“মাম্মা, মাম্মা।”
বাচ্চাদের একটা খেলনার শোরুমে ভাগ্নির জন্মদিন উপলক্ষে তার জন্য উপহার কিনতে এসেছিল অধরা। হঠাৎ মাম্মা ডাক শুনে এবং নিজের কামিজের হাতায় টান পরছে বুঝতে পেরে চকিতে পেছনে তাকালো ও। দেখলো, ছোট একটা বাচ্চা ওর ফ্রকের এক কোণা টেনে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার বয়স আনুমানিক বছর ছয়-সাতেক হবে। গায়ে একটা খুব সুন্দর গোলাপি রঙের ফ্রক। দুই হাতে দু'টো রূপোর চুড়ি৷ বেশ মায়াবী দেখতে বাচ্চাটা।
অধরা ভাবলো, হয়তো পেছন থেকে ওকে নিজের মা ভেবেই এভাবে ভুল বুঝে ডেকে ফেলেছে বাচ্চাটা। এই ভেবে ওকে কোলে নিলো অধরা। এবার নিশ্চয়ই ওকে ভালোভাবে দেখলে বাচ্চাটার ভুল ভাঙবে। কিন্তু অধরাকে আশ্চর্য করে দিয়ে বাচ্চাটা আবারও মায়াভরা কন্ঠে ডেকে উঠলো— “মাম্মা!”
অধরার মায়া হলো খুব৷ আহারে, বাচ্চাটা নিশ্চয়ই হারিয়ে গেছে। এখন তার মা’কে খুঁজে হয়রান হচ্ছে। ও মেয়েটার গালে আলতো করে হাত রেখে আদুরে গলায় বললো, “বাবু, তোমার মাম্মা আশেপাশেই কোথাও আছে নিশ্চয়ই। চলো, আমরা খুঁজে দেখি।”
অধরা এগোনোর জন্য এক পা বাড়াতেই বাচ্চাটা পুনরায় জেদ ধরে বললো, “না! তুমিই আমার মাম্মা।”
“আমি তোমার মাম্মা নই সোনা।”
বাচ্চাটা মানলো না। জেদ ধরলো খুব। অধরা বিপাকে পরলো। কি করবে এখন! এটুকু বাচ্চাকে তো একা ছেড়ে দেওয়াও যায় না। অধরা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই ক্যাশ কাউন্টারে বিল পে করলো। ওর হাতে তখন পেঙ্গুইন টয়। শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সেটা। মেয়েটা টয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “এটা আমার জন্য কিনেছো মাম্মা?”
অধরা এবার পরলো চরম অস্বস্তিতে। একে তো বাচ্চাটা ওকে কি ভেবে যে নিজের মাম্মা ভেবে বসেছে! তারওপর এখন আবার ভাবছে, অধরা এই খেলনাটা ওর জন্য কিনেছে। অধরা তবু কিছু বললো না। নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে মৃদু হাসলো। এতে মেয়েটা আরো ধরে নিলো, খেলনাটা ওর জন্যই কেনা হয়েছে। অধরার হাত থেকে নিয়ে নিলো সেটা। অধরা কিছু বলতেও পারলো না। এরইমধ্যে পেছন থেকে একটা ভারী গলার স্বর শোনা গেল।
“রিনি!”
কন্ঠস্বরটা শোনামাত্র অধরার কোলের মেয়েটা অবিলম্বে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে উচ্ছ্বাসের সহিত একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলো, “বাপি তুমি এসেছো!”
বলেই অধরার কোল থেকে পেছনে ঝাঁপিয়ে পরলো প্রায়। আকস্মিক ঘটনায় অধরা হতভম্ব। পিছু ফিরে দেখলো, একটা লম্বাচওড়া পুরুষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। সেই লোককে দেখেই তার কোলে ঝাঁপিয়ে পরেছে বাচ্চাটা। যার নাম রিনি। লোকটার বয়স কত? আনুমানিক বছর বত্রিশ-তেত্রিশ হবে। বা তার কমবেশিও হতে পারে। অধরা দেখেই অনুমান করলো, এই লোক-ই রিনির বাবা৷ লোকটার পরনে ব্লু পোলো শার্ট আর ব্ল্যাক ফর্মাল প্যান্ট। কর্পোরেট পার্সন হবে বোধহয়। যদিও আন্দাজ মাত্র। আন্দাজ করারও কোনো আগ্রহ ছিল না অধরার। কিন্তু ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এতই ভালো যে, দেখামাত্র আন্দাজ-অনুমান করতে ব্যস্ত হয়েছে। সামনের প্রতিক্রিয়াহীন ব্যক্তির তরফ হতে কোনো কথাবার্তার আশা না করেই অধরা ধীর-স্থিরভাবে জিজ্ঞাসা করলো, “আপনার বাচ্চা?”
“জি।”
সাধারণ একটা কন্ঠস্বর। অথচ গাম্ভীর্যে ভরপুর শোনালো অধরার কাছে৷ ও পুনরায় বললো, “বাচ্চাকে একটু দেখে-শুনে রাখবেন। এভাবে পাবলিক প্লেসে একা ছাড়া উচিত নয়। যেকোনো অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে যেতে পারতো।”
“আমার বাচ্চা, আমি বুঝে নেব। আপনার অ্যাডভাইসের জন্য নো থ্যাংকস।”
অধরা স্বচ্ছ মনে ভালোর জন্যই পরামর্শটা দিয়েছিল। কিন্তু সামনের ব্যক্তি যে ঠান্ডা গলায় নিতান্তই অভদ্রের ন্যায় এমন রূঢ় জবাব দেবে— সেটা আগে বুঝতে পারেনি অধরা। বুঝতে পারলে অবশ্যই যেচে অপমানিত হত না। মেজাজটা খারাপও হলো খুব। তবে সেটা প্রকাশ করলো না৷ বরং জোরপূর্বক মুখ-মন্ডলী স্বাভাবিক রেখে সামনে তাকালো৷ এতক্ষণ গুরুত্ব না দেওয়া লোকটাকে এবার ও মনোযোগ সহকারে দেখলো। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের ব্যক্তি। হাতে একটা রিস্টওয়াচ। মুখ প্রায় ক্লিনশেভ করা। হালকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতি। যদিও সেটা ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে বোঝা যায় না। মুখ হতে অধরার চোখ গেল লোকটার মাথার দিকে। চুল ছোট বেশ। বলা চলে, আর্মি কাট দেওয়া। ডিফেন্স পার্সন নাকি! যদি তাই-ই হয়, তবে এই লোকের এমন আচরণ যুক্তিসঙ্গত। অধরার একটা দৃঢ় ধারণা — আর্মি পার্সনরা অত্যাধিক মাত্রার বিরস হয়ে থাকে।
সবশেষে অধরার চোখ পরলো লোকটার বাঁহাতের অনামিকা আঙুলের দিকে। অনামিকা আঙুলে একটি আংটি চকচক করছে। অধরার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলো লোকটার কথায়।
“এটা আপনার?”
অধরা বিচলিত দৃষ্টি সরিয়ে সামনের পানে চাইলো। রিনির হাতে ওর কেনা সেই খেলনার ব্যাগ লোকটা দেখিয়ে এই প্রশ্ন করেছে। অধরা ভদ্রভাবে জবাব দিলো, “জি, এটা আমার।”
লোকটা রিনির হাত থেকে ব্যাগ নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই রিনি কান্নারত স্বরে বিরবির করলো, “না পাপা এটা আমার। মাম্মা আমার জন্য কিনেছে।”
‘মাম্মা’ শব্দটা শুনে সামনের ব্যক্তি কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালো অধরার দিকে। অধরা বললো, “সমস্যা নেই। খেলনাটা আপনার বাচ্চা-ই নিক বরং।”
ও এই কথা বলামাত্র লোকটা পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো। ব্যাগের মধ্যে থেকে খেলনা বের করে স্টিকারে মূল্য দেখলো। ভ্যাটসহ ছয়’শ পয়ষট্টি টাকা। মানিব্যাগ থেকে সমপরিমাণ টাকা বের করে অধরার হাতে ধরিয়ে দিলো৷ অধরা ইতস্তত হয়ে টাকা এগিয়ে দিয়ে বললো, “না, না! এটার কোনো দরকার নেই!”
“কেন দরকার নেই?”
“খেলনাটা আপনার মেয়েকে এমনিই দিলাম।”
“এমনি কেন দিবেন? আমার মেয়ে কি আপনার কিছু হয়? ইভেন ওকে আপনি চিনেন? বা আপনার পরিচিত ও? তাহলে অপরিচিত একজনকে কেন আপনি ফ্রি-তে খেলনা দিবেন? আর তার প্যারেন্টস-ই বা কেন সেটা টলারেট করবে?”
অধরার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধীরে ধীরে গুটিয়ে এলো। টাকা ভর্তি হাতটা মুঠো করে নিলো ও৷ ভারী দাম্ভিক লোক তো! ও আর কোনো কথা বললো না। সামনে গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যাওয়ার আগে শেষ দু’টো বাক্য উচ্চারণ করে গেল— “কারো কাছে ঋণী থাকা আমার স্বভাবে নেই। সো, হু আর ইউ?”
গম্ভীর গলায় মুখের ওপরে করে যাওয়া অপমানটা অধরা ভদ্রভাবে হজম করে নিলো নিতান্তই পাবলিক প্লেস বলে!
.
.
রিনি তার বাবার কোলে চড়ে শপ হতে বের হয়ে নিউমার্কেট এরিয়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে কতগুলো ফুড কার্টের অবস্থান। একটা ফুড কার্টে আইসক্রিম বিক্রি করা হচ্ছে। রিনি সেদিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে তার বাবাকে বললো, “বাপি একটা আইসক্রিম কিনে দাও না। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”
রিনির গালে আলতো করে হাত রেখে আদর করে তার বাবা বললো, “সোনা বাচ্চা আমার। তুমি চাইলে একটা কেন, তোমার জন্য গোটা একটা আইসক্রিমের কার্ট এনে দিতে পারি৷ বাপিকে এভাবে প্লিজ বলতে হয়?”
রিনিকে নিয়ে গিয়ে একটা ব্লু বেরি আইসক্রিম কিনে দিলো ওর বাবা। এরপর পার্কিং এরিয়ায় গেল। সেখানে গাড়ি পার্ক করা ছিল। রিনির বাবা গাড়ির দরজা খোলার জন্য হাত রাখতেই তার পকেটে থাকা সেলফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো। রিনিকে একহাতে কোলে শক্ত করে ধরে রেখে পকেট থেকে ফোন বের করলো।
কল এসেছে আননোন নাম্বার থেকে। নাম্বারটা ফোনে সেভ করা নেই। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়েলী কন্ঠস্বর শোনা গেল — “হ্যালো, মেজর মাহাথির বলছো?”
“ইয়েস, মাহাথির মোহাম্মদ রাভি স্পিকিং। কে বলছেন?”
“আমি জুহি। ভয়েসে চিনতে পারছো না মেজর?”
“হ্যাঁ জুহি, বলো। কোনো দরকার?”
“তুমি নাম্বার চেঞ্জ করেছো কেন মাহাথির? তোমার সাথে কনট্যাক্ট করতে পারছিলাম না। দ্যান আমার শাশুড়ি আম্মুর কাছ থেকে তোমার নতুন নাম্বারটা নিলাম। তোমাকে তো সেই দু’দিন আগে মেসেঞ্জার, ইনস্টাতে মেসেজ দিয়ে রেখেছি। তুমি সোশ্যাল মিডিয়াতেও নেই। মেসেজ সিনও করোনি।”
“জুহি, আ’ম বিজি নাউ। সময় কোরে মেসেজ চেক করবো। রাখো এখন। পরে কথা বলছি।”
মাহাথির নিজেই কল কাটতে যাচ্ছিল। তবে তার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে জুহির অস্থিরভাবে বলা কথা কানে আসলো।
“তুমি সবসময় এমন করো মাহাথির। আমাকে একটুও সময় দাও না। কতদিন দেখা হয়নি তোমার সাথে। এখন কি তোমার সাক্ষাৎ পেতে তোমার বাসায় আসা লাগবে? বাসায়ই না-হয় গেলাম। আফটার অল আমাদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। আমি তোমার ফিয়ন্সে৷ যেতেই তো পারি। তাই-না রাভি?”
মাহাথির স্বাভাবিক মুখের ভাব হঠাৎ বদলে গেল৷ কাঠখোট্টা রূঢ স্বরে ও বললেো, “তোমাকে বহুবার বলেছি জুহি, আমাকে এই নামে ডাকবে না। এই নামে ডাকার অধিকার যার ছিল, সে এখন জীবিত নেই। সুতরাং, অন্য আর কেউ এই নামে আমাকে ডাকবে না৷ মাহাথির মোহাম্মদ এক কথা দ্বিতীয় বার বলে না৷ তবে তুমি আমার ফিয়ন্সে বলে কিছুটা ছাড় পেয়েছো। নেভার এগেইন, ওকে?”
#চলবে
গল্পের নাম— #এটা_গল্প_কার ? [সূচনা পর্ব]
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক