ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২৬তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ২৬

#মাকামে_মারিয়া

ইদানীং তাসফিয়ার মনটা বেশ উদাস থাকে। কোনো কিছুতে সে আনন্দ খুঁজে পায় না। কি যেন এক রোগ হয়েছে মনের। এ রোগের নাম তার জানা নেই শুধু এতোটুকুই জানে তার কলেজ যেতে ইচ্ছে করে না। পড়তে মন চায় না। সাদমান আর অর্পার ওমন হাসিখুশি মূহুর্তগুলোও তার সহ্য হয়না। ইচ্ছে করে মা'কে বলে এখুনি একটা বিয়ে করে দুই তিনটে বাচ্চা জন্ম দিয়ে জীবন বরবাদ করে দেয়।

একথা মেহনাজ জানতে পেরে খুব হাসলো। বিয়ে করে বাচ্চা জন্ম দিয়ে জীবন বরবাদ করার সিদ্ধান্ত কে নেয়? কিন্তু তাসফিয়া এমন সিদ্ধান্ত নিবে ভেবেছে। হাশেম বাহাদুর আজ অনেক দিন পর নাতনিদের সঙ্গে ছাঁদে আসলেন। মুরব্বির বয়স হয়েছে। নিজের পায়ে হাঁটতেও এখন কষ্ট হয়ে যায়। হাতে লাঠি নয়তো পাশে কেউ ধরিয়ে ধরিয়ে হাঁটাতে হয়। এ ভাবে বেঁচে থাকা কি যে যন্ত্রণার!

আজ মেহনাজ কিছুটা জোর করেই বাহিরের এনেছে। একটু আলো বাতাসে থাকলে মন ও শরীর দুটোই হালকা হয়। এতো বয়স হলো কিন্তু তার পড়ার আয়েশ মিটলো না। এখনো পত্রিকা পেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে থাকে৷ বই পড়তে পড়তে কিছুটা গুঁজে গেছে তার ঘাড়। স্বর্ণা মাঝে মাঝে বলে — আপনি তো পড়তে পড়তেই মারা যাবেন বাবা।

হাশেম বাহাদুর বড় আনন্দ পায় সে কথায়। যেন পড়তে পড়তে মারা যেতে পারাটাই তার সার্থকতা। যৌবনে পড়ার প্রেমে পড়েছিল সে। এ প্রেমের ক্ষয় হয়নি এখনো।

তাসফিয়া রেলিং এর পাশে হেলান দিয়ে আনমনা হয়ে আছে। মেহনাজ জানতে চাইলো কি হয়েছে?

তাসফিয়া বললো— মন খারাপ লাগছে আপু।

" সে তো আসার পর থেকেই শুনছি যে মন খারাপ, মন খারাপ। কিন্তু মন খারাপ কেনো সেটা তো বলবা নাকি?"

তাসফিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো — আপু আমি মনে হয় প্রেমে পড়েছি। কিন্তু প্রেম তো সুন্দর হওয়ার কথা ছিল। প্রেম কেনো এতো বিশ্রী? আমি আগে কত আনন্দে দিন কাটাতাম। আর এখন? এখন আমার সমস্ত দিনটাই মাটি। খেয়ে শান্তি পাই না, বসে শান্তি পাই না, ঘুমাতে গেলে ঘুম আসে না। পড়তেও ইচ্ছে করে না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি আপু প্লিজ হেল্প মি।"

মেহনাজ বললো— এতো চাপ নিচ্ছো কেনো? কুল! তুমি আসলে প্রেমে পড়োনি। সত্যিকারের প্রেম অবশ্যই সুন্দর।

তাসফিয়া তেতে উঠে বললো— বাজে কথা বলো না তো প্রেমে পড়িনি মানে কি?

" সাদমান ক্লাসের সবচেয়ে ইয়াং আর সুন্দর ছেলে। প্রেম তো দূরে থাক তার সাথে মেয়েরা বন্ধুত্ব করতে পারলেই যেন বাঁচে। কিন্তু তুমি সাদমানকে তোমার পিছনে ঘুরাতে চেয়েছিলে। সাদমান তোমার পিছনে ঘুরছে না। বরং সে চাচ্ছে সমস্ত মেয়েগুলো তার পিছনে ঘুরতে থাকুক। এতে সে আনন্দ পায় নিজেকে নিয়ে অহংকার হয় তার। কোনো ভাবে অর্পার সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। এদিকে তুমি তোমার ইগোর কাছে হেরে গেলে। হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরছো তুমি নিজে। এতে কিন্তু তোমার লস হচ্ছে তাসফিয়া। তাদের কি কোনো লস হচ্ছে?"

তাসফিয়া বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সে কিছুই বুঝতে পারলো না। মেহনাজ হয়তো বুঝিয়ে বলতেই পারেনি। তাসফিয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে মেহনাজ বললো— সামনে পরিক্ষা, পড়াশোনায় মনযোগ দাও। সাদমানের মতো হাজার টা ছেলে আমার বোনের পিছনে ঘুরবে। তুমি কি কোনো কিছুতে কম বলো?

"তুমি তো মোটিভেশনাল বক্তা হয়ে গেছো আপু।"

" বি সিরিয়াস তাসফিয়া। যা-ও পড়তে বসো। আমি যেন তোমাকে আর ওসব নিয়ে ভাবতে না দেখি।"

তাসফিয়া চলে গেলো। হাশেম বাহাদুর হাতের ইশারায় ডাকলো মেহনাজকে। কাছে যেতেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো— দাদু ভাই! তোমার মুখটা ওমন শুকনা হয়ে আছে কেনো? তোমার শরীর ভালো তো?

মেহনাজ হেঁসে বললে— ভালো দাদু। কিছু হয়নি আমার।

মির্জা বাড়িতে তুলকালাম লেগে গেলো। নওয়াজ মির্জা বেশ শান্তশিষ্ট মানুষ। সে সব সময় রাগে না। কিন্তু যখন রেগে যায় তাকে সামলানো কষ্টকর হয়ে যায়। আজকের রাগটা একটু বেশিই হলো। উঠানের মাঝখানে সবাই জড়োসড়ো হয়ে চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখই চুপসে আছে।

নওয়াজ মির্জা নাফিজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো — বউকে কি বাপের বাড়িতে একেবারে রেখে এসেছো?

নাফিজ কিছু বললো না। নওয়াজ মির্জা মারজানার দিকে তাকিয়ে বললো— কাল সারারাত না ঘুমিয়ে জেগে ছিলে কেনো? শরীরের দিকে তাকিয়েছো? আর কত করবো আমি তোমাদের জন্য? এবার তোমরাও একটু নিজেদের নিয়ে ভাবো। আমাকে রেহাই দাও।

মারজানা চুপটি করে রইলো সে-ও কোনো জবাব দিলো না। অবশ্য এখানের কেউই কোনো জবাব দিবেও না এটাই নিয়ম। নওয়াজ মির্জা যখন রেগে যায় সে হাজারটা প্রশ্ন করতেই থাকবে কিন্তু জবাব দেওয়া চলবে না শুধু চুপচাপ শুনতে হবে। মারজানা গতরাতে জেগে ছিল এটা বাবার জানার কথা নয়। কি ভাবে জানলো এই প্রশ্নটা কি এখন বাবাকে করা ঠিক হবে? মারজানা মনে মনে নিজেকেই বকা দিলো। যেখানে জবাব দেওয়া না জায়েজ সেখানে প্রশ্ন করা তো হারাম।

নওয়াজ মির্জা এবার দুই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো — সামান্য একটা মেয়ের সাথে তোমাদের বনিবনা হয় না। তোমাদের বনিবনা আর কার সাথে হবে বলতে পারো? একটা মাত্র ছেলে, একটা মাত্র বউ। এর সাথে তোমাদের বনিবনা হয় না? তোমাদের যদি চার পাঁচটা করে ছেলে থাকতো তাহলে আমার এই বাড়ি তো মনে হয় মাছ বাজার করে রাখতে। এ জন্যই বোধহয় আল্লাহ তোমাদের কোনো সন্তান দেয় নাই।

রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নওয়াজ মির্জা কি কি বলে ফেললো সে নিজেও জানে না। রাগটা মূলত হয়েছে আজ সকালে দোকানে গিয়ে। সে দোকানে যায় সবার শেষে। একটু বেলা করেই যায়। দশটা এগারোটার দিকে। নাফিজ এবং বাকি কর্মচারীগণ আগে গিয়েই দোকান ওপেন করে কাজকর্ম শুরু করে দেয়। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছিল তাই নওয়াজ মির্জার ঘুমটাও ভালো হয়েছে। সকালে বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছে। একটু রয়েসয়েই দোকানে গিয়ে তো তার মাথায় হাত। বেলা বারোটা বাজে অথচ তার দোকান এখনো খোলাই হয়নি। কতগুলো লস হয়ে গেলো যে তার। খবর নিয়ে জানতে পারলো তার গুনধর ছেলে শশুর বাড়ি গিয়েছে। সেখান থেকে এখনো ফিরেনি। আর মকবুল? মকবুলের খবর এখনো জানা যায়নি। তাকে সরাসরি বাড়িতে ডাকা হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর মকবুল বাড়িতে হাজির হলো। এমনিতেই এ বাড়িতে পা রাখতে তার ভয় করে। আজ এসে একেবারে উঠানে এতবড় সমাবেশ পেয়ে ছেলেটা ভড়কে গেলো। নাফিজ চোখের ইশারায় ভেতরে আসতে বললে সে একটু সাহস নিয়ে এগিয়ে এসে সালাম দিলো —

" আসসালামু আলাইকুম কাকা।"

" কি ব্যাপার তোমার কি শরীর ভালো না? ওয়া আলাইকুমুস সালাম।"

পাশ থেকে মারজানা বিরবির করে বললো — আব্বু প্রথমে সালামের জবাব নিতে হয়।

" চুপ থাকো। তোমাকে শিখাতে হবে না।" তা মকবুল তোমার মন্তব্য কি?"

মকবুল হাত কচলাতে কচলাতে বললো— কাকা শরীরে একশো দুই ডিগ্রি জ্বর।

শরীরে জ্বর এই কথা শুনে সবাই যতটা না চমকিত হলো তারচে বেশি চমকিত হলো নওয়াজ মির্জার কান্ডতে। সে বসা থেকে উঠে এসে মকবুলের কপালে হাত রেখে জ্বর মেপে বলছে" সেকি! জ্বর তো খুব। চলো ঘরে চলো। নাস্তা পানি খেয়ে ঔষধ খাবে।" যেন এতোক্ষণ দেখানো সমস্ত রাগ পানি হয়ে গেলো।

মারজানা নাফিজের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো। তার বাবা যে কেমন মানুষ এটা তাদের চেয়ে ভালো কেউ বলতে পারবে না। এ লোক রাগ দেখিয়ে মূহুর্তের মধ্যে বুকে টেনে নিতে পারে।ছোট বেলায় মারজানাকে কত ধমক দিয়েছে আবার একটু পরেই লোকমা তুলে খাইয়ে দিতো, চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ে দিতো। এমন আদর গুলো নাফিজ একটু কম পেয়েছে কারন তখন উনি বিদেশ ছিল।

মকবুলের মনে হলো সে শশুর বাড়ির আপ্যায়ন পাচ্ছে। যদিও সে জানে না নতুন জামাইকে ঠিক কি ভাবে আপ্যায়ন করা হয় তা-ও একটু ধারণা তো থাকেই। খাওয়া দাওয়া শেষ করে নাফিজ সিদ্ধান্ত নিলো সে এবার দোকানে যাবে। দুপুর থেকে রাত অব্দি থাকবে। মকবুলকে বলা হলো বাড়ি চলে যেতে। আজ আর দোকান করতে হবে না।

মকবুল চলে যাবে ঠিক এমন সময় আকাশে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলো। বৈশাখ মাসের বৃষ্টির লজ্জা শরম কিছু কমই বটে। তা না হলে যখন তখন বৃষ্টি আসবে কেনো?

লম্বা বারান্দায় মকবুল বসে বসে ঝিমাচ্ছে। সে খুব অস্বস্তি আর ভয়ে আছে। কে জানে তাকে আবার কার মুখোমুখি হতে হবে! এ বাড়ির মানুষ গুলোকে অদ্ভুত রকমের লাগে তার কাছে। সবাই কেমন গম্ভীর।

মকবুল দুপা নাচাতে নাচাতে ঝিমাচ্ছিল। হঠাৎ দুটো ফর্সা পা তার চোখে পড়লো। একটু একটু করে পা দুটো তার দিকে এগুচ্ছে। কারো পা এতো সুন্দর হয়? মকবুল মুগ্ধ হয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। শাড়ির পাড় পা ছুঁয়ে যাচ্ছে একটু পর পর।

মারজানা কাছাকাছি এসে গলা ঝেড়ে বললো— বৃষ্টি আপনাকে অনেক ভালোবাসে নাকি আপনি বৃষ্টিকে ভালোবাসেন?

মকবুলের ইচ্ছে করলো না পায়ের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মুখের দিকে তাকাতে। তবুও তাকালো। একটু ভেবে বললো — ভালোবাসা বাসির কোনো সম্পর্ক আমাদের মধ্যে নেই।

"তবে আপনার সাথে বৃষ্টির যে খুব সমঝোতা চলে সেটা কেনো?"

মকবুল একটু থেমে থেমে বললো — হিংসা হচ্ছে আপনার?

" হিংসা? আমার হিংসা হতে যাবে কেনো মকবুল সাহেব?"

মকবুল কিছু বললো না চুপ করে রইলো। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর সাথে নিচের দিকে ঝুকে একটি মেয়ের দুটো পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভীষণ ভালো লাগছে। এমন ভালো লাগা কখনো অনুভব করেনি সে। মেয়েটা শুভ্র রঙের শাড়ি পড়েছে। উঠানের বেলী গাছটা বৃষ্টির পানিতে নড়ছে। মনে হচ্ছে একটা ফুল মেয়েটার কানে গুঁজে দিতে পারলে ভালো লাগতো।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন