত লাগাতে হবে না কোথাও।

মেহনাজ একবার তাসফিয়ার বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বললো, মেরেছেন তাসফিয়াকে?

মারার কাজ করলে মারবো না?

বাড়িতে মেহমান। মারার কি দরকার ছিল?

এখন তুমি আমাকে ঠিক ভুল শিখাবে মেহনাজ??

মেহনাজ একটু থেমে বললো, আপনাকে কেনো কিছু শিখাবো আম্মু! আমি জাস্ট এমনি বলছিলাম।

তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তুমি রুমে যা-ও মেহমানকে সময় দেও। নাফিজকে সময় দেও। সবাইকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বলো।

মেহনাজ চলে আসলো। ড্রয়িং রুমে থাকা সবাইকে রুম দেখিয়ে দিলো। ফ্রেশ হয়ে নিতো বললো এরপর আড্ডা দেওয়ার জন্য পুরো রাত বাকি রয়েছে।

নাফিজ আর মেহনাজ রুমে আসলো। নাফিজ মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো। মেহনাজ লাগেজ থেকে টাওয়েল বের করে হাতে দিয়ে বললো, ফ্রেশ হয়ে আসুন।

নাফিজ টাওয়েলটা হাত থেকে নিয়ে বিছানায় রেখে দিলো। বুঝা যাচ্ছে ফুলে আছে। মেহনাজ ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, কি সমস্যা? গাল ফুলিয়ে রাখছেন কেনো?

নাফিজ বাচ্চাদের মতো অভিমানের স্বরে বললো, আমাকে তো ভুলেই গিয়েছো।

মেহনাজ হুহু করে হেঁসে উঠলো। মুখের উপর ঝুঁকে এসে বললো, নিজেকে আয়নায় দেখেছেন মির্জা সাহেব?? আস্ত এক ব্যাডা মানুষ আপনি। এমন বাচ্চাদের মতো করবেন না বুঝতে পারছেন?

নাফিজ টেনে টেনে বললো, যদি করি?

যদি করি আবার কি? করবেন না। এমন দামড়া গন্ডারের মতো ব্যাডা মানুষ বাচ্চামো করলে মেহনাজের হাসি পায় বুঝলেন?

হোয়াট?? দামড়া গন্ডার?? এ কেমন ধরনের ল্যাঙ্গুয়েজ এলিন?

মেহনাজ ঠোঁট কামড়ে বললো, এগুলো বউজাতের ল্যাঙ্গুয়েজ মির্জা সাহেব।

নাফিজ নাক ফুলিয়ে বললো, তাহলে আমারও স্বামীজাতের কিছু ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করতে হয় মিসেস মির্জা।

জ্বি করুন শুনি।

আমি যদি দামড়া গন্ডার হই তবে তুমি বুইড়া বেডি।

মেহনাজ হাহা করে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা ধরে গেলো। কোনো রকম হাসি থামিয়ে বললো, ওকে,ওকে মির্জা সাহেব আমি বুড়ো। এবার যান। বলতে বলতে নাফিজকে ওয়াশরুমের দরজায় ঠেলে দিয়ে আসলো। নাফিজ চোখ মুখ কুঁচকে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। বের হয়েই মেহনাজকে আবার খোঁচা মারতে হবে কারণ এবেলায় ঠকে গিয়েছে।

মেহনাজ শাড়ি চেঞ্জ করবে ভেবে নিজের পড়ার জন্য একসেট কাপড় বের করলো। শাড়ি খুলতে যাবে ওমনি নাফিজ ওয়াশরুম থেকে গোসল করে বের হয়ে গেলো।

আপনি গোসল করেছেন?

নাফিজ বললো, হ্যাঁ কেন? শশুর বাড়িতে গোসল করা নাজায়েজ??

মেহনাজ কপাল চাপড়ে বললো, ইয়া মাবুদ! ওটা বলিনি। আবার গোসল করতে গেলেন কেনো সেটাই ভাবছি।

ক্লান্ত লাগছিলো তাই। রাত বিরেতে আমার গোসল করার অভ্যেস আছে।

মেহনাজ আর কিছু বললো না। গুটিশুটি মেরে বসে রইলো। নাফিজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রং ঢং করছে। হুট করে পিছনে বসে থাকা মেহনাজের দিকে চোখ যেতেই মনে পড়লো তখনের খোঁচা টা এখন মারতে হবে। ঠোঁটে দুষ্ট হাসি ফুটিয়ে মেহনাজকে ডেকে বললো,

এলিন বাই এনি চান্স তোমার একটা চোখ কি ট্যারা?

মেহনাজ ভড়কে গেলো। চোখে চোখ রেখে বললো, বাই এনি চান্স মির্জা সাহেব আপনার মাথায় সমস্যা নেই তো?

নাফিজ নড়েচড়ে মেয়েটার সামনা সামনি এসে বসলো। মেহনাজকে ভড়কে দিতে মজা লাগে কিন্তু মেয়েটা বোকাসোকা হলেও মাঝে মাঝে খুব চালাক। এদেরকে চিকন চালাক বলা হয় নাকি!

নাফিজ বললো, আমার মাথায় সমস্যা এটা কেনো মনে হলো?

মেহনাজও বললো, আমার একটা চোখ ট্যারা এটা কেনো মনে হলো??

কারণ তোমার চোখ সত্যিই ট্যারা তাই।

মেহনাজও টেনে টেনে বললো, কারণ আপনার মাথায় সত্যি সত্যি সমস্যা তাই।

নাফিজ টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আবার আয়নাতে তাকালো। ঠিক তার পিছনে মেহনাজ বসে আছে। গায়ে খয়েরী রঙের শাড়ি। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। মেয়েটা এতো সেজেছে কেনো? নজরকাঁড়া সাজ!

নাফিজ ফট করে সামনে এসে বললো, এতো সাজুগুজু করেছো কেনো?

আপনাকে ঘায়েল করতে।

বাপের বাড়িতে এসে খুব সাহসী হয়ে গিয়েছো মনে হচ্ছে।

মেহনাজ বসে ছিল, নাফিজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। মেহনাজ ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে বললো, সাহসের কি দেখলেন বলুন তো?

এই যে মুখ থেকে খুব মধুর কথা বের হচ্ছে!

তা না হলে কি আপনার মতো তেঁতো কথা বলবো? এটা কি বলবো যে আমার স্বামীকে মফিজের মতো দেখতে লাগে?

এলিন!! নাফিজ ধমকে উঠলো।

কি হয়েছে? মেহনাজ খুব মজা পাচ্ছিলো নাফিজকে রাগাতে পেরে। মফিজ বললে বেচারা রেগে বোম হয়ে যায়।

তুমি আমাকে মফিজ বলছো কেনো??

মেহনাজ নাফিজের চোখ বরাবর দাঁড়িয়ে বললো, আপনি আমাকে চোখ ট্যারা বলেছেন কেনো?

নাফিজ সেটা মজা করে বলেছিলো। মেহনাজের চোখ মোটেও ট্যারস নয়। বরং ভীষণ সুন্দর, হরিণীর মতো চোখ মেয়েটার। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যায় না। সত্যি সত্যি ঘায়েল হয়ে যেতে হয়।

আচমকা মেহনাজকে কাছে টেনে নিলো নাফিজ। চোখে চোখ রেখে বললো, এলিন! তোমার চোখ সমুদ্র হলে আমি সেই সমুদ্রের গভীরে ডুব দিতে চাইতাম।

ঘোরলাগা কন্ঠে মেহনাজ ফিসফিস করে বললো, সমুদ্রে ডুব দিতে চান? মরতে হবে যে!

মরবো! ভয় পাচ্ছি না তো।

হ্যাঁ তা-ও তো কথা একদিন তো মরতেই হবে। কথাটা বলেই মেহনাজ নাফিজের বুকের উপর থেকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে আসলো।

নাফিজ নাক ফুলিয়ে বললো, নিরামিষ একটা!

আপনি করলা!

তুমি একটা নিমপাতা!

হলাম! উপকারী তো।

হ্যাঁ খুব উপকার করা হচ্ছে মানুষকে। নিজের স্বামীর বেলায় কোনো মায়া দয়া নেই তার।

আমার মায়া দয়া ছাড়া আপনি মরে যাচ্ছেন না নিশ্চয়ই?

নাফিজের ইচ্ছে করলো চিৎকার করে বলতে, হ্যাঁ মরে যাচ্ছি এলিন! আমায় একটু মায়া করো।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন