ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২৮তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ২৮

#মাকামে_মারিয়া

লোকে বলে বৃষ্টি সবার জন্য সুখকর হয়না। লোকে আরও বলে যার দুঃখ তার চিরকালই দুঃখ। জেরিন আজকাল সেটা টের পাচ্ছে। মানুষ কোনো না কোনো ভাবে দুঃখ পেতেই থাকে। বৈশাখ মাসের অঝোর ধারার বৃষ্টি। রওনক যে বাসাটা ভাড়া নিয়েছে সেটা চারপাশে ইটের হলেও মাথার উপরের ছাঁদটা টিনের, তাও দুই এক জায়গায় ছিদ্র। বৃষ্টি আসলে সেগুলো খুব ভালো করেই টের পাওয়া যায়। ঠিক যেমন ভাবে অভাব আসলে টের পাওয়া যায় ভালোবাসা বলতে আসলে কিছু হয়না।

বৃষ্টির পানিতে শরীরটা ম্যারা হয়ে গিয়েছে। এমাসে একটা খাট কিনে এনেছে, তাও জেরিনের টিউশনির টাকায়। সংসারও চলে তারই টাকায়। রওনক কাজ করে না। তার ভাষ্যমতে কোনো কাজ নাকি নেই যেটা সে করবে। অর্থাৎ রওনকের উপযুক্ত কাজ সে পাচ্ছে না। ওতো হ্যান্ডসাম একটা ছেলে যা-তা কাজ তো আর করতে পারে না। সম্মানে লাগে। বাবা মা-ও ঠিক ভালো চোখে দেখছে না তাকে। বড় ভাইয়ের প্রতি অনুগত বেশ। তাকে তো বাড়ি ছাড়া করেই দিলো।

বৃষ্টিতে ভিজে টইটম্বুর হয়ে বাসায় ফিরলো রওনক। হাতে একটা পলিথিন। অনেক গুলো ভেজা কদম ফুল। জেরিনের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে ফুল গুলো দিয়ে রওনক বললো— ফুল এনেছি তোমার জন্য।

জেরিন পলিথিনটা ছুঁড়ে মেরে চেচিয়ে বলে উঠলো — এতে পেট ভরবে তো? ঘরে চাল ডাল কিছু নেই সে খবর আছে তোমার? তুমি ঢং করে ফুল নিয়ে আসছো!

রওনক একটুও রেগে গেলো না। জেরিনের রাগ যর্থাথ, শুধু শুধু রাগ করার মতো মেয়ে নয় সে। আর কত দিনই বা কষ্ট করে সংসার করবে? সব মেয়েরই তো শখ একটা সুন্দর সাজানো-গোছানো সংসার পাবে। কিন্তু জেরিনকে ওমন সংসার রওনক দিতে পারেনি সে ব্যর্থ। মাঝে মাঝে রওনকের মনে হয় জীবন এতো কঠিন কি ভাবে হয়ে গেলো! আগে কি বিন্দাস ছিল সে। অথচ এখন চাইলেও জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়। জেরিনকে ফেলে কোথাও পালিয়ে যাবে এটা সে ভাবতেও পারে না। মেয়েটার প্রতি ভালোবাসাটা খাঁটি-ই বটে!

জেরিন যখন খুব রেগে যায় রওনক তখন চোখের সামনে থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাই আজও বৃষ্টি মাথায় করেই সামনের গলিতে হাঁটা ধরলো। কিছুদূর যেতেই একটা বটগাছ আছে। সেটার নিচে বসে রইলো কিছুক্ষণ, বৃষ্টি প্রবলভাবে বাড়ছে,থামাথামির নাম নেই। রওনক বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ভাবে সে কি করবে? খোদা তাকে এমন অপর্দাথ কেনো বানালো? তার কি মরে যাওয়া উচিৎ? কিন্তু না সে মরতে চায় না। জেরিনের সঙ্গে তার অনেক দিন সংসার করার ইচ্ছে। আর সে মরে গেলে জেরিন কাকে নিয়ে বাঁচবে? রওনক বিশ্বাস করে জেরিন তাকে বড় ভালোবাসে। এই দুঃসময়ে এসে রওনক উপলব্ধি করলো তার সকল পাপের শাস্তি সে এই দুনিয়ায় পেয়ে যাচ্ছে। সাথে আরও একটা মেয়েকেও ভুগতে হচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতেই রওনকের চোখ দুটো ভিজে আসে কিন্তু বৃষ্টির পানিতে চোখের পানি আড়াল হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করেই অনুভব করে তার বাহুডোরে সেই চিরচেনা স্পর্শ। রওনক চোখ বন্ধ করেই জিজ্ঞেস করে— তুমি ভিজতেছো কেনো জেনি?

"তুমিও ভিজছো তাই।"

রওনক চোখ খুলে জেরিনের ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে বলে— আমি ভিজছি তাই তোমাকেও ভিজতে হবে?

জেরিনের চোখে মুখে পাহাড়সম অভিমান। সে অভিমানী স্বরে বলে— তুমি পুড়ছো আমিও পুড়ছি না বুঝি? দুজনেই যদি পুড়বো তবে ভিজবো না কেনো?

রওনক আর কিছু বলে না। এই নির্জন রাস্তায় কোনো জনমানবকে চোখে পড়ছে না৷ সবাই বৃষ্টির থেকে বাঁচার জন্য ছায়া খোঁজে নিয়েছে অথচ জেরিন খোঁজে নিয়েছে রওনকের সঙ্গ। রওনক সেই প্রথম রাতের মতো পাজ কোলে করে জেরিনকে নিয়ে ঘরের দিকে রওনা দিলো। জেরিনের ভেজা ঠোঁটের কোণে হাসিরা উড়ো উড়ি করছিলো বোধহয়। মাঝে মাঝে তার মনে হয় তাকে যে জন ভালোবাসে মন উজাড় করে ভালোবাসে। মকবুল ভাইও তো কম ভালোবাসেনি। কিন্তু কেন যে সে মকবুল ভাইকে ভালোবাসার চোখে দেখতে পারেনি। সে ছিল বড় ভালো মানুষ, তাকে সর্বদা সম্মান আর শ্রদ্ধার চোখে দেখতেই ভালো লাগে। ভালোবাসার চোখে তো দেখেনি।

ভালোবাসা পাওয়ার দিক থেকে জেরিন ভাগ্যবতী বটে। সব পাত্রেই তার জন্য ভালোবাসা ভরপুর।

_________

তাসফিয়ার এইচএসসি পরিক্ষা প্রায় শেষের দিকে। স্বর্ণা প্রতিটা পরিক্ষার সময়েই তাসফিয়ার সাথে গিয়েছে। এমন মেয়েকে একা ছেড়ে দেওয়া রিক্সের ব্যাপার। রাস্তাঘাটে সে যার তার সঙ্গে ঝামেলা করে ফেলতে পারে। স্বর্ণার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করতো তাসফিয়ার মুখটা সেলাই করে দেয়। এই মুখটাই যত নষ্টের মূল। কাউকে একচুল ছাড় দিতে চায় না এ মেয়ে।

রাফির মুখোমুখি আর হয়নি সে। রাফিও বা ওমন চুপ করে গেলো কি ভাবে সেটাও ভেবে পায়নি তাসফিয়া। কলেজ মাঠে সবার সামনে কানে ধরে রোদে দাঁড়িয়ে থেকে কি তবে সে ভয় পেয়েছে?

শেষ পরিক্ষার দিন স্বর্ণা সাথে আসতে পারলো না। তাসফিয়ার বাবা চট্টগ্রাম থাকে প্রায় সময়। মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা কিছুটা গম্ভীর। মা অবশ্য কিছু পরিষ্কার করতেও দেয় না তাই সম্পর্কের ম্যারপাচঁ ঠিক জানে না মেহনাজ বা তাসফিয়া কেউই, ব্যস একটু আকটু আন্দাজ করতে পারে। তাসফিয়া বাবাকে বলেছিল সাথে আসতে সে তখন বাড়িতে ছিল। কিন্তু স্বর্ণা কড়া গলায় নিষেধ করেছে। তার ভাষ্যমতে "ছোট থেকে দুই মেয়ের সমস্তটাই সে দেখে এসেছে তাই একদিনের জন্য যেন কেউ বাবা সাজতে না আসে।" যদিও কথাটা বেশ উগ্র শুনায়। কিন্তু আদোতে মা আর বাবার মধ্যে ঠিক কি নিয়ে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে আছে সেটা তাদের জানা হয়না।

নাফিজ এসে তাসফিয়াকে দিয়ে গেলো পরিক্ষা কেন্দ্রে। যাওয়ার সময় কে নিয়ে যাবে সেটা নিয়ে কথা হয়নি। মেহনাজের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাকে দেখেশুনে রাখতে তিন চারজনের প্রয়োজন হয়ে যাচ্ছে যে কারনে তাসফিয়ার বেলায় এসে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিক্ষার শেষ দিন সবার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। পরিক্ষা শেষে অর্পা এসে থেমে থেমে তাসফিয়াকে বললো — তাসফিয়া আমরা ঘুরতে যাচ্ছি। তুমি কি যাবে আমাদের সাথে?

খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারো সাথে কথা বলে না। আজ অর্পা নিজ থেকে কথা বলতে আসলো। তাসফিয়া অবাক হলো। সে হার মানার মেয়ে নয়, মুখের উপর বলে দিলো যাবো না।

সাথে থাকা শর্মি বেশ অনুরোধের স্বরেই তাসফিয়াকে বললো— চল না যাই দোস্ত। সবাই যাচ্ছে আমরা যাবো না?

" আমরা মানে? শুধু আমি যাচ্ছি না। তুই চাইলে যেতে পারিস।"

" তোকে ছাড়া আমি যাবো? চল না তুইও। এই তো শেষ, সবার সাথে আর দেখা নাও হতে পারে।"

শর্মির যাওয়া বন্ধ হচ্ছে তাসফিয়ার জন্য এটা তাসফিয়ার ভালো লাগলো না। সে বার বার বললো শর্মি যেন চলে যায়। কিন্তু শর্মি নাছোড়বান্দা। এরপর একে একে সবাই এসে তাসফিয়াকে অনুরোধ করতে লাগলো। তাসফিয়ার নিজেকে একটু হিরোইন ভাবতে লাগলো সবাই সাধাসাধী করছে বেশ মজার ব্যাপার। শুধু রাফি আর সাদমান এগিয়ে আসলো না। দুটো মিলে দূর থেকে বিরবির করছিলো।

তাসফিয়া উঁচু স্বরে সবাইকে শুনিয়ে বললো— যাবো একটা শর্তে। কেউ যেন আমাকে না খোঁচায়।

অর্পা আস্তে করে বললো— কেউ খোঁচাবে না চলো।

__________

মেহরিমা দু'গালে হাত রেখে আনমনা হয়ে বসে আছে। মকবুল একটা পেপসি এনে মেহরিমাকে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো — তোমার মন খারাপ নাকি মেহরিমা?

মেহরিমা পেপসি মুখে নিয়ে ঘাড় দু'দিকে নাড়ালো কেবল।

মকবুল আবার জিজ্ঞেস করলো — কিছু হয়েছে?

" কিছু হয়নি মামা। কিন্তু কাল স্কুলে প্যারেন্টস মিটিং আছে। ম্যাম বলেছে বাবা অথবা মা'কে নিয়ে যেতে। কিন্তু মামাকে নিয়ে যেতে তো বলেনি। আমি তোমাকে নিয়ে গেলে ম্যাম বকা দিবে না তো?

মকবুল দু'হাতে মেরিমার গাল দুটো হাতের মুঠোতে এনে বললো — একদম বকা দিবেনা মা। মন খারাপ করো না।

মকবুল কথা দিয়েছিলো সে মেহরিমার সাথে স্কুলে যাবে তবে কথা রাখতে পারেনি। রাতে নাফিজের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে রাখলেও সকালে নাফিজ ব্যথিত কন্ঠে জানিয়েছে মেহনাজকে নিয়ে হসপিটালে যেতে হবে মেয়েটার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আজ একবার ডক্টর দেখাতে হবে। তাই মকবুল যেনো দোকানে চলে যায়। মকবুল হ্যাঁ বলে দিলো ঠিক কিন্তু চিন্তায় পড়লো সে। মা'কে বলবে নিয়ে যেতে? মেহরিমা নিশ্চয়ই মন খারাপ করবে। এমনিতেই মেয়েটা মন খারাপ করে ছিল কাল।

কি করবে ভেবে না পেয়ে মকবুল আনমনেই একটা নাম্বার ডায়াল করলো। তখনও সে চিন্তায় মগ্ন। ওপাশ থেকে দুবার হ্যালো হ্যালো শব্দ শুনার পর সে জবাব দিয়ে বললো— জি! একটা সাহায্য করতে পারবেন?

মারজানা যেনো অধির অপেক্ষায় বসে ছিল মকবুল যদি একটা বার তার নিকট কোনো আবেদন নিয়ে আসে। সে বললো— আপনাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে মকবুল সাহেব। কিছু হয়েছে?

" কিছুই হয়নি। তবে সাহায্যের জন্য আপনার কাছেই কেনো আসলাম সেটা ভাবার বিষয়। এটা নিয়ে গভীর রাতে ভাববো। আপাতত আপনি কি মেহরিমাকে নিয়ে একটু স্কুলে যেতে পারবেন? আপনি গেলে খুশী হবে সে। আপনাকে খুব পছন্দ করে, সব সময় বলে আপনি তাকে খুব আদর করেন।"

মারজানা বড় খুশী হলো। এরকম একটা সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য মকবুলকে ধন্যবাদ দিতে হবে। কোনো একদিন আয়োজন করেই বরং ধন্যবাদ দিবে। ঠিক যেমন ভাবে সে আয়োজন করে গভীর রাতে মারজানা কে নিয়ে ভাবতে বসবে তেমন ভাবে।

মেহরিমাকে যখন বাড়ি থেকে মারজানা নিতে আসলো তার খুশী দেখে কে! মারজানাকে কিসের কারণে এতোটা আপন আর পছন্দ করে ফেলেছে সেই ব্যাখা কারো কাছে নেই। মালাইকার শরীরটা আজ খারাপ, গত দুইদিনের বৃষ্টিতে জ্বর চলে আসছে। মারজানাকে গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলো দিলো— মেয়েটাকে চেয়ে রেখো মা। আবার বাড়িতে এনে দিয়ে যাবে তো?

" জি আন্টি আমি আবার দিয়ে যাবো। আপনি চিন্তা করবেন না।"

মালাইকা সত্যি সত্যি চিন্তা করলো না। মনে হলো এই মেয়েকে নিয়ে করা এতো দিনের সমস্ত চিন্তা উধাও হয়ে গেলো। বেলা বারোটায় ঝড়তুফান হলো, বজ্রপাতে একা ঘরে মালাইকার মৃত্যু হলো। দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে সমস্ত চিন্তার সমাপ্তি টেনে, মকবুলকে এতিম করে দিয়ে মালাইকা বিদায় নিলো। যে বিদায় অবধারিত, সবাইকে নিয়ে হবে। কে কখন নিবে কেউ জানে, তবে নিতে তো হবেই।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন