ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছলেবলে কৌশলে

২৯তম পর্ব

লেখক: মাকামে মারিয়া

#ছলেবলে_কৌশলে

#পর্ব ২৯ ( শেষ পর্ব)

#মাকামে_মারিয়া

সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকের চিৎকারে উপস্থিত সবাই যেন নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। নার্স এসে ফুটফুটে একটা ছেলে বাবু এনে নওয়াজ মির্জা কোলে দিলেন। খুশিতে নওয়াজ মির্জার চোখের কোণে পানি জমলো। তারই বংশে কিনা ছেলে সন্তানের জন্ম হয়েছে!

এ যেন সাত কপালের ভাগ্য। নওয়াজ মির্জাদের পরে মির্জা বাড়িতে আর কোনো ছেলে সন্তান হয়নি। নাফিজ নিজেও এ বংশের ছেলে নয়। নওয়াজ মির্জার ভাইদেরও সেই একটা দুটো করে ছেলে মেয়ে, কারো একটা ছেলে কিংবা একটা মেয়ে। কারো আবার কোনো সন্তানই ছিল না।

তার মধ্যে নওয়াজ মির্জা ছিল সন্তানহীন পিতা। কোহিনূরকে বিয়ে করার পাঁচ বছর পর কোহিনূর একটা মৃত সন্তান জন্ম দেয় এরপর বহু বছর কেটে গেলো সে আর সন্তানের মুখ দেখলো না। বংশ বৃদ্ধির কথা ভেবে নওয়াজকে দ্বিতীয় বিয়ে করানো হলো। শামসুন্নাহার নিচু জাতের মেয়ে ছিল, তবে দেখতে সুশ্রী। স্বামীর ভালোবাসার থেকে বঞ্চিত না হয়নিবতবে সে-ও সন্তানের মুখ দেখাতে সক্ষম হলো না।

মারজানার মা তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলো। নওয়াজ মির্জার আম্মা নসিমন কোহিনূরের কোলে তিন দিন বয়সী মারজানাকে দিলো। নিজের মেয়ের মতো লালন-পালন করতে লাগলো দুই বউ। মারজানা বড় হতে লাগলো। শামসুন্নাহার বহু আরাধনা করেও সন্তান পেলো না। এরপর সিদ্ধান্ত নিলো এবার বরং একটা ছেলে সন্তান লাগবে। সূদুর চট্টগ্রাম থেকে নাফিজকে আনা হয়, তখন তার বয়স সাতদিন। হসপিটাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিলো। এসব কাহিনি মারজানা আর নাফিজের জানা হয়ে গিয়েছে। পাছে লোকে ওসব কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে বেশ দায়িত্ব নিয়েই তবে নাফিজ বাবা মায়ের প্রতি বেশ অনুগত যতই হোক, জন্ম না দেক। লালনপালন করেছে তো। মারজানা মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে উগ্র হয়ে যায় হয়তো। তবে কম ভালোবাসে যে তেমনটা নয়।

এমন এক সংসারে অন্ধকার দূর করে মেহনাজের কোল আলো করে সন্তান এসেছে। এ তো বড় খুশীর সংবাদ। স্বর্ণা নিজেও খুশী তার মেয়েটা এতো বড় হয়ে গেলো, সে মা হয়ে গেলো ভাবতেই হৃদয় কাঁপছে তার। সবাই যখন নতুন বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত স্বর্ণা তখন নিজ সন্তানের জন্য চিন্তিত। তার মেয়ে, তারও তো প্রথম সন্তান। সে কেমন আছে, ভালো আছে কিনা সেই চিন্তায় মরিয়া।

বাচ্চা পেটে আসার পর থেকেই মেহনাজ অনেকটা রুগ্ন হয়ে গিয়েছিলো। ডেলিভারি হওয়ার দুই ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরলো। বেডে দেওয়ার পর চোখ মেলে দেখলো তার পাশে ফুটফুটে একটা চাঁদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মেহনাজ কল্পনা করতে পারেনি মা হওয়ায় এতো আনন্দ। তারই পাশে তার ছেলে চোখ এদিক সেদিক করছে। কি যে সুন্দর দৃশ্য। এমন সুন্দর দৃশ্য সে কখনো দেখেনি। ভাগ্যিস মা হয়েছিল।

পাশ থেকে তাসফিয়া বলে উঠলো— ছেলেকে দেখা শেষ হলে আমাদের দিকেও একটু তাকাও আপু। আমরা তো আছি এখানে।

মেহনাজ ধীরে ধীরে রুমের চারপাশে তাকালো। সবার দৃষ্টি তার দিকে। শশুর বাড়ির লোক, বাবার বাড়ির লোক সবাই এক দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। হুট করে লজ্জা লেগে গেলো মেয়েটার। ঠোঁটের কোণের লজ্জা মাখা হাসিটা লুকালো। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো— একদম বাপের মতো দেখতে হয়েছে।

নওয়াজ মির্জা পাঁচ দিনের জন্য অপেক্ষা করলেন না। সে সাথে সাথে নাম রেখে দিলেন। যেহেতু এই সন্তান মির্জা বাড়ি আলো করে এসেছে তাই তার কানের কাছে গিয়ে জোরে জোরে ডাকলেন - প্রদীপ প্রদীপ বলে।

দুএকজন অবশ্য আপত্তি জানালো। এমন নামও কি হয়? মেহনাজের কথা বলতে কষ্ট হয়। তাও সে ধীরে ধীরে বললো— বাবা শখ করে নাম রেখেছে। এটা আদরের নাম। কয়েক দিন ডাকবে না হয়। দাদা নানাদের আলাদা একটা দুটো অদ্ভুত নাম থাকতেই পারে।

নাফিজ বাহিরে গিয়েছিল। হসপিটালে যে দুজন থাকবে তারা ছাড়া বাকিরা চলে গেলো। নাফিজও রাতে চলে যাবে। এখানে থাকা সম্ভব না,প্রতিদিন এসে দেখে যাবে। সন্ধ্যায় বাবুর জন্য কিছু জামাকাপড় আর হালকা নাস্তা নিয়ে আসলো। মা ছেলে দুজন ঘুমাচ্ছে। নাফিজ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রইলো। সে বিয়ে করেছে, একটা বউ হয়েছে, এখন একটা সন্তানও হয়েছে, সে বাবাও হয়ে গিয়েছে। কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে সমস্তটা। খুব করে চাচ্ছে এই সুখ যেনো বিলীন না হয়ে যায়। নিজেকে বড় কোটিপতি মনে হচ্ছে। যার ঘরে স্ত্রী সন্তান আছে তারচেয়ে কোটিপতি আর কে হতে পারে?

________

মালাইকার মৃত্যুতে মকবুল কতটা ভেঙে পড়েছে সেটা টের পাওয়া গেলো না। লোকটাকে আল্লাহ এতো পরিমাণে ধৈর্য্য শক্তি দিয়েছে মারজানার মাঝে মাঝে হিংসা হয়। মায়ের মৃত্যুতে কেবল মুখ ফুটে বলেছিলো— আম্মার পথচলা আমাদের সঙ্গে এতোটুকুই ছিল। ক্ষনস্থায়ী দুনিয়া থেকে সবাইকেই তো বিদায় নিতে হবে। আল্লাহ আম্মাকে জান্নাতবাসী করুক।

বিপত্তি বাঁধলো মেহরিমাকে নিয়ে। মারজানা খুব করে চাইলো তার কাছেই রেখে দিতে। মকবুল স্থীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল— ঠিক কোন অধিকারের জোরে মেহরিমা আপনার কাছে থাকবে?

"আমার কাছে একটা বাচ্চা মেয়ে থাকবে সেটার জন্য আবার অধিকার দরকার মকবুল সাহেব?"

" জি দরকার! সমাজে বসবাস করি আমরা ভুলে গেলেন? সমাজ প্রশ্ন তুলবে।"

মারাজানার আর বলার থাকতে পারে না। বাস্তবতা সত্যি কঠিন। কোনো প্রকার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া কি আর কাউকে খুব কাছে রাখা সম্ভব হয়? বোধহয় হয়, তবে একটু কঠিন। মারজানাও সেটাই করলো। সমাজের চোখে ফাঁকি দিয়ে মেহরিমাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া থেকে নিয়ে আসা সমস্তই দেখলো। মাঝে মাঝে রাতটা নিজের সাথে রেখে দিলো। মকবুল তার চিরচেনা ভঙ্গুর ঘরটায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ঢুকে তখন বুকের ভেতরটা খাঁখাঁ করে। তার দুটো মা ছিল, অথচ এখন কেউ নেই।

মারজানাকে কল দিয়ে বিরক্ত করতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু মারজানা ঠিকই সময়মতো কল দিয়ে মেহরিমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। মেহরিমা যখন বলে — মামা তোমার মন খারাপ হচ্ছে? আমি চলে আসবো?

মকবুল রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলে— তুমি আসতে পারবে মেহরিমা?

মেহরিমা বড় চিন্তায় পড়ে যায়। পাশেই মারজানার দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত চিন্তা উধাও হয়, হেঁসে বলে— একা যাবো কেনো? মামনি নিয়ে যাবে। মামনি গেলেও কি তোমার মন ভালো হবে না মামা?

মকবুল শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে— তোমার মামনি কি আসবে আমার মন ভালো করতে?

মেহরিমা জোর গলায় বলে— হ্যাঁ আসবে। মামনি খুব ভালো জানো! মামনি আমাকে অনেক আদর করে,তোমাকেও তো আদর করবে।

মকবুল শব্দ করে হেঁসে দেয়। সেই হাসির শব্দে মারজানার হৃদয়ের কোথাও যেন চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়! এ কীসের ব্যথা তার জানা নেই। মকবুলকে জিজ্ঞেস করবে। মকবুলের জন্য প্রতিদিন অনেক গুলো প্রশ্ন জমিয়ে রাখে সে। কিন্তু সেগুলো করা হয়না, উত্তর পাওয়া তো দূর!

দুইদিন পর মকবুল ভাবলো একবার মির্জা বাড়ি হয়ে ফিরবে। মেহরিমাকে একটু দেখে যাবে। এখন আর ওই বাড়িতে যেতে ভয় লাগে না। মানুষগুলোকেও ভয় লাগে না। সবাই বেশ আদর করে তাকে। মেহরিমাকে তো আরও বেশিই আদর করে। যখন জানলো মকবুলের মা মারা গেছে তখন থেকে কোহিনূর মকবুলকে বেশ স্নেহ করে। তারউপর তাদেরই দোকানের কর্মচারী হওয়ায় মেহরিমা ও মকবুল দুজনেই এ বাড়ির একজন হয়ে গিয়েছে।

মকবুল বাড়িতে ঢুকতেই নওয়াজ মির্জার চোখে পড়লো। মির্জার মন বড় ভালো ইদানীং। নাতি হওয়ার আনন্দ এখনো যায়নি। তবে আজ কিছুটা গম্ভীর স্বরে মকবুলকে ডাকলো। মকবুল কাছে এসে সালাম দিলো। সে বললো— বাজারের কি অবস্থা মকবুল?

"জি কাকা ভালো চলছে।"

মির্জা অনেকটা সময় চুপ করে থেকে হঠাৎ বললো— তুমি তো বিয়ে করোনি তাই না?

বিয়ের কথা আসতেই মকবুল একটু নড়েচড়ে উঠলো। কি বলবে বুঝতে না পেরে কেবল মাথা নাড়লো। মির্জা বললেন — বিয়েটা করে ফেলো। সংসারের দরকার আছে। নারী আর সংসার ছাড়া কোনো পুরুষ সম্পূর্ণ হতে পারে না।

মকবুল হেঁসে বললো— আমাকে কে মেয়ে দিবে কাকা!

"আমি দিবো।"

মকবুল থমকে গেলো। মির্জা একটু হাসার চেষ্টা করে বললো— আমার মেয়েকে নিবে তো? ঠকবে না বুঝলে! আমার মেয়ের ওই একটু দোষ ডিভোর্সী! তাছাড়া মেয়েটার আর কোনো দোষ খুঁজে পেলে আমার মেয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিও।

মকবুল চুপ করে রইলো। নওয়াজ মির্জার মেয়ে! সেটা যে মারজানা ওটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কারণ মির্জার ওই একটাই মেয়ে। মকবুল চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো। মির্জা জিজ্ঞেস করলেন— মেহরিমাকে দেখতে এসেছো?

মকবুল আমতাআমতা করে বললো— জি!

"তুমি কি ভয় পাচ্ছো মকবুল?"

" ভয়? কই না তো।"

নওয়াজ মির্জা প্রসঙ্গ এড়িয়ে বললো— মেহরিমাকে পাওয়ার পর আমার মেয়েকে আমি যতটা সুখী দেখেছি ওমন সুখীভাব তার সাথে শেষবার যখন সে মা হবে শুনেছিলাম তখন দেখেছিলাম। গর্ভের সন্তান হারিয়ে বহুদিন সে সুখী ছিল না।

মকবুল একটু সাহস করে জিজ্ঞেস করলো — আপনার মেয়ে রাজি হবে?

" আরেহ সে তো বোধহয় মেহরিমার সাথে সাথে তোমাকেও ভালোবাসে।"

মকবুল এবার ভীষণ লজ্জায় পড়লো। কি অবলীলায় ভালোবাসার কথা জানিয়ে দিচ্ছে লোকটা। ভালোবাসা কি আসলেই ওতো সহজে পাওয়ার জিনিস? অনেক সাধনা করেও তো মকবুল ভালোবাসার নাগাল পায়নি। তার ভালোবাসা অন্য পুরুষের সংসার করছে।

নওয়াজ মির্জার কাছ থেকে বিদায় ও অনুমতি নিয়ে মকবুল ভেতরে আসলো। মেহরিমা ঘুমাচ্ছে, মকবুলের পা অসাড় হয়ে আসলো। সে কি রুম থেকে বের হয়ে যাবে নাকি বসবে বুঝতে পারছে না। মারজানার সামনে আজকে একটু লজ্জা লাগছে বোধহয়।

মারজানা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো — মন ভালো মকবুল সাহেব?

মকবুল মারজানার দিকে তাকালো। মেয়েটা এতো সুন্দর কেন! দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য যেকোনো সুপুরুষ। এমন সুন্দর নারীকেও কিনা কোনো এক পুরুষ প্রত্যাখান করেছে।

"চুপ করে আছেন যে?"

মকবুল বললো— বৃষ্টি হবে মনে হয়।

"সে আর নতুন কি! আপনার আমার সাক্ষাৎ এ বৃষ্টি হয়নি এমনটাও কি হয়েছে? বরং এমনটা না হলেই অবাক হতাম।"

"বৃষ্টি হয় কেনো তবে?"

"আকাশের বোধহয় হিংসা হয় আমাদের সাক্ষাৎ এ।"

মকবুল কিছুটা মিনমিনে স্বরে বললো— আকাশ নিশ্চয়ই আপনাকে ভালোবাসে। তাই সে হিংসা করে।

মারজানা চুপ করে রইলো। ইচ্ছে করছে হৃদয়ের যে তোলপাড় চলছে সেটার সমস্তটাই মকবুলের সম্মুখে উপস্থাপন করতে কিন্তু পারছে না। কি যে তাকে চুপ করিয়ে দিচ্ছে হয়তো লজ্জায়!

মকবুল বললো— মারজানা। একটা কথা বলবো।

" জি বলুন?"

" আপনার বাবা, মানে নওয়াজ কাকা বললেন।" এতোটুকু বলে থেমে গেলো।

" বাবা কি বললেন?"

" আপনি বোধহয় আমাকে ভালোবাসেন।"

মারজানা একটু চুপ করে থেকে মিছে অভিমানী স্বরে বললো— বাবা বললেন? বাবাকে বলতে হলো? আপনি বুঝলেন নাই?

" কি ভাবে বুঝবো?"

" আপনি আসবেন বিধায় পরিপাটি করে শাড়ি পড়ি, চুল বেঁধে রাখি। রোজ নিয়ম করে ফোনকলে আপনার কন্ঠস্বর শুনি। আপনার মন খারাপে আমারও যে প্রচন্ড মন খারাপ হয়। এরপরও আপনাকে বাবা বলে দিতে হবে আমি আপনাকে ভালোবাসি?"

মকবুল চুপ করে রইলো। বাবা বলে দিয়েছে এই কথাটা বলা বড় অন্যায় গিয়েছে। কি আর করার! নারীর মন রক্ষা করা বড় কঠিন জিনিস।

মারজানা জিজ্ঞেস করলো — চুপ করে আছেন যে? আপনি কি এখনো জেরিনকে ভালোবাসেন?

" ছি ছি! অন্য কারো স্ত্রীকে ভালোবাসা পাপ।"

মারজানার জিজ্ঞেস করতে মন চাইলো " আপনি তবে আমায় ভালোবাসেন না?" কিন্তু জিজ্ঞেস করতে বড় লজ্জা করলো। ভালোবাসার কথা ওমন জোর করে শুনায় কোনো আনন্দ নেই।

তিনদিন পর ছোটখাটো আয়োজনে মকবুল আর মারজানার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়েটা হয়েছে মির্জা বাড়িতে। মেহনাজ বিয়ের একদিন আগে তার রাজকুমারকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেছে। মির্জা বাড়ি আনন্দে টইটম্বুর। চারদিকে মৌমাছির মতো আনন্দরা নেচে বেড়াচ্ছে। নাফিজ তার বন্ধু রওনক আর জেরিনকে বিয়েতে দাওয়াত করেছে। রওনক একটা চাকরি জোগাড় করেছে। সেই টিনসেট বাড়িটি ছেড়ে একটি চার দেওয়ালের বাসায় উঠেছে। জেরিন তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা। বিশেষ যত্ন করার জন্য রওনক মরিয়া হয়ে থাকে। ভালোবাসার কমতি নেই তবে জেরিন প্রায় মেজাজ হারিয়ে ফেলে। চিল্লাফাল্লা করতে থাকে। রওনক বুঝতে পারে মেয়েটা এতিম, জীবনের সমস্ত ডিপ্রেশনে সে ট্রমায় থাকে। সে না বুঝলে কে বুঝবে মেয়েটাকে?

জেরিন রাগারাগির পরক্ষণেই যখন অনুতপ্ত হয়ে রওনকের কাছে ক্ষমা চায় তখন রওনক পরম যত্নে জেরিনকে কাছে টেনে বলে, তোমার সমস্ত কিছুর দায়িত্ব আমি নিয়েছি না বলো তো? তাহলে তোমার রাগ, অভিমান,মায়া ভালোবাসা, ভুল, সব কিছুই তো এই রওনকের। তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে না জেনি। তোমার ভুলভ্রান্তি সবই আমার।

তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে মকবুল গায়ের ঘামে ভেজা পাঞ্জাবিটা খুলে ফেললো। উঠানের বড় আম গাছটার নিচে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে আওড়ালো, "বিয়ে করে কোন পাগলে!"

পিছন থেকে জেরিন এসে হেঁসে বললো, "মকবুল ভাই! বিয়ের প্রথম দিনই হাঁপিয়ে গেলেন?"

মকবুল পিছন ফিরে জেরিনের দিকে তাকালো। তাদের ঠিক সামনে লম্বা বারান্দায় বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে মারজানা। মকবুল একবার মারজানার দিকে তাকিয়ে বললো, "গরমে বিয়েসাদী করা একটু কষ্টকর জেরিন। তুমি তো বিয়ে করেছো বর্ষায় তুমি ওই কষ্ট বুঝবে না।

জেরিন কি বলবে আর ভেবে পেলো না মারজানার দিকে তারও দৃষ্টি পড়লো। মারজানার প্রশংসা করে সে চলে যেতে নিবে ওমনি মকবুল পিছন ডেকে বললো, " জেরিন!"

" কিছু বলবেন মকবুল ভাই?"

মকবুল একটু চুপ থেকে বললো, " ভালো আছো তো?"

" খুব ভালো আছি মকবুল ভাই।"

মকবুল কিছুটা উৎসাহিত কন্ঠে বললো, " বুঝলে জেরিন! এবার বোধহয় আমাকেও কেউ ভালোবাসবে।"

জেরিন একটু মুচকি হেঁসে চলে গেলো। মারজানা তখনও মকবুলের দিকে তাকিয়ে আছে। দু'জন চোখাচোখি হতেই হেঁসে দিলো। মকবুলের মনে হলো এটাই তার সুখের ঠিকানা, এই চোখ, এই হাসিতেই সে সুখ খোঁজে পাচ্ছে। যে সুখের সন্ধানে পথিক হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে বনবাদাড়ে।

বিয়ের আমেজ শেষ হয়ে গেলো খুব দ্রুতই। মারজানা খুব করে চেয়েছে সে তার স্বামীর ভিটায় বউ সেজে উঠবে। মকবুল তার ভাঙাচোরা বাড়িতেই নতুন বউকে নিয়ে উঠালো। সাথে মেহরিমাকেও নিয়ে গেলো।

আনন্দকে ছাড়িয়ে গিয়ে এবার বিকট চিৎকারে মির্জা বাড়ি কেঁপে উঠল। মেহনাজের ছেলে মেহফিল মির্জা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। নওয়াজ মির্জা, শামসুন্নাহার, কোহিনূর, নাফিজ সবাই মিলে কান্না থামানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। মেহনাজ গিয়েছিল গোসল করতে এর মধ্যেই চিৎকার করতে করতে ছেলের চোখে পানি চলে আসলো। নাফিজ ছেলেকে থামাতে না পেরে মেহনাজকে ডাকলো। মেহনাজ ওয়াশরুমের ভেতর থেকে বললো, "দুই মিনিট অপেক্ষা করুন আসছি আমি।"

" দ্রুত আসো ছেলে কাঁদছে তুমি শুনতে পাচ্ছো না?"

" শুনবো না কেনো? আমি তো সারাক্ষণই শুনি এবার বরং আপনারা শুনুন। আপনারা তো টের পান না। দেখেন এখন কেমন লাগে।"

নাফিজ রেগেমেগে আগুন হয়ে গেলো। এমন মূহুর্তে এসে মেয়েটা মুখে মুখে তর্ক করছে কি ভাবে! মেহনাজ ভেজা চুল বাঁধতে বাঁধতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসলো। রুম জুড়ে সবাইকে দেখতে পেয়ে বেশ মজা পেলো। রাত-বিরেতে এই ছেলের কান্নার জন্য সে ঘুমাতে পারে না। সবাই বেশ আরাম করেই ঘুমায়। এবার বুঝুক কেমন মজা লাগে।

মেহনাজ দুষ্ট হেঁসে বললো, " বাবা মেহফিল আরেকটু জোরেশোরে কাঁদো তো দেখি। তোমার দাদা ভাইয়ার কানে পোকা গুলো বের করে দাও। তোমার দাদীদের পাকা চুল গুলো যেন তোমার চিৎকারে জড়ে পড়ে। আর তোমার বাপ! তার যেন বিয়ে করার শখ মিটে!

মেহনাজের দুষ্ট কথায় সবাই বেশ মজাই পেলো।।মেয়েটা ইদানীং ছেলে পেয়ে বেশ আহাল্দি আর দুষ্ট হয়ে গিয়েছে। মুখে যখন যা আসে বলতে থাকে। সবাই চলে গেলো মেহনাজ ছেলেকে কোলে নিলো। নাফিজ পাশে বসে দাঁত কিড়মিড় করে বললো," মুখটা সেলাই করে দিবো বলে দিচ্ছি।"

মেহনাজ ফোঁস করে এসে কিছু বলতে নিবে ওমনি নাফিজ মেহনাজের ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বললো,"একদম চুপ! মুখ বন্ধ রাখো কোনো কথা হবে না। ডাক্তার তোমাকে অতিরিক্ত কথা বলতে নিষেধ করেছে।"

মেহফিল তখনও কাঁদছে। নাফিজ ধমকে উঠে বললো," ছেলেকে খাওয়াচ্ছো না কেনো? খাওয়াও ওকে।"

মেহনাজকে ছেলেকে নাফিজের দিকে কিছুটা ঠেলে দিয়ে মুখ ভেঙছি মেরে বললো," আপনি খাওয়ান। আপনারও তো দুদু আছে।

নাফিজ হা করে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়ে বলে কি! বাচ্চা জন্ম দিয়ে এর লাজ শরম সব বিনাশ হয়ে গিয়েছে। মেহনাজ ছেলেকে শান্ত করে নাক কুঁচকে নিজে নিজে আওড়াতে থাকলো, " মুখে বড় বড় কথা। কোনো কামেরই তো না। আমি এখন ছেলের মা হয়েছি আমার সাথে সাবধানে কথাবার্তা বলবেন মির্জা সাহেব। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে বাঁচতে পারবো। আপনি কি ভাবে বাঁচবেন আপনারটা আপনি বুঝে নেন।

নাফিজ না হেঁসে পারলো না। মনে মনে ভাবলো বাচতে হলে ছেলে এবং ছেলের মা তার দুজনকেই চাই। কিন্তু এ কথা মেহনাজকে শুনিয়ে বলা চলবে না। এমনি সে ছেলের মা হয়ে অতি আহাল্দে মাথায় চড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সন্তানের মা হয়ে গেলে একটা মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে এতো কিউট লাগে, এতো আদর আদর লাগে সেটা নাফিজ ইদানীং টের পাচ্ছে। সে মনে মনে পরিকল্পনা করে নিলো এই মেয়েটাকে ছলেবলে কৌশলে আরও দুই তিন সন্তানের মা বানিয়ে দিতে হবে এতে করে যদি আরও কিউট লাগে তবে মন্দ কি!

সমাপ্ত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন