#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৫৭ (অন্তিম পর্ব )
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
ইতালির মিলানের আকাশটা তখন ভোরের ম্লান আলোয় সবেমাত্র ধূসর থেকে রূপালি হয়ে উঠছে। 'অস্পেদাল নিগুয়ারদা'এর বিশাল গেট দিয়ে টায়ারের আর্তনাদ তুলে দুটি কালো এসইউভি গাড়ি এসে থামল। ভোরের এই নিস্তব্ধতায় হাসপাতালের করিডোরগুলো যেন এক অশুভ ছায়াচ্ছন্ন করিডোর মনে হচ্ছিল।
রোজেলিয়া গাড়ি থেকে নামল এক ঝটকায়। তার পরনের পোশাকটা ধুলোয় ধূসর, আর চোখের পাতাগুলো যেন ভারী কোনো বিষাদময় পাথরের চাপে নুয়ে আছে। কান্নায় কান্নায় তার চোখ জোড়া এখন জবার মতো টকটকে লাল। সে যখন হাঁটছিল, তার দেহটা কাঁপছিল এক তীব্র অজানা আতঙ্কে। সে কখন যে ক্লান্তিতে চোখ বুজে ফেলেছিল, তার কোনো হুশই ছিল না।
এখন সেই ঘুমন্ত মুহূর্তগুলোর কথা ভেবেই তার বুকের ভেতরটা অপরাধবোধে চি'ড়িবি'ড়িয়ে উঠছে। কেন সে রিভেনের সেই শেষ মুহূর্তগুলোতে জেগে থেকে প্রার্থনা করল না? কেন তার আত্মা রিভেনের সুরক্ষার জন্য ব্যাকুল হলো না? প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে সে মনে মনে আউড়ে চলছিল এক অশেষ প্রার্থনা 'রিভেনের কিছু হবে না, রিভেনের কিছু হতে পারে না।' রিভেন ছাড়া তার তো আর কেউ নেই! বাবা-মা, সবাইকে তো নিয়তি নিষ্ঠুর হাতে কেড়ে নিয়েছে, রিভেনই হলো তার শেষ সম্বল, তার একমাত্র পৃথিবী।
মার্কো রোজেলিয়ার ঠিক সামনে দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। রোজেলিয়া তাকে অন্ধের মতো অনুসরণ করল। কিন্তু মার্কোর মুখাবয়ব দেখে রোজেলিয়ার স্নায়ুগুলো আরও উ'ত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মার্কো বরাবরের মতোই শান্ত, তার চোয়াল শক্ত, চোখে কোনো অস্থিরতার চিহ্ন নেই। সে বারবার বিড়বিড় করে বলছে, "সব ঠিক আছে, ম্যাম। শান্ত হোন।" কিন্তু রোজেলিয়ার কানে সেই সান্ত্বনা বি'ষের মতো লাগছে। এনজোর মৃত্যুর পর, মেহেরিনের বিদায়ের মুহূর্তেও তো তাদের সবার মুখ ঠিক এমন পাথরের মতোই শীতল আর শান্ত ছিল! তাদের সেই নিস্পৃহ অভিব্যক্তিই তো এক ভয়াবহ সত্যের বার্তা বহন করে নিয়ে আসত।
লিফটে ওঠার পর রোজেলিয়ার ধৈর্য বাঁধ ভেঙে গেল। তার মনে হচ্ছিল প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি ধা'রা'লো ছু'রি দিয়ে তার বুক চিরে দিচ্ছে। সে বারবার চোখের জল মুছছে আর বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছে ।
লিফটটা যখন দ্বিতীয় তলায় থামল, ধাতব দরজাটা খোলার শব্দটা রোজেলিয়ার মনে হলো কোনো মৃ'ত্যুপণ যুদ্ধের দামামা। করিডোরের মেঝেতে তাদের পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। দ্রুত পায়ে হেঁটে তারা যখন সেই ভিআইপি কেবিনের সামনে পৌঁছাল, রোজেলিয়ার হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল।
ভিআইপি কেবিনের দরজাটা মার্কো আলতো করে ঠেলে দিতেই রোজেলিয়া নিজের সমস্ত শক্তি সংকুচিত করে ভেতরে পা রাখল। তার পায়ের নিচের মেঝেটা যেন এক মুহূর্তের জন্য তলিয়ে গেল, আর পুরো পৃথিবীটা এক ভয়াবহ ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে শুরু করল।
কেবিনের সেই তীব্র সাদা আলোর নিচে, মাঝখানের বিছানায় পড়ে থাকা অবয়বটি দেখামাত্রই রোজেলিয়ার হৃদপিণ্ডের স্প'ন্দন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিছানায় শায়িত সেই মানুষটির দে'হটি মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা।
রোজেলিয়ার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না, তার কণ্ঠনালী যেন কোনো অদৃশ্য শৃঙ্খলে রুদ্ধ, কোনো শব্দই তার ওষ্ঠাধর থেকে নির্গত হতে পারছে না। কেবল এক বুকফাটা য'ন্ত্রণার হাহাকার, যা তার বুকের পাঁজরগুলোকে চূ'র্ণবিচূ'র্ণ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার পৃথিবীটা ঠিক কাঁচের দর্পণের মতো আ'ছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে গেল। টলমল পায়ে সে বিছানার সন্নিকটে এগিয়ে গেল প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জ্ব'লন্ত অ'ঙ্গারের ওপর দিয়ে হাঁটার সমান যাতনাদায়ক। তার সারা অঙ্গে এক অমোঘ কম্পন যেন কোনো ঝড়ের কবলে পড়া পত্রপল্লব। সে নিজের ডান হাতটি কাঁপতে কাঁপতে সেই চাদরের ওপর স্থাপন করল,কিন্তু সাহস পেল না সেটা সরিয়ে মুখটা দেখার। তার মস্তিষ্ক চিৎকার করে বলছে
'না, এটা রিভেন হতে পারে না! আমার রিভেন তো আমাকে কথা দিয়েছিল, ও ফিরে আসবে!'
রোজেলিয়ার চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেল, তার টকটকে লাল হয়ে যাওয়া চোখজোড়া দিয়েও সে আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না। সে বিছানার পাশে আ'ছড়ে পড়ল। তার নখগুলো বিছানার চাদর খা'মচে ধরল, যেন সেই চাদরের ওপর দিয়ে রিভেনের শরীরের উষ্ণতা খুঁজে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করছে সে।
রোজেলিয়ার আ'র্তনাদহীন হাহাকার কেবিনের নিস্তব্ধতাকে যেন এক প্রবল চাপে বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। সে চাদর ঢাকা সেই নি'থর দেহের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, তার নখগুলো বিছানার চাদরের ভাঁজে গভীরভাবে বিদ্ধ হয়ে আছে, যেন সেই সাদা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে সে নিজের সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে টেনে ধরতে চাইছে। তার মস্তিষ্ক এক ভয়াবহ অসংলগ্নতায় ঘুরপাক খাচ্ছে ।রিভেন, তার রিভেন, যে কিনা কয়েক ঘণ্টা আগেও তার চোখের মণির সূর্যমুখীকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, সে কি আজ কেবল একখণ্ড নি'থর অস্তিত্বে পরিণত হয়েছে?
ঠিক সেই মুহূর্তেই, চাদরের নিচে থাকা শরীরটি সামান্য নড়ে উঠল।রোজেলিয়ার হৃৎপিণ্ড যেন এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গিয়ে আবার উল্টো দিকে যাত্রা করল। চাদরের নিচ থেকে এক গভীর, ঈষৎ ভারী অথচ পরিচিত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বিছানার সেই সাদা চাদরের নিচ থেকে আচমকা এক শক্তিশালী হাতের টান অনুভূত হলো। চাদরটা এক ঝটকায় সরে যেতেই বেরিয়ে এল রিভেনের সেই বলিষ্ঠ, ক্ষ'তবি'ক্ষত শরীর। তার কাঁধে একটা ব্যান্ডেজ, কপালে র'ক্তের দাগ কিন্তু তার হ্যাজেল চোখ দুটো রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে এক অদ্ভুত অস্থিরতায়। রিভেন আর স্থির থাকতে পারল না, রোজেলিয়াকে ওইভাবে চাদর খা'মচে ভেঙে পড়তে দেখে সে যন্ত্রণার তোয়াক্কা না করেই বিছানা থেকে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
রোজেলিয়া স্তব্ধ। তার চোখের জল গালের ওপরই জমে গেল, যেন সময় এক লহমায় থমকে দাঁড়িয়েছে।রিভেনের সেই বলিষ্ঠ হাতের টান রোজেলিয়ার সমস্ত অস্তিত্বের ওপর এক প্রবল ঝটকা দিল। বিছানার সাদা চাদরটা মেঝেতে লুটোপুটি খেল, আর রোজেলিয়ার সামনে দৃশ্যমান হলো রিভেনের খানিকটা জ'খম দেহ। তার কাঁধের ব্যান্ডেজে র'ক্তের হালকা লালচে দাগ, কপালে ব্যান্ডেজ, তবুও তার হ্যাজেল চোখ দুটোতে সেই একই তীব্র আবেশ, যা রোজেলিয়ার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি কোণাকে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে দিল।
রোজেলিয়ার কণ্ঠনালী দিয়ে এক অস্পষ্ট, ভাঙা স্বর বেরিয়ে এল, "রি... রিভেন?"
রিভেন তার দীর্ঘ হাত দুটো বাড়িয়ে রোজেলিয়াকে এমনভাবে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল, যেন সে এক হারিয়ে যাওয়া মহামূল্যবান সম্পদকে পুনরায় ফিরে পেয়েছে। তার ভারী কণ্ঠস্বর কেবিনের নিস্তব্ধতায় মখমলের মতো আছড়ে পড়ল, "রোজ পেটাল..."
রোজেলিয়ার মস্তিষ্ক যেন কোনো ঘোরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সে নিজের কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে রিভেনের মুখ, কাঁধ আর হাতের ক্ষ'তের জায়গাগুলোতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, রিভেন সত্যিই বেঁচে আছে। তার মাথাটা অকারণে ঝিমঝিম করছে, ঘরটা যেন চারপাশ থেকে দুলে উঠছে। সে আবার অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
"রিভেন..."
রিভেন রোজেলিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে, আঙুলের ডগা দিয়ে তার ভেজা গাল আলতো করে ছুঁয়ে দিল। তার কন্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ় আশ্বাস,
"আমার কিছুই হয়নি, রোজ পেটাল। আমি একদম ঠিক আছি, দেখো।"
রোজেলিয়ার দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে বুকটা ধকধক করে ওঠানামা করছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস যেন আর ছন্দ মেনে চলতে পারছে না, প্রতিটা নিঃশ্বাসই মনে হচ্ছে এক একটা ক'ষ্টের পাহাড় ডিঙিয়ে আসছে। রিভেন তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জাপটে ধরে শান্ত করতে চাইল, কিন্তু রোজেলিয়ার ভেতরের জমে থাকা অভিমান আর শোক তখন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে আবার ফে'টে পড়ে কেঁদে উঠল, চাদরের সেই সাদা রঙের দৃশ্যটা তাকে এখনো তাড়া করে ফিরছে। সে অস্ফুট আর্তনাদে বলল,
"সাদা... ওই সাদা কাপড় দিয়ে তোমাকে কেন ঢেকে রাখা হয়েছিল কেন? আমি... আমি ভেবেছিলাম আমি তোমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি!"
রিভেন তার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে খানিকটা সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল, তার মুখে তখন এক অদ্ভুত দুষ্টুমির রেখা, যদিও যন্ত্রণায় তার কপালে ব্যথার ভাঁজ স্পষ্ট। সে বাঁকা হেসে বলল,
" রোজ পেটাল, এতো কাঁদছ কেন? ওটা তো ছিল একটা সামান্য প্র্যাঙ্ক! আরওয়াইন ম্যানশনের লর্ডদেরও তো মাঝেমধ্যে একটু বিনোদনের প্রয়োজন হয়, তাই না?"
রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। রিভেনের এই অপ্রত্যাশিত বেঁচে থাকাটুকু যে কতোটা নিষ্ঠুর রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল, তা যখন রোজেলিয়ার ম'স্তিষ্কে ধরা দিল, তার ভেতরের সমস্ত শোক মুহূর্তের মধ্যে তীব্র অভিমানে রূপান্তরিত হলো। সে রিভেনের বুক থেকে মাথা সরিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল, তার চোখের কোণ দিয়ে তখনও অশ্রুর ধারা গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই চোখের দৃষ্টি এখন আ'গ্নেয়গিরির মতো জ্ব'লন্ত।তার কান্নারুদ্ধ কণ্ঠনালী দিয়ে এক তীব্র চিৎকারের মতো শব্দ বেরিয়ে এল,
" তুমি এটাকে প্র্যাঙ্ক বলছ? "
সে রিভেনের বুকের ওপর সজোরে একটা কি'ল বসিয়ে দিল, যদিও তার হাতের পেশিতে কোনো জোর ছিল না।
"তুমি কি পা'গল? তুমি কি জানো আমি ওই কয়েকটা মিনিট কীভাবে কাটিয়েছি? আমি ভেবেছিলাম তুমি আর নেই! আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা আমার মাথার ওপর ভে'ঙে পড়ছে, আর তুমি এখানে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্র্যাঙ্ক করছ? তোমার কি একটুও লজ্জা নেই? ফা'কিং সাই'কোপ্যা'থ!"
রিভেন তার য'ন্ত্রণাকা'তর মুখটা চেপে ধরেও অট্টহাসিতে ফে'টে পড়ল। সে রোজেলিয়ার দুহাত নিজের মুঠোয় জাপটে ধরে তাকে কাছে টেনে আনল। রোজেলিয়া মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু রিভেন তাকে ছাড়ল না। সে হাসতে হাসতে রোজেলিয়াকে থামানোর জন্য এক অদ্ভুত রসিকতা করে বসল।
রোজেলিয়া তার জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে রিভেনের দিকে আবার তাকাল, তার ঠোঁট দুটো কান্নার আবেগে থরথর করে কাঁপছে। সে রিভেনের বুকের ওপর থেকে নিজেকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু রিভেনের লোহার মতো শক্ত বাহুর বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়া এখন তার সাধ্যের বাইরে। সে ফুঁসে উঠে বলল,
"তুমি কি জানো না, এই প্র্যাঙ্কের মূল্য কতটা চড়া হতে পারত? যদি সত্যি সত্যিই হার্টফেল করে মা'রা যেতাম, তখন কী করতে? তোমার এই আজগুবি সা'ইকোপ্যা'থি একদিন আমাকে এই হাসপাতালের ম'র্গে পৌঁছে দেবে, রিভেন!"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার হ্যাজেল চোখ দুটোতে হঠাৎ করেই এক বিষাদময় গম্ভীরতার ছায়া নেমে এল। সে রোজেলিয়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল, তার নিশ্বাসের উষ্ণতা রোজেলিয়ার ত্বকে এক বিদ্যুৎস্পর্শ তৈরি করল। খুব নিচু অথচ ভারী স্বরে রিভেন বলল,
"মা'রা তো আমি ওই বি'স্ফো'রণেই যেতাম, রোজ পেটাল। কিন্তু বেঁচে গেলাম কেবল তোমাকে দেখার নেশায়।"
রিভেনের এই স্বীকারোক্তি রোজেলিয়ার সমস্ত রা'গের আ'গুনে যেন এক ঝাপটা হিমশীতল জল ঢেলে দিল। সে শান্ত হয়ে রিভেনের বুকের ওপর মাথা রাখল, শুনতে পেল তার হৃদপিণ্ডের সেই পরিচিত, অথচ এখনকার মতো কিছুটা ধীরগতির স্পন্দন। সে রিভেনের ক্ষ'তবি'ক্ষত কাঁধের ব্যান্ডেজের ওপর আলতো করে চু'মু খেল, যেন প্রতিটি চু'ম্বন এক একটি অব্যক্ত প্রার্থনা। অস্ফুট স্বরে, গভীর আবেগে সে ফিসফিস করে উঠল,
"আমি বাঁচব না তোমাকে ছাড়া, রিভেন আরওয়াইন ।আমার পুরো পৃথিবীটা তোমার বুকের স্পন্দনের ওপর নির্ভরশীল"
রিভেন রোজেলিয়ার চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল, তার চোখে তখন এক অদ্ভুত উজ্জ্বল আভা, যা মৃ'ত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার তীব্র উল্লাস। সে রোজেলিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর কিন্তু মখমলি স্বরে বলল,
"আর রিভেন আরওয়াইনও কি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারে, রোজ পেটাল? "
রিভেন একটু কেশে নিয়ে, যন্ত্রণায় কুঁ'কড়ে যাওয়া মুখটাকে সামলে নিয়ে বাঁকা হাসল। সে জানালার বাইরের ম্লান ভোরের আলোর দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
" বি'স্ফো'রণের সময় যখন গাড়িটা আ'গুনের গো'লার মতো উড়ছিল, তখন একটা মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল সব শেষ। আ'গুনের শিখাগুলো যখন আমার চোখের সামনে নাচের মতো দুলছিল, আমার মাথায় তখন কেবল একটাই চিন্তা কাজ করছিল । কী নির্দয় আমি! আমার এই অপূর্ব সুন্দরী, রত্নসম স্ত্রীকে এই বয়সেই বিধবা বানিয়ে যাওয়ার পাপ আমি মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছি? ওই নরকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল এই যে, আমার মৃত্যুর পর তোমাকে হয়তো অন্য কেউ আমার চোখের মতো করে দেখবে না, তোমার ওই সূর্যমুখী চোখদুটোর রহস্য কেউ কোনোদিন বুঝবে না।"
রিভেন থামল, তার হাতের আলতো চাপে রোজেলিয়া আরও কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে এল।
কেবিনের এক কোণে এতক্ষণ পাথরপ্রতিম হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মার্কো। একটা নিস্পৃহ ভঙ্গিমার মতোই সে চুপচাপ সাক্ষী ছিল এই পুনর্মিলনের। রিভেন তার দৃষ্টির কোণ দিয়ে মার্কোর অস্তিত্ব অনুভব করল, তারপর চোখের এক সংক্ষিপ্ত ইশারায় তাকে বাইরে যেতে বললো। কোনো শব্দ না করেই, ছায়ার মতো মার্কো দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল করিডোরে।
এখন কেবিনে শুধু তারা দুজন। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে রোজেলিয়ার এলোমেলো চুলের ওপর। রিভেন তার হাতের আলতো চাপে রোজেলিয়ার চিবুকটা ধীরে ধীরে ওপরে তুলল। রোজেলিয়া নিচের দিকে দৃষ্টি নামিয়ে রেখেছে, তার গালের ওপর তখনও অশ্রুচিহ্ন, যেন বৃষ্টির পর কোনো পুষ্পরেণু।
রিভেন তার হ্যাজেল চোখজোড়ায় এক পরম প্রশান্তির আভা ফুটিয়ে রোজেলিয়ার চোখের মণির গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। তার কণ্ঠস্বর তখন ছন্দময়, গম্ভীর আর তৎসম শব্দের মায়ায় মোড়ানো,
"দেখো রোজ পেটাল, নিয়তি অমোঘ হলেও আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য স্পন্দন কেবল তুমিই। আমার এই রূঢ়, রক্তসিক্ত জীবনের আবর্তে তুমিই একমাত্র স্বর্গীয় আবেশ। তোমার চাহনিতে আমার এই হিং'স্র হৃদপিণ্ডেও এক পরম শাশ্বত শান্তির সুর বাজে। তুমি আমার এই দগ্ধ জীবনের একমাত্র অনির্বাণ দীপশিখা যার দ্যুতিতে আমি আমার অন্ধকার পথ খুঁজে পাই।"
রোজেলিয়া তার দীর্ঘ চোখের পাতা কাঁপিয়ে রিভেনের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কেবল এক নিখাদ, অকৃত্রিম সমর্পণ। রিভেন তার রোজেলিয়ার কপাল থেকে একটি চুলের গোছা সরিয়ে দিল।
ভোরের রক্তিম সূর্য তখন আকাশের বুক চিরে পূর্ণিমার চাঁদের মতোই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। রিভেন আর রোজেলিয়া ।মাফিয়া জগতের সমস্ত গ্লানি, সমস্ত অন্ধকার আর সমস্ত বিষাদ পেছনে ফেলে, এক নিস্তব্ধ কেবিনের গণ্ডিতে যেন নতুন করে একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে গেল। এই পুনর্মিলন কেবল জীবনের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এক নতুন উপাখ্যানের সূচনা যেখানে রিভেন আরওয়াইনের সমস্ত শক্তি আর রোজেলিয়ার সমস্ত কোমলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে রইল।
আরওয়াইন ম্যানশনের সেই অন্ধকার অতীত এখন অনেক দূরে, আর তাদের এই নতুন ভোরের পথে দাঁড়িয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে রিভেন শুধু অনুভব করল জীবনের সবটুকু রঙ যখন শেষ হয়ে যায়, ঠিক তখনই মানুষ তার ভালোবাসার আসল রংটুকু খুঁজে পায়।
𝒀𝒐𝒖 𝒂𝒓𝒆 𝒕𝒉𝒆 𝒐𝒏𝒍𝒚 𝒓𝒐𝒔𝒆 𝒑𝒆𝒕𝒂𝒍 𝒕𝒉𝒂𝒕 𝒔𝒖𝒓𝒗𝒊𝒗𝒆𝒅 𝒎𝒚 𝒘𝒊𝒏𝒕𝒆𝒓, 𝒎𝒚 𝒍𝒐𝒗𝒆. 🌹
~ 𝒎𝒚 𝒑𝒓𝒆𝒄𝒊𝒐𝒖𝒔 𝑹𝒐𝒔𝒆 𝑷𝒆𝒕𝒂𝒍
────୨ৎ────────୨ৎ────────୨ৎ─────୨[সমাপ্ত]ৎ────────୨ৎ─
───────୨ৎ────────୨ৎ──