ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২০তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ২০

#মাকামে_মারিয়া

মকবুলের বাবার মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মালাইকার ইচ্ছে ছিল একটু মিলাদ পড়াবে। কিন্তু হুজুরকে খাওয়াতে হবে হাদিয়াও দিতে হবে। সেসব সম্ভব হবে না। এতোটা অভাবে কখনো পড়েছে কিনা মনে করতে পারলো না। সকাল থেকে মনটা ভীষণ উদাস। ঘরের পিছনে যে ছোট্ট খালটা আছে। সেটার পাড়ে বসলে মৃদু বাতাস গায়ে লাগে। মন হালকা হওয়ার মতোই আবহাওয়া কিন্তু বার বার দীর্ঘশ্বাস ছেড়েও মনটা হালকা করতে পারলো না সে। মকবুলের কথা ভাবলে মনটা আরও ভারী হয়। অভিমান জমে। এতবড় একটা ছেলে অথচ তার জন্য নাকি এই বিশাল পৃথিবীতে কোনো কর্ম নেই। সে টিউশনিকেও নিজের জন্য হারাম করে নিয়েছে। টিউশনি করবেই না নিয়ত করে ফেলছে। একবার যেটা করবে না বলে সেটা আর করে না। তাহলে এই ছেলে করবে টা কি? মালাইকার বুকটা ভারী হয়ে আসে। চোখে পানি চিকচিক করতে থাকে। এ অভাবী জীবন তার আর ভালো লাগে না। মেহরিমার মুখের দিকে তাকিয়ে এই কুৎসিত জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। সেই ছোট্ট একটা প্রান মালাইকার মেয়ে তার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছে। এটা তো আমানত। আমানতকে আগলে রাখতে হয়।

মকবুলের কন্ঠস্বর শুনতে পেলো, সে গলা ঝেড়ে ডাকছে, "আম্মা! কই দেখে যান।"

ছেলেটার প্রতি খুব অভিমান তার কিন্তু যখনই আম্মা বলে ডাকে সেই অভিমান পানি হয়ে যায়। নিজের সন্তানের প্রতি কি আর রাগ অভিমান স্থায়ী হয়!

মকবুল অনেক গুলো বাজার নিয়ে এসেছে। একটা বয়লার মুরগী, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, করলা আর সাথে কিছু মশলা। মালাইকা একবার বাজারে দিকে তাকালো আরেক বার ছেলের দিকে। মকবুল বাজার গুলো ব্যাগ থেকে নামাতে নামাতে বললো,"হুজুর আসবে যোহরের পর। দাওয়াত কইরা আসছি।"

মালাইকা করুণ কন্ঠে বললো,"এত কিছু কোথা থেকে আনলি বাপজান? এত টাকা কই পেলি?"

মকবুল মাথা চুলকিয়ে বললো,"ইয়ে! আম্মা একটা কাম জোগাড় করছি।"

মালাইকা তেড়ে এসে বললো,"কি বললি? কি কাম? কোথায়? কবে জোগাড় করলি? আগে তো বললি না?"

" ভাবছি প্রথম বেতনটা পাইলে তারপর জানাবো। এ জন্য আগে জানাই নাই আম্মা মাফ কইরা দেন।"

মালাইকা ময়লা শাড়ির আঁচলটা টেনে ছেলের ক্লান্ত মুখটা মুছে দিয়ে বললো,"কি কাম পাইছোছ বাপজান? খারাপ কোনো কাম না তো আবার? আমার হারাম পয়সা লাগবো না কিন্তু।"

মকবুল তেজি কন্ঠে বললো," এজন্যই ভাল লাগে না আম্মা। আপনে তো চিনেন আমারে। হারাম ইনকাম করুম না বলেই সাতাশ বছর বয়সে আইসাও আমি বেকার ঘুরছি। টইটই করে ঘুরে বেড়াই পথে পথে। মানুষের কথা শুনছি। আপনারে মেহরিমাকে অভাবে থাকতে দেখছি। আর এখন আমি হারাম ইনকাম করুম?"

মালাইকা ছেলেকে শান্ত করার জন্য বললো,"আমি জানি তো বাপ। এখন কি কাম পাইলা সেটাই আমারে জানাও।"

মকবুল মিনমিন করে বললো," মেহনাজ আপা একটা কাম দিছে। একমাস হয় নাই এখনো। পঁচিশ দিন হইছে কিন্তু আজকে আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী তাই বেতন চাইয়া আনছি।"

মালাইকা স্থীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,"মেহনাজ কাম দিছে? সে কি কাম দিলো?"

" বেশ কদিন আগে আমার লগে দেখা হইছিল। জিগাইলো আমি এখন কি করি? কইলাম কিছুই করিনা। মনমতো কোনো কাজ পাই নাই। মেহনাজ আপা একটু সহানুভূতি দেখাইলো। আর বললো, "এবার তো কিছু করেন মকবুল ভাই। আপনার মতো একটা প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে থাকতেও আপনার মা আর ভাগ্নী কষ্টে থাকবে এটা দেখতে আপনার ভালো লাগে?"

আমি অপরাধীর ন্যায় চুপ করে রইলাম। তাকে জানাতে পারলাম না আমার অপারগতার কারনটা। অতঃপর মেহনাজ আপার স্বামী নাফিজ ভাই নিজেই আমাকে বললো যেনো তাদের ব্যবসার কাজে হাত দেই। এমনিতেও নাকি একজন কর্মচারী প্রয়োজন ছিল। মেহনাজ আপা স্বপ্ন দেখাইলো আমি ভালো আর বিশস্ত হলে পার্সোনাল সেক্রেটারির পদটা পেতে পারি।

ছেলের মুখে এসব কথা শুনে মালাইকার কন্ঠস্বরে দোয়া বর্ষিত হতে থাকলো মেহনাজ মেয়েটা সব সময়ই তার পছন্দের ছিল এখন আরেকটু পছন্দের হয়ে গেলো। মকবুল হেঁসে বললো," বুঝলেন আম্মা! মেহনাজ তো আমার ছোট। কিন্তু তাকে সম্মান করে আপা ডাকি সব সময়। এখন মনে হচ্ছে আপা ডাকা সার্তক হলো।"

মালাইকা হাসলো। এতোক্ষণের সব বিষন্নতা এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। ভীষণ আনন্দ লাগছে এখন। মকবুল মায়ের সঙ্গে কাজে হাত দিলো। মেয়েলি অনেক কাজ সে পারে। বেকার বসে বসে মাঝে মাঝে মায়ের সাথে অনেক কাজ করেছে বিধায় প্রায় সবই পারে। রান্না থেকে শুরু করে কাটাকুটি।

দুপুরে নাফিজ কল করে মেহনাজকে বললো, "একটা দাওয়াত আছে একটু গ্রহণ করে আসুন মিসেস নাহিয়ান মির্জা। আমি আজকে বের হতে পারছি না কাজের অনেক চাপ তারউপর মকবুল ভাইও নেই।"

মেহনাজ বললো," কিসের দাওয়াত?"

"ওই তো মকবুল ভাই খুব অনুরোধ করে বলে গেলো আজকে তার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ হবে। আমি যেনো যাই। কিন্তু আমি তো যেতে পারছি না। একেবারে কেউ না গেলে খারাপ লাগবে তার।"

মেহনাজ অনাগ্রহে বললো,"আমি একা যাবো কি ভাবে!"

" মারজানা আপুকে সাথে নিয়ে চলে যাও। এমনিতেও আপু কোথাও যায় না জিজ্ঞেস করো যাবে কিনা!"

মেহনাজ মারজানাকে গিয়ে জানালো দাওয়াতের কথা। মারজানা কিছুক্ষণ ভেবে বললো,"একটা ছোট মেয়ে বাবু আছে যে তাদের বাড়িতে? নাম টা কি যেন মেয়েটার!"

মেহনাজ অবাক হয়ে বললো,"মেহরিমার কথা বলছো?"

" ওহ হ্যাঁ মেহরিমা। ভীষণ মিষ্টি দেখতে মেয়েটা।"

মেহনাজ বললো,"তুমি তাকে চিনো কি ভাবে?"

" শেষ বার তোমাদের বাড়িতে যখন গেলাম। এই মেয়েটার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। আমার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার সেকি মিষ্টি আলাপ। কথায় কথায় মকবুল নামের কাউকে স্মরণ করেছিল।"

মেহনাজ হেঁসে বললো,"বেশ পাকা মেয়ে বুঝলে। যাবে তো তবে?"

মারজানা রাজি হয়ে গেলো। শুধু রাজিই হলো না সে খুব সুন্দর করে রেডি হলো। মেহনাজ চোখ ফেরাতে পারছে না। মারজানাকে কখনো তেমন খেয়াল করে দেখা হয়নি। ছাব্বিশ বছরের একটা মেয়েকে আজকে ষোলো বছরের কিশোরী দেখতে লাগছে। হাসিখুশি থাকলে বুঝি মেয়েদের দেখতে এতো সুন্দর লাগে?

মারজানা হেঁসে জিজ্ঞেস করলো,"আমাকে দেখতে সুন্দর লাগছে তো মেহনাজ?"

মেহনাজ নেচে উঠে বললো,"হ্যাঁ কি মিষ্টি লাগছে তোমাকে।"

" এক বাচ্চার মা মনে হয়?"

মেহনাজ বিস্ময় নিয়ে বললো,"তা কেনো মনে হবে? তুমি কি এক বাচ্চার মা?"

মারজানার হাসিখুশি মুখটাতে কালবৈশাখী নেমে এলো। সে আনমনে শাড়ির পাড় ঠিক করতে করতে বললো," আমি যখন প্রথম বারের মতো প্রেগন্যান্ট হলাম। তাকে খুব আশা নিয়ে খবর টা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সে খুশীতে আত্মহারা হয়ে যাবে। কিন্তু সে খুশী হয়নি মেহনাজ। উল্টো আমার মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়েছিল কয়েকটি বিচ্ছিরি বাক্য। বলেছিল, " বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলো মারজানা। আমি তোমাকে ভালোবাসিনা। এ জন্য বাচ্চা ভালোবাসার প্রতীক হতে পারে না। আমার প্রেমিকা শুনলে আমার উপর মেজাজ দেখাবে। জানোই তো মেয়ে মানুষ কেমন হিংসুটে হয়।"

" আচ্চা কাপুরষ তো।" মেহনাজের মুখ ফুটে বিরক্তির প্রকাশ ঘটলো।

মারজানা তাচ্ছিল্য হেঁসে বললো," কাপুরষ কিনা জানি না। তবে সে মানুষ ছিল না বোধহয়। না হয় নিজের বাচ্চাকে অস্বীকার করতে পারে?"

মেহনাজ জানতে চাইলো,"বাচ্চাটা এখন কোথায় আপু?"

" নেই। তাকে বাঁচতে দেয়নি তো। কিন্তু জানো সে বেঁচে আছে আমার কল্পনায়। আমি স্বপ্ন দেখি তাকে সে খিলখিলিয়ে হাসে, আমি তার ছোট তুলতুলে হাত পায়ে স্পর্শ করি। কিন্তু সে কখনো আমায় মা বলে ডাকেনি। আমার কি ভীষণ আফসোস আমি মা ডাক শুনবো আমার মেয়েটার থেকে।"

মেহনাজের খুব কান্না পাচ্ছে। এতো কষ্ট নিয়ে একটা মানুষ দিব্যি বেঁচে আছে। মারজানা চোখের কোণের পানিটা মুছে দিয়ে বললো," এরপরও তার সাথে সংসার করার কোনো মানে হয় বলো? তাকে আমি মুক্ত করে দিয়েছি। সে ভালো থাকুক তার মতো করে।

দুঃখের পর্ব গুছিয়ে মেহনাজ আর মারজানা চলে আসলো মকবুলদের বাড়িতে। প্রথমে তাদের দেখে মকবুল বেশ অস্বস্তি তে পড়ে গেলো। তার গরিবী ভিটেতে বড়লোক বাড়ির মেয়ে বউয়ের পা পড়েছে অস্বস্তিতে না পড়ে উপায় আছে?

কিন্তু মেহনাজ আর মারজানাকে দেখে মনে হলো তারা খুব স্বাভাবিক এবং এই পরিবেশেই মিশে গিয়েছে। অবশ্য মারজানার মনে হলো এই বাড়িটা এক অদ্ভুত রকমের সুন্দর। একটা নড়বড়ে ঘর, দেখলে মনে হয় একটুখানি ধমকা হাওয়া আসলেই টিনের চালা উড়িয়ে নিয়ে যাবে, খোলা রান্নাঘর, পাশেই চাপকল। চারপাশে থৈথৈ করা খাল আর বিলের পানি। সত্যি সুন্দর। মারজানার খুব ভালো লাগলো। মেহরিমার সাথে তার বিস্তর আলাপ চললো। মেহরিমা বাচ্চা মনের হাজারো প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসলো, মারজানা অতি ধৈর্য আর আনন্দ নিয়ে সেসব প্রশ্নের উত্তর করতে থাকলো। মারজানার মনে হলো ঠিক এইটুকু আনন্দ পাওয়ার লোভেই সে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল অথৈজলে।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন