ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্রিকা

২য় পর্ব

লেখক: বোরহানা আক্তার রেশমি

#চৈত্রিকা (৩)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

___________

৫.

সকাল সকাল আজম আলী জমিদার বাড়িতে হাজির হয়েছে। জমিদার গিন্নি পল্লবী তাকে ভদ্র ভাবে বসতে দিলেও মনে মনে সে ভীষণ চোটে আছে। এই গ্রামের সব থেকে চরিত্রহীন লোক হচ্ছে আজম আলী। যেকোনো মেয়ে থেকে মহিলা সবাই তার থেকে যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রাখে। সেই লোককে নিজের বাড়িতে দেখে মাথায় আগুন জ্বলছে পল্লবীর৷ চয়ন রেনওয়াজের ওপর সে ভীষণ রকম ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। কোনো রকমে একজন দাসীকে দিয়ে টুকটাক নাস্তা পাঠিয়েছে সে। অথচ আজম আলী সেই দাসীর সাথেও অস'ভ্যতা করার চেষ্টা করে। দাসী এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ভাঙা ভাঙা ভাবে বলে,

'গিন্নি মা দয়া করে আমাকে আর লোকটার ফরমায়েশ খাটতে কইবেন না৷'

পল্লবী ফোঁস করে ওঠে। দাসীকে যেতে বলে সে অন্দরমহলে যায়। নিজের রুমে বেশ আয়েশ করে তখনও শুয়ে ছিলো চয়ন রেনওয়াজ। পল্লবী কপট রাগ দেখিয়ে বলে,

'আপনার কি খেয়ে কাজ নেই? ওই আজম আলীকে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি কেনো দিয়েছেন?'

চয়ন খানিকটা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বলে, 'সে আবার কি করলো গিন্নি?'

'আপনি জানেন না সে কি করেছে বা করতে পারে? যান তো! গিয়ে দেখুন ল'ম্প'টটা কি কাজে এসেছে! যা কাজ আছে সেড়ে দ্রুত বিদেয় করুন।'

পল্লবীর রাগ বুঝলো চয়ন। এমনিতে সহজে তার মুখের ওপর কোনো কথা বলে না তার গিন্নি কিন্তু আজম আলীকে দেখলেই রেগে যায়। চয়ন চুপচাপ দরজা দিয়ে বেড়োতে নিলে পল্লবী বেশ শান্ত কন্ঠে বলে,

'আপনি কি সত্যি ওই চ'রিত্র'হীনটার ভাগ্নীকে আমার প্রহরের বউ করে আনবেন? ওর মতো ওর ভাগ্নীটার আবাার চরিত্রে দোষ নেই তো?'

চয়ন এবার বেশ গম্ভীর হলেন। কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ গটগট শব্দ তুলে বের হয়ে গেলেন। পল্লবী ঘরে থাকা বিশাল আয়নাটার সামনে বসে। নিজেই নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে কিয়ৎক্ষণ হাসে।

চয়ন হলরুমে এসে আজম আলী কে বসে থাকতে দেখে তার পাশেই বসে। আজম আলী বেশ উশখুশ করছে। চয়ন তা খেয়াল করেও চুপচাপ বসে রইলেন। কতক্ষণে আজম আলী মুখ খোলে তার আশায় রইলেন তিনি। আজম আলী বেশ অনেকটা সময় নিয়ে বললো,

'জমিদার সাহেব আমি জানি কাল আপনার সাথে এ নিয়ে আমার কথা হয়েছে তবুও আজ আরো একবার বলছি! দয়া করে বেয়াদবি মাফ করবেন। আপনারা কি সত্যিই চৈত্রিকাকে বাড়ির বউ করতে চান? মানে আরো একবার ভালো করে ভেবে দেখলে হতো না?'

চয়ন কোনো জবাব দেওয়ার আগেই ভেসে আসে কর্কশ, গম্ভীর এক পুরুষালী কন্ঠ, 'ভেবে দেখার তো কিছু নেই আজম আলী। আর চৈত্রিকাকে বিয়ে করতে চাওয়ায় তোমার কেনো এতো সমস্যা হচ্ছে? তোমার কি এবার নিজের ভাগ্নীর দিকেও নজর পড়লো নাকি!'

এ কথায় বেশ ঘাবড়ে গেলেন আজম আলী। চয়নকে সে যতটা না ভয় পায় তার চেয়েও দ্বিগুণ বা কয়েকগুণ বেশি ভয় পান প্রহরকে। বার কয়েক ফাঁকা ঢোক গিলে আস্তে করে তাকায় প্রহরের দিকে। গায়ে একটা শুভ্র রঙের পাতলা শার্ট জড়িয়ে তার ওপরের বোতাম খোলা রেখেছে প্রহর। হাত দুটো গুজে রেখেছে প্যান্টের পকেটে। চুলগুলো এলোমেলো। ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। ঠোঁটে লেগে আছে অদ্ভুত এক হাসি। চেহারায় জমিদার জমিদার ভাবটা বেশ এটে সেটে রয়েছে। নিঃসন্দেহে জমিদারের বড় পুত্র সুদর্শন। এই সুদর্শন পুরুষের জন্য নারীরা যেমন মরিয়া হয়ে যায় ঠিক তেমনই এই সুদর্শন চেহারার পিছনের ভ'য়ং'কর রুপের কথা জানলে এই পুরুষের চেয়ে অন্তত ৫০ হাত দুরে থাকে। আজম আলীর কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম আর ভীতু মুখ দেখে বেশ মজা পায় প্রহর। নিজের মতো করে সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ে৷ তারপর বেশ ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করে আজম আলীর উদ্দেশ্যে,

'চৈত্রিকার সাথে আমার বিয়েতে ঠিক কি সমস্যা আজম আলী?'

আজম আলী আশ পাশ হাতড়েও কিছু বলার মতো পেলো না। মাথা নিচু করে বসে রইলো। রীতিমতো ঘাম ছুটে যাচ্ছে তার। প্রহর শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো কিছু সময়। তারপর চোয়াল শক্ত করে বললো,

'তোমাকে আমি কু'র'বা'নী দেওয়ার আগে ভালো হয়ে যাও আজম আলী। আমি যদি একবার তোমার মু'ন্ডু ধরি তবে তা মাথা থেকে আলাদাা করতে সময় নিবো না। চৈত্রিকার সাথে বিয়েটা আমার হবেই। আর তা আমি যখন বলবো তখনই। তাছাড়া আমার জানামতে চৈত্রিকার কোনো আপত্তি নেই এই বিয়েতে। অবশ্য থাকলেও তা আমি শুনতাম না। যায় হোক আজ বিকেলে চৈত্রিকার সাথে দেখা করবো আমি। কোনো রকম চালাকি করলে খুব একটা ভালো হবে না।'

আজম আলী প্রত্যেকটা বাক্যে কেঁপে উঠলেন। প্রহরের কন্ঠে কিছু একটা তো ছিলো যার কারণে আজম আলী ভয়ে রীতিমতো ঘেমে গোসল করে ফেলেছেন। চয়ন শুধু পুরোটা সময় ছেলের কথার দাপট দেখে গেলো। একদম যোগ্য জমিদারপুত্র। চয়ন মুচকি হাসে। মনে মনে নিজের শ'য়'তা'নী বুদ্ধির যোজন বিয়োজন করতে থাকে।

৬.

দুপাশে দুই বেনুনি ঝুলিয়ে নাচতে নাচতে বের হয়েছে চৈতালী। পড়ালেখা করতে তার ভাল্লাগে না তাই ঠিক করেছে এখন হিমানীর বাড়ি গিয়ে আড্ডা দিবে। ক'দিন পর তো বিয়েই হয়ে যাবে তখন তো আর তার সাথে কথাও হবে না। ভেবেই একটু পর পর ঠোঁট ফুলাচ্ছিলো চৈতালী। চৈতালী মুখ ফুলিয়ে যখন সামনে এগোতে ব্যস্ত তখনই দুর্ভাগ্যবশত সামনে পড়ে যায় নিবিড়। নিবিড়কে দেখে ফাঁকা ঢোক গিলে চৈতালী। চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে। নিবিড় চোখ মুখ কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলে,

'এই মেয়ে নেচে নেচে কোথায় যাচ্ছো? পড়ালেখা নেই? ওদিকে কি?'

'আসলে মাষ্টারমশাই আমি তো একটু হিমানীর বাড়ি যাচ্ছি। 'ও' না ডেকেছে আমাকে!'

চৈতালী কথা বলার সময় বার বার চোখের পলক ফেলছিলো খেয়াল করে নিবিড় গাঢ় দৃষ্টিতে তাকায়। কন্ঠের গাম্ভীর্যতা ধরে রেখে বলে, 'সারাদিন এসব করে বেড়ানো ছাড়া কোনো কাজ নেই? হিমানী তোমাকে ডেকেছে? মিথ্যা বলা শিখেছো খুব!'

চৈতালী চোখ পিটপিট করে তাকায়। এই মাষ্টারমশাই কেমনে বুঝে যায় যে সে মিথ্যা কথা বলছে! মাষ্টারমশাই কি ম্যাজিক জানে নাকি! চোখ চকচক করে ওঠে চৈতালীর। বেশ উৎফুল্ল স্বরে বললো,

'মাষ্টারমশাই আপনি কি ম্যাজিক পারেন?'

নিবিড় কপালে ভাজ ফেলে তাকায়। তারপর চৈতালীর বিনুনি টেনে দিয়ে বলে, 'বাড়ি যাও। সোজা পড়তে বসবে!'

'সারাদিন কি কেউ পড়ে মাষ্টারমশাই?'

'তুমি কি পড়তে বসেছিলে সারাদিনে একবারও? মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করলে তোমার আব্বাজান তোমাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।'

চৈতালী লাফিয়ে ওঠে। বিনুনি নাচাতে নাচাতে বেশ আনন্দের স্বরে বলে, 'মাধ্যমিকে ফেল করলে আব্বাজান সত্যি আমার বিয়ে দিয়ে দিবে? তাহলে তো আর পড়তে হবে না তাই না!'

নিবিড়ের ইচ্ছে করলো নিজের কপাল নিজে চাপড়াতে। মনে মনে সে নিজের কপাল চাপড়েও নিলো তবে চৈতালীর সামনে চোখ রাঙিয়ে তাকালো৷ চৈতালী সে চোখে তাকিয়ে খানিকটা ঘাবড়ে পিছিয়ে যায়। ভীতু ভীতু চোখে তাকিয়ে বলে,

'ওমন রা'ক্ষ'সের মতো তাকান কেনো? আমার বুঝি ভয় করে না! আমার তো ছোট্ট একটা হৃদয় ওমন করে তাকালে হৃদয়টা যদি ভয়ে ভেঙেই যায়!'

নিবিড়ের ভীষণ হাসি পেলো। তবে সে হাসলো না৷ নিজের শার্ট ঠিক করে নিয়ে বললো, 'হিমানীদের বাড়ি যাচ্ছো তো! চলো আমিও বাড়ির দিকে যাচ্ছি।'

চৈতালী মাথা নাড়ালো। আগের মতোই বেনুনি নাচাতে নাচাতে নিজেও লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। পেছন থেকে নিবিড় বেশ গম্ভীর স্বরে বলে,

'এই মেয়ে ভালো মতো হাঁটো। নেচে নেচে যাচ্ছো কেনো? স্বাভাবিক ভাবে হাঁটো!'

চৈতালী ভয়েই স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘাড় ফিরিয়ে নিবিড়ের দিকে চেয়ে দেখে নিবিড়ের দৃষ্টি তার দিকেই। চৈতালী ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলে, 'আপনি এতো সুন্দর কেনো মাষ্টারমশাই?'

৭.

বিকেলের দিকে মামীর হাতে হাতে কাজ করছিলো চৈত্রিকা। সাথীও আছে। মায়ের বাড়ি থেকে এসেই মুখটা ভার সনিয়া বেগমের। চৈত্রিকা বেশ কয়েকবার খেয়াল করেছে সনিয়া বেগমের অন্যমনষ্কতা। হঠাৎ মামীর মুখের এমন অবস্থা দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে সে। গলাার স্বর নরম করে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

'কিছু হয়েছে মামী?'

সনিয়া বেগম চৈত্রিকার মুখের দিকে তাকায়। বেশ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চৈত্রিকার মুখ। হাত বাড়িয়ে মুখে আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,

'জীবনটা ন'র'ক কেনো করতে চাচ্ছিস মা?'

চৈত্রিকা বুঝলো, হাসলো তবে জবাব দিলো না। চুপচাপ নিজের কাজে মন দিলো। আজ প্রথমবারের মতো সে প্রহরের সামনে যাবে৷ সে এই সাক্ষাৎ টার জন্যই তো কতগুলো দিন ধরে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। এবার তার অপেক্ষার শেষ। এই সাক্ষাৎ এর পর যে বিয়েটা খুব বেশি দেড়িতে হবে না এটা বেশ ভালো ভাবেই জানে চৈত্রিকা। চৈত্রিকার ভাবনার মাঝেই আজম আলী আসে। এসে রগচটা স্বরে বলে,

'জমিদারের ব্যাটা আয়ছে। যান দেখা কইরা আসেন মহারানী!'

আজম আলীর কন্ঠ স্বরের এই রাগ, ক্ষোভ ঠিকই বুঝলো সবাই। তবে তাাতে কেউই বিশেষ পাত্তা দিলো না। চৈত্রিকা নিঃশব্দে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে। হাতটা পানিতে ধুয়ে উঠতেই সনিয়া বেগম বলে,

'উল্টা পাল্টা কিছু বলিস না মা।'

চৈত্রিকা মাথা নাড়ায়। সাথী আসতে চাইলে সে আনেও না আর সনিয়া বেগমও আসতে দেয় না। চৈত্রিকা নিজের শাড়ির আঁচল ভালো মতো টেনে হেলেদুলে এসে দাঁড়ায় দিঘির সামনে। সেখানে প্রহর আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলো৷ ভীষণ সাধারণ একটা শার্ট পড়ে আছে। হাত দুটো প্যান্টের পকেটে গুজে রাখা। চৈত্রিকার উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনে ঘুরে তাকায় প্রহর। কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলেও নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। চোখ নামিয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে শক্ত করতে থাকে। চৈত্রিকা আরো এক দফা হাসে। হাত বগলদাবা করে বলে,

'কিছু বলবেন জমিদার সাহেব?'

প্রহর জবাব দেয় না। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে কাঠকাঠ চেয়ে রয় চৈত্রিকার মুখ পানে। চৈত্রিকার দৃষ্টি শান্ত। মুখে গম্ভীরতা এঁটে প্রহর বেশ রয়ে সয়ে বলে, 'তোমার কোনো আপত্তি আছে বিয়েতে?'

চৈত্রিকা এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজেই প্রশ্ন করে, 'আমাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কারণ কি প্রহর সাহেব?'

প্রহর এবারে বাঁকা হাসে। দু কদম এগিয়ে চৈত্রিকার মুখোমুখি দাঁড়ায়। প্রহর এগোনোর পরও চৈত্রিকার কোনো হেলদোল নেই। সে কাঠকাঠ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নিজের জায়গায়। চৈত্রিকার কাজে মনে মনে শ'য়'তা'নী হাসি হাসে প্রহর। ফের নিজের জায়গায় সরে এসে বলে,

'বাহ! তেজ আছে!'

চৈত্রিকা এবার হাসে। কন্ঠ আগের ন্যায় কঠিন রেখেই বলে, 'আমার প্রশ্নের কিন্তু উত্তর দেননি!'

'এক সাধারণ ঘরের মেয়ের কাছে জমিদার পুত্র প্রহর রেনওয়াজ কৈফিয়ত দিবে!'

'যখন সাধারণ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন তখন তার কাছে তো আপনার কৈফিয়ত দিতেই হবে। তাছাড়া যেখানে স্বার্থ ছাড়া জমিদারের বাড়ির কোনো পুরুষ এক পাও আগায় না সেখানে বিনাস্বার্থে এক চালচুলোহীন মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে! এটা আবার মানতেও হবে?'

শেষের কথাটুকুতে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য ফুটে উঠলো। প্রহর বিনিময়ে হাসে। কোনো প্রকার জবাব না দিয়ে উল্টো ঘুরে যেতে যেতে বলে, 'যাক নামের মতো, তেজের মতো তবে বুদ্ধির প্রখরতাও আছে!'

চৈত্রিকা হাসে। প্রহরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে ঠোটের কোণে কুটিল হাসি ঝুলায়। বিড়বিড় করে বলে, 'আ'গুন নিয়ে খেলতে নেমেছেন জমিদার সাহেব এবার সে আ'গুনে যে আপনাকেই পু'ড়তে হবে। তিলে তিলে, একটু একটু করে কষ্ট দিয়ে আপনার সত্বা পু'ড়াবো। আপনার প্রতিটা শিরদাঁড়া ভেঙে দিয়ে আপনাকে নিঃস্ব করে দিবো। জমিদারের পা'পের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে। এবার শুধু শা'স্তির পালা। কথা দিলাম জমিদার সাহেব ভীষণ যত্ন করে একেকটা আ'ঘাত দিবো। কথা দিলাম!'

চলবে..

(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পটির প্রত্যেকটা চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো চরিত্রকেই অযথা ভাববেন না। ধীরে ধীরে সবটা পরিষ্কার হবে। আর চৈতালী নামটা চৈত্রিকার সাথে কি গুলিয়ে ফেলছেন? মানে পড়তে বা বুঝতে কি সমস্যা হচ্ছে? নামটা কি পরিবর্তন করে দিবো?)#চৈত্রিকা (৪)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

____________

(চৈতালীর নামের সাথে অনেকেই চৈত্রিকার নামটা গুলিয়ে ফেলছিলেন তাই চৈতালীর নাম বদলে অর্থি দেওয়া হয়েছে)

৮.

জমিদার বাড়ি থেকে খবর পাঠিয়েছে বিয়ে এই মাসেরই ২৫ তারিখ হবে। বার টাও শুক্রবার। হাতে শুধু আছে কেবল ৭ দিন। এই ৭ দিনের মধ্যেই বিয়ের জন্য বেনারসি, গহণা সকল কিছু পাঠিয়ে দেবে জমিদার বাড়ি থেকে৷ বিয়েটা তেমন আয়োজনে হবে না। শুধু জমিদার বাাড়ি থেকে বর আর কয়েকজন এসে বিয়ে পড়িয়ে বউ নিয়ে চলে যাবে৷ বিয়ের খবর শুনেই সনিয়া বেগম আর সাথীর মন খারাপ হয়ে গেছে। আজম আলী বেশ ক্ষেপে আছেন। চৈত্রিকার বিয়েটা সে মানতে পারছে না তবে প্রহরও তাকে মানতে বাধ্য করছে৷ চৈত্রিকার কোনো হেলদোল নেই। সে জানতো এমনটাই হবে। আর সে মনে মনে এটাই তো চেয়ে এসেছে। তবে তার এই সংবাদ পেয়ে খুব বেশি খুশি হওয়া উচিত নাকি দুঃখ করা উচিত তা জানা নেই। তাই কোনো রকম অনুভূতিই তার মধ্য থেকে আসছে না। চুপচাপ বসে আছে ঘরের কোণায়। সাথী গুটি গুটি পায়ে চৈত্রিকার কাছে আসে। কাছ ঘেষে বসে বেশ নরম স্বরে শুধায়,

'তুই কি আরো একবার ভাববি চৈত্র? বিয়েটা তোর জন্য ভ'য়ং'কর বি'পদের আশঙ্কা। আর একটা বার ভেবে দেখ!'

'যে রাস্তায় একবার পা ফেলেছি সেখান থেকে বের হওয়ার তো আর কোনো উপায় নেই সাথী।'

'তবুও প্রতিশোধের নেশায় বুদ না হয়ে শুধুমাত্র একটিবার নিজের কথা ভাব!'

'আমি আর নিজের কথা কি ভাববো? ম'রা মানুষকে কি আর ওই জমিদাররা নতুন করে মা'রতে পারবে?'

সাথী সামান্য কেঁপে ওঠে। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে চৈত্রিকার মুখপানে। সে নিজেও জানে না চৈত্রিকা আসলে কিসের প্র'তিশোধের আশায় ওমন বিপদের মুখে যাচ্ছে শুধু জানে মেয়েটার সাথে ভ'য়ং'কর কিছু হয়েছে। যে ঘটনার পর মেয়েটা ভেতর থেকে কেমন অনুভূতিহীন হয়ে গেছে। আচ্ছা মানুষ এভাবেও বাঁচতে পারে? সাথী চৈত্রিকার মাথাটা এনে নিজের কাঁধে রাখে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

'এতোটা পা'ষাণ, সাহসী তুই কিভাবে হলি চৈত্র? তুই তো এতো কঠোর ছিলি না! এমন অনুভূতিহীন তো ছিলি না! তোর সেই চঞ্চলতা, দুরন্তপনা আমি ভীষণ করে মিস করি। আগের তুইটা তো সবাইকে ভালোবেসে আগলে রাখতি এখন কেনো তবে দুরে থাকিস সবার থেকে?'

চৈত্রিকা অদ্ভুত ভাবে হাসে। সাথীর কাঁধে মাথা রেখেই বলে, 'আপন মানুষের প্র'তা'র'ণা চোখের সামনে থেকে দেখে কিভাবে যেনো ভেতরটা পা'থরে পরিণত হয়ে গেছে। এখন আর এই ছোট্ট হৃদয়ে ভালোবাসার মতো কিছু নেই। যা আছে তা এক আকাশ সমান ঘৃ'ণা।'

শেষের কথায় কন্ঠ কঠিন হয়ে যায় চৈত্রিকার। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু আবছা স্মৃতি। মুহুর্তেই মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। রাগে, ঘৃ'ণায় মাথার মধ্যে যেনো দপদপ করে আগুন জ্ব'লছে। সাথীর কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে নিজে উঠে দাঁড়ায়। শাড়ি ঠিকঠাক করে বলে,

'বিয়েটা আমি করবোই। নিজেকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। বেশি হলে হয়তো আমার শেষ পরিণতি হবে মৃ'ত্যু। তবে যে আমি গত ১ বছর আগেই ভেতর থেকে ম'রে গেছি তাকে আর কেউ নতুন করে কিভাবে মৃ'ত্যু দিবে! তাই শেষ পর্যন্ত আমার মৃ'ত্যু হলেও জিতটা আমারই হবে। তবে এতো সহজে আমি কখনোই ছাড়বো না জমিদার বাড়ির সদস্যদের। সবাইকে ধীরে ধীরে য'ন্ত্রণা দিয়ে মা'রবো। একটাও অন্যায় থেকে পা'র পাবে না। একটাও না।'

চৈত্রিকা বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। পেছন থেকে সাথী তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিজেও উঠে যেমন গুটি গুটি পায়ে এসেছিলো ঠিক তেমন করেই চলে যায়।

৯.

নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সমানে সিগারেট ফুঁকছে প্রহর। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। চোখে মুখে কি ভীষণ হিং'স্রতা ফুটে উঠেছে। নিজের রাগ দমাতে না পেরে ব্যালকনিতে থাকা ফুলের টব মাটিতে ফেলে দেয় সজোড়ে৷ টব ভেঙে গুড়িয়ে যায় মুহুর্তেই৷ প্রহরের রাগ কোনোমতেই কমে না। নিজের হাতে নিজের চুল আঁকড়ে ধরতেই রুমের ভেতর থেকে কেউ ডেকে ওঠে। নিজেকে যতটুকু সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। প্রহর নিজেকে সামলে রুমের ভেতর ঢোকে৷ সেখানে তার গোপন খবর দেওয়া লোককে দেখে চোখের ঈশারায় বসতে বলে। বেশ শান্ত কন্ঠে বলে,

'কোনো খোঁজ খবর আছে?'

লোকটি মাথা নিচু করে ছোট করে বলে, 'নাহ সাহেব। এ গ্রামের যারা মেয়েটাকে চেনে তারা সবাই তেমন কিছুই জানে না। গত ১ বছর আগে মেয়েটির বাবা-মা আগুনে পু'ড়ে মা'রা যায় এবং তারপর থেকে এই মেয়ে এখানে থাকছে তার মামার বাড়িতে। তবে তার ব্যাপারে সেরকম কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর নেই।'

প্রহর মুখটা গম্ভীর করে লোকটি কে বিদায় দেয়। বসে বসে ভাবতে থাকে বেশ অনেক কিছু। সে তো কম কিছু জানে না চৈত্রিকার ব্যাপারে তবুও কোন আশায় সে আবারও খোঁজ নেওয়াচ্ছে! হতাশায় চোখ বন্ধ করে নেয়। সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চৈত্রিকার তেজী রুপ। সেই উত্তপ্ত চোখ। ফট করে চোখ মেলে তাকায় প্রহর। বিড়বিড় করে বলে, 'এ নারী ভ'য়ং'কর। ভ'য়ং'কর তার তেজ। আদৌও কি এই তেজের কাছে জমিদার পুত্র প্রহর রেনওয়াজ টিকতে পারবে?'

নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেই অবাক হয়। সাথে সাথে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে পরপর কয়েক বার ফাঁকা ঢোক গিলে। হুট করেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে তাকায়। দরজার ওপাশ থেকে অর্থি বেশ চঞ্চল স্বরে ডাকছে,

'বড় ভাইজান! আছো? আসবো আমি?'

প্রহর নিজেকে পুরোপুরি শান্ত করে। ছোট্ট বোনের সামনে সে কোনোভাাবেই নিজেকে এলোমেলো রাখবে না। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে নিলো প্রহর। নরম স্বরে বললো,

'ভেতরে আয়।'

মুহুর্তেই অর্থি রুমে ঢোকে হুড়মুড় করে। যেনো সে এই কথাটির অপেক্ষাতেই ছিলো। অর্থি গাল ফুলিয়ে এসে সরাসরি বসে পড়ে প্রহরের পালঙ্কের ওপর। হাত দুটো বগলদাবা করে বেশ অভিমান নিয়েই বলে,

'তোমরা আমাকে কেউ ভালোবাসো না বড় ভাইজান!'

প্রহর ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হাসে। অর্থি দেখার আগেই নিজের হাসি চেপে বেশ গম্ভীর স্বরে বলে, 'কে বলেছে তোকে কেউ ভালোবাসে না?'

'ভালোবাসলে তো এমনটা করতে পারতে না। তুমি না এর আগে একবার বিয়ে করেছো! তবে এখন আমাকে বিয়ে না দিয়ে তুমি আবার বিয়ে করছো কেনো বড় ভাইজান?'

অবাক চোখে তাকায় প্রহর। অবাকতার রেশ ধরেই বলে, 'তোকে বিয়ের কথা কে বলেছে? আর কি উল্টো পাল্টা বলছিস? তোর বয়স কত! এখন কিসের বিয়ে অর্থি? পড়ালেখা নেই তোর?'

শেষের বাক্যগুলোতপ প্রহরের কন্ঠ শক্ত হয়ে যায়। অর্থি খানিকটা কেঁপে ওঠে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকায় প্রহরের দিকে। বলে, 'বড় ভাইজান তুমিও রেগে যাচ্ছো আমার সাথে! আসলেই আমাকে কেউ ভালোবাসো না। আমি আব্বাজানকে বলে দিবো তোমরা সবাই পঁচা।'

প্রহর ভ্রু কুঁচকে অর্থির মাথায় গাট্টা মা'রে। কন্ঠ স্বাভাবিক করে বলে, 'পিচ্চি একটা মেয়ে আসছিস বিয়ে করতে! পি'টিয়ে বিয়ের শখ মিটিয়ে দিবো।'

'বড় ভাইজান তুমি যে বিয়ে করছো এটা আমাকে আগে বলো নাই কেন? আচ্ছা বড় ভাইজান নতুন ভাবী কি বড় ভাবীর মতোই ভালো হবে? নাকি অনেক বা'জে হবে? ঠিক কাকিমার মতো!'

কাকিমা, মহুয়া, চৈত্রিকার কথা শুনতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় প্রহরের। অর্থির দিকে বেশ ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, 'নিবিড় এসেছিলো আজ?'

'নাহ মাষ্টারমশাই আসেনি আজকে। ভালোই হয়েছে আসেনি। শুধু শুধু বকে আমাকে পঁচা লোক।'

এরমধ্যেই অর্থির ডাক পড়ে তার আম্মাজানের ঘরে। অর্থি দাঁত দিয়ে জিভ কেটে বিড়বিড় করে বলে, 'আম্মাজান তো আমারে তার কাছে সব বই নিয়ে যেতে বলছিলো! হায় হায় আজ নিশ্চিত আম্মা আমার এই ছোট্ট মাথা কে'টে ফেলবে। ওহ ভাইজান আমি গেলাম!'

বলেই একছুটে বেড়িয়ে গেলো। পেছন থেকে প্রহর জোড় কন্ঠে বলে উঠলো, 'অর্থি সাবধানে যা। পড়ে যাবি!'

কে শোনে কার কথা! অর্থি যত দ্রুত পারে দৌড়ে চলে যায়। প্রহর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা আটকে দেয়। আলমারির কাছে এসে ধীরে সুস্থে তা খুলে চোখ বুলায়। ৩ মাস আগেও এ ঘরের এই আলমারিতে মহুয়ার শাড়ি জায়গা পেলেও এখন পুরো আলমারি ফাঁকা। কাপড়ের ভাজ তুলে তুলে প্রহর বের করে আনে একটি ছবির ফ্রেম। সেখানে বউ সাজে এক মেয়ের হাস্যজ্জ্বল মুখ জ্বলজ্বল করছে। প্রহর বেশ কিছুটা সময় নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত রকমের এক হাসি ফুটে উঠলেও চোখে ফুটে উঠে ক্ষো'ভ, হিং'স্রতা। আলতো করে মেয়েটার ছবির ওপর হাত বুলিয়ে রাগে ক্ষোভে ছবির ফ্রেম ছুড়ে মা'রে দেয়ালে। মুহুর্তেই শব্দ করে তা ভেঙে চু'ড়মা'র হয়ে যায়। টুকরো টুকরো পড়ে থাকা ফ্রেমের দিকে তাকিয়ে প্রহর চোয়াল শক্ত করে আওড়ায়,

'কোনো প্র'তা'রক, বিশ্বাস'ঘা'তকের স্থান প্রহর রেনওয়াজের জীবনে নেই। সেখানে তার স্মৃতি থাকাটাও অসম্ভব।'

১০.

অর্থি ভর দুপুরে বের হয়েছে। বেশ লুকিয়েই বের হয়েছে। তার আম্মাজান তাকে এই সময়ে বের হতে দেখলে নিশ্চিত বকাঝকা করেই বাড়ি মাথায় তুলতো। তাই লুকিয়েই বের হতে হয়েছে। পরে না হয় বাড়ি ফিরে বাবা বা ভাইয়ের আড়ালে লুকিয়ে বকা খাওয়া থেকে বাঁচা যাবে। চৈত্র মাসের এই দুপুরের রোদেও বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে অর্থি নেচে নেচে গ্রামের মেঠোপথ ধরে যাচ্ছে। চুলগুলো এলোমেলো করে খুলে রাখা। আজ আর বিনুনি করেনি। খোলা চুলে টান খাওয়ায় চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। ব্যাথায় মৃদু শব্দ করে ওঠে। পেছনে তাকিয়ে দেখে নিবিড় তার চুল টেনে ধরেছে। ব্যাথায়, ভয়ে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বলে,

'আপনি সবসময় আমাকে ব্যাথা দেন কেনো মাষ্টারমশাই? আপনি জানেন না আপনি চুল টেনে ধরলে আমি ব্যাথা পাবো!'

'তুমি এই দুপুর বেলায় চুল খুলে এমন করে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় যাচ্ছো? জানো চুল খোলা রাখলে ভুতে ধরে!'

নিবিড়ের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলা কথাতে অর্থি ধরেই নেয় সত্যিই বোধহয় ভুতে ধরে। তাই ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, 'ভু-ভুতে ধরে? সত্যি!'

'হ্যাঁ।'

নিবিড়ের সহজ স্বীকারোক্তি দেখে অর্থি দ্রুত এসে নিবিড়ের কাছ ঘেষে দাঁড়ায়। নিবিড় অস্বস্তিতে খানিকটা স্বরে গেলে অর্থি হাত চেপে ধরে নিবিড়ের। ফিসফিস করে বলে, 'এই মাষ্টারমশাই! সরে যাচ্ছেন কেনো? পরে আবার যদি আমাকে ভুতে ধরে?'

নিবিড়ের জবাব দেওয়ার আগেই অর্থি চট করে ছেড়ে দেয় তাকে। ভয়ে ভয়ে তোতলিয়ে বলে, 'ম-মাষ্টারমশাই এই সময় কো-কোথা থেকে আসবে? আপনি আবার আমার মাষ্টারমশাই এর বেশে ভুত আসেননি তো!'

নিবিড় কপালে ভাজ ফেলে তাকায়। বেশ খানিক্ষন বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে, 'তোমার মতো বোকা মেয়ে জীবনে একটাও দেখিনি৷ তোমার সামনে ভুত কেনো আসবে? তুমি নিজেই তো একটা পেত্নী। তাছাড়া ভুত যদি ভুল করেও আসে তাহলে তোমার বোকা বোকা কথা শুনে হয়রান হয়ে নিজেই দৌড় দিয়ে পালাবে।'

অর্থি বুঝলো না কিছুই। মাথা চুলকে চুলগুলো আগে বেঁধে নিলো। তারপর দ্রুত পায়ে নিবিড়ের কাছে এসে তার সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে,

'মাষ্টারমশাই ভুতকে কি ছুঁয়ে দেখা যায়?'

এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না নিবিড়। চুপচাপ নিজের মতো সামনে তাকিয়ে হাঁটতে থাকে৷ ভুল করেও এই পঞ্চদশী কন্যার দিকে সে তাকাবে না। চৈত্র মাসের উত্তপ্ত রোদের আলোয় মুখ লাল হয়ে আছে অর্থির। এ লালচে মুখের দিকে তাকিয়ে যদি সে ভুল করে বসে তবে আজীবন পস্তাতে হবে৷ ওদিকে বোকা অর্থি জবাবের আশায় তখনো তাকিয়ে আছে নিবিড়ের দিকে। নিবিড়ের জবাব না পেয়ে ফের হাত টেনে ধরে। নিবিড় ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,

'আর একবার আমাকে ছুঁলে তোমাকে আমি মা'র লাগিয়ে দেবো অর্থি। চুপচাপ হাঁটো! কোনো শব্দ করবে না।'

অর্থি হাত ছেড়ে দিলো। অভিমানে চোখ চিকচিক করে উঠলো। নিজের মতো চুপচাপ হেঁটে গেলো নিবিড়ের পাশে। নিবিড় আড়চোখে একবার অর্থির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,

'এই বোকা মেয়ে অভিমানও করতে জানে! কিন্তু অভিমান করলো ঠিক কোন কারণে?'

নিবিড় ভাবলোও না গভীরভাবে। অর্থি আর নিবিড় সাথীদের বাড়ির সামনের দীঘির কাছে আসতেই দেখে এই ভর দুপুরের রোদের মধ্যেই কে যেনো বসে আছে! চোখ পিটপিট করে সেদিকে তাকায় অর্থি। নিবিড়কে বলে,

'ওটা কে মাষ্টারমশাই? ওমন রোদের মধ্যে বসে আছে কেনো? এখন তো শীতকাল না।'

নিবিড় দীঘির পাড়ে বসে থাকা চৈত্রিকার দিকে তাকিয়েই বললো, 'ওটা তোমার হবু বড় ভাবীজান। চৈত্রিকা!'

অর্থি বেশ অবাক হলো। তার ভাবীজান বুঝি তার মতোই বোকা! নয়তো এই দুপুর বেলা চুল এলোমেলো করে রোদের মধ্যে বসে আছে কেনো? ধীর পায়ে এগিয়ে এসে চৈত্রিকার কাঁধে হাত রাখে। চৈত্রিকা চমকে তাকায় পেছনে। অর্থি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়। রোদের উত্তাপে দুধে আলতা গায়ের রঙ লালচে ধারণ করেছে। ঠিক তার মতোই। তবে চোখে মুখে চৈত্র মাসের এই রোদের উত্তাপের মতোই তেজ যা অর্থি নামক বোকা মেয়েটার চোখে মুখে ছিটেফোঁটাও নেই।

চলবে..

(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন