#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ২৫
#মাকামে_মারিয়া
আকাশের চাঁদটা এখন আর নেই। মেঘ এবার চাঁদটাকে পুরোপুরি গিলে ফেলছে। আকাশ গম্ভীর হয়ে আছে। চারদিকে মৃদু বাতাস, বাড়িটা বিলের পাশে আর নির্জনে বিধায় মৃদু বাতাসটাকে কিছুটা ধমকা হাওয়া মনে হচ্ছে। কাজী সাহেব তাড়া দিলেন এমনিতেই এতো রাত হয়ে গেলো তারউপর আকাশে মেঘ করেছে যেকোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে।
কাবিননামা খাতাটায় স্বাক্ষর করেছে রওনক। পুরুষ লোকগুলো বাহিরেই বসে ছিল। বাড়িতে আর তেমন মানুষও নেই। মালাইকা বাহিরে আসবেন না। মকবুলকেই কাবিননামা খাতাটা ঘরে জেরিনের কাছে নিয়ে যেতে হলো। জেরিন নতুন বউ সেজে বসে আছে মকবুলেরই নড়বড়ে ঘরে। একটু পর সেই নড়বড়ে ঘর ও বিধ্বস্ত হৃদয় থেকে মেয়েটাকে বিদায় দিবে সে। অন্যের স্ত্রী বা প্রেমিকার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার মতো লোক মকবুল নয়, তার আত্মসম্মান প্রখর।
মকবুল হাত দিয়ে স্বাক্ষরের জায়গা টা দেখিয়ে দিলো। জেরিন বেশ সুন্দর করেই স্বাক্ষর করলো অর্থাৎ সে কারো নামে হয়ে গেলো। এক নতুন জীবন। কাজী সাহেব বিয়ে পড়ালেন। বর ও কনের সংসার জীবন সুখ ও শান্তিময় হওয়ার উদ্দেশ্যে মোনাজাত ধরলেন। নাফিজ রওনক ভিতরের ঘরে মালাইকা মেহরিমা এবং নতুন বউ জেরিনও মোনাজাতে শরীক হলো। সবাই যে যার মতো মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। মকবুল কেবল দুটো হাত একসাথে করেই রাখলো, শেষে এসে বিরবির করে একবার আওড়ালো "আল্লাহ এতিম মেয়েটাকে আপনি সুখী করিয়েন। বড় একা মেয়েটা। আপনি তাকে সঙ্গ দিয়েন।"
এবার নতুন বউয়ের বিদায়ের পালা। এদিকে আকাশের অবস্থা খারাপ মালাইকা চাইলেও নতুন বউ এবং জামাইকে তার ঘরে রাখতে পারেন না কারণ তার ঘর যে উপযুক্ত নয়। নাফিজ বললো সোজা নিজ বাড়িতে চলে যেতে এই রাতে নিশ্চয়ই বের করে দিবে না। পরে যা হওয়ার দেখা যাবে। রওনক জেরিনকে নিয়ে বাইকে রওনা হলো। নাফিজ থেকে গেলো। এখান থেকে বেশি দূরে নয় তার শাশুড়ী বাড়ি। সে আজকে মেহনাজের কাছে থাকবে এটাই ভেবে রেখেছিল। বড় রাস্তা অব্দি মালাইকা এগিয়ে দিতে আসলো। জেরিন মালাইকার দিকে তাকিয়ে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো, " আবার আপনাদের বাড়ি আমি আসতে পারবো তো চাচী?"
মালাইকা বড় ভালো মানুষ, সে হেঁসে বললো "কেনো পারবে না মা? অবশ্যই আসবা। এটাই তোমার বাপের বাড়ি মনে করবা। মেয়েরা যেমন বাপের বাড়ি আসার জন্য ছটফট করে তুমিও তোমার এই বাপের বাড়ি চলে আসবা। রওনকের দিকে তাকিয়ে বললো," মেয়েটাকে নিয়ে আবার এসো বাবা।"
রওনক বললো, " আসবো আন্টি। গেলাম তাহলে দোয়া করিয়েন।"
রওনক আর জেরিন চলে গেলো। মকবুল বাড়ি ফিরে আসলো। তার কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। মালাইকা ছেলেকে ডেকে বললো, " খেয়ে নে এবার। অনেক রাত হলো যে!"
মকবুল বাহিরে বসে আছে। বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো," আপনি ঘুমায় যান আম্মা। বৃষ্টি আসবো মনে হয় আমি একটু বাহিরে বসি। পরে খাইয়া ঘুমাবোনে।"
মালাইকা এবার আর ছেলেকে কিছু বললো না, তাকে তার মতো করে ছেড়ে দিলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই বৃষ্টি নামলো। মকবুলের চিন্তা হলো এটা ভেবে যে রওনক আর জেরিন ঠিকঠাক পৌঁছালো কিনা! এরপর ভাবলো চিন্তা করার জন্য এখন তার স্বামী আছে। তাদের টা তারাই বুঝে নিবে। জেরিনের জন্য চিন্তা করার জন্য রওনক আছে। রওনকের জন্য চিন্তা করার জন্য জেরিন আছে। কিন্তু মকবুলের জন্য কে চিন্তা করবে? কেউ না। মকবুলের কেউ নেই। এই দুনিয়ায় অনেক মানুষ কিন্তু সবার নিজের একটা মানুষ হয় না।
একদম বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। জেরিন খানিকটা ভিজে গেলো। রওনক বাইক থেকে নেমে জেরিনের হাত জাপ্টে ধরে দুজনেই একসাথে দৌড় লাগালো। জেরিন থামিয়ে দিয়ে বললো, " একটু বৃষ্টিতে ভিজবো চলো।"
রওনক ততক্ষণে ভিজে গিয়েছে। চোখ মুখের পানি মুছতে মুছতে বললো," ভিজা শরীর নিয়ে বাড়ি যাবো কি ভাবে?"
" ভিজেই তো গিয়েছি। আরেকট ভিজলে কিছু হবে না।"
প্রিয়তমার আবদার ফেলতে পারলো না রওনক। আচমকা ভেজা শরীরের জেরিনকে কোলে তুলে নিলো। জেরিন লজ্জায় রওনকের বুকে মুখ লুকালো।
শহুরে পাকাঁ রাস্তা পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ভিজে টইটম্বুর, ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোয় একজোড়া কপোত-কপোতী মনের আনন্দে ভিজলো। এ যেন বৃষ্টিতে নয় সুখের সাগরে ভিজছে। ঠিক উল্টো দিকে হয়তো অন্য কেউ বৃষ্টিতে নয় দুঃখের সাগরে ভিজছে। তাই তো বলা হয়ে থাকে বৃষ্টি সবার জন্য সুখকর নয়। কারো কারো জন্য বিষাদ বয়ে আনে।
মারজানার শরীরটা বেশি ভালো নেই। সে সন্ধ্যায় নাওয়া খাওয়া রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মাঝরাতের বৃষ্টির শব্দটা কানে বাজতেই তার ঘুম ছুটে গেলো। খিদেও লেগেছিল কিছুটা। বিছানা ছেড়ে রান্না ঘরে গিয়ে এককাপ কফি হাতে রুমে আসলো। উঠানে যে লাইট টা দেওয়া হয়েছে সেটা সারারাত জ্বলে। এ লাইটের আলোতে মারজানার রুমের বারান্দাটা আলোকিত করে রাখে। ঠিক তার ডানের বারান্দাটা নাফিজের। সেটাতে সরাসরি আলো না পড়লেও মৃদু আলো পড়ে। মারজানা কফিতে চুমুক দিয়েই ফোন স্ক্রীনে সময়টা দেখে নিলো। রাত বারোটা তেত্রিশ বাজে। হঠাৎ মনে হলো আজ নাফিজ বাড়ি ফিরেনি। আজ তো মেহনাজদের বাড়ি যাওয়ার কথা। মেহনাজও বাড়ি নেই বেশ অনেক দিন হলো। মারজানার বড় একা একা লাগে। অবশ্য মেহনাজ বার বার বলে তাদের বাড়িতে যেন একবার গিয়ে ঘুরে আসে কিন্তু মারজানার ইচ্ছে করে না। ঘরকোণো হয়ে থাকতে তার যেন একটু বেশিই ভালো লাগে।
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মকবুলের কথা মনে হলো। উঠানের বড় আম গাছটার দিকে তাকিয়ে মারজানা চুপটি করে রইলো। একটা মানুষকে কারো শুধু শুধু তো মনে পড়ার কথা নয়। তাহলে হঠাৎ মকবুলকে কেনো মনে পড়ছে? সেদিন মকবুল আরও একবার তাদের বাড়ি এসেছিল। নাফিজ দোকানের চাবি নিতে ভুলে গিয়েছিল। মকবুলকে পাঠিয়েছিল চাবি আনতে। মকবুল সরাসরি এসে মারজানার সামনে পড়লো। মারজানা জানতে চাইলো — " কিছু হয়েছে? নাফিজ দোকানে গিয়েছে তো।"
" জি গিয়েছে। কিন্তু চাবি, মানে চাবি নিতে ভুলে গেছে।"
মারজানা ভ্রু কুঁচকে বলেছিল, ' আপনি কি এ ভাবেই কথা বলেন সব সময়?"
মকবুল আরেকটু ইতস্তত করে বললো, " কেমন করে কথা বলি?"
" এই যে আমতাআমতা করেন সব কিছুতে। মনে হয় ভয় পান খুব।"
মকবুল বলেই ফেললো, " জি আপনাকে একটু ভয়ই লাগে।"
মারজানা বেশ মজা পেয়ে জানতে চাইলো, " তাই নাকি? কিন্তু আমাকে কেনো ভয় লাগে?"
মকবুল একটু নড়েচড়ে বলেছিল," পরে বলবো। বস অপেক্ষা আছে চাবির। চাবিটা দেন আজ যাই।"
" আবার আসবেন তাহলে?"
" জানিনা আসতেও হতে পারে।"
মারজানা ঘর থেকে চাবিটা এনে দিতে দিতে বলেছিল, " আকাশ ডাকছে। খুব বৃষ্টি হবে হয়তো। একটু অপেক্ষা করুন বৃষ্টির অবস্থাটা দেখুন তারপর না হয় যান।"
মকবুল মেয়েটাকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করে বলেছিল, " বৃষ্টিতে ভিজতে আমার অসুবিধা হয় না। রাত দুটো তিনটে তে বৃষ্টি হলে আমি ঘুম বাদ দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি। ভালোই লাগে। মন্দ না। আমার অভ্যেস আছে।
মারজানার কফি শেষ হয়ে আসলো। সে এখন ভাবছে — আচ্ছা লোকটা কি তবে আজকেও বৃষ্টিতে ভিজছে?
মকবুল জানলো না তাকে নিয়ে চিন্তিত হওয়ার জন্যও এই মহাবিশ্বে একজনের নতুন করে জন্ম হয়েছে। যে অজান্তেই মকবুলকে নিয়ে চিন্তা করছে।
নাফিজ বৃষ্টি মাথায় করে মেহনাজদের বাড়িতে ঢুকলো। মেহনাজ বৃষ্টি ভেজা নাফিজকে দেখে জিজ্ঞেস করলো— বিয়ে খাওয়া শেষ?
নাফিজ বললো," হ্যাঁ তোমার দাওয়াত টাও আমি খেয়ে আসছি।"
মেহনাজ হাসলো। স্বর্ণা তাসফিয়া কেউ জানতো না নাফিজ আসবে। তাই তারা যে যার রুমে ঘুমিয়ে গেছে। যদিও মেহনাজ আর তাসফিয়া একই রুমে ঘুমাতো। মেহনাজ আজকে তার নিজের রুমে থাকবে বলেই চলে এসেছে।
কিচেন থেকে এক গ্লাস গরম দুধ এনে নাফিজকে দিলো সে।
নাফিজ গ্লাসটা একপাশে রেখে বললো, " বউয়ের হাতের স্পেশাল কোনো রেসিপি খেতে ইচ্ছে করছে। সম্ভব কি?"
মেহনাজ ভাবুক চাহনিতে জিজ্ঞেস করলো, " খিদে পেয়েছে তাই না?"
" খিদে পাবে কেন? তোমার হাতের স্পেশাল রেসিপি খেতে চাইতে পারিনা?"
" জি পারেন কিন্তু আপনার যে খিদে পেয়েছে সেটা আমার বুঝতে বাকি নেই। বসেন আমি খাবার নিয়ে আসছি।"
মেহনাজ কিচেনে চলে গেলো। নাফিজকে আর খাওয়া দাওয়া নিয়ে জিজ্ঞেস করে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইলো না। মকবুল ভাইদের অবস্থা সম্পর্কে তার জানাশোনা কিছু কম নেই। তাও রাত-বিরেতে কি বা আয়োজন করবে তারা। দিন হলে না হয় অন্য ব্যাপার ছিল।
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে নাফিজ গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। আজ একটু বেশিই ক্লান্ত। মেহনাজ পাশে বসে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো — " বাড়ির সবাই কেমন আছে?"
" ওসব এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।"
" তাহলে কি ইচ্ছে করছে মির্জা সাহেব?"
" মিসেস নাহিয়ান মির্জাকে একটু আদর করতে ইচ্ছে করছে।"
মেহনাজ পাশ থেকে উঠে যেতে যেতে বললো," শুধু দুষ্ট ইচ্ছে।"
নাফিজ চোখ বন্ধ রেখেই বললো— " এলিন আসো একটু বুকে নেই। বুকটা খালি খালি লাগছে।"
মেহনাজ কি ভীষণ লজ্জা পেলো। নাফিজ অতি কষ্টে চোখ খুলে সেই লজ্জা মাখা মুখটা দেখার সুযোগ লুফে নিলো। বৃষ্টি থামার নাম নেই, রাত বাড়লো। একটি বৃষ্টিস্নাত রাত অনেকের হলো। কারো বিষাদে কাটলো, কারো আবার আনন্দে, কারো মধুময়, কেউ বা অজান্তেই কাউকে নিয়ে চিন্তায় কাটিয়ে দিলো।
চলবে......