কাক ঢাকা ভোরে মেহনাজকে কল দিয়ে নাফিজ জিজ্ঞেস করলো, "আমার ব্রাশটা কোথায় এলিন?"
মেহনাজ ভড়কে গিয়ে বললো,"নিশ্চয়ই আমি বাপের বাড়িতে আপনার ব্রাশ সাথে করে নিয়ে আসিনি তাই না?"
"বলা তো যায় না। হয়তো নিয়ে গেছো। না হয় পাবো না কেনো?"
মেহনাজ ব্রু কুঁচকে বললো, " ভালো করে খোঁজে দেখুন। পেয়ে যাবেন।"
নাফিজ উঁচু স্বরে বললো, "আরেহ পাচ্ছি না তো। তুমি থাকাকালীন সময় থেকেই পাচ্ছি না।"
মেহনাজ বললো, "কই আমাকে তো তখন বললেন না? তার মানে কি সেদিন ব্রাশ করেন নাই?"
" করেছি। করবো না কেনো? তোমার ব্রাশ দিয়েই দাঁত মেজেছি। কিন্তু এখন তো তুমিও নেই।"
মেহনাজ চোখ বড় বড় করে সামনে বসে থাকা তাসফিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাসফিয়া পড়তে বসে ঝিমাচ্ছে। ওতো সকালে উঠে পড়তে বসা ভালো স্টুডেন্টের কাজ কিন্তু তাসফিয়া মোটেও ভালো স্টুডেন্ট না। স্বর্ণার চাপাচাপিতে মেহনাজ বেশ অনেক্ক্ষণ সময় নিয়ে বুঝিয়ে তাকে সকালে পড়তে বসিয়েছে। তাসফিয়া চোখের ইশারায় জানতে চাইলো, " কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?"
মেহনাজ আমতাআমতা করলো, দু'দিকে ঘাড় নেড়ে বুঝালো কিছু হয়নি। বোনকে যদি একথা জানায় যে তার গুনধর স্বামী তারই ব্যবহার করা ব্রাশ ব্যবহার করেছে তাহলে তাসফিয়া আগামী দিন মেহনাজকে দেখলেই নাক কুঁচকাবে। আর নাফিজের অবস্থাটা যে কি হবে ভাবতেই মেহনাজের গা গুলিয়ে আসলো।
" হা করে আছো যে? আমি ব্রাশ করবো তো। বের হতে হবে।" ওপাশ থেকে নাফিজ তাড়া দিলো।
মেহনাজ কিছু বুঝে উঠতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, "ওয়াশরুমের ব্রাশ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করে ফেলুন।"
" বউয়ের ব্রাশ দিয়ে না হয় দাঁত ব্রাশ করা যায়, তাই বলে ওয়াশরুমের ব্রাশ দিয়ে করবো? এমন কুবুদ্ধি দিতে পারলে? তুমি বউ নাকি শত্রু? মাত্র দুইদিন না হয় তোমার ব্রাশ ব্যবহার করেছিই! তাতে কি এমন পাপ হয়ে গেলো যে তুমি আমাকে ওয়াশরুমের ব্রাশ দিয়ে কাজ সারতে বলছো!" একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলো নাফিজ কিন্তু ততক্ষণে মেহনাজ ফোনকল কেটে দিয়ে বসে বসে ফুসফুস করছে। বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছে কেবল তিনদিন হয়েছে। এর মধ্যেই শশুর বাড়িতে যত অঘটন ঘটে যাচ্ছে। শশুর ফোনকলে জানাচ্ছে, "বউমা জলদি বাড়ি চলে আসো আমার পেট খারাপ করছে।"
শশুরের পেট খারাপ করলে পুত্রবধূকে কেনো যেতে হবে? তাসফিয়া শুনে তো চেচিয়ে বলে উঠেছিল, " তোমাকে কেনো যেতে হবে? উনার দুই দু'টো বউ থাকতে তোমাকে যেতে হবে কেনো?"
মেহনাজ শান্ত স্বরে আওড়ালো," পেট খারাপ টারাপ কিছু নয়। ওসব বাহানা।"
হাশেম বাহাদুর মেহনাজকে কাছে ডেকে বলেন, "দাদু ভাই। বাহানা হলেই বা কি? তোমাকে ছাড়া তারা ভালো নেই। তাই তো বাহানা দিয়ে তোমাকে কাছে ডাকছে। এতে দোষের কিছু নেই।"
" আমি বেড়াতে আসছি দাদু ভাই! একটুও বেড়াবো না?" মেহনাজ কন্ঠে মিছেমিছি অভিমান টেনে বলে।
হাশেম বাহাদুর ঘন্টাখানেক নাতনিকে পাশে বসিয়ে নানান গল্প শুনায়। মেহনাজ মনযোগী শ্রোতা। তাসফিয়াকে ডেকেও নাগাল পাওয়া যায় না। বুড়ো মানুষের গল্প শুনার মতো মেয়ে সে নয়। চ্যাট গ্রুপে সারাক্ষণ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারলে সে বাঁচে। স্বর্ণার বকাবকি এখন আর তার গন্ডারের চামড়ায় ফোস্কা ফেলতে পারে না। মেহনাজ অবশ্য সেটার জন্য মা'কেই দায়ী করে। বেশি শাসনে রাখতে গিয়েই মেয়েটা হাতছাড়া হলো বলে!
সেদিন রবিবার, ঘুটঘুটে অন্ধকার। সন্ধ্যায় জেরিন ফিরছিলো টিউশনি থেকে। স্টুডেন্টের বাসা থেকে বেড়িয়ে চিপা রাস্তাটায় কোনো ল্যাম্পপোস্ট নেই। সন্ধ্যা হতেই কেমন অন্ধকার হয়ে যায়। জেরিন সাহসী মেয়ে মনে তেমন ভয়ডর নেই। কিন্তু আজ কেমন অস্বস্তি লাগছে যেনো! টিউশনি চার টা থেকে, কিন্তু আজকে যেতে যেতে প্রায় পাঁচটা বেজেছে। এক ঘন্টা পঁচিশ মিনিট পড়িয়ে মাগরিবের পর বেড়িয়েছে। ভাগ্য করে একটা স্টুডেন্ট পেয়েছে। জেরিন নিজে পড়াবে কি! স্টুডেন্ট নিজেই ম্যামকে ধরে ধরে এই পড়া, সেই পড়া বুঝে নেয়। সময় শেষেও ছাড়তে চায় না। যেকারণে আজ এতো দেরি হয়ে গেলো।
কিছুদূর একটা চায়ের দোকানে মৃদু আলো জ্বলছে। এটা কাশেম কাকার চায়ের দোকান। জেরিনের মনে একটু সাহস এলো। সে জানে এখানে মকবুল আছে। মকবুল ভাই যতই জ্বালাতন করুক এমনিতে ভালো মানুষ। ভরসা করা যায়, বিশস্ত বটে।
চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে জেরিন হেঁটে চলে আসলো কিন্তু অন্য দিনের মতো কেউ পেছন থেকে "এই জরিনা চা খাইয়া যা, লাল চা। তোর মেজাজের মতো লাল" এ কথা বলে ডেকে উঠলো না।
জেরিন একটু দূরে এসে দোকানটার দিকে দৃষ্টি দিলো। খুব সুদক্ষ চোক্ষে লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করলো কিন্তু মকবুল ভাই নেই। জেরিনের ভেতর থেকে একটা বিষন্ন দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো। জেরিন অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো, " এতো হতাশ কেনো হচ্ছে সে?"
আনমনে কয়েক কদম এগোতেই পিছন থেকে চিরচেনা সেই স্বর ভেসে আসলো, " জেরিন দাঁড়া ।"
বলতে বলতেই মকবুল ভাই খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে। জেরিনের মনটায় কেমন ফুরফুরে বাতাস বয়ে গেলো। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামে এখন হিমশীতল অনুভব হচ্ছে।
" আজকে এতো রাইত কইরা বাড়িত যাইতেছোছ?"
" এমন সময়ই তো যাই।" জেরিন কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ভান করার চেষ্টা করলো।
" মোটেও না। মাগরিবের আজানের আগেই যাস। আজকে দেরি হইলো কেন?"
" সব কিছু আপনেরে কইতে হইবো মকবুল ভাই?"
" হু কইবি না? আমার একটা দায়িত্ব আছে না?"
" কিসের দায়িত্ব আপনার?"
" এই যে আমারে মকবুল ভাইই কইয়া ডাকোস। ভাইয়ের দায়িত্ব।"
জেরিন ব্রু কুঁচকে মকবুলের দিকে তাকাতেই মকবুল খ্যাক করে হেঁসে উঠলো। জেরিনের মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিরি হাসিটা মকবুলের।
" আর ভাই ডাকলাম না আপনারে! লাগবো না ভাইয়ের দায়িত্ব।" কথাটা বলেই জেরিন হনহনিয়ে হাঁটতে লাগলো।
মকবুল পিছন পিছন এসে বললো, " না ডাকলি ভাই! তখন অন্য দায়িত্ব নিমু।"
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় জেরিন তার বাড়ির কাছেই চলে আসলো। সব সময়ের মতোই মকবুল পিছন পিছন এসে বাড়ি অব্দি এগিয়ে দেয়। বাড়ি থেকে কিছুটা দূর এসেই থেমে যায় সে। জেরিন মাঝে মাঝে একটা দুটো কথা বলে। কখনো আবার কিছু না বলেই বাড়িতে ঢুকে যায়। আজ মকবুল থেমে গেলো রাস্তার ঠিক ডানপাশের বড় নিমগাছরটার নিচে। ভেবেছিলো জেরিন হয়তো আজকেও কিছু না বলেই বাড়িতে ঢুকে যাবে। কিন্তু জেরিন তাদের বাড়ির নড়বড়ে গেইটে ঢুকতে ঢুকতে একটু থামলো। মকবুলের দিকে তাকালো, তার চেহারা তেমন দেখা যাচ্ছে না, অবয়ব টা বুঝা যাচ্ছে। কারণ এখানেও ল্যাম্পপোস্ট নেই। আশেপাশে বাড়িগুলো থেকে একটু আকটু আলো ছিটকে পড়ছে চারপাশে। মকবুল সিগারেট ধরিয়ে মনের আনন্দ টানছে। সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন স্পষ্ট, মকবুলের পায়ের পাশে একটা কুকুর কেকিয়ে বেড়াচ্ছে।
সিগারেটের একটা লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে মকবুল বিশাল আকাশের দিকে নজর দিলো। জেরিন উচ্চ স্বরে ডাকলো, "মকবুল ভাই।"
মকবুল আশ্চর্য হয়ে তাকালো সেদিকে। তাকিয়ে রইলো অধীর আগ্রহ নিয়ে, তার প্রেয়সী হয়তো এবার কিছু বলবে। প্রণয়নের কথা না হোক অন্তত এটা বলবে যে, " বাড়ি চলে যান মকবুল ভাই।বেশি রাইত করে বাহিরে থাকতে হয় না।"
কিন্তু জেরিন সেসব কিছুই বললো না। সে দ্বিতীয় বারের মতো ডেকে বললো, " মকবুল ভাই! আপনি একটা অসভ্য।"
#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ১৭
#মাকামে_মারিয়া
গায়েষ আবার এত্তু লিখছি।🥲