#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৫৬
সকালবেলার রোদটা আরওয়াইন ম্যানশনের বিশাল জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতেই একটা বিষাদময় আভার জন্ম দিল। এরিকার ঘরের কোণে রাখা সুটকেসগুলো আজ তার বিদায়ের নিথর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আভা খুব নিপুণ হাতে এরিকার জরুরি জিনিসপত্রগুলো ব্যাগে গুছিয়ে দিয়ে গেছে ।এখন বাকি টুকটাক জিনিস গোছাতে রোজেলিয়া এরিকাকে সাহায্য করছে কিন্তু তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল এক গভীর আচ্ছন্নতা। রিভেন আজ খুব ভোরেই অফিসের জরুরি কাজে বেরিয়ে গেছে, তাই ম্যানশনের করিডোরগুলোতে আজ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
এরিকা আজ সকালে তার বাবা-মায়ের পুরনো বাড়িতে গিয়েছে সেখানে এনজো আর তার বাবা-মায়ের সমাধিও দেখে এসেছে ।সেই নির্জন সমাধিক্ষেত্রে রাখা প্রতিটি শ্রদ্ধাঞ্জলি আর পুরনো বাড়ির স্মৃতিগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সে আজ এক নতুন গন্তব্যের দিকে পা বাড়াচ্ছে যেখানে আকাশ হয়তো আরও একটু বেশি নীল, আর বাতাস হয়তো এনজোর অনুপস্থিতির যন্ত্রণায় অতটা ভারাক্রান্ত নয়।সে এনজো আর তার বাড়িতে গিয়েও তার প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে এসেছে।
এদিকে রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা কোনো এক অদৃশ্য পাথরের চাপে চিড়বিড়িয়ে উঠছিল, তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনে যেন কোনো এক অমীমাংসিত অপরাধবোধের তীব্র দ'হন প্রতিনিয়ত তাকে কুরে কুরে খা'চ্ছিল। সে এরিকার সামনে এসে বারবার নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কণ্ঠনালী কান্নার প্রবল জোয়ারে রুদ্ধ হয়ে আসছিল। শেষমেশ, সমস্ত জড়তা কাটিয়ে সে এরিকার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন বাঁধভাঙা জল, যা তার গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে এক বিষাদময় রেখা তৈরি করেছে।
রোজেলিয়া অত্যন্ত কাঁপা স্বরে, যেন কোনো এক নিষিদ্ধ সত্যকে সে আজন্মের ভারমুক্ত করতে চাইছে, ফিসফিস করে বলল,
"তোমায় একটা কথা বলি, এরিকা?"
এরিকা তার ব্যাগ গোছানোর কাজ থামিয়ে রোজেলিয়ার দিকে মুখ ফেরাল। তার চোখের সেই অসীম শূন্যতা যেন কোনো এক স্থির সমুদ্রের তটরেখা, যেখানে কোনো ঝড় নেই, কোনো ঢেউ নেই। সে অত্যন্ত শান্ত অথচ মায়াবী স্বরে বলল,
"হ্যাঁ ম্যাম, বলুন।"
রোজেলিয়া এরিকার হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তার আঙুলগুলো কাঁপছে ।সে অস্ফুট স্বরে স্বীকার করল,
"আসলে এটা কীভাবে বলব জানি না, কিন্তু এই অপরাধবোধ আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। এনজোর মৃ'ত্যুর জন্য আমিই দায়ী, এরিকা। সেদিন যদি আমি ডেইগোর সেই কুৎসিত প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করে তার কাছে চলে যেতাম, তবে হয়তো তোমার ভাইকে এভাবে প্রা'ণ হা'রাতে হতো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও, প্লিজ!"
এরিকা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নিজের বুকের ভেতরকার শোকের পাহাড় যেন রোজেলিয়ার এই কান্নার সাথে একাকার হয়ে গেল। সে খুব দ্রুত তার হাতটা রোজেলিয়ার হাতের ওপর রেখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তায় চেপে ধরল।তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত, পরিণত শান্ত ভাব।সে রোজেলিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
"এইভাবে বলবেন না, প্লিজ। মৃত্যু আমাদের কারো হাতে নেই, এটা ছিল নিয়তি এক অমোঘ, অমোচনীয় সত্য। নিজেকে এভাবে দগ্ধ করে কোনো লাভ নেই, ম্যাম। আপনি কি মনে করেন আপনি নিজে কম কষ্ট পেয়েছেন ?আপনাকে দিনের পর দিন ড্রা'গস দিয়ে অ'বশ করে রাখা হয়েছিল, আপনার বাবা-মাকে হ'ত্যা করা হয়েছিল। আমাদের এই ধ্বং'সের খেলায় আমরা সবাই একই সাথে ক্ষ'তিগ্রস্ত। আপনি দায়ী নন, দায়ী এই আ'ন্ডারওয়ার্ল্ডের কুৎসিত অন্ধকার। দয়া করে আর নিজেকে অপরাধী ভাববেন না।"
এরিকার চোখের সেই গভীর শূন্যতা এখন যেন এক স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় প্লাবিত। সে মৃদু হেসে অত্যন্ত ধীর ও অবিচল কণ্ঠে যোগ করল,
"ম্যাম, মানুষ যখন শোকের চরম শিখরে পৌঁছায়, তখন তার রাগ আর ঘৃণাগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। আমি অনেক কেঁদেছি, অনেক ভেবেছি ।কেন ভাইয়াকে এভাবে চলে যেতে হলো? কেন আমার পৃথিবীটা মুহূর্তের মধ্যে এভাবে ত'ছন'ছ হয়ে গেল? কিন্তু আজ সকালে যখন ভাইয়ার কবরের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন মনে হলো বাতাসের প্রতিটি কণা যেন আমাকে বলছে ,এরিকা, মুক্তি দাও নিজেকে।' আপনি যে ক্ষমা চাইছেন, সেটা আপনার হৃদয়ের বিশালতাকে প্রমাণ করে। কিন্তু সত্য তো এটাই যে, সবই আমাদের নিয়তি"
রোজেলিয়া তার ভিজে চোখের পাতাগুলো কাঁপিয়ে এরিকার দিকে তাকাল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
"তোমার আমার প্রতি কোন ক্ষো'ভ বা ঘৃণা নেই এরিকা?"
এরিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরের সেই অসীম আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে আজ সকালের রোদটা বড্ড বেশি উজ্জ্বল। সে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
"ঘৃণা করার শক্তি আমার ভেতরে আর অবশিষ্ট নেই, ম্যাম। ঘৃণা তো খুব তীব্র এক আবেগ, এর জন্য অনেকটা প্রাণশক্তি লাগে। আমি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছি যেখানে ঘৃণা বা ভালোবাসা সবই এক পরম নির্লিপ্ততায় ঢাকা।
ম্যাম, আমি সত্যি আপনাদের কাউকেই ভাইয়ার মৃ'ত্যুর জন্য দায়ী করি না। হ্যাঁ, প্রতিটি সেকেন্ড আমার বুকের ভেতরটা এক অবর্ণনীয় ক'ষ্টে চিড়িবিড়িয়ে উঠছে, কিন্তু কারো প্রতি আর কোনো ক্ষো'ভ বা রাগ আমার অবশিষ্ট নেই। এই কয়েকটা দিন আপনাদের সান্নিধ্যে থেকে আমি বুঝেছি একা থাকাটা কতটা বিভীষিকাময়। যখনই আপনাদের মাঝে থাকি, মনে হয় না যে আমি একা। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায়, যখন একাকীত্ব আমার ঘরের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসে, তখনই এই য'ন্ত্রণার হাহাকারগুলো যেন আমাকে ত'ছনছ করে দেয়।"
রোজেলিয়া এরিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, তার আঙুলের ডগায় ছিল এক পরম মাতৃত্বের উষ্ণতা। সে রোজেলিয়ার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্নিগ্ধ স্বরে বলল,
"তুমি তো আমার বোনের মতো এরিকা আমার বোনই ।তুমি আমার পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখনই তোমার মনে হবে এই একাকীত্বের পাহাড় তোমাকে গ্রাস করতে চাইছে, তুমি নিঃসংকোচে চলে আসবে । আমার দরজা আর আমার হৃদয় তোমার জন্য সবসময় খোলা থাকবে। আর রিভেন তোমাকে এড়িয়ে চলছে বলে ভেবো না যে ও তোমাকে অবহেলা করছে। রিভেন নিজেও এনজোকে হারানোর সেই একই আ'গুনে ভেতরে ভেতরে পু'ড়ে খা'ক হয়ে যাচ্ছে, ওর নীরবতা আসলে সেই শোকেরই এক কুৎসিত ভাষা। ও নিজে ওর এই অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি বলেই হয়তো তোমার সামনে এসে দাঁড়াতে পারছে না।"
এরিকার চোখের সেই মণি দুটোতে যেন এক নতুন প্রভাতের আভাস ফুটে উঠল। সে রোজেলিয়ার কথাগুলো শোনার পর এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল, যেন সে তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে এই আশ্বাসটুকু নিজের হৃদপিণ্ডে গেঁথে নিতে চাইছে।
রোজেলিয়া আবার কিছুটা ঝুঁকে এসে এরিকার কপালে এক আলতো চু'মু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কানাডায় গিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখো। তোমার ভাইয়া ঠিক এটাই চেয়েছিল, তোমাকে এক রাজকন্যার মতো স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেখার স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্নটা পূরণ করাটা এখন তোমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য, মাই ডিয়ার।"
এরিকা মৃদু হাসল।তার হাসিটা ছিল এক ঝরা পাতার মতো কোমল, যাতে কোনো তি'ক্ততা নেই, আছে কেবল এক পরম আত্মনিবেদনের সুর। সে তার ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, যেখানে এক নতুন গন্তব্য তাকে ডাকছে।
__________________
সাইলাস আর মার্কো এরিকাকে দুপাশ থেকে আগলে রেখে টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করল। আন্ডারগ্রাউন্ডের দুনিয়ায় তারা দুজনে যেন একেকটা জীবন্ত দেয়াল, যাদের চাউনিতে আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে যায়, কিন্তু আজ এরিকার জন্য তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক সতর্ক মমতা।
বিমানবন্দরের সেই বিশাল প্রাঙ্গণটায় একদিকে মানুষের তীব্র আনাগোনা, ঘোষণা আর অগণিত মানুষের ব্যস্ততার গুঞ্জন, আর অন্যদিকে এরিকার মনের ভেতরকার সেই নিঃশব্দ শূন্যতা। চারিদিকে সিকিউরিটি চেকপোস্ট আর লম্বা লম্বা সারি। সাইলাস ইশারা করতেই এরিকার জন্য এক আলাদা ভিআইপি ল্যাউঞ্জের পথ খুলে গেল।
সাইলাস এরিকার সুটকেসটা ট্রলির ওপর থেকে নামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
"তুমি এগিয়ে যাও, এরিকা। তোমার সব কাগজপত্র রেডি আছে, তোমাকে কোথাও দাঁড়াতে হবে না। আমরা সব আগেই হ্যান্ডেল করে রেখেছি।"
এরিকা তার ফ্যাকাশে চোখে ল্যাউঞ্জের সেই কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা যেন এক অদৃশ্য পাথরের চাপে বারবার দু'মড়ে-মু'চড়ে যাচ্ছিল। সে সাইলাসের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসল, যে হাসিতে একরাশ বি'ষাদ আর কৃতজ্ঞতা মিশে ছিল।
মার্কো এতক্ষণ খুব গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তার সেই চেনা দুষ্টুমি সুলভ চাহনি আজ পুরোপুরি অনুপস্থিত। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে এরিকার কাঁধে হাত রাখল। মার্কোর চোখের কোণেও যেন এক মুহূর্তের জন্য কোনো এক অকথিত শোকের ছায়া খেলে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল,
"কানাডা একটা দারুণ জায়গা, এরিকা। ওখানে পৌঁছানোর পর নিজেকে ছোট ছোট কাজে ব্যস্ত রেখো ।একদম মন খারাপ করবে না আবার দেখা হবে। আমরাও যখন সুযোগ পাবো কানাডা গিয়ে তোমাকে দেখে আসবো"
এরিকা মাথা নাড়ল। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল এক গভীর আচ্ছন্নতা। বোর্ডিং গেটের দিকে যাওয়ার জন্য সে যখন ধীর কদমে হাঁটতে শুরু করল, তখন সাইলাস আর মার্কো দুজনই দাঁড়িয়ে রইল।
বিমানবন্দরের সেই বিশাল নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে এরিকা এক গভীর শ্বাস নিল। সে জানে, এই বিমানে চড়া মানেই এক নতুন জীবনের যাত্রা, যেখানে এনজোর অস্তিত্ব আর কেবল স্মৃতির আলমারিতে বন্দি থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা।
বোর্ডিং গেটের ঠিক সামনে গিয়ে এরিকা একবার পেছন ফিরে তাকাল। দূর থেকে সাইলাস আর মার্কোকে দেখা যাচ্ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই দুই দু'র্ধর্ষ মাফিয়া, যারা শত বিপদেও ভ্রূক্ষেপ করে না, তারা আজ এক মুহূর্তের জন্য যেন তাদের সমস্ত আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে সাধারণ অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সাইলাসের গম্ভীর মুখমণ্ডল, যেখানে সর্বদা এক চিলতে রূঢ়তা খেলা করে, আজ সেখানে কোনো এক অব্যক্ত বেদনার রেখা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। মার্কো তার হাত দুটো পকেটে গুঁজে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
এরিকা আবার সামনের দিকে তাকাল। সামনেই অসীম আকাশের হাতছানি। এই বিমানে চড়া মানেই কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করা নয়, বরং অতীতের সেই র'ক্তমা'খা অন্ধকার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নতুন অস্তিত্বের দিকে যাত্রা। তার ম'স্তিষ্কের পা'রদে পা'রদে আ'ন্দোলন করে উঠল ইতালিতে তাদের সুন্দর স্মৃতিগুলো ।
বোর্ডিং ব্রিজ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় জানালার কাঁচের ওপারে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এয়ারক্রাফটটাকে দেখে এরিকার বুকের ভেতরটা তৎক্ষণাৎ মা'ত্রাতিরিক্ত ক্রো'ধে আর শোকে চিড়বিড়িয়ে উঠল। সে নিজের মুঠোয় ধরে থাকা পাসপোর্টের ওপর আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল, যেন ওই ছোট্ট কাগজটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র নোঙর।
যখন বিমানটি রানওয়ে ছেড়ে আকাশের বুকে ডানা মেলল, এরিকা জানালার পাশে বসে নিচে তাকাতেই দেখল ইতালির শহরটা ক্রমে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। সেই মুহূর্তে তার চোখের কোণ গড়িয়ে এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল, যা তার গাল বেয়ে এক বিষাদময় রেখা তৈরি করল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
"আমি আসছি, ভাইয়া। তোমার দেখা সেই স্বপ্নের ক্যানাডায় আমি আসছি।"
নিচে টার্মিনালের ছাদে দাঁড়িয়ে সাইলাস আর মার্কো দেখল সেই বিমানটি মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।বিমানবন্দরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় আর ধূ'মপানমুক্ত অঞ্চলের বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করেই সাইলাস তার পকেটের ভেতর থেকে সিলভার কেসটা বের করল। একটা সি'গারেট ধরিয়ে সাইলাস ধোঁ'য়া ছাড়ল। সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসের সাথে মিশে এক অদ্ভুত বি'ষাদ তৈরি করল।
বিমানবন্দরের নিয়মনীতি বা বিধিনিষেধ এই মুহূর্তে সাইলাসের কাছে তা নিতান্তই তুচ্ছ। তার ভেতরটা তখন এক হিমশীতল শূন্যতায় কুঁকড়ে আছে, যেখানে আইনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এরিকার বিদায়ে সৃষ্ট সেই দীর্ঘশ্বাস।
বিমানের গর্জন তখন ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। মার্কো এখনো অপলক দৃষ্টিতে আকাশের সেই বিন্দুটার দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে এরিকাকে নিয়ে বিমানটি মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
মার্কোর দৃষ্টি ছিল এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতায় মোড়ানো তার সেই পরিচিত চপলতা আজ পুরোপুরি বিলীন। সে খুব ধীর লয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বিড়বিড় করে উঠল,
"জানিস সাইলাস? মেয়েটা... ছোটবেলায় তোকে বড্ড পছন্দ করত"
সাইলাস সি'গারেটে এক দীর্ঘ টান দিল। তার চোখের দৃষ্টি তখন দিগন্তের অসীম নীলিমায় স্থির। ধোঁয়া ছেড়ে সে অত্যন্ত নিরুদ্বেগ কণ্ঠে, অতি সংক্ষেপে উত্তর দিল,
"হুম।"
কিন্তু তার এই একটা শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ'হন। সাইলাস জানত, এরিকার সেই শৈশবের মুগ্ধতা আজ আর অবশিষ্ট নেই। এনজোর মৃত্যুতে সেই মুগ্ধতা আজ একরাশ শোক আর নিঃসঙ্গতায় রূপান্তরিত হয়েছে।মার্কো আবার একটু ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত স্মৃতিমেদুরতা, যেন সে অতীতে ফিরে যাওয়ার একটা অদৃশ্য সুড়ঙ্গ খুঁজে পাচ্ছে। সে আবার জেদের মতো কথাটা পুনরায় উচ্চারণ করল, তার কণ্ঠে এবার এক ব্যঙ্গাত্মক অথচ করুণ সুর,
" ও তোকে ভীষণ পছন্দ করত,সাইলাস ।ভালোবাসতো তোকে "
সাইলাস এবার সি'গারেটটা আঙুলের ডগায় চেপে ধরল, তার ধূসর চোখের মণি দুটোয় এক তীব্র অস্থিরতা খেলে গেল। সে জানে মার্কো তাকে উস্কাচ্ছে, সে জানে এরিকার সেই শৈশবের নিষ্পাপ টানটা আসলে কত বড় এক দায়ভার। সাইলাস সি'গারেটের ধোঁয়াটা আকাশের দিকে মুখ করে জোরে ছেড়ে দিয়ে অত্যন্ত ধারালো গলায় বলে উঠল,
"হুম। কিন্তু সেটা ছিল এক অন্য পৃথিবী, মার্কো। আজকের এই পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি জানি ও আমাকে পছন্দ করত, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসতে চেয়েছি কেবল এক ভাই হিসেবে, এক অভিভাবক হিসেবে। ওকে কানাডায় পাঠানোটা আমার কাছে শুধুমাত্র একটা দায়িত্বই নয় বরং এনজোর প্রতি আমার শেষ অঙ্গীকার। ওই মেয়েটার চোখে এখন আর কোনো মুগ্ধতা নেই, আছে কেবল এক বি'ধ্বস্ত আ'ত্মার শোক। সেই শোকের ভাগিদার হওয়ার মতো যোগ্যতা কি আমার আছে?"
মার্কো কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর হালকা মৃদু হাসল, সে সাইলাসের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
"জীবনকে কি আর একবার সুযোগ দেওয়া যায় না? মানে আমি বলছি ধর, তুই আমার মতো হয়ে যা। ক্লাব আর সেখানকার ললনাদের ভিড়ে এই সব শোক উ'ন্মা'দনা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে"
সাইলাসের ভেতরটা তৎক্ষণাৎ মাত্রাতিরিক্ত ক্রো'ধে চিড়িবিড়িয়ে উঠল। সে মার্কোর হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে এক গা'লি দিল,
"ফা'কিং ও'ম্যানা'ইজার! গেট লস্ট, মার্কো!"
মার্কো একটুও বিচলিত না হয়ে বরং শব্দ করে হেসে উঠল, যেন সে এক অমোঘ সত্যি বলে ফেলেছে। সে মাথা নাড়ল,
"মানুষ যে কীভাবে একটা নারীর জন্য নিজের পুরো জীবন এভাবে বি'সর্জন দিতে পারে, আমি বুঝি না।"
সাইলাস এবার মার্কোর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। সি'গারেটটাতে শেষ এক গভীর টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সে অত্যন্ত নিস্পৃহ অথচ ভারী গলায় বলল,
"নাইলা আমার সব ছিল, মার্কো। ও আমার জীবনের প্রথম নারী, শেষ নারী এবং সব কিছু। ওই একটা নামেই আমার পুরো পৃথিবী বন্দি। ও ছাড়া অন্য কারো ভালোবাসা দেখার মতো দৃষ্টি আমার নেই, কারণ আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ধমনীতে এখনো নাইলার স্মৃতিই র'ক্ত হয়ে বইছে।"
সাইলাসের কণ্ঠের সেই হিমশীতল শূন্যতা আর আবেগের তীব্রতা মুহূর্তের জন্য বিমানবন্দরের ছাদটাকে নিস্তব্ধ করে দিল।স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে এক মুহূর্তের বি'দ্যুৎ চমকের মতোই নাইলার মুখচ্ছবি সাইলাসের মস্তিষ্কের ভেতর আন্দোলন করে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই মুখ যার প্রতিটি রেখায় ছিল এক অপার্থিব প্রাণশক্তির স্পন্দন।তার গাঢ় বাদামী রঙের চোখদুটো , যেন কোনো এক গহীন অরণ্যের রহস্যে মোড়ানো শান্ত দীঘি। সাইলাসের মনে পড়ে গেল, সেই চোখের গভীরে তাকালে সে নিজেকে খুঁজে পেত, হারিয়ে ফেলত আন্ডারগ্রাউন্ডের সমস্ত হিং'স্রতা। নাইলা যখন হাসত, মনে হতো বাতাসের প্রতিটি অণু যেন খুশিতে নেচে উঠছে।
তার ঝগড়াটে মেশিন ছিল তার ভালোবাসার এক অবিরাম প্রবাহ, যার প্রতিটি স্পন্দনে সাইলাসের পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার হতো। নাইলার চঞ্চলতা , ঝগড়াটে মে'জাজ সবই যেন সাইলাসের ধূসর জীবনে রঙের ছিটেফোঁটা ছিল। কী করে ভুলবে সে এই মেয়েটাকে ?
মার্কো পাশ থেকে একদৃষ্টিতে সাইলাসের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে জানে, এই মানুষটার বুকের ভেতর কত বড় একটা শ্ম'শান পু'ড়ে ছা'ই হয়ে আছে। সাইলাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ভারী গলায় বলতে শুরু করল,
"মানুষের জীবনে ভালোবাসা হয়তো অনেকবার আসে, মার্কো। কিন্তু প্রথম অনুভূতি? সেই প্রথমবার কারো চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের অ'স্তিত্বকে বি'লীন করে দেওয়ার সেই ব্যাকুলতা কি আর দ্বিতীয়বার আসে? নাইলা ছিল আমার কাছে ঠিক তেমন এক প্র'লয়ংকরী ঝড়ের আগের স্নিগ্ধ আকাশ। আমার পুরো সত্তা, আমার যাবতীয় অন্ধকার সবই যেন মেয়েটার গিয়ে নতজানু হয়ে যেত।"
সাইলাস সি'গা'রেটের ছা'ইটা নিচে ঝেড়ে দিয়ে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসল, যে হাসিতে একরাশ দ'হন স্পষ্ট,
"জানিস মার্কো ভালোবাসা সবার জীবনে একই রঙ নিয়ে আসে না। কারো কারো ক্ষেত্রে ভালোবাসা আসে শান্ত বসন্তের মতো যা ধীরলয়ে আসে, জীবনের সবটুকু পূর্ণতা দিয়ে যায়। আবার কারো কারো জীবনে ভালোবাসা আসে টর্নেডোর মতো যা সবকিছু ও'লটপা'লট করে দিয়ে যায়, ত'ছন'ছ করে দেয় গোটা পৃথিবী, কিন্তু রেখে যায় এক এমন ধ্বং'সাবশেষ, যা আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। নাইলা ছিল আমার জীবনে সেই ট'র্নেডো। সে এসেছিল, আমাকে জীবনের মানে শিখিয়েছিল, আর তারপর নিজেই চলে গিয়ে আমাকে বানিয়ে দিয়েছিল এই নিস্প্রাণ সাইলাস ডুয়েন"
সে একটু থেমে আকাশের দিকে তাকালো। তার কণ্ঠে এবার এক চরম সত্যের উপলব্ধি,
"বসন্তের ভালোবাসা মানুষ হয়তো ভুলে যেতে পারে। কিন্তু ট'র্নেডোর ধ্বং'সয'জ্ঞের দাগ কি কেউ কোনোদিন মুছতে পারে? আমি সেই ট'র্নেডোর শেষ চিহ্নটুকু বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। আমার আর কোনো নতুন ভালোবাসার প্রয়োজন নেই, কারণ ওই ধ্বং'সাবশেষের মধ্যেই আমি আমার সমস্ত আনন্দ, সমস্ত দুঃখ আর সমস্ত অ'স্তিত্বকে খুঁজে পাই। নাইলা ছাড়া আমার জীবনের ব্যাকরণ তো অসম্পূর্ণ, আর সেই অসম্পূর্ণতা নিয়েই আমার পথচলা।"
সাইলাসের প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি সুঁ'ইয়ের মতো বিঁ'ধছিল। সে তার ধূসর দৃষ্টি নিয়ে আবার বিমানবন্দরের সেই বিশাল টার্মিনালের দিকে ফিরল, যেখানে এখন কেবল এক বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছে ।
__________________
টরন্টোর আকাশটা আজ যেন কোনো এক অখণ্ড বি'ষাদগ্রস্ত ক্যানভাস, যেখানে পাইন গাছের ধূসর সারিগুলো দিগন্তের রেখায় একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরিকাদের বিলাসবহুল গাড়িটা শহর পেরিয়ে হাইওয়ে ধরে ছুটছে। এরিকা চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে আছে ।তার জানালার কাঁচের ওপারে ফেলে আসা ইতালির দিনগুলো এখন এক আবছা মরীচিকার ন্যায় ভেসে উঠছে।
ক্যালেন্তিয়া পাশে বসে আছে নির্বাক হয়ে
আর সামনের সিটে বসা দীর্ঘদেহী বডিগার্ডটি পাথরের মূর্তির মতো সতর্ক দৃষ্টি রাখছে রাস্তার প্রতিটি বাঁকে। এরিকা তাদের নাম বা পরিচয় নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না ।তার মনের ভেতরটা তখন জলোচ্ছ্বাসের ঠিক আগের নিস্তব্ধতার মতো একই সাথে শোকের তীব্র দ'হন এবং এক অজানার আতঙ্ক। ইতালির কথা খুব মনে পড়ছে তার মনে হচ্ছে এনজো থেকে বহু দূরে চলে এসেছে সে ।
গাড়িটা একসময় সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছাল। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার টফিনো প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এই এলাকাটি যেন রূপকথার কোনো ক্যানভাস।বারান্দার সাদা কাজের ওপর সূর্যের আলো পড়ে এক অলৌকিক দ্যুতির সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রের গর্জন যখন বাতাসে ভেসে আসছে, তখন এরিকার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আবেগে কেঁপে উঠল।
গাড়িটা একটি পাথুরে রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে থামল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রমুখী এক অসাধারণ সুন্দর কটেজ। কাঠের তৈরি বাড়িটির বারান্দায় সাদা রঙের কাজ করা, আর তার নামফলকে লেখা - "Erika & Enzo's heaven "
এরিকা গাড়ি থেকে নামতেই সমুদ্রের নোনা বাতাসের শীতল স্পর্শ তার চুলে এসে আছড়ে পড়ল। সমুদ্রের উন্মত্ত ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে উপকূলের বালিয়াড়িতে, আর দিগন্তের আকাশটা নীল আর ধূসরের এক অদ্ভুত মায়ায় মিশে আছে।
ক্যালেন্তিয়া ধীর পায়ে এরিকার পাশে এসে দাঁড়াল, তার কণ্ঠে ছিল এক গভীর সমবেদনার সুর, সে পরম মমতায় এরিকার হাতের ওপর হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল,
"ম্যাম, এই বাড়িটি এনজো স্যার আপনার জন্য কিনেছেন "
এরিকার চোখের মণি দুটি যেন হঠাৎ কোনো এক অতল বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। তার চোখের কোণ ঘেঁষে জমে থাকা নোনাজল তখন বাঁধভাঙা নদীর মতো তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে বারান্দার দিকে পা বাড়াল, তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক যুগের ক্লান্তি।তাহলে এই উপহারটার জথায় এনজো বারবার বলছিলো।
তার হঠাৎই মনে পড়ে সে ছোটবেলায় প্রায়সময় বলতো যে সে সমুদ্রের ধারে একটা বাড়ি কিনতে চায়।সমুদ্র তার খুব পছন্দ ।তার কথাটা এতোবছর মনেও নেই অথচ এনজো তার সেই নিছক বালখিল্যতাকে এত বড় এক বাস্তবতায় রূপ দেবে, তা সে ভাবতেই পারেনি।
এনজো নেই ,তার ভাইয়ের সেই উষ্ণ বাহুডোর নেই যেখানে সে নিজের সমস্ত ভার সমর্পণ করে তাকে ধন্যবাদ জানাবে এই বিশেষ উপহারের জন্য এই উপলব্ধিটুকু যেন তার শিরদাঁড়ায় বিদ্যুতের শ'ক দেওয়ার মতো আ'ঘাত করল।
তার সারা শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে ।এক অসহায় শিশুর মতো, যার পৃথিবীটা মুহূর্তের ব্যবধানে এক বিশাল শূন্যতায় পর্যবসিত হয়েছে।এরিকার চোখের জল তখন কটেজের কাঠের মেঝের ওপর টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে, প্রতিটি বিন্দু যেন এনজোর প্রতি তার শেষ বি'সর্জনের এক একটা অমোঘ সাক্ষ্য। তার হৃদয়ের ভেতরের হাহাকার এই উত্তাল সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে এক অদ্ভুত বিষাদময় সুর রচনা করছে। ক্যানাডার এই শান্ত উপকূলে দাঁড়িয়ে এরিকা অনুভব করল, এনজোর এই বিশাল ভালোবাসার ভার বহন করার মতো শক্তি তার নেই সে যেন এনজোর দেওয়া এই স্বর্গের ভেতরে দাঁড়িয়েই এক গভীর ন'রকয'ন্ত্রণা ভোগ করছে, যেখানে সমুদ্রের উন্মত্ত ঢেউগুলো কেবল তার ভাইয়ের স্মৃতির নোনা স্বাদ বহন করে নিয়ে আসছে। প্রকৃতির এই বিশালতা যেন আজ তার সামনে এক মস্ত উপহাসের মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর সে সেই শোকের দ'হনে দ'গ্ধ হয়ে যাচ্ছে ।
************************************************************************
"লেডিস ফার্স্ট।"
রিভেনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ পরিশীলিত সৌজন্যবোধে রোজেলিয়া এক চিলতে ম্লান হাসি হাসল। সে ধীর কদমে গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে গিয়ে বসল। রিভেন আলতো করে দরজার হাতল ধরে মৃদু শব্দে সেটা আটকে দিল, তারপর দ্রুতপায়ে ঘুরে এসে নিজের ড্রাইভিং সিটে চেপে বসল। রাত তখন প্রায় ১২:১৫।
গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইঞ্জিন থেকে একটা মৃদু গর্জন বেরিয়ে এল, যা রাতের নীরবতাকে খানিকটা কাঁপিয়ে দিল। রোজেলিয়া জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে রইল। আজ এই বিশাল প্রাসাদের প্রতিটা ঘর, প্রতিটি গথিক আর্চ, যেন এক এক করে তার দিকে ধেয়ে আসছে একাকীত্বের এক তীব্র হাহাকার নিয়ে। এরিকা চলে যাওয়ার পর আরওয়াইন ম্যানশনটা আজ সত্যিই এক মরুভূমির মতো ফাঁকা লাগছে তাই রিভেন তার মন ভালো করতে তাকে লং ড্রাইভে নিচ্ছে । রিভেন স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একবার পাশের সিটে বসা রোজেলিয়ার দিকে আড়চোখে তাকাল।
রিভেন গাড়িটাকে ম্যানশনের গেট পার করে হাইওয়ের দিকে মোড় নিল। হেডলাইটের তীব্র আলো অন্ধকারের বু'ক চিরে এক দীর্ঘ পথ তৈরি করে দিল সামনে।গাড়ি চলতে শুরু করতেই রিভেন নিচু স্বরে বলল,
" রোজ পেটাল কি বিন্দুমাত্র খুশি হয়নি? আমার কী আবার ফিরে যাওয়া উচিত"
রোজেলিয়া জানালার কাঁচে ঠেকানো কপালটা সরিয়ে রিভেনের দিকে ফিরল। সে কিছুটা হালকা হওয়ার চেষ্টা করল। সে রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসিতে বলে উঠল,
"না রিভেন, ফিরে যেতে হবে না। তোমার সাথে এই নির্জন পথে থাকাটাই এখন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমার এমনি একটু খারাপ লাগছে এরিকার জন্য তাই"
"তাহলে খারাপ লাগা দূর করার জন্য কিছু করো ।আমার প্রেয়সীর মনের বিষন্নতা কাটাতে এই রিভেন সব করতে পারে "
রোজেলিয়া এবার নিজেকে একটু হালকা করার জন্য তুচ্ছ কিছু নিয়ে কথা শুরু করল। সে রিভেনের গলার কাছে থাকা শার্টের বোতামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা রিভেন, তোমার প্রিয় রঙ কী?"
রিভেন জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কিন্তু কোমল স্বরে বলল,
"আমার প্রিয় রং ?"
"হুম ,বলো না প্লিজ"
রিভেন এবার রোজেলিয়ার চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করলো ,
"আমার প্রিয় রং হলো বাদামী "
রোজেলিয়া কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
"বাদামী? কেন? এটা তো খুব সাধারণ একটা রঙ।"
রিভেন মৃদু হেসে আবার রোজেলিয়ার চোখের মণি দুটোর দিকে এক পলক তাকাল,
"কারণ আমার প্রেয়সীর চোখের রঙ বাদামী। যে রঙে আমি আমার শান্তি খুঁজে পাই, সেটা সাধারণ হতে পারে না।"
রোজেলিয়া লজ্জিত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল, কিন্তু রিভেনের কথায় তার হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে গেল। সে একটু সামলে নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা, আর প্রিয় ফুল? ব্ল্যাক রোজ তো নিশ্চয়ই হবে?"
রিভেন স্টিয়ারিং হুইলটা এক হাতে আলতো করে ধরে বলল,
"ফুলটা হলো সূর্যমুখী "
রোজেলিয়া এবার সত্যিই অবাক হলো, তার চোখের বিস্ময় যেন উপচে পড়ছে। সে বলল,
"সূর্যমুখী? কিন্তু কেন? তোমাকে তো কোনোদিন এই হলুদ রঙের ফুলের ভক্ত হতে দেখিনি!"
রিভেন গাড়ির ড্যাশবোর্ডে থাকা আলোর দিকে তাকিয়ে খুব কাছ থেকে রোজেলিয়ার চোখের দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কারণ আমার প্রেয়সীর চোখের ভেতরে আমি এক অদ্ভুত সূর্যমুখীর গঠন দেখতে পেয়েছি। যখন তুমি আলোতে আমার দিকে তাকাও, তোমার চোখের মণির চারপাশে ঠিক যেন সূর্যমুখীর পাপড়ির মতো এক মায়াবী নকশা ফুটে ওঠে"
রোজেলিয়া তার বড় বড় চোখ দুটোতে বিস্ময়ের এক অতলান্তিক সাগর নিয়ে রিভেনের দিকে ঝুঁকে এল। তার কৌতূহল এখন বাঁধনহারা। সে ফিসফিস করে বলল,
"এটা কি সত্যি? কই, আমি তো কোনোদিন আমার চোখের ভেতরে সূর্যমুখী খুঁজে পাইনি! আমি দেখতে চাই, রিভেন। আমাকে দেখাও তো!"
রিভেন মৃদু হাসল, তার ঠোঁটের কোণে খেলা করা সেই রহস্যময় হাসিটা রাতের অন্ধকারে যেন চাঁদের আলোর মতো উজ্জ্বল। সে স্টিয়ারিং এক হাতে নিয়ন্ত্রণ করে ড্যাশবোর্ডের দিকে ইশারা করে বলল,
"দেখবে? তাহলে আমার ফোনটা নাও"
রোজেলিয়া চট করে রিভেনের স্মার্টফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিন লক করা। সে কিছুটা ভ্রু কুঁচকে রিভেনের দিকে তাকাল,
"ফোনটা লক করা, রিভেন। লক কি?"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য রোজেলিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল,
‘My Only Sanctuary’
রোজেলিয়া দেখলো কী প্যাডের উপরে লেখা 'রোজ পেটাল ইজ ' ।সে কিঞ্চিৎ থমকে গিয়ে ফোনের কী প্যাডে রিভেনের বলা শব্দগুলো টাইপ করল । ফোনটা আনলক হতেই রোজেলিয়ার চোখ ছা'নাবড়া হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওয়ালপেপারে তার নিজেরই এক ছবি সে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, জানালার ধারের ম্লান আলো এসে তার চিবুকে পড়েছে। রোজেলিয়া রিভেনের দিকে এক তীব্র ডে'ড গ্লে'য়ার বা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বলল,
"তুমি লুকিয়ে আমার ছবি তোলো না? এটা খুব অন্যায়, রিভেন!"
রিভেন নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
"যে সৌন্দর্য প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ দান, তাকে ফ্রেমে বন্দি করা কি অপরাধ? যাও, গ্যালারিতে ঢোকো"
রোজেলিয়া গ্যালারিতে গিয়ে ফাইলগুলোতে চোখ বোলাতে শুরু করল। রিভেনের ইশারা অনুযায়ী সে ৩ নম্বর ফোল্ডারটিতে ক্লিক করল। সেখানে অসংখ্য ছবি, যার অধিকাংশেরই কেন্দ্রবিন্দু রোজেলিয়া। সে একটি ছবির ওপর ক্লিক করতেই রিভেন শান্ত স্বরে নির্দেশ দিল,
"ছবিটা জুম করো, রোজ। একবারে চোখের মণিটার ওপর ফোকাস করো।"
রোজেলিয়া তার আঙুল দিয়ে স্ক্রিনটা জুম করতে শুরু করল। যতবার সে জুম করছে, তার হৃদস্পন্দন ততটাই তীব্র গতিতে বাড়ছে। এক সময় ছবিটা একেবারে তার চোখের গভীরে ফোকাস হলো। রোজেলিয়ার দম যেন বন্ধ হয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে সকালের একফালি রোদের আলো তার চোখের মণির ওপর এসে পড়েছে, আর সেই আলোর বিচ্ছুরণে তার বাদামী চোখের চারপাশটা যেন সত্যিই সূর্যমুখীর পাপড়ির মতো নিখুঁত জ্যামিতিক নকশায় ফুটে উঠেছে। চোখের মণির সোনালী আভা আর বাদামী রঙের সংমিশ্রণটি ঠিক যেন একটি জলজ্যান্ত সূর্যমুখী ফুল।
রোজেলিয়া হতবাক হয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে নিজের চোখের এই অনন্য রূপটি কোনোদিন লক্ষ্য করেনি। তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আবেগে দুলতে লাগল। আলো-ছায়ার এমন নিখুঁত খেলায় যে তার নিজের চোখেই এমন এক রহস্যময় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা সে আগে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।রোজেলিয়া অপলক দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল। তার গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
"আমি... আমি জানতামই না যে আমার চোখ আলোতে এমন দেখায়।"
হঠাৎ এক যান্ত্রিক কম্পনে রিভেনের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল জ্যাক এর নাম। রিভেন গাড়ি চালাতে চালাতেই পাশের সিটে থাকা রোজেলিয়ার দিকে ইশারা করল,
"রিসিভ করো, রোজ।"
রোজেলিয়া দ্রুত স্পিকারে বাটনটি টিপতেই জ্যাকের উ'ত্তে'জিত এবং ভারী কণ্ঠস্বর পুরো গাড়ির ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো,
"বস! আমাদের রাডারে অন্তত তিন-চারটে মার্সিডিজ ধরা পড়েছে। ওরা হাইওয়ের দিকেই আসছে, সম্ভবত আমাদের ট্র্যাক করছে। আমরা ওদের থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি!"
রিভেনের চোয়াল মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল। তার হ্যাজেল চোখ দুটোয় এক হিং'স্র আ'গুনের আভা খেলে গেল। সে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে গাড়িটাকে রাস্তার পাশে ঘুরিয়ে নিল। ব্রেক কষার তীব্র শব্দে টায়ারের পো'ড়া গ'ন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
"রোজ, শোনো!"
রিভেন অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে বলল আর রোজেলিয়াকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়ির বাইরে বের করে নিয়ে এল। সামনেই একটা ঘন ঝোপঝাড়। রিভেন রোজেলিয়ার কবজিতে থাকা ব্রেসলেটটার দিকে একবার তাকাল এবং সেটার হুকটা আলতো করে টিপে দিল।
"এটায় ট্র্যাকার আছে, রোজ। মার্কো আর তার স্কোয়াড ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে এখানে থাকবে। ওইদিকে লুকিয়ে থাকবে। কোনো শব্দ করবে না, যতক্ষণ না মার্কো তোমাকে ডাকছে।"
রোজেলিয়া চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রিভেন তার ঠোঁটে একটা আঙুল রেখে মৃদু কিন্তু আদেশের সুরে বলল,
"ট্রাস্ট মি। জাস্ট স্টে দেয়ার।"
রিভেন তাকে ধাক্কা দিয়ে ঝোপের অন্ধকারে ঠেলে দিল। রোজেলিয়া ঝোপের আড়ালে পাথরের মতো জমে রইল। তার হৃদপিণ্ড তখন গলার কাছে এসে লাফাচ্ছে। ঠিক তখনই হাইওয়ের বুক চিরে ধেয়ে এল সেই মার্সিডিজগুলোর হেডলাইটের তীব্র আলো।রিভেন এক ঝটকায় গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। টায়ারের তীব্র ঘ'র্ষণে রাস্তা কেঁপে উঠল, তারপরই একটা কালো চি'তার মতো গাড়িটা বিদ্যুৎবেগে সামনের দিকে ধেয়ে চলল। পিছু নেওয়া মার্সিডিজগুলোও যেন ক্ষু'ধার্ত নে'কড়ের মতো আর্তনাদ করতে করতে তাকে তাড়া করে ফিরল।
ঝোপের আড়ালে অন্ধকারে কুঁকড়ে বসে থাকা রোজেলিয়ার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। তার শ্বাসনালী দিয়ে আসা প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন কাঁ'চের টু'করোর মতো বু'কের ভেতর বিঁ'ধছে। চোখের সামনে যা ঘটছে, তা তার উপলব্ধির বাইরে ।রিভেন আসলে কী করতে চাচ্ছে ? ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখা সেই হেডলাইটের নাচানাচি আর গাড়ির ইঞ্জিনের তীব্র গর্জন তার মস্তিষ্কের পারদে পারদে ভয় আর আতঙ্কের এক বি'ভীষিকাময় জট পাকাচ্ছিল। এই মার্সিডিজগুলো কাদের? রিভেনের শত্রুরা কি এতটাই বেপরোয়া যে প্রকাশ্য হাইওয়েতে এমন তা'ণ্ডব চালাচ্ছে? প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে একটা শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নারকীয় শব্দের মাঝে দূর থেকে ভেসে এল অন্য এক জোড়া গাড়ির তীব্র গতি আর টায়ারের আ'র্তনাদ। দুটো গাড়ি ধুলোর ঝড় উড়িয়ে রিভেনের চলে যাওয়া পথের দিকেই প্রচণ্ড গতিতে ছুটল। কিছুক্ষণ পরেই শেষ গাড়িটি একটা যান্ত্রিক ঝটকায় ব্রেক কষে রাস্তার কিনারায় থমকে দাঁড়াল।
গাড়ির দরজা খুলে যে ব্যক্তিটি বেরিয়ে এল, সে দীর্ঘকায় আর তার চলনভঙ্গিতে এক দুর্ধর্ষ আভিজাত্য। অন্ধকারের বুক চিরে সেই মানুষটির কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
"ম্যাম! এখানে আছেন? বেরিয়ে আসুন!"
রোজেলিয়া পাথরের মতো জমে রইল। আতঙ্কে তার মস্তিষ্কের সমস্ত যুক্তি যেন লোপ পেয়ে গেছে। এই কণ্ঠস্বর... পরিচিত, তবুও এই বিভীষিকাময় মুহূর্তে তার চেনা জগতটাকেও যেন অচেনা ঠেকছে। সে নিজের নামটা পর্যন্ত ভুলে গেছে কি না, সেই সংশয়ে নড়াচড়া করতে পারল না। মানুষটি আবার ডাকল, কণ্ঠস্বরে এবার উদ্বেগ ,
"ম্যাম! রোজেলিয়া ম্যাম! আমি মার্কো। দয়া করে ভয় পাবেন না, দ্রুত বাইরে আসুন!"
মার্কোর নামটা কানে আসতেই রোজেলিয়ার সম্বিৎ ফিরল। সে কোনোমতে ঝোপের আড়াল থেকে টলমল পায়ে বেরিয়ে এল। তাকে দেখামাত্রই মার্কো স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত সামনে এগিয়ে এল, তার চোখে-মুখে তখন এক চরম সতর্কতার ছাপ।
"এখনই গাড়িতে উঠুন, ম্যাম! আমাদের হাতে সময় নেই!"
কিন্তু মার্কোর সেই অনুরোধের বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই নিস্তব্ধ রাতের আকাশ চিরে বি'কট এক বি'স্ফো'রণের শব্দ কেঁ'পে উঠল। সেই শব্দের কম্পন মাটির গভীরেও যেন অনুভূত হলো। তার ঠিক পরের মুহূর্তেই গর্জে উঠল অসংখ্য স্ব'য়ংক্রিয় অ'স্ত্রে'র গু'লির শব্দ । একনাগাড়ে বৃষ্টির মতো বু'লে'টের শব্দে চারপাশের দেবদারু গাছগুলোর ডালপালা ছিন্নভিন্ন হয়ে নিচে ঝরে পড়তে লাগল। দূরে রিভেনের গাড়িটা যেদিক দিয়ে গেছে, সেই দিক থেকে আ'গুনের এক বিশাল লে'লিহান শিখা অন্ধকার আকাশটাকে র'ক্তব'র্ণ করে তুলে গগনবিদারী এক বি'স্ফো'রণের আওয়াজে রাতের শান্ত বাতাসকে স্তব্ধ করে দিল।
রোজেলিয়ার গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক রু'দ্ধশ্বাস আর্তনাদ, তার পায়ের তলার মাটি যেন এক লহমায় ধ'সে গেল। রিভেন কি তবে...না এটা হতে পারে না? তার ম'স্তিষ্ক আর কোনো চিন্তা করার শক্তি পেল না, শুধু সেই আ'গুনের শি'খার দিকে চেয়ে তার পৃথিবীটা এক নিমেষে ধূ'সর হয়ে এল।
To be continue,,,,